পিতৃত্ব কিংবা মাতৃত্ব নয় ; “প্যারেন্টহুড”

১। পিতৃত্ব কিংবা মাতৃত্ব নিয়ে কোন ডিবেটে আমি যাবো না । আমার কাছে “প্যারেন্টহুড” জিনিষটাই মহান একটা জিনিষ । আমার রাসূল যেখানে প্রথম ৩ বার মায়ের কথা বলেছেন সেখানে আমার নতুন করে কিছু প্রমান করার চেষ্টা করার মতো বোকামী না করলেও চলে । আমি নিজেও বোধ হয় মায়ের দিকেই একটু বেশী পক্ষপাতদুষ্ট ।

২। কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা হেলিকপ্টার ক্র্যাশ করে । আকাশে থাকা অবস্থায় হেলিকপ্টারটির টেইল রটর ভেঙে যায় । পাইলট ২ জনের খুব বড় কোন ক্ষতি না হলেও তাদের এরকম অল্পস্বল্প ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ফিরে আসাটাই বিরাট এক স্বস্তির ব্যাপার ছিল । পরবর্তিতে পাইলট ২ জনের সংগেই আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল । মনের মধ্যে ঘুরতে থাকা ১টা প্রশ্ন ১ জনকে না করে পারলামই না ; জিজ্ঞাসা করলাম, “স্যার, চপারটা যখন মাটিতে পড়ে যাচ্ছে, আর কোন কন্ট্রোল আপনাদের হাতে নেই, আপনারা ২ জন তো মোটামুটি নিশ্চিত যে মারা যাচ্ছেন । ঠিক সেই সময় আপনার কি মনে হয়েছিল?” ইউনিফর্ম পড়া মানুষের চোখে পানি কেমন যেন ঠিক মানায় না; সেটা যদি হয় জুনিয়রের সামনে তাহলে তো প্রশ্নই আসে না । তবুও আমার সিনিয়র চোখের পানিটা ঠিক লুকাতে পারলেন না । আমার প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “রুম্মান, ঠিক ঐ সময়ে ১ বারের জন্য আমার ছেলেটার মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।” প্রস্তুত ছিলাম না; তাই আমারও চোখের মধ্যে মনে হয় ময়লা এসে পড়লো । ইউনিফর্ম পড়া মানুষের চোখে যে পানি ঠিক মানায় না !!!

৩। গতকাল লঞ্চডুবির ঘটনাটা শুনে খুব একটা উপলব্ধি করতে পারিনি । পরবর্তিতে যখন ডুবে যাওয়ার ভিডিওটা দেখলাম তখন আবার চোখে কি যেন এসে পড়লো । মানুষ শেষ চেষ্টা পর্যন্ত করে আর কোন উপায় না দেখে পানিতে লাফিয়ে পড়লো । ঠিক তখনি আমার মনে হলো ঐ লঞ্চে আমি থাকতে পারতাম; তার চাইতেও ভয়ংকর ব্যাপার হলো আমার সংগে আমার ছেলে থাকতে পারতো । আমি আর ভাবতে পারছিলাম না । আমি নিশ্চিত, ঐ লঞ্চে আমার মতো কিছু বাবার সংগে আমার ছেলের মতো কিছু সন্তান ছিল । আমি ১০০ ভাগ নিশ্চিত, ঐ সব বাবা কিংবা মা’রা তাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও তাদের সন্তানকে বাঁচাতে চেয়েছেন । প্যারেন্টহুডটা এ জন্যই মহান । নিশ্চিত মারা যাওয়ার আগ মুহুর্তে ছেলের মুখটা ভেসে উঠে, নিজের জীবন দিয়ে হলেও সন্তানকে বাঁচাতে চায় ।

৪। আমার খুব প্রিয় কোর্সমেট ফাত্তাহ (রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ) । খুব ভালো, উপকারী আর বুদ্ধিদীপ্ত একটি ছেলে । খুব কম মানুষ আছে যে ফাত্তাহ কে পছন্দ করে না (হয়তোবা কেউই নেই)। আমাদের ২ জনের একই সংগে একই ‌ব্যাটালিয়নে মিশনে নাম আসে । আমরা ২ জন মিলে প্ল্যান করতে শুরু করি ২ জন মিলে ইউরোপ ট্রিপে যাব । ইউরোপ ট্রিপের জন্য মোটা ওভারকোট থেকে শুরু করে সব শপিং ও করে ফেলি । ফ্লাই করার ৭ দিন আগে ফাত্তাহ আমার সংগে বিশ্বাসঘাতকতা করে বিয়ে করে বসে । আর বিয়ে করা মানেই ইউরোপ ‌ট্যুর বাতিল । অনেক গালাগালি করে আমি মিশনে যাই । এবার ৫ মাসের মাথায় ছুটিতে এসে আমিও বিয়ে করে ফেলি । ইউরোপ এর বদলে আমরা ২ জন আবিদজানে বউয়ের জন্য শপিং করি আর দিন গুনি । দেশে এসে বছর দুয়েক পর আমাদের ২ জনের স্ত্রীই সন্তানসম্ভবা হয় । আল্লাহর ইচ্ছায় কোন সমস্যা ছাড়া আমার সন্তান জন্মগ্রহন করলেও ফাত্তাহর ক্ষেত্রে দেখা দেয় বিপত্তি । ৭ মাসের মাথায় বাচ্চাটা পেটেই মারা যায় । বছর দেড়েক পর আমরা আবারও খুশীর খবর পাই । আগের মতো খারাপ না হলেও এবার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বাচ্চাটার ডেলিভারী করাতে হয় । প্রাথমিকভাবে কিছুদিন ইনকিউবেটরে এবং পরবর্তীতে বাসায় ওর ট্রিটমেন্ট ভালও চলছিল । কিন্তু ঈদের দিন সকালে হঠাৎ করেই ১০৪ ডিগ্রী জ্বর এসে বাচ্চার সব কিছু এলোমেলো হতে শুরু করে । বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে সি এম এইচে যায়গা হয় ওর । আস্তে আস্তে শরীরের সব অর্গানগুলি কাজ করা বন্ধ করতে শুরু করে । শরীরের ভেতরে রক্ত জমাট হয়ে যেতে থাকে । ব্রেইন কাজ করতে থাকে এলোমেলো । সমস্ত শরীরে ভাইরাস আর ব্যাকটেরীয়ায় ছেয়ে যায় । নিস্তেজ ৪ মাসের বাচ্চাটা চলে যায় লাইফ সাপোর্টে ।।।।।। হাসতে আর হাসাতে চ্যাম্পিয়ন ফাত্তাহর মুখে হাসি থাকে না ; আমরা ১টা মিরাকলের অপেক্ষা করি । আল্লাহ চাইলে তো সবই পারেন । হয়তো তিনি কোন পরীক্ষা নিচ্ছেন ।।।।।। আজ ৬ দিন বাচ্চাটা লাইফ সাপোর্টে । সবাই একটু দোয়া করবেন । আল্লাহ তায়ালা তাদের হেফাযত করুন । আমিন ।।।

১,১৬৮ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “পিতৃত্ব কিংবা মাতৃত্ব নয় ; “প্যারেন্টহুড””

    • রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

      নূপুর দা, আসলেই অনেক দিন । খুব একটা আসা হয়না আজকাল । কেমন আছেন ?


      আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
      ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
      ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
      সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
      ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
      আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

      জবাব দিন
    • রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

      প্রায় ৩ বছর পর উত্তর দিলাম । কারনটা নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন । এর দিন চারেক পরেই এক রাতে ঘুমিয়েছি । ২টার দিকে আরেক বন্ধুর ফোন- "ওঠ সি এম এইচে যেতে হবে।" বোঝার আর বাকী ছিলনা কিছু । সি এম এইচে গিয়ে দেখলাম বাচ্চাকে গোসল করানো হচ্ছে কারন ফজরের পরেই জানাযা আর তার পরেই দাফন ; ঠিক আমার বাসার পার্শ্বের ঘুমাবার জায়গাটাতেই...

      তবে হ্যাঁ, আল্লাহ ওদেরকে শান্তি দিয়েছেন । আরেকটা ফুটফুটে ছেলে এখন ওদেরকে বাবা-মা ডাকে ।


      আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
      ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
      ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
      সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
      ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
      আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।