অ-দাস

দাসত্ব আমাদের সমাজে একটা ঋণাত্বক শব্দ। চিন্তায়, কাজে, এমনকি শরীরেও আকণ্ঠ দাসত্বে ডুবে থাকা একটা মানুষও চিন্তা করার সময় “দাসত্ব” ব্যাপারটাকে খারাপ হিসেবে জানে। যদিও তাদের কাছে “দাসত্ব” আসলে যে কি বস্তু, খায় না মাথায় দেয় সেটা পরিষ্কার না। আবার মজার ব্যাপার হল এই লোকগুলাই আবার “অ-দাসদের” সন্দেহের চোখে দেখে, একটা ঘিনঘিনে অবজ্ঞার ভাব নিয়ে অ-দাসদের দিকে তাকায়, দাসের মগজ দিয়ে ওদেরকে ঠিক বুঝা যায়না কিনা। আর যেটাই তারা বুঝতে পারেনা সেটাকেই তারা “অস্তিত্বের জন্য হুমকি” হিসেবে দেখে, ভয় পায়। তাই অ-দাসদের অস্তিত্বই এরা অস্বীকার করতে চায়। আর তাই ঋণাত্বক হিসেবে বাজারে চালু থাকলেও একজন দাস কিন্তু দাসেদের মাঝেই স্বস্তি পায়, আর তাই তার চারপাশের সবাইকে, সবকিছু সে তার ছকে দেখতে চায়। দাসেরা বৈচিত্র ভয় পায়, বৈচিত্র তাদের শত্রু।
একইভাবে, দাস-মালিক সম্পর্কটাকে চলতি বাজারে প্রতিপক্ষের (antagonist) হিসেবে প্রচার করা হলেও আসলে বাস্তবে সেটা কাজ করে মিথোজীবিতার (simbiotically) মতন করে। দাস এবং মালিক, একে অন্যের পরিপূরক, দুই মিলে এক স্বত্তা এবং বাস্তবেও এরা খুব বেশী না হলেও প্রায়ই জায়গা বদল করে। সব দাসেরই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে কোন না কোনভাবে মালিক হয়ে বসা। আর তাই কোন একক মালিক ব্যাক্তি হিসেবে আমাদের চোখে খারাপ হতে পারে কিন্তু চিন্তা হিসেবে মালিকানার চেয়ে আরাধ্য কোন কিছু ইহজগতে নাই!
আমার সবসময়ই মনে হত দাসত্বের ব্যাবহারিক উপকারিতাটা আসলে কোথায় যে এরকম একটা বৈচিত্রহীন, বিষন্ন ব্যাপার মানুষের সাড়ে তিন লক্ষ বছরের ইতিহাসের প্রায় বেশীরভাগটা জুড়েই টিকে থাকল? আসলে প্রশ্নটা যত কঠিন, ব্যখ্যাটা আসলে ততটাই সহজ! দাস না হয়ে থাকাটাই আসলে খুব কঠিন। দাস হতে যত কষ্টই হোক, যত একঘেয়েই লাগুক, দাস হলে নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। দাস মানসিকতাই প্রমান করে আমরাও আর দশটা জীবিত প্রানী ছাড়া আর কিছু না। প্রানী বা জীবিত হতে হলে তাকে দুটো কাজ করতেই হবে, টিকে থাকা আর বংশ বিস্তার। দাসত্ব আমাদের এই প্রথম শর্ত পূরন করে। যত খারাপই হোক, দাস হলে খেতে পাওয়া যায়, পড়তে পাওয়া যায়, মাথার উপর ছাদ পাওয়া যায়। দাসত্ব কষ্টের হতে পারে কিন্তু সেটা নিরাপদ। জীবিত প্রানী (অবশ্যই মানুষ না অর্থে) মাত্রই নিরাপত্তা বাদ দিয়ে মানুষ হবার বিলাসিতা করতে পারেনা। এখানে একটা ব্যাকটেরিয়া, বা ঘোতঘোতে একটা শূয়োরের সাথে দাসদের কোনই পার্থক্য নাই। সবাই তাদের জৈবিকতাকেই অনুসরণ করছে শুধু।
কিন্তু গোলটা বাধে তখন যদি কিছু অ-দাস দাসদের মাঝে আটকা পড়ে যায়। তার তাদের জৈবিকতাকেই অস্বীকার করে বসে। এরা “নিশ্চিত দাসত্বের”  উপরে “বিপজ্জনক স্বাধীনতা”কে গুরুত্ব দিয়ে ফেলে। তারা নিজেদের যেমন বিপদের মাঝে ফেলে তেমনি দাসদের মধ্যেও ত্রাসের সঞ্চার করে তাদের “বৈচিত্র আর স্বাধীনতা” নামক অনিশ্চয়তা প্রীতির কারনে। যেখানে জন্তুদের মাঝে বৈচিত্র, অনিশ্চয়তা এসব হল ঋণাত্বক, এসবকে বিপদ হিসেবে দেখাই যেখানে স্বাভাবিক, সেখানে অ-দাসেরা কিনা অনিশ্চয়তা ভালবাসে, বৈচিত্র এদের কাছে পরম আরাধ্য জিনিষ! পাগল!!

কিন্তু সবচেয়া কষ্টকর অ-দাস হয়ে একগাদা দাসেদের মাঝে আটকা পড়াটা। এর চেয়ে বড় শাস্তি আর হয়না। অ-দাসের রঙীন চোখ ধুসর একঘেয়ে ব্যাপারগুলো জোর করে বারবার দেখতে থাকার মতন নিপীড়ন দুনিয়ার জঘন্যতম নিপীড়ন। দাসদের জন্য তাদের জীবনটা সহজ কারন তারা এই ব্যাপারে সচেতনও না যে তারা দাস, কিন্তু অ-দাসদের জন্য ব্যাপারটা অনেকটা মাতাল বোঝাই একটা গাড়িতে একমাত্র অ-মাতালের মত, সেই গাড়ি আবার আপনাকে চালাতে দেয়া হবেনা কারন আপনি অ-মাতাল! সেটা আপনার দোষ!

২ টি মন্তব্য : “অ-দাস”

মওন্তব্য করুন : জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

জবাব দিতে না চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।