আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…………

আজকে বাসা থেকে আই.ইউ.টি ফিরছিলাম ২৭ নাম্বার এ। পাশে এক লোক বসা। দেখলাম লোকের হাতে একটা ছোট খাতা। হঠাৎ উনি খাতা টা খুলল। দেখলাম ছোটদের ইংরেজি লিখার খাতা। ভিতরে একটা বাচ্চা মেয়ের ছবি। উনি ছবিটার দিকে তাকায় থাকল বেশ কিছুক্ষণ। পরে খাতাটা বন্ধ করলেন। দেখলাম উনার চোখে পানি। অবাক হয়ে দেখলাম কিছুক্ষণ। অদ্ভুত একটা দৃশ্য। বাস থেকে নামার একটু আগে জিজ্ঞেস করলাম “আপনার মেয়ে?”
হাসি দিয়ে বললেন “হ্যাঁ”
“কোথায় এখন?”
“দেশের বাড়ীতে”

জানতে পারলাম উনি গাজীপুর এ কাজ করেন। দেশের বাড়ি জামালপুর। মেয়েটার বয়স ৫। স্কুল এ ভর্তি হবে সামনে। কথা বলে খুব ভালো লাগল উনার সাথে।

বাস থেকে নামলাম। হলে চলে আসলাম। কিন্তু ওই খাতাটা দেখার পর থেকে ওই যুগের কথা মনে হচ্ছে যখন লাইফ টা কত্ত সিম্পল ছিল। অনেক কিছু মনে পড়তেছে। তাই লিখতে মন চাইল।

কতো মজা ছিল আগে। একবারে ছোটবেলায় ওই খাতা গুলাতে এ,বি,সি,ডি লিখলেই আব্বু আম্মু খুশি হইয়া যাইত। কোন কিছু নিয়া কোন টেনশন ছিল না। সারাদিন খালি খেলতাম ই।

একটু বড় হইলাম। স্কুল এ ভর্তি হলাম। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট হাই স্কুল। প্রথম দিন এক স্যার এর হাতে বেত দেইখা এতো ভয় পাইসিলাম যে দৌড় দিয়া বাসায় চলে আসছিলাম। আব্বু আমারে গরম ২ টা ঝারি দিয়া আবার স্কুল এ নিয়া যাইয়া ক্লাস এ বসায় আসছিল। আতঙ্কিত অবস্থায় ওই দিন টা পার করছিলাম।

এই স্কুল টা আমার খুবই পছন্দের, কারণ বেশি জিনিয়াস পোলাপান ছিল না। স্কুল এ ফার্স্ট বয়। কি শান্তি! সব স্যার ম্যাডামদের প্রিয় পাত্র। ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। ভাব ই আলাদা। B-) আফসোস! ক্যাডেট কলেজ এ যাওয়ার পর আমার এই প্রতিভা হারায় যায়। 😛

স্কুল এর পরের টাইম টা ছিল কঠিন। অনেক পাহাড় ছিল ওইখানে। সারা বিকাল পাহাড়ে ঘুরতাম। পাহাড়ে এক রকম কাঁটা ছিল। ওইটা ছিঁড়ে হাতে ধরে রাখলে হালকা ঘুরত। আমরা বিজ্ঞ কিছু পোলাপান ধইরা ই নিছিলাম যে এইটা কম্পাস!!

আর একটা জিনিস পাওয়া যাইত পাহাড়ে। এখানে কে কে খাইসে জানি না। বন পেয়ারা। এই জিনিস টা এতো মজা না খাইলে বুঝানো সম্ভব না। পেয়ারা তো এর কাছে কিছুই না!!

আমাদের তখন একটা সাদাকালো ১৪” টিভি ছিল। কঠিন সেই টিভি। ওইটার এক অদ্ভুত সমস্যা ছিল। টিভি অন করার ২০-২৫ মিনিট পর ওইটা পাওয়ার পাইত। আমরা টিভি অন করে ঘুইরা আসতাম। অনেকক্ষণ পরে সাউন্ড শুনতাম। তখন কেউ একজন চিল্লায় উঠতো “টিভি আসছে, টিভি আসছে………… ” =))

আর বাঁশের উপর অ্যান্টেনা ছিল। বাতাসে ঘুরে যাইত মাঝে মাঝে। তাই তখন একজন বাইরে যাইত। অ্যান্টেনা ঘুরাইত। আর ভিতর থেকে বলত……… “না না……… হ্যাঁ আসছে আসছে……… গেছে গা……… বামে বামে…… আর একটু ডানে……… ” =)) এখন এই কথাগুলা ভাবতেই কেমন যেন লাগে।

ডিশ ছিল না। কিন্তু মনে আছে তখন বিটিভি তে অনেক চরম চরম জিনিস দেখাইত। মিষ্টেরিয়াস আইল্যান্ড দেখতাম। শুক্রবার সকালে দেখাত “মোগলি”…… সেই বিখ্যাত গান………… “জঙ্গলে ভোর হল……… আজ নতুন প্রভাত এল……… ”

আলিফ লায়লা দেখতাম বাসার সবাই মিলে। আব্বু অফিস থেকে চলে আসত। কি সব লোমহর্ষক কাহিনী!!! মাঝে মাঝে আসলেই ভয় ও পাইতাম। 😛

এক্স ফাইলস, রোবোকোপ, নাইট রাইডার, সিন্দবাদ, টারজান……… আরও কত কিছু!!!!

পেইন টা হত শুক্রবার বিকালের বাংলা সিনেমা। এইটা ছাড়া আর কিছুই তো আর দেখার ছিল না। তাই দেখতাম আলমগীর- শাবানা র বিখ্যাত সব সিনেমা। ৩-৪ টা বুলেট খাওয়ার পর ও বেঁচে থাকতো। বুক থেকে একটা হার্ডবোর্ড বের করে বলত- “এ বুকে আছে মায়ের দোয়া”………… =)) কি মজা!!

কুমিল্লায় ডিশ ছাড়া ই হিন্দি ন্যাশনাল চ্যানেল টা আসতো। শুক্র-শনিবার রাতে হিন্দি সিনেমা দিত। রাত দশ টা থেকে দেড় টা পর্যন্ত। আমি আর আমার আপু মিলে রাতে চুরি কইরা টিভির ভলিউম কমাইয়া কি সব মুভি যে দেখতাম, এখন মনে করলে অবাক ই লাগে।

ক্লাস ফোর এ উঠার পর সাইকেল চালানো শিখলাম। এর পর থেকে যতদিন কুমিল্লা ছিলাম, রিকশায় কয়দিন চরছি গুনে বলা যাবে। ক্যান্টনমেন্ট এর ফাঁকা রাস্তায় নায়কের মত সাইকেল চালানো। স্কুল এ সাইকেল চালায় যাইতাম। স্ট্যান্ড এ যখন সাইকেল টা লক করে রাখতাম এমন একটা ভাব ছিল যেন বাইক নিয়া আসছি। ভাব ই অন্য রকম। যারা সাইকেল চালাইতে পারত না, ওদের দেখতাম আর হাসতাম। এমন একটা ভাব যে এদের চেয়ে বড় ‘লুজার’ আর দুনিয়া তে নাই!! 😛
ড্যাম! আই মিস দোজ ডেইজ!!!

খেলা গুলা ও কত জোস ছিল। স্কুল এ নারিকেল গাছের খোল দিয়ে ব্যাট বানাইয়া ক্রিকেট খেলতাম। সাত চাড়া খেলতাম। নির্মম এক খেলা ছিল “বোম-বাস্টিং” । আমি ছোটবেলা থেকেই একটু সুস্বাস্থ্যবান। দৌড় দিতাম। লাভ হইত না। ইচ্ছা মত আমারে মারত পোলাপান। 😀

আরও কত ছোট ছোট কাহিনী যে আছে। ১ টাকার আইসক্রিম, কটকটি। ১ টাকা দিয়ে একটা জিনিস পাওয়া যাইত। নাম টা খুবই অদ্ভুত। “টিকটিকির ডিম”……… এইটা আমার লাইফ এ দেখা সবচেয়ে সাশ্রয়ী জিনিস। ১ টাকায় মনে হয় ২০ টা পাওয়া যাইত।

সব লিখতে গেলে আজ আর পোস্ট করা লাগবে না। কত কিছুই তো আছে।

লিখতে লিখতে বেশ কয়েক বার বেশ বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। আসলেই আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম !!

২,১৬০ বার দেখা হয়েছে

২৯ টি মন্তব্য : “আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…………”

  1. কামরুলতপু (৯৬-০২)

    টিকটিকির ডিম শুধু ১০টা পাইতা ১ টাকায়? কি বল আমার তো মনে হয় আমি আরো অনেক পাইতাম। অফট্র্যাক এইটা কি এখন আর পাওয়া যায়?
    আগে আসলেই অনেক সুন্দর দিন কাটাইতাম।

    জবাব দিন
  2. শাহরিন (২০০২-২০০৮)

    লেখাটা পড়ে খুব ভাল লাগলো ভাইয়া,আগের কথা মনে পড়তেছে :dreamy:

    আর খুব টিকটিকির ডিম খাইতে ইচ্ছা করতেছে,ভুলেই তো গেছিলাম এটার কথা,

    এখন কি আর পাওয়া যাবেই না 🙁

    জবাব দিন
  3. ওফ্ বস! কি একখান জিনিষ মনে করায়া দিসেন...

    কিন্তু মনে আছে তখন বিটিভি তে অনেক চরম চরম জিনিস দেখাইত। মিষ্টেরিয়াস আইল্যান্ড দেখতাম। শুক্রবার সকালে দেখাত “মোগলি”…… সেই বিখ্যাত গান………… “জঙ্গলে ভোর হল……… আজ নতুন প্রভাত এল……… ”

    সত্যিই মিষ্টেরিয়াস আইল্যান্ড, মোগলি, রবিনহুড, অ্যাডভেন্চার অব সিন্দবাদ, আলিবাবা চল্লিশ চোরের কথা ভোলাই সম্ভব না!

    জবাব দিন
  4. ওফ্ বস! কি একখান জিনিষ মনে করায়া দিসেন…

    কিন্তু মনে আছে তখন বিটিভি তে অনেক চরম চরম জিনিস দেখাইত। মিষ্টেরিয়াস আইল্যান্ড দেখতাম। শুক্রবার সকালে দেখাত “মোগলি”…… সেই বিখ্যাত গান………… “জঙ্গলে ভোর হল……… আজ নতুন প্রভাত এল……… ”

    সত্যিই মিষ্টেরিয়াস আইল্যান্ড, মোগলি, রবিনহুড, অ্যাডভেন্চার অব সিন্দবাদ, আলিবাবা চল্লিশ চোরের কথা ভোলাই সম্ভব না!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।