টীন এজার

৩রা জুন, ১৯৯৯ থেকে ২০১২ , পাক্কা তের টা বছর ! । কলেজের এ্যালবাম খুলে নিজের ছবি দেখে সবার মনে একটা কথাই আসে, ইস ,আমরা কি পিচ্চি ছিলাম ! ;)) বিশ্বাস ই হতে চায়না কবে এত্ত বড় হয়ে গেলাম থুক্কু বুড়ী  ;;;  হয়ে গেলাম । পিছন ফিরে তাকালে হুড়মুড় করে ছয়টা বছর চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় ।

ক্লাস সেভেনে প্রথমের দিকে , তখন মনে হয় আমরা দুনিয়ার সবচেয়ে আজিব চিড়িয়া ছিলাম  O:-) অবশ্য ক্লাস সেভেনটা এমনই, সব ব্যাচই তাই। তবে কিছুতেই বুঝতাম না আসলে , ক্লাস সেভেনের ফর্মে প্রেপ গার্ড আসলে নাক কুঁচকে ফেলে কেন ;)) । তবে পাশ দিয়ে সিনিয়র আপা গেলে যে দমকা (!) হাওয়া গায়ে লাগত,তার স্পর্শে হাত একবার মুখ আর গলায় ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে সরি বলাটা সাতদিনের টারম শেষেই  যেমন অভ্যাস হয়ে গেসিল ,তেমনি আরও অনেক কিছুই। বকা খাওয়ার সময় কিভাবে এক কান দিয়ে কথা ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে দেয়া যায়, টেবিল লিডার আর সিনিওরদের লুকিয়ে কিভাবে জঘন্য ডালপুরি টেবিলের নিচে চালান দেয়া যায়, প্রেপ গার্ড কে লুকিয়ে না ঢুলে ঘুমানো যায়, এরকম আরও অনেক কিছু। :))

তবে ক্লাস সেভেনে ঝগড়ার বিষয় বস্তু ছিল সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং  =))   ! একদিন ফল ইনে দাঁড়িয়ে তাবা আর কলি কোমর বেধে ঝগড়ায় নামছে । তাবা বলে, তুমি আমার কাছ থেকে সেফটিপিন নিয়ে আর দাওনি কেন? কলি বলে, তুমিও তো আমার কাছে সেদিন দুইটা কাল ক্লীপ নিছিলা,দিছ  :khekz: ? ফর্মে একদিন দেখি দুই ক্লাসমেটের মুখ হাড়ি । পরে জানা গেল, একজন আরেকজনের ক্যামেল কালারের সবুজ রঙ টা প্রায় (!) ফুরায়ে ফেলসে !

সেভেনের সেকেন্ড  টার্মে একদিন দেখি আমার পাশে বসে ফারানা খুব মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখছে। প্রেপে সাধারণত ঘুম ছাড়া অন্য ব্যাপারে ওর মনোযোগের বড়ই অভাব ছিল দেখে আমি বড়ই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি করিস? তারপর ও একটা ডায়েরী এনে আমার হাতে দিয়ে কয়, গ্রেডিং করি। পড়ে খেয়াল করে দেখি ছাপ্পান্ন টা ক্লাসমেটের নাম লেখা। সবার নামের শেষে ২, ৩, ৪, ৫ টা করে স্টার। ম্যাক্সিমাম ৫ টা স্টার। এক ক্লাসমেটের নামের পাশে একটা স্টার দখে জিজ্ঞেস করলাম, ও কি করসে? তখন ফারানা কয়, ও হিংসুইট্টা। আমাকে ফলিনে সেদিন ধাক্কা দিসে, আমি আগে গেসিলাম তাও আমাকে ধাক্কা দিয়ে ও দাঁড়াইছে । এই ফাঁকে আমি আবার আড়চোখে দেখে নিলাম আমার নামের পাশে কয়টা স্টার । দেখি ও আমারে ভালা পায় ,আমার বত্রিশ দন্ত বিকশিত হয়ে গেল  😀 😀

আরেকটা কাহিনী না বললেই না। দুপুরে এক ক্লাসমেট ডিসেকশন ট্রে তে আটকান ব্যাঙের মত হাত পা ছড়ায়ে শান্তিমত ঘুমানোর জন্য বালিশে মাথা দিছে। জানালা দিয়ে তাকায়ে দেখি ড্রইং এর এক ম্যাডাম ব্লকে রাউন্ড দিচ্ছেন, জানালার সামনে এসে ম্যাডাম বললেন , “—“ কাঁটা কম্পাসের মত শুয়ে আছ কেন? এতোটুকু সৌন্দর্য জ্ঞান নাই ! :grr:

প্রিন্সিপ্যাল ইন্সপেকশনে একবার জানালা পরিস্কার করতে বেমালুম ভুলে গেসিল এক ক্লাসমেট । এডজুট্যান্ট স্যার জানালা দেখায়ে বল্লেন,এ কি অবস্থা ! কি বলবে থতমত খেয়ে ক্লাসমেট টা বলল ,স্যার টিস্যু দিয়ে পরিস্কার করসি ত ! তাই টিস্যুর গুঁড়া লেগে আছে  😛

ক্লাস টুয়েলভের ব্লকে কাউন্ট করতে গেলে আপারা গান গাইতে বলত। তাও স্পেশাল গান “নাতি খাতি বেলা গেল শুতি পাল্লাম না “ , “দরজা খুইলা দেখুম যারে করুম তারে বিয়া “ । প্রথম যেদিন গেসি, আপারা গান গাইতে বললেন। আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা। গানের সুর কেন যেন আমারে মোটেই ভাল পায়না, দু লাইন গাইতে গেলেই চিকন সুরে চি চি টাইপ আওয়াজ বের হয়।  তো আমি গাওয়া যখন শেষ করলাম,তখন দেখি আপারা আমার গান শুনে হাসতেও  ভুলে গেসে। কিছুক্ষন সবাই সবার মুখের দিকে তাকিয়ে তারপর একসাথে সবার দম ফাটানো সে কি হাসি  :khekz: ! অবশ্য এই কারণে পরে আর গান গাইতে বলেনি কেউ   😀 ।

ক্লাসমেটদের এত্ত এত্ত কাহিনী লিখে শেষ হবেনা। সেভেন এইট পার করে কবে যে টুয়েলভ পার করে ফেললাম ,বুঝতেই পারলাম না । বের হওয়ার পর ও কেমনে কেমনে সাত বছর চলে গেল! এখনো ভীষণ মিস করি সব্বাইকে। তবে ক্যাডেটীয় অভ্যাস একটাও মনে হয় পিছু ছাড়েনি। আলসেমি,ফাঁকিবাজি,চিল্লাপাল্লা, শয়তানি বুদ্ধি কোনটারই অভাব হয়না । :awesome:

তান্টুর বিয়েতে আমরা যখন সবাই একসাথে হাও কাও করতে ব্যস্ত , একজন আমাদের জিজ্ঞেস করলেন আমরা তান্তুর ক্যাডেট ফ্রেন্ড কিনা।আমরা বললাম ,হ্যাঁ । উনি এমন একটা হাসি দিলেন যার অর্থ, এই বান্দর প্রজাতির কয়েকজন একসাথে থাকলেই বুঝা যায় ! =))

এখন আসলেই আমরা বড় হয়ে গেসি, বলতে গেলে অর্ধেকের বেশি  ক্লাসমেটদের বিয়ে হয়ে গেছে।আমাদের গল্পে স্টাফ লাউঞ্জ, এডজুট্যান্টের গুষ্টি উদ্ধার, ক্লাস বাং মেরে এম আই রুমে ঘুমানোর গল্প, চুরি করা আম, কাঠাল খাওয়ার দাওয়াত , আরেকজনের খাবারের ব্যাগে হামলা চালানোর প্ল্যান এইসব বাদ দিয়ে জায়গা পাইসে সংসারের সাতকাহন, চাকরির পেরেশানী ইত্যাদি ইত্যাদি! নাহ, বয়স হয়েছে ! ব্যাচের প্রথম ভাগ্নী নুহা হওয়ার পর স্যাম মেসেজ দিসিল সবাইকে, ক্লাসমেট “আমাদের” মেয়ে হয়েছে  😕 ! ইভু বেচারি ‘মা’ টা কে একটুও ক্রেডিট  দিল না ! :((

এখনো কোন কাজ করতে হুট  করে মাথার কোন অংশে টুং  করে একটা ঘন্টা  বেজে ওঠে মাঝে সাঝে।ক্যাডেট  শব্দ টা শুনলেই আপন আপন লাগে। কলেজ থেকে বের হওয়ার পর টানা ৩-৪ বছর কলেজ স্বপ্ন দেখতাম। সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেলেই এক ধরনের শুন্যতা কাজ করত। সারাদিন শুধু মনে হত, ইস আরেকটা ক্যাডেট জন্ম যদি পেতাম। আবার বিষ্টি সায়মার  “আকাশে বাতাসে চল সাথী ” ডুয়েট, আবার রোয়াজার বোতল নাচ,ফাইনাল স্পোর্টসের অন ইয়োর মার্ক, হাসপাতালের  গ্রীল ধরে ক্লাসমেটদের ভেংচি কাটা  , কাঁচা কাঠাল চুরি করে লবন ঢুকিয়ে কাঁঠাল পাকার অপেক্ষায় থাকা। মোবাইল টা হাতে নিয়ে রাতবিরেতে কাছের ফ্রেন্ডদের ঘুম ভাঙ্গাই হয়ত এখন , কিন্তু বক্সরুমের জানালা দিয়ে আসা চাঁদের  আলোয় একটা রাত গল্প করে পার করে দেয়া হয়না , ঝুম বৃষ্টিতে শর্ট ওয়ে দিয়ে না এসে কার্পেট ঘাসের উপর দিয়ে থপ থপ  করে পানি ছিটিয়ে ভেজা হয়না ।অনেক অনেক অনেক কিছুই হয়না … 🙁 🙁

বার বছর শেষ করে ক্যাডেট লাইফের তের বছর ! টীনএজার হয়ে গেছি ক্লাসমেটস !   😡 😡   চল ক্লাস সেভেনের ট্যালেন্ট শো এর মত আবার কোরাস গাই , উই শ্যাল ওভার কাম …… :guitar: :guitar:

ও হ্যাঁ, হ্যাপি বার্থ ডে ক্লাসমেটস 😀 😡

২,৯৭২ বার দেখা হয়েছে

৩৭ টি মন্তব্য : “টীন এজার”

  1. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)
    হ্যাপী বাড্ডে ৯৯ ব্যাচের সবাই কে।
    পুরাই নষ্টালজিক হইয়া গেলাম।
    লেখাটা ভাল হয়েছে। :thumbup:

    (দোস্তের কমেন্ট কপি মাইরা ইনটেক ফিলিংস দেখাইলাম... ;)) )


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  2. দিবস (২০০২-২০০৮)
    কিন্তু বক্সরুমের জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় একটা রাত গল্প করে পার করে দেয়া হয়না , ঝুম বৃষ্টিতে শর্ট ওয়ে দিয়ে না এসে কার্পেট ঘাসের উপর দিয়ে থপ থপ করে পানি ছিটিয়ে ভেজা হয়না ।অনেক অনেক অনেক কিছুই হয়না

    মন খারাপ হয়ে গেল 🙁

    বাই দ্যা ওয়ে হ্যাপী বাড্ডে ভাইয়া-আপুরা 😀 :guitar: :guitar: :guitar:

    আপু লেখাতে ইমোর ব্যবহারটা একটু কমাইলে মনে হয় বেশী ভাল হইত :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll:


    হেরে যাব বলে তো স্বপ্ন দেখি নি

    জবাব দিন
  3. সামিয়া (৯৯-০৫)

    সকালে ঘুম থেকে উঠেই এই লেখাটা পড়লাম। তুমি তো জানই গতকাল আমার মেজাজ প্রচন্ড খারাপ ছিল। সকালে উঠে লেখাটা পড়ে মনটা আরো খারাপ লাগল।

    আসলে, আমাদের মাঝে কি ছিল, আর আছে, কলেজের বাইরের কেউ সেটা বুঝবে এটা আশা করা যায়না।

    জবাব দিন
  4. জাহিদ (১৯৯৯-২০০৫)
    “—“ কাঁটা কম্পাসের মত শুয়ে আছ কেন? এতোটুকু সৌন্দর্য জ্ঞান নাই !

    ঘুমের মধ্যেও সৌন্দর্য খুঁজতে হয়?! কি আজিব দুনিয়ায় ছিলাম। এরকম একটা ঘটনা আমাদেরও হয়েছিলো। এক বন্ধু কেঁচোর মত গোল হয়ে ঘুমিয়েছিলো, জনৈক সিনিয়র এসে বলে, "ও কি পাগল?এমনে ঘুমায় কেন?? ডাকো ওকে।

    ধন্যবাদ, সুষমা, বরাবরের মত সুন্দর লেখার জন্য।

    জবাব দিন
  5. তপু (৯৯-০৫/ককক)

    ইদানিং অফিসে বসে বসে পুরান পুরান ব্লগ পরি। ভালই লাগে। ভাল লাগ্ল এই লেখাতা। কলেজ র কাহিনি ত কাহিনি । এগুলাই সারা জিবনের শম্বল।

    চালিয়ে জাও বন্ধু

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।