আর্নেস্ট হেমিংওয়ে লিখেছিলেন -“সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, জীবন থেমে থাকে না। তুমি যতই ভেতর থেকে ভেঙে পড়ো, যতই ক্লান্ত হও, জীবন তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না।” কথাটি নির্মম, কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সত্য। জীবনের ধর্মই হচ্ছে নিরন্তর ছুটে চলা। এই ছুটে চলার ধরন অবশ্য মোটা দাগে দুই রকমের। প্রথমটি হচ্ছে ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিনিয়ত ছুটে চলা। যেমন ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাওয়ার তাড়া। সময়মতো বাস কিংবা সাবওয়ে ধরতে না পারলে অফিসে লেইট হওয়ার টেনশন। তারপর অফিসের কাজের তাড়া। ডেড লাইনের আগেই পেন্ডিং কাজগুলি ডেলিভারি দেয়ার তাড়া। এই তাড়াগুলি আমাদেরকে প্রতিনিয়তই তাড়িয়ে বেড়ায়। আর দ্বিতীয় রকমের ছুটে চলাটা হচ্ছে নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা বা নিজেকে অতিক্রমণের চেষ্টা। প্রফেশনাল দৃষ্টিতে এর আবার ব্যাখ্যা আছে, ক্যারিয়ারের উন্নতির জন্য তোমাকে প্রতিনিয়তই তোমার কম্ফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নতুন নতুন স্কিলসেট তোমাকে অর্জন করতে হবে যাতে তুমি ইন্ডাস্ট্রিতে ‘এমপ্লয়েবল’ থাকতে পার। এটা এক ধরনের ‘ইঁদুর দৌড়’ যার কোন শেষ নেই। আমরা যে কোন পেশাতেই জড়িত থাকি না কেন, কমবেশি আমরা সবাই এই ছুটে চলার ভেতরই রয়েছি। কিন্তু যেটা শুনতে আরও বেশি আশ্চর্যজনক লাগবে সেটা হলো আমরা কিন্তু নিজেরাও টের পাই না যে আমরা একটি র্যাট-রেসের ভিতরই রয়েছি প্রতিনিয়ত। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্ত আছি কানাডার এক শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের ক্রেডিট সংক্রান্ত একটি সফটওয়্যারের সাথে। প্রথমে আমি ‘সল্যুশন ডিজাইনার’ হিসেবে যুক্ত ছিলাম এই সফটওয়্যারের বিজনেস লজিক, কোড ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্টের সাথে। আমার বর্তমান পজিশন ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার। এই ক্রেডিট সফটওয়্যারে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ফিচার যোগ হচ্ছে। সেই ফিচারগুলি কিভাবে যোগ করা হবে সেটার ‘বিজনেস রিক্যুয়ারমেন্ট’ বুঝে ‘সল্যুশন ডিজাইন’ করা আমার কাজের একটি বড় অংশ। তারপর আছে ডেলিভারি প্ল্যান। কবে এই ফিচারগুলি সফটওয়্যারের সাথে যুক্ত হবে যাতে ‘এন্ড ইউজার’-দের কাছে এই ফিচারগুলি সময়মতো পৌঁছে যায় সেটারও একটি ‘রোড ম্যাপ’ তৈরি করতে হয় আমাকে। এই ‘রোড ম্যাপ’ তৈরি করার জন্য আমাকে বসতে হয় বিভিন্ন টিমের বিজনেস এনালিস্ট, টেক লীড আর কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স-এর লোকজনের সাথে। প্রথমে তাদেরকে ফিচারগুলির ‘বিজনেস রিক্যুয়ারমেন্ট’ সম্পর্কে ক্লিয়ার আইডিয়া দিতে হয় যাতে বিজনেস এনালিস্ট রিক্যুয়ারমেন্টকে ‘ইউজার স্টোরি’-তে কনভার্ট করতে পারে আর কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স টিম তৈরি করতে পারে তাদের ‘টেস্ট সিনারিও’। এরপর ডেভেলপমেন্ট টিমের টেক লীড ‘সল্যুশন ডিজাইন’ দেখে একটা হাই লেভেল আইডিয়া পায় কোথায় কোড লজিক অ্যাড করতে হবে। তারপর তাদের টিম ক্যাপাসিটির উপর নির্ভর করে তারা এস্টিমেট দেয় কখন তারা ফিচারগুলি ডেলিভারি দিতে পারবে। সেই এস্টিমেটের ভিত্তিতেই তৈরি হয় ‘রোড ম্যাপ’। তারপর সেই ‘রোড ম্যাপ’-কে প্রেজেন্ট করতে হয় ‘কোয়ার্টারলি প্লানিং’-এর মিটিং-এ। তারপর শুরু হয় আসল কাজ। আর তখন আমাকে খেয়াল রাখতে হয় কেউ যেন কাজে পিছিয়ে না পড়ে। পড়লে তাদেরকে দিতে হয় সাপোর্ট এবং সেই সাথে তাড়া। আবার এরই মাঝে নেক্সট কোয়ার্টার-এর জন্য নতুন ফিচারের ‘সল্যুশন ডিজাইন’-এর কাজ শুরু হয়ে যায়। এতকিছুর পর আমাকে গাইড করতে হয় বিভিন্ন লেভেলের বেশ কয়েকজন ডেভেলপার বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে। তাদের সাথে সপ্তাহে একদিন ‘ওয়ান-অন-ওয়ান’ মিটিং করতে হয়। তাদের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের জন্য টার্গেট সেট করে দিতে হয়। বছর শেষে সেই টার্গেট তারা কতটুকু অর্জন করতে পারল সেটা বিচার করে দিতে হয় পারফরমেন্স গ্রেডিং যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় তাদের ইয়ার-এন্ড বোনাস আর ইনক্রিমেন্ট। আর আমাকেও আমার ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের জন্য আমার ম্যানেজারের কাছে প্রেজেন্ট করতে হয় আমার প্ল্যান। আমার ম্যানেজারও একইভাবে আমার পারফরমেন্সের উপর নির্ধারন করে আমার বোনাস আর ইনক্রিমেন্ট। এই হচ্ছে আমার কাজের রুটিন। একটা চক্রের মতন চলছে আমার এবং আমাদের কর্মজীবন। কর্মজীবনের একঘেয়েমি দূর করার জন্য আছে ভ্যাকেশন। কিন্তু অনেক সময় কাজের তাড়ায় সেই ভ্যাকেশন আর নেয়া হয় না সময় মতন। জমা পড়ে থাকে বছরের শেষ মাস অর্থাৎ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সেই সময় ক্রিসমাসের সাথে মিলিয়ে এক নাগাড়ে তিন সপ্তাহের একটা ছুটি নেই বটে তবে কোথাও যাওয়া হয় না অনেক বছর। এই সব যে নীরবে নিভৃতে জীবনের উপর একটা টোল বসাচ্ছিল সেটা টের পাই এক সময়ে।
আমার শরীরটা যে আগের মতন নেই প্রথম সেটা টের পাই গত বছরের মাঝামাঝি থেকে। অফিসে যাওয়ার জন্য আমাকে সাবওয়েতে নামতে হয় ইউনিয়ন স্টেশনে। সেখান থেকে আমার অফিস সাত মিনিটের হাঁটা পথ। প্রথমে ইউনিয়ন স্টেশন থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে হয় ফ্রন্ট স্ট্রীটে। সিঁড়িটা বেশ খাড়া এবং লম্বা। পায়ে হেঁটে সিঁড়ি টপকিয়ে উপরে উঠার পর আমি যে হাঁপিয়ে উঠছি সেটা টের পেতে শুরু করি। বাধ্য হয়ে সিঁড়ি না ভেঙে এস্কেলেটরে করে এই পথ পাড়ি দেয়া শুরু করলাম। তবে বুঝতে পারলাম যে আমাকে সাবধান হতে হবে। এমনিতে আমি নিয়ম করে সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন প্রায় ঘণ্টাখানেক বেশ জোরে হাঁটি, যাকে বলে ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’। তখন কিন্তু তেমন হাঁপিয়ে উঠি না। খাবারের ব্যাপারে ঠিক ক্যালোরি মেপে না খেলেও ‘হেলদি ডায়েট’-এর দিকে নজর ছিল সব সময়ই। আমার কোলেস্টেরল লেভেল কিছুটা হাই আর সুগারের লেভেল ছিল ডায়াবেটিস-এর দ্বারপ্রান্তে। তাই ডাক্তারের অ্যাডভাইস ছিল কার্ব কম খাওয়ার। সেটা মেনে চলার চেষ্টা করেছি সব সময়। তারপরও যখন লম্বা সিঁড়ি ভাঙতে হাঁপিয়ে উঠা শুরু করলাম তখনই মনে মনে ঠিক করলাম হার্টের একটা থরো চেকআপ করা দরকার। কিন্তু কাজের ব্যস্ততায় সেটা আর হয়ে উঠছিল না। তারপরও ডিসেম্বরের ছুটিতে যখন একদিন মাথা ব্যাথার কারণে অসময়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম তখন সেটা আমার স্ত্রীর চোখ এড়ায়নি। ফলে এ বছরের জানুয়ারীতে তারই জোরাজুরিতে করিয়ে ফেললাম ইকোকার্ডিওগ্রাম আর স্ট্রেস টেস্ট। স্ট্রেস টেস্ট-এর ফলাফল ভালো আসেনি। কার্ডিওলজিস্ট সাজেস্ট করলেন এনজিওগ্রাম করাতে। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম কবে ডাক পাব সেই টেস্টের। কিন্তু ফেব্রুয়ারীর দশ তারিখ সোমবার সকালে অফিসে যাওয়ার আগে বুকে সামান্য ডিসকম্ফোর্ট বোধ করায় স্ত্রী সহ সোজা চলে গেলাম ডাউনটাউন টরন্টোতে অবস্থিত টরন্টো জেনারেল হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে। যাওয়ার আগে নিয়ম অনুসারে অফিসের ল্যাপ্টপ থেকে আমার ম্যানেজার আর টিমকে একটা ইমেইল করে জানালাম যে, ‘আই অ্যাম নট ফিলিং ওয়েল, টেকিং অ্যা ডে অফ টু রেস্ট’। আর সকাল এগারোটায় একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল যেখানে আমার কিছু ইনপুট-এর জন্য অন্য একটা টিম অপেক্ষা করছে সেই মিটিংটা রিশিডিউল করলাম পরেরদিন সকাল এগারোটায়।
সকাল ন’টার দিকে আমি এবং আমার স্ত্রী টরন্টো জেনারেলের ইমার্জেন্সি বিভাগে এসে পৌঁছাই। ইমার্জেন্সি বিভাগকে এদেশে সংক্ষেপে ইমার্জ বলে অভিহিত করে থাকে। প্রথমেই রেজিস্টেশনের পালা। একজন ট্রিয়াজ নার্স আমার হেলথকার্ড স্কান করতেই কমপিউটারে আমার নাম-ধাম সহ অন্যান্য তথ্য স্ক্রিনে চলে আসে। তাকে আমার চেস্টের ডিসকম্ফোর্ট-এর কথা জানালাম। আমার কমপ্লেইনের বিশদ বিবরণ কমপিউটারে রেকর্ড করে নার্স আমাদেরকে অপেক্ষা করতে বললো। সাধারণত ইমার্জেন্সিতে অপেক্ষার পালা রোগীর সিচুয়েশনের উপর নির্ভর করে। নন ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশনে ঘণ্টা চার পাঁচ লেগে যেতে পারে রেজিস্ট্রেশনের পর। রেজিস্ট্রেশনের সময় অভিজ্ঞ ট্রিয়াজ নার্স রোগীর কন্ডিশন কতখানি গুরুতর সেটার উপর নির্ভর করে তার কেইসটা হ্যান্ডেল করে। আমাকে দশ মিনিটের ভেতর আরেকজন নার্স এসে ভেতরে নিয়ে গেল সেকেন্ডারি ট্রিয়াজের জন্য। এবার তারা আমাকে ইসিজি করল এবং সেই সাথে বেশ কিছু ব্লাড নিলো ল্যাব টেস্টের জন্য। তারপর আমার বাম হাতের তালুর উল্টো পাশে একটা ক্যানোলা চ্যানেল ওপেন করলো যাতে যে কোন সময় আমার শরীরে আইভি দেয়া যায়। আবারও আমার অপেক্ষার পালা। তারা ব্লাড টেস্টের রেজাল্ট আধা ঘণ্টার ভেতর হাতে পেয়ে আমাকে সোজা ভেতরে নিয়ে গেলো। সেখানে আমার জায়গা হলো একটা বেডে। বেডটা করিডোরের একপার্শ্বে অবস্থিত। মাথার দিকটা বেশ উঁচু করে আমাকে তারা সেই বেডে শুইয়ে দিলো। একজন নার্স এসে তার পরিচয় দিলো – আমি অ্যালেক্সা, আমি তোমার নার্স, কিছুক্ষণের ভেতর আমাদের ডিউটি ডক্টর তোমাকে দেখতে আসবে। অ্যালেক্সা নাম শুনে আমি এবং আমার স্ত্রী দুজনেই একই সাথে একটু অবাক হতেই সে মৃদু হেসে আমাদেরকে জানালো যে, অ্যামাজনের জেফ বেজোজ তার নামকে পুরো পৃথিবীতেই সুপার পপুলার করে দিয়েছে। তার এই মৃদু রসিকতায় আমরা সবাই একটু প্রাণ খুলে হাসলাম। যাই হোক, ঘড়িতে তখন বাজে সকাল দশটা। সব কিছুই বেশ তাড়াতাড়িই এগুচ্ছে।
ঘণ্টা খানেকের ভেতর ডিউটি ডাক্তার ডঃ ওয়েবার আসলেন আমাকে দেখতে। বয়সে একদম তরুণ ডঃ ওয়েবার আমার হিস্ট্রি নেয়া শুরু করলেন। আমার স্ত্রী এই সময় বেশ গুছিয়ে আমার হিস্ট্রি বলে গেলেন। বিশেষ করে আমার ফ্যামিলিতে প্রায় সবারই যে হার্টের সমস্যা রয়েছে সেটা বেশ গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হলো। আমার স্ত্রী বেইজিং মেডিকেল ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিবিএস করা। পাশ করেই উনি তার পিতার কর্মস্থল সৌদি আরবের জেদ্দায় চলে যান। সেখানে কিং ফাহাদ হসপিটালের কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টে প্রায় বছর খানেক কাজ করেছিলেন। ফলে ডঃ ওয়েবারের সাথে তার আলাপগুলো হচ্ছিল প্রফেশনাল লেভেলে। ডঃ ওয়েবার আমাকে বার বার জিজ্ঞেস করছিলেন কি করলে বা কোন ম্যানুভারে আমি বুকে ডিসকম্ফোর্ট অনুভব করি। আমি তাকে বললাম, সিঁড়ি ভাঙলে। বিশেষ করে ইউনিয়ন স্টেশনের সেই খাড়া আর লম্বা সিঁড়িটা। ডঃ ওয়েবার কিছুক্ষণ পরে কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের একজন ডাক্তারকে সাথে নিয়ে আসলেন আমার কন্ডিশন অ্যাসেস করা জন্য। সেই ডাক্তারও আমার হিস্ট্রি নিলেন। আমি যে সিঁড়ি ভাঙলে হাঁপিয়ে উঠি সেটার জন্য উনি বললেন যে জরুরী ভিত্তিতে আমার একটা এনজিওগ্রাম হওয়া উচিৎ। ফলে ডঃ ওয়েবার আমাকে হসপিটালে ভর্তি করে নিলেন। সেই সাথে পরদিন সকালে আমার এনজিওগ্রাম করার স্লট বুক করলেন। তখন ঘড়িতে বাজে বেলা বারোটার একটু বেশী। হসপিটালে ভর্তির কথা জানতে পেরে প্রথমেই আমি আমার দীর্ঘদিনের কলিগ এবং বন্ধু ডুয়োং-কে ফোন করে ঘটনা জানালাম এবং বললাম যে হয়ত আগামী কয়েকদিন আমি অফিসে যেতে পারব না। তবে আগামীকাল এনজিওগ্রামের রেজাল্টের উপর নির্ভর করবে কবে নাগাদ আমি আবার অফিসে যেতে পারব। আর আমার ম্যানেজারকে একটা টেক্সট ম্যাসেজ দিলাম।
আমার দীর্ঘ উনিশ বছরের টরন্টো জীবনে আগে কখনো হসপিটালে ভর্তি হইনি। স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে আমি কিছুটা শঙ্কিত। কিছুক্ষণের ভেতর একজন বয়স্ক মহিলা এসে আমাকে জানালো যে সে এসেছে হসপিটালের ‘অ্যাডমিশন’ ডিপার্টমেন্ট থেকে। আমার কাছ থেকে জানতে চাইলো প্রাইভেট কেবিনে থাকার জন্য আমার কোন ইনস্যুরেন্স আছে কিনা। হাসপাতালে যখন কোন রোগীকে ভর্তি করা হয় তখন তিন ক্যাটেগরির রুমের অপশন রয়েছে তার। প্রথম ক্যাটেগরি হচ্ছে প্রাইভেট কেবিন যেখানে রোগীকে রাখা হয় একটি সিঙ্গেল রুমে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সেমি-প্রাইভেট কেবিন, যেখানে এক রুমে দুইজন রোগী থাকে। আর শেষ ক্যাটেগরিটি হচ্ছে ওয়ার্ড যেখানে সাধারণত একটি বড় রুমে চার থেকে ছয়জন রোগীকে রাখা হয়। ওন্টারিও হেলথ ইনস্যুরেন্স প্ল্যান বা ‘ওহিপ’ কানাডিয়ান সিটিজেন কিংবা পার্মেনেন্ট রেসিডেন্টের জন্য ওয়ার্ডে থাকার ব্যয়ভার বহন করে থাকে অর্থাৎ রোগীকে নিজের পকেট থেকে কোন পয়সা দিতে হয় না। হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে সমস্ত প্রকার মেডিক্যাল প্রসিড্যুর এবং মেডিসিনের খরচও ‘ওহিপ’ কাভার করে থাকে। এখানে বলে রাখা ভালো যে ‘ওহিপ’-এর ফান্ডিং-এর একটি বড় অংশ আসে আমাদের অর্থাৎ কানাডিয়ানদের ট্যাক্স ডলার থেকে। প্রাইভেট কিংবা সেমি-প্রাইভেট কেবিনে থাকার জন্য হাসপাতাল থেকে নির্ধারিত একটি রেন্ট চার্জ করা হয়ে থাকে। রোগী নিজ পকেট থেকে কিংবা রোগীর ইনস্যুরেন্স সেই রেন্ট পে করে থাকে। আমার ইনস্যুরেন্স সেমি-প্রাইভেট কাভার করে বিধায় আমার জন্য সেমি-প্রাইভেট কেবিনের রুম খোঁজা শুরু হলো। আমার যদি কোন ইনস্যুরেন্স না থাকত তবে আমাকে এই সেমি-প্রাইভেট কেবিনে থাকার জন্য প্রতি রাতের জন্য গুনতে হত সাড়ে তিনশত ডলার। আমাকে জানানো হলো যে সিট পাওয়া গেলেই হসপিটাল থেকে লোক আসবে আমাকে নিতে। আপাতত আমাকে ইমার্জ-এর এই বেডে শুয়েই সেই লোকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। লাঞ্চের সময় পার হয়ে যাচ্ছে দেখে নার্স অ্যালেক্সা এক সময় আমাকে আর আমার স্ত্রীকে দুটো স্যান্ডউইচ দিয়ে যায়। টরন্টো জেনারেল হসপিটালের ইমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টের নার্সদের এখতিয়ারে যে এই জাতীয় স্ন্যাক্স মজুদ থাকে সেটা আগে জানা ছিল না। স্যান্ডউইচ খাওয়া শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে ডঃ ওয়েবার এসে জানালেন যে এনজিওগ্রামের জন্য একটা স্লট ফাঁকা পাওয়া গেছে। কিন্তু আমি যে মাত্রই স্যান্ডউইচ খেয়েছি সেটা জানতে পেরে তিনি আমাকে আগামী চার ঘণ্টা ‘নাথিং বাই মাউথ’ অর্থাৎ কোন কিছু না খেয়ে থাকার উপদেশ দিলেন। আর যদি আজ সন্ধ্যার মধ্যে আর কোন স্লট না পাওয়া যায় তবে আগামীকাল সকালে আমার জন্য বুক করা স্লটেই এনজিওগ্রাম করা হবে। সেই ক্ষেত্রে রাত বারোটা থেকে ‘নাথিং বাই মাউথ’। এবার আমার শুরু হলো দ্বিমুখী অপেক্ষার পালা। কখন হসপিটালের সিট খালি হবে আর আমাকে সেখানে নেয়া হবে। কখন আবার এনজিওগ্রাম করার স্লট পাওয়া যাবে। এই দ্বিমুখী অপেক্ষার ভেতরই শুরু হয়ে গেল আমার মেডিকেল ট্রিটমেন্ট। আমার রেগুলার ঔষুধগুলোর সাথে যোগ করা হলো একটা ব্লাড থিনার ট্যাবলেট। আর আইভি চ্যানেলে ‘হেপারিন’ নামক আরেকটি ব্লাড থিনার। সেই সাথে মাপা শুরু হলো আমার ‘রেসিডুয়্যাল ইউরিন’। পেশাব করার পর তলপেটে আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং মাধ্যমে মাপা হয় কি পরিমাণ ইউরিন এখনও রয়ে গেছে। এসব করতে করতে এক সময় রাত হয়ে আসলে আমার স্ত্রী বাসায় চলে যায়। আমি একা একা অপেক্ষা করতে থাকি কখন সিট খালি হবে। এক সময় মনে হলো হয়ত আজকের রাত্রিটা ইমার্জ-এর এই বেডেই কাটিয়ে দিতে হবে।
রাত নয়টায় অ্যালেক্সার ডিউটি শেষ হয়ে যাওয়ায় তার বদলি নার্স স্টিভেন এসে আমাকে জানিয়ে যায় যে সে এখন আমার দায়িত্বে। আজ রাতে আমার আর এনজিওগ্রাম করার সম্ভাবনা নেই সেটা জানার পর আমি স্টিভেনকে স্যান্ডউইচ দেয়ার অনুরোধ করি। কারণ রাতে আমাকে হসপিটালের বেডে নিয়ে গেলেও সেখানে আমার জন্য কোন ডিনার থাকবে না। আবার রাত বারোটা থেকে ‘নাথিং বাই মাউথ’ শুরু হয়ে যাবে। স্টিভেন যখন আমার জন্য স্যান্ডউইচ আর সাথে ইয়োগার্ট নিয়ে এলো, ঠিক তখনই হুইল চেয়ার নিয়ে সেই প্রত্যাশিত লোকটির আবির্ভাব ঘটলো যে আমাকে হসপিটালে নিয়ে যাবে। যাই হোক সে আমাকে ডিনার করার জন্য কিছুটা সময় দিলো। ডিনার শেষ হতেই সে আমাকে নিয়ে হাজির হলো হাসপাতালের পিটার মাঙ্ক বিল্ডিং-এর পাঁচ তলায়। সময় তখন রাত্রি সাড়ে দশটা। আমার জন্য সিট বরাদ্দ হয়েছে ১৮৮ নম্বর রুমের জানালার সাথে লাগোয়া বেড নম্বর ২। এই রুমে বেড দু’টি। বেড নম্বর ১-এ এক পৌঢ়া মহিলাকে শুয়ে থাকতে দেখলাম। পরে জেনেছিলাম এই মহিলার নাম এলিজা। অধিকাংশ সময়ই তিনি অচেতন থাকেন। আমি হুইল চেয়ার থেকে নেমে আমার বেডে বসতেই দু’জন নার্স এসে উপস্থিত। তাদের ভেতর একজন আমাকে জানালো যে তার নাম এরিকা এবং আগামীকাল সকাল সাতটা পর্যন্ত সে আমার দায়িত্বে। এরিকা হচ্ছে একজন ট্রেইনি নার্স। তার সাথে থাকা নার্স জিঙ্কি হচ্ছে তার সুপারভাইজার। আমাকে তারা সেটল ডাউন করতে অর্থাৎ আমার নিজস্ব জামা কাপড় ছেড়ে হাসপাতালের গাউন পরা থেকে শুরু করে কিভাবে বেডটিকে বিভিন্ন সুইচের মাধ্যমে মাথা এবং পায়ের দিক উঁচু কিংবা নিচু করা যায়, কিভাবে নার্সকে কল করার জন্য সুইচ টিপতে হয় সেগুলো বুঝিয়ে দিলো। প্রথমে এরিকা আমার ব্লাড প্রেসার, টেম্পেচার আর অক্সিজেন স্যাচুরেশন মেপে রেকর্ড করে নিল। এই তিনটিকে তারা একত্রে ভাইটালস বলে। দিনের ভেতর বেশ কয়েকবার তারা সব রোগীর ভাইটালস রেকর্ড করে। ভাইটালসের পর আমার ব্লাড সুগার মাপা হলো। এরপর তারা সার্বক্ষণিকভাবে আমার হার্টের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য টেলিমেট্রি নামের একটা ডিভাইস চালু করল। সাইজে একটা মোবাইল ফোনের চেয়ে কিঞ্চিৎ বড় এই ডিভাইসটির সাথে লাগানো সাত থেকে আটটি প্রোব আমার চেস্টের বিভিন্ন জায়গায় স্টিকার দিয়ে লাগানো হলো। আর ডিভাইসটিকে একটা ক্রস-বডি-ব্যাগের সাহায্যে আমার শরীরে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। এবার এরিকা আমার ব্লাড নেয়ার প্রস্তুতি নিতেই আমি তাকে সতর্ক করে দিলাম যে আমার ভেইন খুঁজে পাওয়া কিছুটা ডিফিকাল্ট। ব্লাড দেয়ার সময় এটা আমি সব সময়ই করে থাকি কারণ আমি আমার অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জানি অনেকেই আমার ভেইন খুঁজে পায় না সহজে। বেশ কয়েকবার গুতাগুতি করে তারপর তারা জায়গামত নিডল ঢুকাতে সমর্থ হয়। আমার সাবধান বাণী শুনে এরিকা মনে হয় কিছুটা ভড়কে গেলো। কারণ সে জিঙ্কিকে অনুরোধ করল আমার ব্লাড নিতে। ব্লাড নেয়ার পর তারা আমাকে রাতের ঔষুধগুলি খাইয়ে বিদায় নেয়ার সময় আরো একবার মনে করিয়ে দিলো যে রাত বারোটা থেকে ‘নাথিং বাই মাউথ’। কারণ আগামীকাল সকালে আমার এনজিওগ্রাম করা হবে।
(চলবে)