প্রসংগ – ছড়া

রফিক নওশাদ স্যার ছিলেন আমার হাউস মাস্টার আর আমি হাউস কালচারাল। সেই সুবাদে স্যারের বেশ খানিকটা কাছাকাছি এসেছিলাম (না চাইলেও আসতে হয়েছিল)। স্যারের কাছ থেকে অনেক ভাল জিনিস শিখেছি। তার মধ্যে একটি ছিল “নিজের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে যাও এবং বেচে থাক পরবর্তি প্রজন্মের মাঝে”। শাহরিয়ারের কবিতা ও ছড়া সংক্রান্ত লেখাটি পড়ে আমার মা এর শেখানো একটা ছড়ার কথা মনে পড়ে গেলো। লেখার শেষ অংশে আমি চড়া টি লিখবো। তার আগে রফিক স্যারের সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা বলে নেই।

আমাদের যখন আন্তঃ হাউস কালচারাল প্রতিযোগীতা হয়, তখন অনুষ্ঠানের নাম কি দেব, তাই নিয়ে চলহিলো মহা গবেষণা। কিন্তু কেন যেন আমরা কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলাম না। হাউস মাস্টার বিরক্ত হয়ে বললেন, “বাবা রে যাও ত এখন। নাম কাঠ খড় কেরোসিন টাইপের কিছু একটা রেখে দাও তো।”

ত্যাদর আমি ও তো কম না। সত্যি সত্যি আমি অনুষ্ঠানের নাম রেখে দিলাম কাঠ খড় কেরোসিন। ষ্টেজের পর্দা খোলার সাথে সাথে তো সবার আক্কেল গূড়ুম……। এটা কি টাইপের নাম? স্বয়ং হাউস মাস্টার ই হতভম্ব। প্রিন্সিপ্যাল স্যার পিছনে স্যার কে কি জিজ্ঞেস করেছিলেন আর তিনি কি বলেছিলেন আমি জানিনা। অনুষ্ঠান শেষে হাউস মাষ্টার আমার উপর চড়ম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। পারলে তো আমাকে জুনিয়রদের সামেনই অপদস্থ করেন আর কি।

পরের দিন ভিপি’র রুমে ডাল পড়লো। ভিপি ছিলেন সামসুদ্দোহা স্যার। আমরা তাকে ডাকতাম ডেড বডি। তো তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “তোমার অনুষ্ঠানের নাম করণের স্বার্থকতা একটি সাদা কাগজে করে লিখে নিয়ে আসো।” প্রিন্সিপ্যাল জানতে চেয়েছেন। স্যারের বলার মাঝেই এমন একটা ভঙ্গি ছিলো যে আমি মোটামুটি চুপসে গেলাম। ক্লাশে আর ফেরত না গিয়ে সরাসরি লাইব্রেরীতে চলে গেলাম। কি করবো বা কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছিল তখন। কোন দুঃখে হাউস মাষ্টার কে ফিক্স করতে গেছিলাম…এখন তো নিজেই ফিক্সড হয়ে গেলাম।

সময় দ্রুত চলে যাচ্ছিল। আমি হাত বাড়িয়ে কাগজ কলম নিলাম। গভীর ভাবে চিন্তা করা বাদ দিলাম। ঠিক করলাম, ঝরের গতিতে কিছু একটা লিখে যাবো পৃষ্ঠা না ভরা পর্যন্ত। কোন কিছু বিশেষভাবে চিন্তা করা যাবেনা। ঠিক ই কিছুক্ষণের মধ্যে পৃষ্ঠাটি ভরিয়ে ফেললাম। এবং কি লিখেছি, তা দ্বিতীয় বার আর না পড়ে সোজা ভিপি’র রুমে গিয়ে জমা দিয়ে আসলাম। এদিকের এতকিছু যে হচ্ছে, তা আমি হাউস মাস্টার বা অন্য কোন হাউস টিউটর কে জানাইনি। আর জানাবো ই বা কি করে। আমার তখন চরম খারাপ ফর্ম। আবার স্যারদের সামনে গিয়ে কোন বিপদে পড়ি।

ঐদিন রাতেই হাউস অফিসে আমাকে তলব করা হলো। অনেক সংশয় নিয়ে হাউস অফিসে ঢুকলাম। ঢুকেই কেমন যেন একটু বেমানান লাগলো। আমার হাউস মাস্টারের চেহারাটা আমার সাথে তার বিদ্যমান সম্পর্কের সাথে ঠিক যায়না। কারণ অনুসন্ধান করতে থাকলাম। কিন্তু হাউস মাস্টার নিজেই রহস্যের মোড়ক উম্মোচন করলেন। আমার জমা দেয়া লেখাটা নাকি তিনি পড়েছেন। তার ভাষ্যমতে প্রিন্সিপ্যাল, ভিপি এবং তিনি – তিনজনই নাকি প্রচন্ড অবাক হয়েছেন আমার অকাট্য যুক্তি দেখে। এর পর তিনি যে মন্তব্যটি করেছিলেন সেটি আমি এখানে লেখার দুঃসাহস করতে চাইনা। তবে এরকম একটা কমপ্লিমেন্ট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সব শেষে যথা রীতি স্যার আমাকে বলেছিলেন, “নিজের জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে যাও এবং বেচে থাক পরবর্তি প্রজন্মের মাঝে।”

স্যারের এই কথাটির রেশ ধরেই এবার আমার মা এর শেখানো ছড়াটি তে আসি। এই ছড়াটি আমার মা শিখেছিলেন তার ছেলে বেলায়। তখনো তিনি স্কুলে ভর্তি হননি। আমার ছেলে বেলাতে তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম আমার পরবর্তী প্রজন্মকে আমি ছড়াটি শিখিয়ে যাবো। (অফ টপিক – যদিও আমার পরবর্তী প্রজন্মের কোন আশা , ভরসা কিংবা খবর কোনটা ই দেখাতে পাইতাছিনা।) আর তাই আজ ব্লগের সবার মাঝে আমার মা এর শেখানো ছড়াটি ছড়িয়ে দিলাম-

খোকার প্রশ্ন

আচ্ছা মাগো বলনা দেখি, রাত্রি কেনো কালো
সূর্য্যি মামা কোথা থেকে, পেলেন এত আলো
চিনি কেন মিষ্টি এত, তেতুল কেন টক
কোকিল কেন কালো এত, ফর্সা কেন বক
দুধ কেন মা এত সাদা মরিচ কেন ঝাল
আম গুলো সব পাকলে পরে, কেন হয় মা লাল
পশু পাখি কয়না কথা, মানুষ কেন কয়
বলো বলো এসব মাগো, কেমন করে হয়।।

সবাই আমার মা এর জন্য দোয়া করবেন।

৫,০৭১ বার দেখা হয়েছে

৫৪ টি মন্তব্য : “প্রসংগ – ছড়া”

  1. বস্, দারুন লাগলো লেখাটা।
    আপনি যুক্তিগুলো কি দিয়েছিলেন আর স্যারের কমেন্ট দুইটাই জানতে চরম কৌতুহল হচ্ছে।

    আন্টিকে সালাম দেবেন এবং এইছেলেগুলোর জন্য দোয়া করতে বলবেন।

    জবাব দিন
    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      ভাইয়া,
      exactly কি কি যুক্তি দিয়েছিলাম তা খেয়াল নেই। তবে একটু চিন্তা করলে হয়তো কাছাকাছি যেতে পারবো। কমেন্টটা বলতে সত্যি লজ্জা পাচ্ছি। ঐ কমেন্টটা আমি আমার কোন ক্লাশমেটকে ও এখন পর্যন্ত বলিনি।

      আমি অবশ্যই আমার মা এর কাছে বলবো তোমাদের কথা।

      ভালো থেকো।

      জবাব দিন
  2. জিহাদ (৯৯-০৫)

    আমার ভাগ্নিটার প্রথম শেখা ছড়াগুলোর মধ্যে এইটা একটা। 🙂 অবশ্য আমি নিজে ছোটবেলায় এটা পড়িনাই 🙁

    আমারও খুব জানতে ইচ্ছা হইতেসে যুক্তিগুলা কি ছিল। 🙂


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন
    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      আদনান,
      ধন্যবাদ ভাইয়া।
      যুক্তি গুলো বলবো... আসলে সত্যি ই মি দ্বিতীয় বার আর পড়িনি।
      আবছা আবছা কিছু মনে পড়ছে...। একটু না গুছালে ঠিক লিখতে পারবোনা ভাইয়া...। তবে, অন্ততঃ বিষয়বস্তুটা তুলে ধরতে পারবো বলে মনে হয়...।

      ভালো থেকো ভাইয়া।

      জবাব দিন
  3. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    রফিক নওশাদ স্যার ক্লাসে একদিন তার কোন একজন নিকট আত্মীয়ের (সম্ভবত বাবা) কথা বলছিলেন যিনি অত্যন্ত সাহিত্যানুরাগী। কিন্তু বঙ্কিমের লেখা পড়ে তিনি অদ্ভুত আচরণ করতেন। পড়ার সাথে সাথে রাগ করে বই টেনে ছিড়ে ফেলতেন। আর রাগ পড়ে গেলে সেই বই আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতেন। তাকে কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলতেন, বইয়ের বিদ্বেষ ছড়ানো উপাদানগুলো তাকে রাগিয়ে দিত আর ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে অভাবনীয় সাহিত্যমানসমৃদ্ধ লেখাগুলোকে বই আকারে রাখতেই মন টানত।

    আহসান ভাই, স্যারের করা মন্তব্যগুলো হুবহু দাবী করছি ;;) ।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
  4. বন্য (৯৯-০৫)

    প্রিন্সিপ্যাল, ভিপি এবং তিনি – তিনজনই নাকি প্রচন্ড অবাক হয়েছেন আমার অকাট্য যুক্তি দেখে

    ক্যাডেটের চাপাই আরেকজনের অকাট্য যুক্তি...এইবার বুঝ আমরা কি জিনিস... :grr: :grr:

    জবাব দিন
  5. সত্যি সত্যি আমি অনুষ্ঠানের নাম রেখে দিলাম কাঠ খড় কেরোসিন।

    =)) =)) আমরা আমাদের ব্যাচের একটা অনুষ্ঠানের নাম একবার দিছিলাম 'ছায়াছন্দ'। পুরা অনুষ্ঠান জুড়ে ছিলো খালি বাংলা ছবির গান।

    আহসান ভাই, লেখা মারদাঙ্গা হইছে।

    জবাব দিন
  6. তৌফিক (৯৬-০২)

    আহসান ভাই, আপনার সাথে আমার তো বন্ধন আরেকটু পোক্ত হয়া গেল। ক্যাডেট কলেজ সূত্রে তো ভাই ছিলামই, এখন রফিক স্যার সূত্রে আরো বেশি ভাই হইলাম।

    আপনার জন্য :salute:

    জবাব দিন
  7. সাব্বির (৯৫-০১)

    আহসান ভাই,
    আপনি তো পুরা হিট!!!
    যুক্তি গুলা তারাতারি গুছাইয়া ছাড়েন।

    লেখা টা জটিল!!
    আমি ছোট খাটো মানুষ কি মন্তব্য করুম বুঝবার পারতাছিনা।
    পামোশ রে আমরা অল্প কিছু দিন পাইছিলাম।

    জবাব দিন
  8. সাব্বির (৯৫-০১)

    ভিপি ছিলেন সামসুদ্দোহা স্যার।

    আমরা স্যার রে প্রিন্সিপাল হিসাবে পাইছিলাম। বেশি ভাল মানুষ।
    ডাইরেক্ট পলি মাটির মানুষ, কোন ভেজাল নাই।
    আমারে একদিন জিগাইছিল,
    স্যারঃ আমি তোমাদের কলেজের জন্য অনেক কিছু করছি না?
    ঃ জ্বী স্যার করছেন!
    স্যারঃ আমি অনেক ভাল না?
    ঃ জ্বী স্যার আপনে অনেক ভাল!
    স্যারঃ ধন্যবাদ!!!
    <<<হাসুম না, কান্দুম কিছু বুঝলামনা!!!

    জবাব দিন
  9. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    ...প্রশ্ন থেকেই তো যাবতীয় জ্ঞানের উৎপত্তি।এই ছড়াতে সেটাই দারুনভাবে ফুটে উঠেছে।

    অফ টপিক – যদিও আমার পরবর্তী প্রজন্মের কোন আশা , ভরসা কিংবা খবর কোনটা ই দেখাতে পাইতাছিনা।

    ভাই বেরাদার যে যেইখানে আছেন আহসান ভাইয়ের জন্য পাত্রী দেখেন। আহসান ভাই, এই ব্লগে সিভি আপলোড করেন-"মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর অফ সিসিবি" হিসাবে। 😀 আমার আম্মার লেডি জিম আছে, তারাবি নামাজ পইরা আইলে কয়া দিমুনে আপনের কথা... 😀

    জবাব দিন
  10. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    আমার আম্মা কেন জানি "ওয়ান লেডী টু পলিসি" ফলো করে।শুনছি তাঁর ছাত্রীরা
    ব্যাপক সাহায্য পায় হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে আর এইদিকে আমার বাসায় কুনু মাইয়া ফুন দিলে তাঁর পুরা ইন্টারভিউ নেয়...মায়ের মন বুঝা বড়ই দুষ্কর... 🙁

    জবাব দিন
  11. ৫ বছর বয়সে শিখেছিলাম। ২১ বছর বয়সে আত্মজাকে শেখাই। ৪৩ বছর বয়সে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ফেসবুকে পোসবট করলাম। মায়ের দোয়া তোমার জন্য সবসময় রইবে

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।