প্লাস্টিক ! (female version)

প্লাস্টিক জিনিষটা কেন জানি আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করে। অনেক খুঁজেও এর কোন খুঁত বের করতে পারিনা আমি। এই জিনিষ পানিতে পচেনা, আগুনে পোড়েনা। বাইরে পড়ে থাকলেও শত শত বছর অবিকৃতি রয়ে যায়, ভাইরাস ব্যাক্টেরিয়াও এদের কিচ্ছু করতে পারেনা। এরা এতোই নমনীয় যে প্রয়োজন হলেই এরা যেকোন আকার নিতে সক্ষম। আবার প্রয়োজন হলে এতই শক্ত হয় যে টনকে টন ওজন অনায়াসে বহন করতে পারে! প্লাস্টিকের জিনিষ অনেক চকচকে, সোনার মত কাজ দিতে না পারুক জেল্লায় সে সোনাকেও টক্কর দিতে পারে।

কিছুদিন ধরেই মাথায় এই ব্যাপারটা ঘুরছে। বস্তুর সাথে মানুষের চরিত্রের মিল আছে কোন? যত আপডেটই হই, ঘুরায় ফিরায় আমরা তো একেকটা বস্তুই, তাইনা? হয়ত অনেক জটিল, কিন্তু ওই বস্তুই। আমাদের আকার আয়তন আছে, ভর আছে, আমরা স্থান দখলও করি! যদিও কেউ কেউ মনে করে এর বাইরেও ( পদার্থ না হয়েও ) অস্তিত্ব থাকা সম্ভব, কিন্তু সে তো সেই মনে করা পর্যন্তই। বাস্তবের দুনিয়া তো এর এসব কল্পনা মেনে চলেনা।

মানুষের পছন্দের তালিকায় কত শত কাজই না আছে। একটা মানুষ কি পছন্দ করে সেটার উপর তার চরিত্রের অনেকটা নির্ভর করে। কেউ খেতে পছন্দ করে, কেউ ঘুমাতে, কেউবা পড়তে। এমনকি এখনকার দিনে এমন কিছু মানুষও আমি পেয়েছি যারা শুধু পরার জন্য বেঁচে থাকে! না না, বই না, সেই যুগ গেছে, এখন ডিজিটাল যুগ, এখন ওইসব “আউট” পড়াশোনা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়না, যতটুকু দরকার সেটা (টেক্সটবই) পড়ারই সময় পাওয়া যায়না, সেখানে আবার আউট বই টই পড়ার সময় কোথায়? আমি আসলে কাপড় পরার কথা বলছি আর কি। আমি কিছু মানুষকে চিনি যারা আক্ষরিক অর্থেই জামাকাপড়ের পিছনে দিনের ২৪ঘন্টা ব্যয় করে! তারা ভার্সিটি যায় কাপড়ের গল্প করতে আর ফাঁকা সময়টা কাপড়ের দোকানে “উইন্ডো শপিং” করতে। তাদের প্রিয় জায়গা চাঁদনী চক, কেননা সেখানে “কম খরচে” “দরকারী” “সবকিছু” পাওয়া যায়; তারা বিশাল সময় টিভির সামনে ব্যায় করে নাটক সিনেমা আর সিরিয়াল দেখে। নাহঃ তারা মোটেও বৌ-শ্বাশুড়ির যুদ্ধ দেখেনা, তারা এসব থেকে অনেক প্রগতিশীল, তারা এসব দেখে নায়িকার নতুন নতুন জামার ডিজাইন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করার জন্য! আর যারা এদের মধ্যে আবার “প্রগতিশীল” তারা ওসব সিরিয়াল-টিরিয়াল দেখেনা, তাদের পছন্দ “ট্রাভেলিং এন্ড লিভিং” টাইপের “শিক্ষামুলক” চ্যানেল, অনেক জ্ঞানগর্ভ “রেসিপি” এবং “ডিজাইন” শেখা যায় এখান থেকে! এদের বেড়ানোর জায়গা বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্ক, না হলে আজিজ সুপার মার্কেট। বুঝতেই পারছেন কেন, কাপড়ের দোকানের ঘনত্ব এসব জায়গাতেই সবচেয়ে বেশী কিনা! তবে এগুলো শুধুই তাদের বেড়ানরই জায়গা, এখানে তারা যায় আসলে নতুন জামার ডিজাইন খুঁজে বের করতে অথবা চলতি ফ্যাশন সম্পর্কে আইডিয়া নিতে, যেন পরে তাদের পছন্দের জায়গা থেকে জিনিষগুলো জোগাড় করে নিতে পারে। এখানে বড়জোর বার্গার-আইসক্রিম খাওয়া হয় আর খুব মনে হলে সিনেপ্লেক্সে ঢোকা হয়। এদের প্রানের জায়গা হল চাঁদনিচক-বঙ্গবাজার, ধানমন্ডি-হকার্স বা গুলশান-বনানীর চিপায় চাপায় বিচিত্র সব কাপড়ের দোকানসমূহ, যেখানে তাদের মনমতো কাপড়-চোপড় “শস্তায়” পাওয়া যায়। শস্তায় শুনে এদের আরো একটা গুনের কথা মনে পড়ল, দরদাম করা। সে এক দেখার মত দৃশ্য। এই দরদাম ব্যাপারটাকে তারা রীতিমত শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে! এদের কেনাকাটা করতে দেখার সৌভাগ্য কখনো হলে বুঝতে পারবেন কেন এটাকে শিল্প বলছি আমি। আপনি হয়তো দোকানদারের সাথে এদের কথোপকথন দেখে ধরেই নিয়েছেন যে ব্যপারটা এরপর হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াবেই বা দোকানদার নিশ্চই যেকোন সময় তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বসবে, কিন্তু প্রতিবারই আপনাকে অবাক করে দিয়ে সে তার কাঙ্খিত দামের আশেপাশে কোন একটা দামেই জিনিষটা নিয়ে বেরিয়ে আসবে! এরা অনেক বেশী সামাজিক, মানুষের সাথে মিশতে এরা দারুন পছন্দ করে, শুধু পার্থক্য হল এদের সমাজটা আত্মীয় স্বজনের বাইরে কখনোই যায়না। মোটামুটি ছোট একটা গন্ডীর মানুষ ঘিরেই এদের যত স্বাদ-আহ্লাদ, দয়া-মায়া। এর বাইরের মানুষদের জন্যেও এরা “ফিল” করে ঠিকই কিন্তু ওই “ফিল” করা পর্যন্তই, এর বেশী কিছু যে করা যেতে পারে এরা সেসব চিন্তা স্থানই দেয়না মাথায়। তাই সত্যিকারের সামাজিক কাজগুলোতে এদের কমই পাওয়া যায়। কেনাকাটা এদের এতোই পছন্দ যে অনেকেই স্বেচ্ছায় বাড়ির অনেক আত্মীয় স্বজনের কাপড় কেনাকাটার দায়িত্বটা নিয়ে নেয়, সামাজিকতাও হল আবার শখ মিটিয়ে কেনাকাটাও করা হল। এই টাইপের গুলা আবার সবসময়ই খুব ব্যাস্ত, বাসা আর ক্লাসের বাইরের ফাঁকা সময়টা এদের দর্জি নয়তো কাপড়ের দোকান করে করেই কেটে যায়, মুখে সেটা নিয়ে গজগজ করলেও এই কাজে কখনো ফাঁকি দিতে দেখা যায়না এদের।

এদের বেশীরভাগই স্বাবলম্বী, নিজের খরচ নিজেই চালায়, কেননা হাতখরচের নামে বাসা থেকে যা পায় তার চেয়ে বাজারে নতুন নতুন জিনিষের কালেকশন সবসময়ই বেশী! এরা আবার ভীষন রকম স্বাধীনচেতা, কখনো কারো সাহায্য নেয়না, যদি একান্তই নিতেও হয়, তাহলে প্রথম সুযোগেই পাল্টা একটা উপকার করে দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব “দায়মুক্ত” হয়ে যায়। প্রচুর কেনাকাটা করার জন্যেই বোধয়, এদের হিসেব নিকেশের মাথাটা বড্ড পাকা।

এদের স্বাতন্ত্র্যবোধ এতোই বেশি যে যেখানেই যাক সবসময় নিজেদের জন্য আলাদা একটা পরিবেশ এরা তৈরী করেই নেয়। সেটা স্কুলেই হোক বা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ই হোক। বেশিরভাগ সময় সেটা হয় খুবই যাচাই বাছাই করা কিছু বান্ধবীদের গ্রুপ যেখানে “সিস্টারহুডের” স্বকীয়তা খুব সতর্কতার সাথে রক্ষা করা হয়। গ্রুপে নতুন মানুষ ঢোকা তো একরকম হারামই, এমনকি গ্রুপ মেম্বারদেরও অন্যদের সাথে বেশী মেশা কঠোরভাবে মনিটরিং করা হয়। অন্যদের সাথে বেশী ঘষাঘষি দেখলে গ্রুপ থেকে কাউকে বয়কট করার ঘটনাও প্রায়ই ঘটে। একমাত্র ব্যাতিক্রম করা হয় তাদের বয়ফ্রেন্ড থাকলে তার বেলায় তবে সেখানেও *শর্ত প্রযোজ্য। আর একটা মজার ব্যাপার হল সবসময়ই এই গ্রুপগুলোর স্থায়িত্ব হয় তাদের শিক্ষাজীবনের ব্যাস্তানুপাতে। মানে যতই তারা উপরের ক্লাসে উঠতে থাকে, এসব গ্রুপের মেম্বারও তত কমতে থাকে, কিন্তু এর বিপরীতটা প্রায় কখনোই ঘটতে দেখা যায়না। এরা আসলে প্রচলিত সমাজ সংস্কৃতির বাইরে আলাদা একটা সংস্কৃতিই তৈরী করে নেয়। এদের আলাদা পরিভাষা থাকে, আলাদা সাইন ল্যাংগুয়েজ থাকে, মানুষ বিচার করার আলাদা মানদন্ড থাকে। আপনি “ভাসাভি” না চিনলে বা “লা রিভ” কে “লি রেভে” উচ্চারন করে ফেললে এরা এমনভাবে আপনার দিকে তাকাবে যে আপনার নিজের কাছেই মনে হবে আপনি অশিক্ষিত চর ভাঙ্গা কোন বরিশাইল্লা, এইমাত্র লঞ্চে করে জীবনে প্রথমবারের মত ঢাকা এসে নামলেন!

এরা অসম্ভব রকম স্বাস্থ্য সচেতন। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এদের কড়াকড়ি দেখলে আপনার গুলিয়ে যেতে থাকবে কোনটা সচেতনতা আর কোনটা শুঁচিবায়ু। বিশেষ করে চামড়া নিয়ে এদের সচেতনতা আসলেই বাড়াবাড়ি রকমের। শহরের অন্তত দু একজন চামড়া বিশেষজ্ঞ এদের বাড়ির লোক। এক জায়গায় দুবার ব্রন উঠলেই তার কাছে দৌড়াতে হয় কিনা। এরা খাবারদাবার খায় অনেক বেছে বেছে, এবং মোটা হয়ে যাচ্ছে বলে প্রায়শই এদের ডায়েট কন্ট্রোল করতে দেখা যায়। তবে মজা লাগে তখন যখন দেখি বেশীরভাগের বেলাতেই এসব কন্ট্রোল খুব একটা কাজে আসেনা। শারীরিক পরিশ্রমের কাজে এদের অত আপত্তি নেই, তবে অভ্যাস নেই বলে করতে পারেনা আর কি। কিন্তু পরিশ্রম না করলে অভ্যাসটা হবে কি করে সেই প্রশ্নেরও আবার কোন জুৎসই উত্তর পাওয়া যায়না। এরা ভয় পায় রোদ, ধুলা এসব, তাই বাইরের কাজ এরা খুব একটা বাধ্য না হলে করেনা। নানানরকম টিস্যু এন্টিসেপটিক হ্যান্ডওয়াশ, নেইলকাটার, সুতা, এরকম রকমারি জিনিষ দিয়ে তাদের ব্যাগ ঠাসা এবং এসবের ব্যাবহার করেও দেদারসে।

সাজতে আর সাজাতে এরা অনেক ভালবাসে। অনেকে তাদের সাথে সাজার দরকারী সব জিনিষপত্র সাথে রাখে। কাজল, লিপস্টিক ঘষা তো খুবই সাধারন, এমনকি ক্লাসে বসেই একজন আরেকজনের ভ্রু প্লাক পর্যন্ত করে দিতে দেখা যায়! এই একটা জায়গায় তারা ভাগ করে নিতে কোন আপত্তি করেনা। এমনও দেখেছি যে একটা কলম পর্যন্ত শেয়ার করতে চায়না, সেও এসব ব্যাপারে অনেক উদার হয়ে যায়! দর্শক থাকুক বা না থাকুক, খুব মন দিয়ে, খুব সুন্দর করে তাদের সাজা চাই। কেউ যদি নাই দেখতে পেল তাহলে এইসব সাজুগুজুর দরকার কি জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাবেন, “কেন, কেউ কি নিজের জন্য সাজতে পারেনা? আমার ভালো লাগে তাই সাজি, কাউকে দেখানোর জন্যই সাজতে হবে একথা কোথায় লেখা আছে? প্রথম প্রথম মনে করতাম লজ্জায় ঢপ দিচ্ছে, আসল কথা বলবেনা আর কি, কিন্তু এখন বুঝি যে এর থেকে সত্যি কথা আর হয়না। মাঝেমাঝেই মনে হয় আর একটু এগোলেই এরা নার্সিসিস্ট হয়ে যাবে, কিংবা কে জানে, ভেতরে ভেতরে এরা হয়ত তাই। আমি আমি এবং আমি, আমি ছাড়া এদের জগতে আর কারো অস্তিত্ব নাই!

এই সাজুগুজুর কথায় আর একটা জিনিষ মনে পড়ল। এই যে পোষাক-আশাক, চলনে-বলনে, কথায়-বার্তায় রুচিশীলতা, নতুনত্বের দিকে ঝোঁক, তা স্বত্ত্বেও ভেতরে ভেতরে এরা কিন্তু অনেক রক্ষনশীল। একই কাজ (পার্থক্য হয়তো শুধু মাত্রাগত) নিজেদের বেলায় অধিকার কিন্তু অন্যে করলে বেলেল্লেপনা নয়তো বেয়াদবি। সবাই বলবনা, কিন্তু এদের একটা বড় অংশ হুজুর, এবং সেটা জাহির করতে এরা গর্ববোধ করে। এদের বোরখা দেখলে আপনার মনে হবে এরকম বোরখা পরলে আর ঢেকে রাখার কি প্রয়োজন? আর যারা সাধারন তারা এতোটাই সাধারন যে এসব নিয়ে তাদের বাড়াবাড়ি সময়ের বিশাল অপচয় বলে মনে হয়। মানে ব্যাপারটা অনেকটা দেয়াল ঠেলার মত, সারাদিন ধরে আপনি অনেক কাজ করলেন কিন্তু দিন শেষে সরণ ওই শুন্য, সেরকম সারাদিনে-রাতে কেউ কাপড় আর প্রসাধন নিয়ে কাটায় আর দিন শেষে তাদের জায়গা হয় ড্রেসিংটেবিল আর ওয়ারড্রবে। কোন মানে হয়?

এতসব শুনে অনেকেরই মনে হতে পারে যে এরা হয়ত ছাত্রী হিসেবে অত ভালোনা, কিন্তু শুনলে অবাক হবেন যে বাস্তবে অবস্থাটা ঠিক উল্টা! এদের বেশিরভাগই ছাত্রী হিসেবে চমৎকার, কেউ কেউ প্লেস পর্যন্ত করে! কেন এটা হয়? আমার মনে হয় এদের জগতটা এতোই ছোট যে এদের জানাই নাই যে পড়া আর ঘরের কাজের বাইরেও মানুষের আরো অনেককিছু করার আছে! আর বাকি দোষ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার, যেখানে শুধু মুখস্ত আর বমন করে অনেক ভালো রেজাল্ট করা যায়। তবে এদের জ্ঞানগুলি কেন জানি খুব টেকনিক্যাল, মানে যেকোন কাজ কিভাবে করতে হয় সেইটা এদের কাছে খুব পরিষ্কার কিন্তু কেন করবে সে প্রশ্নে এরা বেশীরভাগই নিরব। ব্যাপারটা এমনও না তারা “কেন” প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যায়, বেশিরভাগ সময় তারা জানেইনা এসব জায়গায় কেন প্রশ্নটা করা যায়! আর খারাপ লাগে যখন দেখি এতো চমৎকার মাথাগুলো, এই ভালো রেজাল্ট, বেশীরভাগ শিক্ষাজীবন শেষ হতে না হতেই ঝরে পড়ে, এসব অর্জিত জ্ঞান কারো কোন কাজেই আসেনা। এর একটা বড় অংশ ব্যায় হয় শিকার ধরার জাল হিসেবে, ভালো জামাই ধরতে। এদেশের বাজারে এখন ভালো শিক্ষিত মেয়েদের অনেক দাম কিনা! এমনিতেই আমাদের দেশের পরিবেশ মেয়েদের কাজ করার জন্য একেবারেই বান্ধব না, একই কাজে সমান যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যখন পারিশ্রমিকের কথা আসে তখন এদেশে একটা ছেলেকেই অতিমুল্যায়ন করা হয়। যেকোন পেশায় (এমনকি রান্না বা সেলাই বা শিক্ষকতার মত তথাকথিত মেয়েলি পেশাতেও) দাঁড়াতে এদেশে মেয়েদের ছেলেদের তুলনায় দ্বিগুন খাটনি দিতে হয় সেখানে কেউ যখন সব জ্ঞান বুদ্ধি খাটায় ভাল “জামাই” ধরার জন্য ও তার উপর বসে খাওয়ার জন্য, তখন অনেক কষ্ট হয়। মেয়েটার জন্য তো বটেই, তার চেয়েও বেশী যার উপর ভর করবে সেই ছেলেটার জন্য। কেননা এদের পায়ের নিচে মাটি থাকেনা বলে এরা এদের সবটুকু দিয়ে একজনকেই আঁকড়ে ধরে। এবং কিছুদিন পরেই তাদের “ভালবাসা” আসলে ছেলেটার জন্য কারাগার হয়ে যায়। আর বাস্তব দুনিয়া থেকে আলাদা জগতে বাস করার জন্য অনেক বাস্তব সমস্যাকে তারা সমস্যাই মনে করেনা, সেইগুলোর বোঝাও ছেলেটাকেই টানতে হয়। আবার এই ভালোবাসাও শিক্ষাজীবনের মতই দিন যাবার সাথে সাথে কমতে থাকে। কিছুদিন পরেই সেটা গিয়ে জমা হয় তার বাচ্চাকাচ্চার উপর। এবং তারা যতই কর্মক্ষম হতে থাকে সে অনুপাতে তাদের প্রতি মায়ের “আদর”ভালোবাসাও” বেড়ে যেতে থাকে, আর স্বামীজির জন্য বরাদ্দ তত কমে!

এরা আবার অনেক সতী সাধ্বী টাইপ, ব্যাঙ্গ করে বলা না, সত্যি সত্যিই! পরপুরুষের দিকে তারা তাকায়, মেশে, তাদের ব্যাবহারও করে (কি ধরনের ব্যাবহার তার ফিরিস্তি দিতে গেলে আরেক ইতিহাস হবে। তবে নিশ্চিত থাকেন, খুব নিরীহ, নির্দোষ সব ব্যাবহার; এই যেমন ধরেন লেকচারটা যোগাড় করে নেয়া, ফটোকপি করায় নেয়া, কোন কাজে গেলে ভাই হিসেবে সাথে নেয়া, আসলে যদিও গার্ড। কলাটা, মূলাটা কেনানো এসবই, এর এক বিন্দুও বেশী কিছু না) তবে ওই ব্যাবহার করা পর্যন্তই, এর মাঝে মানসিক বা শারীরিক আর কোন ব্যাপার নেই। নিজেদের তারা সযত্নে তুলে রাখে একটিমাত্র পুরুষের জন্য, শারীরিক তো বটেই, মানসিকভাবেও, আর সেটি কোনভাবেই কোন প্রেমিক বা লম্পট পুরুষ নয়, একমাত্র এবং কেবলমাত্র তার স্বামী, যে আবার অনেক দাম দিয়ে সামাজিকভাবে তাকে কিনে নেবার এবং ভবিষ্যতে সুখে (সঠিক শব্দটা হবে প্রাচূর্যে, তবে এদের অনেকের বিদ্যার দৌড় এতোটা কষ্ট করতে নারাজ) রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারবে। এদের মাঝে একদল আছে আরেকটু ঝুঁকি নেয় তবে এদের হিসেবনিকাশের মাথা আরো বেশী পাকা! আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একটা ছেলের নিজের পায়ে দাড়াতে একটু সময়ই লেগে যায়, তাই স্বাচ্ছন্দ বেছে নিতে গেলে বেশীরভাগের বেলাতে সুখটা কমে যায়, তেমন কিছু না, জেনারেশন গ্যাপ। মানে টাকাপয়সা অলা “ছেলে” (আসলে মধ্যবয়সী) বিয়ে করতে গেলে বয়সের রেঞ্জটা একটু বেশীই নিতে হয়। সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠার একটা ভালো উপায় এমন কারো সাথে গাঁটছাড়া বাধা যে এখন না পারলেও পরবর্তী জীবনে “শাইন” করবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলা যায়। এদের সঙ্গী বাছাই করাটা আরো অনেক জটিল একটা প্রক্রিয়া। মানে বাইরে থেকে দেখলে আপনার কাছে এটা হয়তো একটু চরিত্রের দোষ মনে হবে কিন্তু এরকম মাথা আর হয়না। আমি ব্যাক্তিগতভাবে এরোকম যতজনের সাথে মিশেছি তাদের প্রত্যেকেই মানুষ হিসেবে, বন্ধু হিসেবে চমৎকার, সবকিছু সম্পর্কে এদের ভালো দখল, অন্তত কথা বলার মত জ্ঞান রাখে, বিশেষ করে প্রাত্যহিক জীবনের দরকারী পন্যের সম্পর্কে এদের জ্ঞান অগাধ! এদের সঙ্গ সবসময়ই উপভোগ্য। আপনি যেমনটা চান ঠিক তেমন করেই আপনার সাথে সে মিশবে। এরা যেটা করে, অনেক আগে থেকেই চেহারা, পারিবারিক অবস্থা, আনুগত্য, মেধা এসব ভালোভাবে যাচাই বাছাই করে একটা স্বামী (সবাই যাকে চেনে বয়ফ্রেন্ড হিসেবে) নির্বাচন করে। সঠিক নির্বাচন করতে না পারলে সেটা দু-একবার পরিবর্তনও করে ( এরকম হলেই সেটা আমরা, টিপিক্যাল বাঙালীরা ভালো চোখে দেখিনা। বেচারীর চরিত্রের দোষ খোজা শুরু করি। কিন্তু আদতে ব্যাপারটা মোটেও চরিত্রের সাথে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। আচ্ছা, ঊদাহরণ দেই। আপনি যদি দোকানে নতুন কোন জিনিষ কিনতে যান, তখন সামনে যেটা পান সেটাই কিনে ফেলেন নাকি দু একটা দোকান দেখে, এটা ওটা টিপেটুপে ভালোটা বাছাই করে নেয়ার চেষ্টা করেন? এবং এই কাজ করার জন্য কেউ আপনার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে? না তোলার কোন কারন আছে? এখানেও কিন্তু ব্যাপারটা তাই ঘটে। এরা শুধু প্রোডাক্টের চাকচিক্য দেখে ভোলেনা বরং সব যাচাই করে যেটা বেশীদিন ভালোভাবে “সার্ভিস” দেবে সেইটা বাছাই করে নেয়। এর সাথে ওই ব্যাক্তিকে পছন্দ বা অপছন্দ করার কোন সম্পর্ক নেই! সেটা রহিমুদ্দীনের জায়গায় সনত হলেও কোন সমস্যা নেই।) সে শুধু তার নাগালের ভিতরের সবচেয়ে ভালোটায় এসে স্থির হয়। তবে এদের আসল কাজ শুরু হয় তারপর। বোকা মেয়েরা যখন প্রানপনে পড়া মুখস্ত করে রেজাল্ট ভালো করে এদেশে বসে ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেখে, এরা তখন কোনমতে বা আরো যোগ্য হলে ভালোভাবেই নিজেরটা তো গোছায়ই, তার চেয়েও হাজার গুন গুরুত্ত্ব দিয়ে সেই ছেলের ক্যারিয়ার তৈরী করতে লেগে যায়। এটাকে তারা নেয় একটা বিনিয়োগ হিসেবে এবং সেটাকে সফল করতে তারা প্রানপার করে। এবং তার ফলও পায় তারা হাতে হাতে। শিক্ষাজীবন শেষ করে তার বাকি বান্ধবীরা যখন “স্ট্রাগল” করছে বা বাচ্চা মানুষ করছে, এদের লাগানো বৃক্ষ ততদিনে ফল দিতে শুরু করে। এদের তখন দেখা যায় প্রতিষ্ঠিত স্বামী নিয়ে, বাচ্চা থাকলে তাকে নিয়ে সুখে হানিমুন করে বেড়াতে। সফল পেশাজীবির স্ত্রী হিসেবে এদের বেশীরভাগ সময়ই অলস সময় কাটাতে হয়, এর স্বামীও “প্রয়োজন নেই বলে” স্রীকে “হাউজ ওয়াইফই” দেখতে চায় বেশীরভাগ সময়। এককথায় ব্রিলিয়ান্ট! শুরুতে একটু ঝুঁকি থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা এর বুদ্ধির জোরের জন্য এদের আটকে থাকতে হয়না প্রায় কখনোই। আর নানারকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায় বলে এরা ছেলেদের বাসার এবং বাইরের সব পরিস্থিতি এতো সুন্দর সামাল দেয় যেটা সত্যিকারের “সিরাতুল মুস্তাকিম” সতী সাধ্বী মেয়েদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না… যেখানে দরকার গলে কাদা হয়ে যায়, যেখানে দরকার ইস্পাতের মত শক্ত হয়ে যায়, ঠিক প্লাস্টিকের মতোই।

আমি প্লাস্টিক অনেক ভালোবাসি, আপনি?

১,৩৪১ বার দেখা হয়েছে

৯ টি মন্তব্য : “প্লাস্টিক ! (female version)”

  1. ফেরদৌস জামান রিফাত (ঝকক/২০০৪-২০১০)

    কী নিখুঁত অবজারভেশন!! দারুণ বর্ণনা আর বিশ্লেষণ!! আপনার ফ্যান হয়ে গেলাম ভাই :boss: :boss:


    যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের- মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা

    জবাব দিন
  2. মাহমুদুল (২০০০-০৬)

    :chup: :chup: :chup:

    ভাই আসলেই অসাধারন লিখেছেন। 😀 চমৎকার ভাবে বিশ্লেষন এবং বর্ণনা করেছেন। তবে আমি কিন্তু male version এর জন্য ওয়েট করছি 😀 ছেলেদের কে কিভাবে বাশ টা দেয়া হয় দেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছি 😛

    চমৎকার লেখা ভাই :gulli2: :gulli2: :gulli2:


    মানুষ* হতে চাই। *শর্ত প্রযোজ্য

    জবাব দিন
  3. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    লেখার বিষয়বস্তু আর উপস্থাপনা ভাল্লাগছে। :clap:

    তবে লেখার ফরমেট, মানে প্যারাগুলো আরেকটু ছোট করতে পারলে পড়তে সুবিধা হতো।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।