আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২৫শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?

সকাল বেলা ড্রিল করা পিটির চেয়ে কম কষ্টকর, কিন্তু পুরো জিনিসটা প্রচন্ড রকমের বিরক্তিকর। স্টাফ একটু পর পর এসে কানের কাছে ভ্যান ভ্যান করে যাবে।

কি ক্লাস ১০, পা উঠে না? পায়ের মাঝখানে কি বাইন্ধা রাখছো? গুটনা টাইট করে ড্রিল হবে। প্রেড, মধ্য থেকে জলদিইইইইইই চল!

অসম্ভব রকমের মানসিক নির্যাতন। তাও আবার সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই। আজকের সারাদিন যে কেমন যাবে চিন্তা করছি আর “গুটনা” টাইট করে ড্রিল করার চেষ্টা করছি। ক্লাস ১০ কে খুব বড় ধরনের অপরাধ না করলে কেউ তেমন কিছু বলে না কারণ “সামনে এসএসসি পরীক্ষা”। দীর্ঘ ৪০ মিনিটের মানসিক অত্যাচার সহ্য করার পরে নাস্তার সময়ে ডাইনিং হলে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি এবারো এক মানসিক অত্যাচার অপেক্ষা করছে। নাস্তার মেন্যু হচ্ছে ব্রেড, বাটার, ডিম এইসব। ক্যাডেট যে ব্রেড খেতে অপছন্দ করে তা না! মাসে একবার ইংলিশ ডিনার দেওয়া হয় সেখানে ক্যাডেটের ব্রেড খাওয়া দেখলে মনে হবে এরা দুর্ভিক্ষ কবলিত মানুষ, কোনদিন ব্রেড খায় নি, ব্রেড কেন কোনদিন কিছুই খায় নি। এবং এই ক্যাডেটদের যদি বলা হয় যে, শনিবার আর বুধবারের সকালের নাস্তার ব্রেড ইংলিশ ডিনারে দেওয়া হবে এবং প্রতি শনিবার এবং বুধবারে ক্যাডেট না খেয়ে থাকবে, আমার মনে হয় ক্যাডেট হাসিমুখে রাজি হয়ে যাবে। সকালের দুই অত্যাচার সহ্য করে একাডেমির দিকে যাচ্ছি। এতকাল জুনিয়র স্কোয়াডের সিনিয়রমোস্ট ছিলাম, আর এখন সিনিয়র স্কোয়াডের জুনিয়রমোস্ট। ব্যাপারটা অনেকটা বিড়ালের মাথা থেকে বাঘের লেজ হয়ে যাওয়ার মত। ক্লাস ১০ এ উঠার একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে হাতঘড়ি পরার অনুমতি মেলে। যদিও কলেজ কর্তৃপক্ষ হাতঘড়ির নিয়মকানুন সম্পর্কে অনেক বিধিনিষেধ জারি করে দেয় বা দেয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু তারপরেও লোকে অনেক বাহারি ঘড়ি পরে ঘুরে বেড়ায়। ব্যাপারখানা এমন যেন হাতঘড়ি পরাটাও একটা বাহাদুরি। মার্চ করে আসতে আসতে একাডেমি ব্লকের নিচে এসে থামলাম। হাউজ প্রিফেক্ট অর্ডার দিল “স্থান ছাড়”। ডানে ঘুরে একটা একটা চেক মেরে হাঁটা দিলাম। ক্লাস ১১ এই “স্থান ছাড়” ড্রিলটা করে না। তারা শুধু থামে, তারপরে সোজা হাঁটা দেয়। আর ক্লাস ১২ তো অপ্রতিরোধ্য, তারা থামেই না, যেভাবে হেঁটে আসছিল, সেভাবেই হেঁটে চলে যায়। ক্লাসে বসে ক্লাস করছি। ক্লাস নাইন শুধু ঘুমিয়ে পার করে দিয়েছি, ক্লাস টেনে ঘুমালে একেবারে সর্বনাশ হয়ে যাবে, এজন্যে আমি এখন মনযোগী।
.
.
দিনটা এভাবেই কেটে যেতে পারত, আর বাকি ৫টা দিনের মত। সকালে পিটি, ব্রেকফাস্ট, ক্লাস, গেমস, প্রেপ, আবার পরদিন সকালে একই রুটিন। এভাবে চললে কোন ক্ষতি হত না। ক্লাস করতে করতে হঠাৎ শুনলাম, সবাই এক্ষুনি হাউজে যাবে, যে যেভাবে যে অবস্থায় আছে, সেভাবেই হাউজে যাবে। ঘটনা বুঝতে আমার খানিক সময় লাগল। ক্লাসের মধ্যে হঠাৎ হাউজ কেন? হঠাৎ মাথায় ঢুকল যে হয়ত হাউজ চেক হবে, এজন্যে। আমি মনে করলাম আমার কাছে বেআইনি কিছু নেইতো? কিছু টাকা আছে, যেটা এক্সকারশনের জন্যে রেখেছি। তাছাড়া কিছু নেই। এর মধ্যে একাডেমি ব্লকে হুলস্থুল কান্ড লেগে গেছে। আমি তাড়াতাড়ি করে আদিল সাধারণ গনিত গাইড, সাধারণ গণিত বই আর লকার থেকে একটা গল্পের বই নিয়ে বের হয়ে গেলাম। সবাই একাডেমি আর হাউজের কানেক্টিং শেড ব্যবহার করে হাউজের দিকে দৌড়াচ্ছে। যাওয়ার সময় দেখি আমার এক ক্লাসমেট জনৈক শিক্ষকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে,

স্যার, কি হইছে? সবাই দৌড়ায় কেন?

স্যার কোন কথা না বলে এক থাপ্পড় দিয়ে বলেন

মাতবর এসেছে খোঁজ নিতে, মানুষের জীবন চলে যাচ্ছে, আর আরেকজন এসেছে খোঁজ নিতে, যা বেটা হাউজে যা

আমি হেসে দেব না কেঁদে দেব ভাবতেছি আর হাউজের দিকে যাচ্ছি। মানুষের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে মানে? হাউজ পর্যন্ত যেতে পারলাম না, ডাইনিং হলের সামনে, কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের দাঁড় করালেন। এডজুটেন্ট স্যার আসলেন, এবং কোন ভূমিকা ছাড়াই কথা বলা শুরু করলেন। তিনি যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে, খুব একটা খারাপ অবস্থা। কিন্তু সবই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে, আমাদের চিন্তার কোন কারণ নেই, আমরা এখন হাউজে যাব, ঠিক সময়ে দুপুরের খাবার খাব, আজকে কোন গেমস নেই, রাতের বেলা প্রেপ নেই। এবং হাউজে যাওয়া মাত্র খাঁকি পোষাক পরিবর্তন করে সাদা পরার আদেশ হয়ে গেল, কলেজ ডিউটি ক্যাডেট সহ। আমরা ঘটনা অর্ধেক বুঝলাম না আর অর্ধেক মাথার উপর দিয়ে গেল। বিডিআর কার সাথে বিদ্রোহ করল? বিডিআরের এত রাগ কার উপরে? ওরা না কিছুদিন আগে স্বল্পমূল্যে চাল ডালের দোকান দিল? ঘটনা খুব গোলমেলে। আবার এদিকে টিভিরুমটাও খোলা নেই যে টিভিতে দেখব ঘটনা আসলে কি! টিভি রূম খোলার অনুমতিও মিলল না। সারাদিন এভাবে অনেক গুজবের উপর দিয়ে পার করলাম, বিভিন্ন জনে বিভিন্ন কথা বলে। সবচেয়ে হাস্যকর গুজব ছিল এরকম যে, বিডিআর এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে ঝামেলা হয়েছে। নিজের মানুষের মধ্যে ঝামেলা করার কি দরকার? আর সবচেয়ে ভীতিকর যে গুজব শুনলাম সেটা হচ্ছে, পিলখানার দরবারে বিডিআর জওয়ানরা অফিসারদের গুলি করে মেরে ফেলছে। রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম টিভি রুম খোলার জন্যে। টিভি রুমে ছুটে গিয়ে দেখি, সবচেয়ে ভীতিকর ঘটনাটাই সত্যি হয়েছে। আসলেই পিলখানায় নরক নেমে এসেছে। সেনা কর্মকর্তাদের লাশ এখানে সেখানে পড়ে আছে, অনেকেই নিখোঁজ, অনেকে জিম্মি। ঢাকা এখন উত্তপ্ত। ঢাকার উপর দিয়ে মাতাল হাওয়া বইছে। টিভি রুমে থাকা অবস্থায়ই শুনলাম যে আমাদের কলেজের ৪ জন এক্স-ক্যাডেট নিখোঁজ। নিউজ শুনে যতটা খারাপ লেগেছিল, এই ঘটনা শোনার পরে খারাপ লাগা আরো হাজারগুণ বেড়ে গেল। পরবর্তীতে শুনেছিলাম, তাদের লাশ উদ্ধার করা গেছে, কিন্তু দুইজনের অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, তাদের ডিএনএ টেস্ট করে শনাক্ত করতে হয়েছে। এই চারজনের মধ্যে একজন আবার আমাদেরই হাউজের আমাদের ইমিডিয়েট জুনিয়রের আপন চাচা। টিভির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। কেন? বেশিক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে থাকার জন্যে? নাকি অন্য কারণে? হতে পারে। গন্ধটা কিসের? লাশের? হতে পারে।
.
.
বাইরে এসে দেখি আকাশে চাঁদটা নেই। ও! আজকে তো অমাবস্যা। আসলেই আজকে অমাবস্যা। আজকে ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। দিনটা সাধারণভাবে যেতে পারত। সকালে ড্রিল, ক্লাস, গেমস, প্রেপ। সাধারণভাবে গেলেই হত! অন্য বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারির মত করেও যেতে পারত, কিন্তু গেল না। আর যাবেও না।

১৬ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।