শাহজাদীর কালো নেকাব

পুরানো এক বাংলা নাটকের নাম থেকে লেখটির নামকরণ। নাট্যকারের নাম যেমন মনে নেই, তেমনি মনে নেই নাটকের কাহিনীও। তারপরও কেন এই শিরোনাম, লেখাটি পড়লেই তা পরিস্কার হবে। এ বছর পবিত্র হজ্জ পালন করার সময় নিকাব নিয়ে ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতাই হচ্ছে এই লেখাটির প্রতিপাদ্য।

হজ্জ পালনের তাগিদ সব সময়ই অনুভব করেছি, কিন্তু “কবে এবং কিভাবে” তার কোন বিশদ পরিকল্পনা কখনোই করা হয়নি। আমার স্ত্রীর হজ্জ করা হয়ে গেছে বিয়ের আগেই। তার দিক থেকে একটা তাগাদা সব সময়ই ছিল, সেই সঙ্গে যখন আমার মেজো ভাইয়ের উপদেশ যোগ হলো তখন ঠিক করলাম আর দেরী নয়, এবারই হজ্জে যাবো। সময়টা তখন রমজানের মাঝামাঝি। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো স্বল্প পরিচিত বাংলাদেশী ছেলেদের একটা দলও যাচ্ছে এবার হজ্জে। তাদের দলে ভীড়ে গেলাম তিন ব্যাচ জুনিয়র পাবনা ক্যাডেট কলেজের জুবায়েরের পরামর্শে। দলের সবাই অবশ্য ইতিমধ্যেই ‘আর্লি বার্ড’-এর সুবিধাসহ ‘আল মাদীনা ট্র্যাভেল’-এ বুকিং দিয়ে ফেলেছে।

হজ্জ কিংবা উমরা সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে তেমন কোন খোঁজ খবর করিনি আগে কখনো। লোক মুখে শোনা কাহিনী আর নিউজ মিডিয়ার বদৌলতে মানসপটে হজ্জের যে চিত্রটি ভেসে উঠত তা হচ্ছে সাদা ইহরাম পরিহিত সারি সারি মানুষ কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করছেন, আরাফাতের ময়দানে আল্লাহ্‌ তা’য়ালার দরবারে দু’হাত তুলে প্রার্থনা করছেন আর মীনাতে শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করছেন। সেই সারি সারি মানুষের মাঝে নিজেকে কল্পনা করে বেশ রোমাঞ্চিত হলাম। আবার একই সাথে অজানা সব আশংকায় মনটা কিছুটা হলেও শঙ্কিত হয়ে উঠলো। তবে এক সময় সমস্ত সংশয় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে অফিসে তিন সপ্তাহের জন্য ছুটির আবেদন করে বসি। আমার ম্যানেজার, ইরাকী খ্রিস্টান ইমিগ্রান্ট, হজ্জের কথা বলাতে বিনা বাক্য ব্যয়ে ছুটি মঞ্জুর করে দিলো। অবশ্য সেই সাথে সৌদী আরবের গরমের ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করে দিলো। অফিসে রটে গেলো যে আমি হজ্জে যাচ্ছি, তবে অনেক কলিগই ধরে নিলো যে আমি আমাদের ডাউন-টাউন অফিসের প্রজেক্ট “হোম ওনার’স জার্নি” যাকে সংক্ষেপে “হজ” (HOJ) বলে, সেই প্রজেক্টে কাজ করতে যাচ্ছি। তাদের এই ভুল ভাঙ্গাতে আমাকে অবশ্য বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো।

অবশেষে হজ্জের বুকিং দিয়ে দিলাম – এক্সপ্রেস প্যাকেজ, দুই সপ্তাহের ভিতর হজ্জ শেষে টরেন্টো ফেরৎ। গত পনেরো বছর ধরে ‘আল মাদীনা ট্র্যাভেল’ টরেন্টো থেকে হজ্জ ও উমরা পালনের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তাদের আয়োজিত দু’টো সেমিনারে যোগ দিয়ে হজ্জে আমাদের করণীয় বিষয়াদি সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পারলাম। আরও বুঝতে পারলাম যে তারা হজ্জ যাত্রীদেরকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে বিভন্ন রুটে যাওয়া আসার ব্যবস্থা করেছে। প্রতিটি গ্রুপে তাদের নিয়োজিত একজন করে ‘শেখ’ যাচ্ছেন যিনি কিনা যাত্রা পথে গ্রুপ লীডারের কিংবা আমীরের ভূমিকা পালন করবেন। বেশ কয়েকবার রদবদলের পর অবশেষে আমার যাওয়ার পথ নির্ধারিত হলো, টরেন্টো-কোপেনহেগেন-ইস্তাম্বুল-মদিনা। আর ফেরার পথ – জেদ্দা-লন্ডন-টরেন্টো। অগাস্টের নয় তারিখে যাত্রা শুরু আর ছাব্বিশ তারিখে টরেন্টোতে ফেরত আসা। এই রদবদলের পালায় আমি আমার মূল দল থেকে অবশ্য আলাদা হয়ে গেলাম। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের যাত্রার সপ্তাহ খানেক আগে কানাডার সাথে সৌদী সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্কে হঠাৎ করেই টানাপোড়ন শুরু হয়ে যায়। যার জের ধরে সৌদী সরকার টরেন্টোমুখী সৌদী এয়ারলাইন্সের সমস্ত ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করে। নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ থাকায় অনেকেই সৌদী এয়ারলাইন্সকে কেন্দ্র করেই হজ্জের প্যাকেজ সিলেক্ট করে থাকেন। ফ্লাইট বাতিলের সৌদী সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে তাদের ফিরতি ফ্লাইট অনিশ্চিত হয়ে পরে। টরেন্টো স্টারে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আল মাদীনার ম্যানেজার ফয়েজ ইয়াহিয়া উল্লেখ করেন যে তাঁর পনেরো বছরের অভিজ্ঞতায় এরকম জটিল পরিস্থিতি তিনি কখনো দেখেননি। আমার ফেরার ফ্লাইট সৌদী এয়ার লাইন্সে না হওয়াতে আমি অবশ্য এই গ্যাঁড়াকল থেকে বেঁচে যাই।

যাত্রা শুরুর নির্ধারিত দিন-ক্ষণে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখি আমার গ্রুপের অনেকেই হাজির। কারো সাথেই আমার পূর্ব পরিচয় নেই, এই প্রথম দেখছি তাদের। বয়সে সবার থেকে তরুণ ওমর উসমান আগ বাড়িয়ে আমার সাথে পরিচিত হলো প্রথম। সাথে তার সদ্য বিবাহিতা হিজাব পরিহিতা স্ত্রী, পাকিস্তানের বনেদী বংশের মেয়ে। কেতাদুরস্ত এহসান ভাইয়ের সাথেও পরিচয় পর্বটাও সারা হয়ে গেল। এহসান ভাইয়ের সাথেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের গ্রুপ লীডার বা দলের আমীর শেখ আরেফ দেশাই। উনাকে অবশ্য আমি ‘আল মাদিনা’-র শেষ হজ্জ সেমিনারে অন্যান্য শেখদের সাথে বক্তৃতা করতে দেখেছি। অন্যান্য শেখদের চেয়ে বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং এক্সেন্ট বিহীন ইংরেজী বলার কারণে তাঁকে আমি আলাদা করে মনে রেখেছিলাম। এবার তাঁর সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় হলো। খেয়াল করে দেখলাম, কিছুটা দূরে মহিলাদের একটা জটলা। সেই জটলার ভিতর কালো নিকাবসহ বোরকা পরিহিতা এক মহিলাকে দেখা গেলো অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। বাকীরা সব শ্রোতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য জানা গেল যে উনি শেখ আরেফের স্ত্রী, মহিলাদের জন্য ‘আল মাদীনা’ থেকে নিয়োজিত শেখ। তাঁর নাম অবশ্য জানা হয়নি।

সময় মতো বোর্ডিং পাস আর ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও এয়ার-কানাডার ফ্লাইট দুই ঘণ্টা দেরী করে ছাড়ল। মদীনার পথে আমাদের যাত্রা শুরু হলো ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন দিয়ে। সাড়ে সাত ঘণ্টার পথ। আড়াই ঘণ্টার যাত্রা বিরতির পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য টার্কিশ এয়ারলাইন্স যোগে ইস্তাম্বুল। যেহেতু আমাদের যাত্রা শুরুই হলো দুই ঘণ্টা বিলম্বে, তাই কোপেনহেগেনের যাত্রা বিরতি যে সংক্ষিপ্ত হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। ফ্লাইট যখন কোপেনহেগেন পৌঁছল তখন মাত্র ভোর হয়েছে। প্লেন থেকে নেমেই সোজা চলে গেলাম টার্কিশ এয়ারলাইন্সের বোর্ডিং কাউন্টারে। কাউন্টার তখনও খোলেনি, তবে খোলার প্রস্তুতি চলছে। আমরা যে যার মতন লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। লাইনের প্রথমেই দেখা গেল শেখ আরেফ স্বস্ত্রীক দাঁড়িয়ে। তাঁদের দু’তিন জন পরেই আমি। কিছুক্ষণের ভেতর পাশাপাশি দুইটি কাউন্টার সার্ভিসের জন্য তৈরী হয়ে গেলো যার একটিতে একজন পুরুষ আর অন্যটিতে একজন মহিলা অফিসার দাঁড়িয়ে। মহিলা অফিসারের ইশারায় সাড়া দিয়ে শেখ আরেফ তাঁর নিকাব পরা স্ত্রীকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। আমি কিছুটা কৌতূহলী হলাম। কেননা ডেনমার্কের আইন প্রণেতারা নিকাব নিষিদ্ধ করে একটা আইন পাশ করেছে যা কিনা পহেলা অগাস্ট থেকে অর্থাৎ মাত্রই কার্যকর করা হয়েছে। কার্যকর করার পরপরই অগাস্টের চার তারিখে কোপেনহেগেনের উত্তরে অবস্থিত হোরশোলম শহরের একটি শপিং মলে এক মুসলিম তরুণীর নিকাব জোর করে খুলে দেয় আরেক তরুণী। পুলিশের হস্তক্ষেপে তাদের মধ্যেকার ধস্তাধস্তি থামলে মুসলিম তরুণীটি আবার তার খুলে যাওয়া নিকাবটি পরে নেয়। নিকাব খুলতে কিছুতেই রাজী না হওয়ায় পুলিশ তাকে নিকাব নিষিদ্ধ আইনে জরিমানা করে। বিলাতের গার্ডিয়ান পত্রিকাসহ বিশ্বের প্রায় সবগুলি সংবাদ মাধ্যম বেশ গুরুত্বের সাথে এই সংবাদটি প্রচার করে। এই ঘটনার কিছুদিন পর আলজেরিয়ার বংশোদ্ভূত ফরাসী ব্যবসায়ী রশীদ নেক্কাজ ঘোষণা করেন যে ডেনমার্কের নিকাব নিষিদ্ধ আইনের আওতায় সরকারের দায়েরকৃত সমস্ত জরিমানা তিনি পরিশোধ করে দেবেন। যদিও ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিকাব পরিধানের পক্ষে নন, তবে তিনি বিশ্বাস করেন যে নিকাব পরিধান করা বা না করার স্বাধীনতা যে কোন মহিলারই থাকা উচিৎ।

এই নিকাব নিয়ে কানাডাতেও কিন্তু কম জল ঘোলা হয়নি। ২০১৫ সালের ফেডারেল ইলেকশনের ঠিক আগে আগে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল উঠে পড়ে লাগল সিটিজেনশীপ সেরেমনিতে নিকাব পরার ব্যাপারে একটি কোর্ট রুলিং নিয়ে। সিটিজেনশীপ বিষয়ক কেবিনেট মিনিস্টার জেইসন কেনি ২০১১ সালে কোন প্রকার আইনি ভিত্তি ছাড়াই সিটিজেনশীপ সেরেমনিতে নিকাব পরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। পাকিস্থান থেকে আগত হাই-স্কুল শিক্ষিকা জুনেরা ইসহাক এই নিষেধাজ্ঞাকে ফেডারেল কোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি চেহারা সনাক্তকরণের জন্য নিকাব উন্মুক্ত করতে রাজী কিন্তু পাবলিক সেরেমনিতে নিকাব পরিধানের ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন। স্টিফেন হারপারের নিয়োগকৃত তিনজন বিজ্ঞ বিচারকই জুনেরা ইসহাকের দাবীর পক্ষে রায় দেন। হারপারের দল এই রুলিং-এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপীল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। একই সাথে ঘোষণা দেয় যে, তারা নির্বাচনে জয়ী হলে সরকারী কর্মচারীদের নিকাব পরা নিষিদ্ধ করবে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রবলভাবে সমালোচিত হয় বিভিন্ন মহলে। টরেন্টো স্টার-এর প্রসিদ্ধ কলাম লেখক হারুন সিদ্দিকি সরকারের এই পদক্ষেপকে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় আকারের ‘state sponsered bigotry’ বলে উল্লেখ করেন। সিবিসি-এর ‘দি ন্যাশনাল’-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যালগেরীর মেয়র নাহিদ নেনশী বলেন – ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে নিকাবকে পছন্দ করিনা এবং মনে মনে চাই মানুষ নিকাব পরিধান না করুক। কিন্তু আরও কম পছন্দ করি যখন সরকার বলে দেয় কি পরতে হবে।’ তিনি এক্ষেত্রে নিকাবকে কোনভাবেই ‘দমন নীতি’-র প্রতীক হিসেবে মানতে রাজী নন। কারণ কারও মতের বিরুদ্ধে নিকাব পরতে বাধ্য করা যদি ‘দমন নীতি’-র প্রতিফলন হয়ে থাকে, তবে কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিকাব অবমুক্ত করাটাও হবে একই নীতির প্রতিফলন। মেয়র নাহিদ হারপার সরকারের এই নিকাব ইস্যু নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপীল করাকে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ এবং ‘জনগণের করের টাকার শ্রাদ্ধ’ বলে মন্তব্য করেন। এই নিয়ে তিনি জেইসন কেনির সাথে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লে লিবারেল দলের দলীয় নেতা জাস্টিন ট্রুডো ‘টুইট’ করে মেয়র নাহিদকে সমর্থন জানান এবং হারপারকে ‘বিছিন্নতার রাজনীতি’ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। অপর দিকে জনগণকে বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে নির্বাচনের জেতার জন্য এই নিকাব ইস্যুকে হারপারের এক ধরণের অস্ত্র (weapon of mass distraction) বলে অভিহিত করেন নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা টমাস মোলকেয়ার। পরে অবশ্য নির্বাচনে হারপারের দল হেরে যায় এবং হারপারকে কনজারভেটিভ দলের দলীয় নেতার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। আরও পরে (২০১৭-তে) যখন ক্যুইবেক সরকার বিল-৬২-এর মাধ্যমে ঘোষণা করে যে নিকাব পরিহিত অবস্থায় কেউ সরকারী কোন সেবা পাওয়ার যোগ্য হবে না, তখন অবশ্য প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো সেটাকে মৌনভাবে সমর্থন দিয়ে যান। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে যে কিছু নেই, সেটাই তিনি আসলে প্রকারান্তে বুঝিয়ে দেন।

এই নিকাব ইস্যু যে শুধু মাত্র ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকাতে গন্ডীবদ্ধ তা কিন্তু নয়। গত বছরের অর্থাৎ ২০১৭ সালের অগাস্ট মাসে অস্ট্রেলিয়ার অতি-ডানপন্থী ‘ওয়ান নেশন’ পার্টির নেতা পলিন হ্যান্সন নিজেকে বোরকা আর নিকাব দিয়ে সম্পূর্ণভাবে আবৃত করে সিনেট চেম্বারে প্রবেশ করে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেন। কুইন্সল্যান্ডে জন্ম থেকে বেড়ে উঠা এই পলিন হ্যান্সন অবশ্য নানা কারণেই বিতর্কিত, নির্বাচনে প্রতারণার আশ্রয় নেয়ার অভিযোগে তাকে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছে ২০০৩ সালে। নিকাব পরে তার এই স্ট্যান্টবাজীর মূল উদ্দেশ্য ছিল নিকাবের বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করার মাধ্যমে নিকাবকে নিষিদ্ধ করার আইন প্রণয়ন করা। তার এই নিকাব নাটক তাৎক্ষণিকভাবে খবরের হেডলাইনে পরিণত হয় এবং একই সাথে তার এই আচরণকে বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা জানানো হয়। সিনেট চেম্বারের এ্যাটর্নী জেনারেল জর্জ ব্র্যান্ডস বিশেষ এক গোষ্ঠীর ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার জন্য তাকে তীব্র ভাষায় ভৎসর্না করেন এবং একই সাথে নিশ্চিত করেন যে নিকাব পরিধান নিষিদ্ধ করার কোন পরিকল্পনা তাদের নেই।

যে নিকাব নিয়ে সারা দুনিয়ায় এত বিতর্ক, সেই নিকাব পরে শেখ আরেফের স্ত্রী দৃঢ় পায়ে এগিয়ে গেলেন কাউন্টারের দিকে, মুখোমুখি হলেন মহিলা অফিসারের। নির্বিকার চিত্তে পাসপোর্ট চেক করার এক পর্যায়ে অফিসার শেখ আরেফের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে গেলেন কাউন্টারের পিছনের আড়ালে, ছবির সাথে চেহারা মিলিয়ে দেখার জন্যে। ফিরে এসে তাদের পাসপোর্টে সিল দিয়ে বোর্ডিং পাস হাতে ধরিয়ে দিলেন হাসিমুখে।

এর পরপরই আমার ডাক পড়তেই আমি ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেলাম কাঊন্টারের দিকে।

পুনশ্চঃ সম্প্রতি ইসরাইলের জনপ্রিয় মডেল বার রাফেলি এই নিকাব নিয়ে একটি অ্যাড করে সমালোচিত হয়েছেন। রেডিমেড পোশাকের ব্র্যান্ড ‘হুডি’-এর জন্য করা এই অ্যাডের থিম হচ্ছে ‘freedom is basic’। আর নিকাব খুলে বেরিয়ে আসাটাকেই এখানে ফ্রীডম-এর প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘ইউ-টিউব’-এ এই ভিডিও-তে একজন কমেন্ট করেছেন এই বলে যে, ‘তোমার ফ্রীডম-এর সংজ্ঞার সাথে আমি একমত নই, আমি হিজাব পরেই নিজেকে ফ্রী মনে করি।’

অতি সম্প্রতি সৌদী আরবের কিছু সংখ্যক নারী তাদের ট্র্যাডিশনাল কালো রঙের পোশাক যা ‘আবায়া’ নামে পরিচিত তা উল্টা করে পরিধান করে জন সন্মুখে আসছেন। আপাদমস্তক ঢাকা এই পোশাকটি প্রতিটি নারীর জন্য রাষ্ট্রীয় ভাবে নির্ধারিত, যা কঠোর ভাবে অনুসরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই বছরের মার্চ মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পোশাকের ব্যাপার শিথিল নীতি গ্রহনের আশ্বাস দিলেও তা এখনও কার্যকরী করা হয়নি। তাছাড়া বিশিষ্ট সৌদী আলেম শেখ আহমেদ বিন কাসিম বলেন যে, আবায়া যে কালো রঙেরই হতে হবে, সেই বিধান কিন্তু ইসলামে নেই। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের নির্ধারিত পোশাক নীতিতে এখনও কোন পরিবর্তন না আসাতে তাদের এই নীরব প্রতিবাদ – ‘ইনসাইড-আউট আবায়া’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে তারা সামাজিক নেটওয়ার্কে তাদের উল্টা করে পরা আবায়ার ছবি দিচ্ছেন।

৪,১৫৯ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “শাহজাদীর কালো নেকাব”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    আমি যতদূর জানি, আমাদের ধর্মে মেয়েদের নিক্বাব পরা বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু হিজাব পরা এবং ঢিলে ঢালা পোষাকে শরীরের ফীচার্সগুলো ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক। তবে কেউ যদি নিক্বাব পরিধান করতে চায়, তাকে সেটা করতে না দেয়াটা ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সামিল।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।