আমাদের বাদশাহ নামদার হুমায়ুন আহমেদ

অকালেই চলে গেলেন হুমায়ুন আহমেদ। দেশের সব স্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হলেও সব চেয়ে নন্দিত ছিলেন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে। ছিলেন মধ্যবিত্তের অন্যতম প্রতিনিধি। আমাদের একটি বিখ্যাত সামাজিক বচন- উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে। মধ্যবিত্তের এই তফাতে চলা কথাটা এক ধরণের বক্রোক্তি হলেও, বাস্তব সত্য হচ্ছে মধ্যবিত্তের তফাতে চলা ছাড়া উপায় নেই। কারণ মধ্যবিত্তকে হিসাব করে চলতে হয়। সেই হিসেবে সামান্যতম ভুল হবার জো নেই, ভুল মানেই পথের শেষ। মধ্যবিত্তের অন্যতম প্রতিনিধি হুমায়ুন আহমেদের চলে যাওয়ার আগে অকাল শব্দটি তাই হিসাব করেই বসাতে হয়েছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মানুষের গড় আয়ু ৬৬ দশমিক ৮ বছর। অথচ হুমায়ুন আহমেদ মারা গেলেন ৬৪ বছর বয়সে। প্রিয় লেখককে হারানোর বেদনার পাশাপাশি দেশের মধ্যবিত্তের এই হিসাব না মেলার একটা সংকট কিন্তু থেকেই গেল।

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আরো একটি বিশেষ পেশার মানুষও হয়তো হিসাব না মেলার এই চিত্রটি পুনরায় পর্যবেক্ষন করার চেষ্টা করেন। এরা চিকিৎসক। সব রকম চিকিৎসা চালানোর পরেও রোগী যখন মৃত্যু বরণ করে তখন ক্লিনিক্যাল অটোপসীর মাধ্যমে শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করে পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি অঙ্গ খুটিয়ে খুটিয়ে পর্যবেক্ষন করা হয়। রোগীর চিকিৎসার দায়িত্বে ফিজিশিয়ান বা সার্জন থাকলেও অটোপসী করেন প্যাথলজিস্ট। পরবর্তীতে সব বিভাগের চিকৎসক মিলে কনফারেন্স ডেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোগীর চিকিৎসার পুণর্মূল্যায়ন করা হয়, অর্থাৎ আর একবার হিসাব কষা হয়। মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি, হুমায়ুন আহমদের অসুখ, অকাল প্রয়ান এর কথা, মৃত্যুর পর তাঁর অটোপসি করানো হয়েছে, তাও জানলাম। তবে সেই অটোপসির বিবরণ জানা যায় নি। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ ব্যাপারটা নিতান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক, সাধারণের জানার কথা নয়। তবে হুমায়ুন আহমেদের একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে ও একজন মধ্যবিত্ত হিসেবে, সেই সাথে একজন প্যাথলজিস্ট হিসেবে কয়েকশত ক্লিনিক্যাল অটোপসি করার অভিজ্ঞতার আলোকেও এই হিসাব না মেলাটা আমাকে ভাবাচ্ছে, ভোগাচ্ছে।

তাই শুরুতেই আমার করা একটি অটোপসির অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরতে চাই এজন্য যে, কেসটির সাথে হুমায়ুন আহমেদের অসুখ ও তার পরিণতির যথেষ্ট মিল রয়েছে। রোগী জাপানী, বয়স ষাটের কোঠায়। জাপানীদের গড় আয়ু ৮২ দশমিক ৭ বছর, সেই হিসাবে বলা যায় তরুণ। একটি প্রাইভেট কোম্পানীর মালিক। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে কাকতালীয় ভাবে ধরা পড়ে বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার। কেমোথেরাপী দেওয়া হয়। কিছুদিন বিরতির পর সার্জন তার অপেরাশন করেন। অপারেশনের এক সপ্তাহ পর তিনি বাড়ী ফিরে যান। তিনিদিন পরে পেটে ব্যাথা অনুভূত হওয়াতে আবারো হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। পরীক্ষায় ধরা পড়ে অপারেশনে বৃহদান্ত্রের জোড়া দেওয়া স্থানে ইনফেকশন ও লিক। দ্বিতীয়বার অপারেশন করা হয়, দেওয়া হয় হেভী ডোজ এ কড়া এন্টিবায়োটিক। তবে, ইনফেকশন কন্ট্রোল করা যায় নি। এক পর্যায়ে ফুসফুসে পানি জমে শ্বাস কষ্ট শুরু হলে সংযোজন করা হয় কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র। চিকৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্তেও রোগীর অবস্থার ক্রমাবনিতি ঘটে ও মৃত্যু হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যাথলজিষ্ট হিসাবে রোগীর অটোপসি করতে আমাকে। অটোপসির সময় আমার কাছে সার্জনের প্রশ্ন ছিল, ইনফেকশন টা ভাইরাস এর কারণে ঘটেছিল না কি ব্যাকটেরিয়ার কারণে? ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশন হলে রক্ত পরীক্ষার ফলাফলে, শ্বেত কনিকার সংখ্যা বৃদ্ধি সহ আরো কিছু পরিবর্তন ধরা পড়ার কথা অথচ সে রকম কিছু ধরা পড়ে নি। আবার নির্দিষ্ট কোন ভাইরাল মার্কার ও পাওয়া যায় নি পরীক্ষায়। ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছিলে পেটে, তা হলে হঠাৎ করে ফুসফুসে পানি জমা ও শ্বাস কষ্টের কারণ কি?

অটোপসি শেষে রিপোর্ট তৈরী করলাম, কিছুদিন পর যথারীতি শুরু হলো সার্জন ও অন্যান্য বিভাগের চিকিৎসক ও প্যাথলজিস্টদের নিয় যৌথ ক্লিনিকো-প্যাথলজিক্যাল কনফারেন্স। বিভিন্ন সময়ে রোগীর দায়িত্ব থাকা চিকিৎসকদের বক্তব্য থেকে জানা গেল, চিকিৎসকের অধিকাংশ নির্দেশই যথাযথ পালন করেছিলেন রোগী। তবে দুএকটা ক্ষেত্রে কিছু গাফিলতও ছিল, কারণ নিজের প্রাইভেট কোম্পানীতে ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ভীষণ মানসিক চাপে ছিলেন। তার উপর, দীর্ঘ কেমোথেরাপীর ফলে ছিলেন ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্থ। ব্যবসায় দেউলিয়া হলে অপারেশন করে সুস্থ হয়ে উঠেই বা কি লাভ, এমন কথাও বলেছিলেন। একটা বড় ধরণের অসুখ মোকবিলা করার জন্য যে আত্মবিশ্বাস থাকার প্রয়োজন তার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল রোগীর মধ্যে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উল্লেখ করলেন, ক্লান্তি দেহের রোগ প্রতিরোধকারি ইমিউন সিস্টেম এর উপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে, দুর্বল করে দিতে পারে রোগীকে।

অটোপসি রিপোর্টে আমি যা উল্লেখ করেছিলাম তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে ব্যাখ্যা সহ তুলে দিচ্ছি। ১) মাইক্রোস্পিক পরীক্ষায় অনুযায়ী, রোগীর অপারেশনের স্থানে ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশন ছিল ও বৃহদান্ত্রের জোড়া দেওয়া স্থানে লিক সৃষ্টি হওয়ায়, সেই ইনফেকশন উদর পর্দার প্রদাহের (পেরিটোনাইটিস) মাধ্যমে সারা পেটেই ছড়িয়ে পড়েছিল। ২) রোগীর অস্থি-মজ্জা (বোন ম্যারো) ছিল প্রায় কোষ শূন্য ও লিভার ছিল অকার্যকর। দেহে কোথাও ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশন হলে তা প্রথমে প্রতিহত করে রক্তে সঞ্চালিত শ্বেত কনিকা। এই শ্বেত কনিকা প্রাথমিক অবস্থায় থাকে অস্থি –মজ্জায় এবং ইনফেকশনের সংকেত পেলে বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধি করে অস্থি মজ্জা থেকে বেরিয়ে রক্ত সঞ্চালনে প্রবেশ করে ও ইনফেকশনের স্থানে পৌঁছে যায়। অস্থি-মজ্জা কোষ শূন্য হয়ে পড়লে ইনফেকশনের সংকেত পাওয়া সত্ত্বেও শ্বেত কনিকার সংখ্যাবৃদ্ধি করার উপায় থাকে না। ফলে সঞ্চালিত রক্তে শ্বেত কনিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পরীক্ষায় ধরা পড়ে না, অথচ ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশন এ এটি ধরা পড়ার কথা। দেহে ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশন হলে, আর এক উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ইমিউনোগ্লোবিন সহ নির্দিষ্ট কিছু প্রোটিন এর পরিমান বৃদ্ধি। এই প্রোটিনগুলি তৈরী হয় লিভার এ। তবে লিভার অকার্যকর হয়ে পড়লে এ সব প্রোটিন এর পরিমাণ বৃদ্ধিতে ব্যঘাত ঘটে। ফলে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে ইনফেকশনের বিষয়টি সঠিক ভাবে প্রতিফলিত হয় না। উপরন্তু, হেভি ডোজ এ কড়া এ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে, এমনকি ব্লাড কালচারের মাধ্যমেও ব্যাক্টেরিয়ার ইনফেকশন নির্ণয় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ৩) পেটে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে, এক পর্যায়ে তা সেপ্টিসেমিয়া অর্থাৎ রক্তের সংক্রমণে রূপান্তরিত হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে, রোগী শক এ চলে যায়, সংজ্ঞা হারায়। স্বাভাবিক অবস্থায় দেহের রক্তনালীগুলি সামান্য সংকুচিত ও শক্ত থাকলেও সেপ্টিসেমিয়া জনিত শক ঘটলে রক্তনালীগুলি প্রসারিত ও শিথিল হয়ে পড়ে ও রক্তের জলীয় অংশ রক্তনালী থেকে চুইয়ে বেরিয়ে যেতে থাকে। বিশেষ করে ফুসফুসের এ্যালাভিওলার স্যাক অর্থাৎ বাতাস থাকার ছোট ছোট বায়ু প্রকোষ্ঠ গুলি ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও রক্তনালী থেকে চুইয়ে বেরিয়ে আসা (প্রোটিন সমৃদ্ধ) জলীয় অংশ বায়ু প্রকোষ্ঠগুলিতে জমা হতে থাকে (প্যাথলজির ভাষায় যাকে বলা হয় ডিফিউজ এ্যালভিওলার ড্যামেজ)। এ ধরণের অস্বাভাবিক পরিবর্তন প্রধানত ফুসফুসের কিছু অসুখ কিংবা ভাইরাস ইনফেকশনে দেখা গেলেও, সেপ্টিসেমিয়া জনিত শক এর ক্ষেত্রেও তা দেখা দিতে পারে। ফুসফুসে পানি জমে যাওয়ার ফলে, রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এটি একটি প্রান্তিক অবস্থা। অনেকে এ অবস্থা থেকেও সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন আবার অনেকের মৃত্যু ঘটে। ফলাফল কি হবে, তা নির্ভর করে রোগীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সহ্য করা ও প্রতিরোধ করার ক্ষমতার উপর, যা প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র এবং তার পরিপূর্ণ মূল্যায়ন অনেক সময় অসম্ভব।

একজন ক্যান্সারের রোগীকে যখন কেমোথেরাপী দেওয়া হয় সেই শক্তিশালী ঔষধ কেবল মাত্র ক্যান্সার কোষগুলিকেই ধ্বংস করে না। সেই সাথে অস্থি-মজ্জার অনেক কোষ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, ফলে কমে যায় রোগীর ইনফেকশন প্রতিরোধ করার স্বভাবজাত ক্ষমতা। কেমোথেরাপীর শক্তিশালী ঔষধ নির্বিষ করে শরীর থেকে মূত্র বা মলের মাধ্যমে বের করে দেওয়ার কাজটি করে লিভার। কেমোথেরাপীর কারণে লিভার এর সাধারণ কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কেমোথেরাপীর রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষনে রাখা হয়, অস্থি -মজ্জা, লিভার, কিডনী সহ সকল অঙ্গের কার্যকারিতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। মানব দেহযন্ত্র তো গাড়ীর ইঞ্জিনের মতোই। গাড়ী স্টার্ট দিয়ে ফুল স্পীডে যাওয়া পর্যন্ত কিছুটা সময় লাগে। ইঞ্জিনের যদি টার্বো ক্ষমতা থাকে তাহলে খুব অল্প সময়ে গাড়ী ফুল স্পীডে চলে যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানব দেহযন্ত্রের জন্যও এই টার্বো ক্ষমতার প্রয়োজন পড়ে। যেমন ইনফেকশন। দেহকে এর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয় দ্রুত স্পীডে। আর সেই দ্রুত স্পীড তোলার ক্ষমতা নির্ভর করে দেহের রিজার্ভ এর উপর। কেমোথেরাপী এই রিজার্ভটাকে ধীরে ধীরে নিঃশ্ব করে দেয়। হুমায়ুন আহমেদ এর ক্ষেত্রে ঠিক কি হয়েছিল জানি না, তবে মানবদেহ ব্যবচ্ছেদের এই অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরার কারণ, ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপী ও তার জটিলতা সম্পর্কে পাঠককে একটা ধারণা দেওয়া।

হুমায়ুন আহমেদ ছিলেন একজন সুস্থ মানুষ, সবল তো বটেই। ধুমপান করতেন, অনিয়ম করতেন, তবে শারিরীক সমস্যা বলতে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু শোনা যায় নি। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রথম ধাক্কাটা খান বুকে, ২০০৪ সালে, হার্ট এ্যাটাকের জন্য তাকে সিঙ্গাপুর গিয়ে বাইপাস সার্জারী করাতে হয়। এর পরেও অনিয়ম চলছিল, তবে ভিতরে ভিতরে সাবধান হয়ে গিয়েছিলেন বোঝা যায়। কারণ, ২০১১ সালে মাকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাবার সময় সেখানে নিজের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিতে তিনি ভোলেন নি, যে সূত্রে কাকতালীয় ভাবে ধরা পড়ে তাঁর বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার। এর পর অবশ্য হিসাবে কোন ভুল করেন নি। ১৪ সেপ্টেম্বর সোজা চলে যান বিশ্বের সেরা ক্যান্সার সেন্টার হিসাবে সুবিদিত, নিউ ইয়র্ক এর মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং সেন্টারে। সেখান সারা দেহ পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পরীক্ষা করে, তাঁর জন্য সব চেয়ে উপযোগী চিকিৎসার কোর্সটি নির্ধারণ করা হয়। শুরু হয় বারোটি কেমোথেরাপী। কোনরকম জটিলতা ছাড়া শেষ হয় কেমোথেরাপী, অপারেশন এর আগে স্বপরিবারে দেশে আসেন ১১ মে। দেশে এসে ঢাকা নগরীর কোলাহল এড়িয়ে সোজা চলে যান নুহাশপল্লীতে, পূর্ণ বিশ্রামে। এ পর্যন্ত এসে একটি কথা মনে জাগে। এই বিশ্রামতো তিনি নিউ ইয়র্কেই নিতে পারতেন, সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নুহাশ পল্লীতে কেন আসা। অনুভব করি তিনি কতটা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ধকলটা কি শুধু কেমোথারাপীর ছিল নাকি অন্যকিছুও ছিল?

একজন কেমোথেরাপীর রোগীকে ডাক্তার পই পই করে যে পরামর্শটা দেন তা হলো- ‘সাবধানে থেকো, যতদূর সম্ভব লোকজন থেকে দূরে থেকো, প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করো, ইনফেকশন বাধিয়ো না’। পরামর্শ শুধু রোগী নয়, তার পরিবার বিশেষ করে স্ত্রী সাথে থাকলে স্ত্রীকেও বারবার দেওয়া হয়। হুমায়ুন আহমেদকেও নিশ্চয়ই এই পরামার্শ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তা মেনে চলা তাঁর পক্ষে হয়ত ততোটা সম্ভব হয় নি। সঙ্গ প্রিয়, হৃদয়বান মানুষ হুমায়ুন আহমেদ। ভক্তদের এড়িয়ে চলবেন, দর্শনার্থীদের দেখা দেবেন না, তা কি হয়! স্ত্রীর বারণ ও তিনি শোনেন নি নিশ্চয়। তার স্ত্রী যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছেন তা বোঝা যায়, শেষ দিকে এসে, অপারেশনের পর যে করে হোক বাসা বদলের প্রচেষ্টা। সেটা ছিল প্রিয়তম স্বামীকে লোকচক্ষুর অন্তরালে একটু দম নেবার সুযোগ করে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা। ভাল ছাত্র ছিলেন হুমায়ুন। জানতেন, পরীক্ষায় ভাল করতে হলে প্রস্তুতি নিতে হয়। জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা, ভাল রেজাল্ট করতেই হবে, সেজন্যেই তো সুদূর নিউ ইয়র্কে পরবাসে যাওয়া। প্রতিক্ষনে তা উপলব্ধি করতে পারলেও পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে ঠিকমতো প্রস্তুতি তিনি নিতে পারেন নি। কবি শামছুর রাহমানের ভাষায়- তাঁর সমস্ত সময়, সব জীবনী শক্তি, সুমিষ্ট পিঠার মতো ভাগ করে খেয়েছে সবাই! সদা হাস্যময় হুমায়ুনকে দেখে কেউ বুঝতে পারেন নি একটু বিশ্রাম তার কতোটা প্রয়োজন ছিল, জরুরী ছিল।

অবশেষে নুহাশ পল্লীতে ফিরে একটু বিশ্রাম হয়তো পেয়েছিলেন। হয়তো বলছি এ জন্যে যে সে সময়, প্রতিদিনের সংবাদে দেখেছি তাঁকে, দেখা গেছে টিভির পর্দায়। একুশ দিন দেশে থাকার পর তার ফিরে যাবার দৃশ্যে কিছুটা সচকিত হই। ৩ জুন শনিবার নিনাদকে কোলে নিয়ে, বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়ে প্রায় দীর্ঘ যাত্রাবিরতি। দিল্লিতে আর ব্রাসেলসে আড়াই ঘণ্টা কাটিয়ে অবশেষে ৪ জুন নিউ ইয়র্ক পৌঁছানোর সময় দুপুর সাড়ে ১২টা। নির্ধারিত সময়ে প্লেন অবতরণ করে কিন্তু লাগেজ না আসায় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয় আরো কিছু সময়। সুদীর্ঘ যাত্রা, এ যাত্রার ক্লান্তি কাটতে সময় লাগার কথা। তবে এর আট দিন পর, ১২ জুন তাঁর শারিরীক অবস্থা মূল্যায়ন করেই, বেলভ্যু হাসপাতালে অপারেশন। অপারেশনের সাতদিন পর, ১৯ জুন হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরা। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, চিকিৎসকরা তাকে একটু আগেই ছেড়ে দিয়েছেলেন। তবে সেটা অবহেলা নয়, উদ্বেগে। হাসপাতালেও তার দর্শনার্থী ছিল প্রচুর, এটা পত্রিকার পাতা থেকেই জেনেছি। তা এত বেশী ছিল যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একবার নাকি পুলিশ ডাকার কথাও ভেবেছিল। আমার মনে হয় বাসা পরিবর্তনের পরামর্শ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তাকেঁ ও তাঁর স্ত্রীকে দিয়ে থাকতে পারে, যাতে রোগী একটু নিরিবিলিতে বিশ্রাম পায়। নিরিবিলিতে থাকার সে সুযোগ কি হুমায়ুন কখনো পেয়েছিলেন? বাসায় ফেরার দুইদিন পর পেটে ব্যথা অনুভব করেন তিনি, অবস্থার অবনতি ঘটলে আবার হাসপাতালে নেওয়া হয়। ২১ জুন হয় দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার।

এই দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার এর আগে, ক্যান্সার সার্জন জজ মিলার এর সাথে হুমায়ুন আহমেদ এর কিছু কথোপকথনে চমকিত হই। আমি কি মারা যাবো এই প্রশ্নের উত্তরে সার্জন মিলার বলেছেন, আপনি আশ্বস্ত হতে পারেন অস্ত্রোপচারের কারণে আপনার মৃত্যু হবে না। সেরকম কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু কেন হুমায়ুনের এই প্রশ্ন? তাঁর হিসাব আর ডাক্তার মিলারের হিসাবে কি কোন ব্যবধান ছিল? কিছু দিন আগে, বাদশাহ নামদার বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন,’আমার কেবলই মনে হচ্ছে পুত্র নিনিত পিতার কোনো স্মৃতি না নিয়েই বড় হবে’। তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন, উত্তীর্ণ হবার জন্য যে প্রস্তুতি ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে অপারেশেন নামক কঠিন পরীক্ষাটি তার দেওয়া দরকার ছিল, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। পরবর্তীতে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত এটাই কি প্রতিভাত হয় না যে ডাক্তারের নয় তাঁর নিজের হিসাবটাই সঠিক ছিল!

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই’। নিজের মৃত্য সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষন ও প্রস্তুতি না থাকলে একজন মানুষ এভাবে বলে না। ২০০৪ সালে হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি যাওয়ার সময় কিন্তু তার আফসোস ছিল- জোছনা ও জননীর গল্প না লিখে যেতে পারার আফসোস। তখনকার কথা তিনি এভাবে বলেছেন, ‘আমাকে যদি আরেকবার পৃথিবীতে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়- আমি এই লেখাটি অবশ্যই শেষ করব’। সেই গল্প তিনি শেষ করেছিলেন, তা প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ এ।

এর পরেই সম্ভবত নিজের জীবন নাটকটি তৈরীর তাগাদা অনুভব করেন হুমায়ুন। তিলে তিলে তিলোত্তমা করে গড়ে তোলেন নুহাশ পল্লী। গুলতেকিন আহমেদ কে ছেড়ে জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন মেহের আফরোজ শাওনকে। মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি-চরিত্র পর্যবেক্ষণ করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল হুমায়ুন আহমেদের। গুলতেকিন কে ছেড়ে না দিয়েও শাওনের সাথে একটা সমান্তরাল সম্পর্ক কি তিনি রাখতে পারতেন না? তা না করে আনুষ্ঠানিক ভাবে কেবল শাওনকে কেন বেছে নিলেন? তাৎক্ষনিক সেটা না বোঝা গেলেও, ক্যান্সারের সাথে দশ মাসের যুদ্ধ, পরবর্তীতে নুহাশ পল্লীতে মরদেহ সমাহিত করার ব্যাপারে শাওনের বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়া দেখে তা বোঝা যায়। শুধু সহধর্মীনি নয়, জীবন সঙ্গীনি হিসেবে বিশ্বস্ত ও নির্ভীক এক সহযোদ্ধার প্রয়োজন ছিল তার। সেই সহযোদ্ধা তাঁর অবর্তমানে, তাঁর জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যটিও যেন নিঁখুত ভাবে বাস্তবায়িত করতে পারে। নুহাশ পল্লীতে সমাহিত হবার সেই নিঁখুত দৃশ্যটি আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেছি।

বরাবর নুহাশ পল্লীতে সমাহিত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করেও জীবনের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ তিনি অন্য কথা বলেছিলেন। ‘আমি চাচ্ছিলাম আমার মৃত্যুটা, আমার কবরটা এখানে (নুহাশ প্ললীতে) হোক। পরে দেখলাম এটা কবরস্থান হয়ে যাবে। এখানে থাকলে দুনিয়ার লোক আসবে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুল দেওয়ার জন্য, তেরোই নভেম্বরে ফুল দেওয়ার জন্য’। তাঁর সংশয় ছিল, কবর পুজার অজুহাতে আজীবন নন্দিত হুমায়ুন, মৃত্যুর পর নিন্দিত হুমায়ুনে যেন পরিণত না হয়। তবে অন্তিম মূহুর্তে সেই দোদুল্যমানতা কেটে গেছে। বিশ্রামের জন্য বারবার নুহাশ পল্লীতে ফেরা হুমায়ুন তার অন্তিম বিশ্রামের স্থানটির কথা শাওনকে বলে গেছেন, ‘আমার যদি কিছু হয় আমাকে নিয়ে ওরা অনেক টানহেঁচড়া করবে, তুমি শক্ত থেক কুসুম। আমাকে নুহাশপল্লীতে নিয়ে যেও’। নিশ্চিত জানতেন, নন্দিত হুমায়ুনের জন্য নিন্দিত হতে হলেও এক পা পিছু হটবেন না এই সহযোদ্ধা।

নিন্দিত হবার ঝুঁকি কিন্তু গুলতেকিন আহমেদ এর মেয়েরা নিতে চান নি। হুমায়ুনের মরদেহ সমাহিত করার ব্যাপারে শাওনের অনড় অবস্থানের উল্টোদিকে, গুলতেকিন এর মেয়েদের নিন্দিত হবার ভয়টি তাদের কন্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে, ‘দেশের মানুষও যেন মনে না করতে পারে যে আমরা তাকে নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছি’। এই যে অনেকে নিজের চশমায় শাওনকে দেখে তাঁর সমালোচনা করছেন, তাতে হুমায়ুনের আত্মা কি শান্তি পাচ্ছে? আমরা তো তাঁর জীবনের এম্পিথিয়েটারে বসা দর্শক মাত্র। নিজের চশমা খুলে যদি হুমায়ুনের চশমায় একবার শাওনের দিকে তাকাই, তা হলে হয়তো দেখতে পাবো এক নির্ভীক গ্লাডিয়েটরকে, যে হারে নি, হারবে না। হুমায়ুন আহমেদই কি সে জন্যে গুলতেকিনকে ছেড়ে শাওনকে বেছে নেন নি? ভালবাসার কাছে হার মেনে, হুমায়ুনের সন্তানেরা দেখতে গেছেন অসুস্থ পিতাকে, মৃত্যুর পর আছড়ে পড়েছেন কফিনের উপর। ক্যান্সারের সাথে মুক্তিযুদ্ধের সমান বয়সী এক যুদ্ধ, অচেনা মাটিতে ধুকে-ভুগে অচিন পুরে যাত্রা, তবু গুলতেকিন শেষ বিদায় জানাতে যান নি। এতেও যদি হুমায়ুনের এক জীবেনের পাপ মোচন না হয়, সে জন্য সহ যোদ্ধা শাওনকে ক্রুশ-বিদ্ধ করে পাপ মোচনের প্রচেষ্টা অন্যায্য।

জয় পরাজয়ের হিসাব নিয়ে হুমায়ুন নিজেও ভুগেছেন। মধ্যবিত্তের জীবনে সেটাই তো সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ! জীবন সায়াহ্নে এসে লিখলেন ‘বাদশাহ নামদার’। বইটির পটভূমি থেকে জানা যায় সম্রাট হুমায়ুনের ক্রমাগত পরাজয়ের দায়ভার তাঁকেও বইতে হয়েছে, স্কুলের বন্ধুরা তাঁকে ‘হারু হুমায়ুন’ বলে ডাকতো। হয়তো দুশ্চিন্তা ছিলো, কালের মূল্যায়নে আবারো না হারু হুমায়ুন হতে হয়! কিন্তু তার অসুস্থতায়, তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর অনুষ্ঠানে, জানাজা ও দাফনে মানুষের যে বিশাল ঢল, টেলিভিশনের পর্দায় তা দেখে একটা কথাই মনে হয়েছে। এ তো দিল্লির সম্রাট ‘হারু হুমায়ুন’ নয়। এ আমাদের বাদশাহ নামদার, হিরো হুমায়ুন। জীবদ্দশায় কলকাতা মুখী প্রকাশনা অর্থনীতির স্রোত তিনি যে ভাবে ঢাকার দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, জীবনাবসানে একজন হুমায়ুনকে চিনতে আমাদের দৃষ্টি তিনি দিল্লি থেকে ঢাকার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। আমাদের বাদশাহ নামদার হুমায়ুন ঘুমিয়ে আছেন ঢাকায়, নুহাশ পল্লীতে। দিল্লীতে সম্রাট হুমায়ুনের কবর ঘিরে যেমন সৌধ তৈরী হয়েছে আমাদের বাদশাহ নামদারের স্মৃতিতে তেমন সৌধ নির্মিত হতেই পারে। নুহাশ পল্লীর প্রবেশ পথে তৈরী হতে পারে হুমায়ুন তোরণ। একুশ থেকে একাত্তর, আমাদের স্মৃতি সৌধ আছে, বিজয় স্তম্ভ তো নেই। কবর পুজা বিহীন বাংলাদেশ, ভাবা যায়! যদি ভাবতেই হয়, আমাদের নতুন কারো জন্য অপেক্ষা করতে হবে। নুহাশ পল্লীর হুমায়ুনের উপর সেই দায়ভার আমরা চাপিয়ে দিতে পারি না।

হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিডিয়া তাঁকে ‘নন্দিত কথা সাহিত্যিক’ বিশেষণে ভূষিত করেছে। কিন্তু তাঁকে শেষ ভালবাসা জানাতে আসা ঐ যে মানুষের ঢল, তাদের অধিকাংশ তাঁর পাঠক তো নয়, দর্শক। তাঁর মহাপ্রয়ানে এই যে শোকের মাতম, মিডিয়া হাইপ, তা দেখে কি আমেরিকার সেরা আইডল মাইকেল জ্যাকসন এর শেষ বিদায়ের কথা মনে পড়ে না? আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে, বাংলাদেশেও যে একটি ব্যাপক আইডল কালচার গড়ে উঠেছে তা কিন্তু আমরা হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করলাম। এই একুশ শতকে বাংলাদেশের সেরা আইডল, কিং হুমায়ুন! তবে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু নিয়ে আমেরিকায় যে গুজব ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল, আমরা চাই না হুমায়ুনে আহমেদের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃতি ঘটুক। বিশেষ করে আমেরিকার প্রবাসী মহল সহ দেশের মিডিয়াগুলি এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করলে হুমায়ুনের আত্মা শান্তিতে থাকবে। সেই কামনা করেই সমাপ্তি টানছি- জীবনের চেয়ে বড় হুমায়ুন আহমেদ, জীবনের পরপারে আপনি শান্তিতে ঘুমান। নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে।

২,৬৭৭ বার দেখা হয়েছে

৩২ টি মন্তব্য : “আমাদের বাদশাহ নামদার হুমায়ুন আহমেদ”

      • প্রায় ২০ বছর পর আপনার লেখা পড়লাম। সন্ধানী, মরু সৈনিকের অনেক দিন পর আবার আলীমুজ্জামান। বাংলাদেশ প্রতিদিন কাল ছেপেছিল এই লেখাটি। লেখার প্রথম পর্ব জটিল এবং অনুসন্ধিৎসুদের জন্যে। দ্বিতীয় অংশ আমার মত পরচর্চা প্রিয় বাঙালিদের জন্যে।
        যে কোন কারনেই হোক হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর পর শাওন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সহানুভূতি হারিয়েছে। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ বাঙালিদের তুলনায় আধুনিক। হুমায়ুন আহমেদের মেয়েদের সাথে আপনি তার যে তুলনাটি করেছেন সেটি অনেককে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। আমরা যারা শব যাত্রায় (!) ছিলাম এবং আমরা যারা কোন কালেই অসাধারণ বাঙালি হতে পারব না তাদের মনে হয়েছে শাওনের পাশে দাঁড়িয়েছে দুই স্রেণীর মানুষ
        ১। সংস্কৃতি ব্যবসায়ী, যারা ঘেটু পুত্র কমলার ব্যবসা পেতে আগ্রহী।
        ২। প্রকাশক কুল। হুমায়ুন আহমেদের শেষ জীবনের লেখা/ কাটাকুটি/ চিঠি পত্তরের ছিটে ফোটা যদি কিছু পাওয়া যায় শাওনের কাছেই পাওয়া যাবে।
        তবে আরও একটি শ্রেণীর তৎপরতা ছোখে পড়েছে যারা মনে করে শাওনের মা মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর খুব কাছের লোক, তাঁর শুনজরে থাকা দরকার। এই শ্রেণীর মানুষের গাড়ি ঘোড়া নুহাশ পল্লীকে মোটামুটি কোলাহল (!)ময় করে তুলেছিল ২৭শে জুলাই।

        আমার বিশ্বাস আপনি এদের মধ্যে পড়েন না। অনেক দিন পর আপনার লেখা পড়ে ভাল লাগলো।

        জবাব দিন
        • শেখ আলীমুজ্জামান (১৯৭০-৭৬)

          সাইদুল ইসলাম ভাই, ২০ বছর পরেও আমাকে মনে রেখেছেন, আমি আনন্দিত ও অভিভূত। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।

          লেখার দ্বিতীয় অংশটিও মেডিক্যাল পয়ন্ট অফ ভিউ থেকে লেখা উচিৎ ছিল। তবে সেক্ষেত্রে লেখাটি জটিল ও দুর্বোধ্য হতো। যা হোক, দেরীতে হলেও সে পয়েন্টগুলি এই উত্তরের মাধ্যমে যোগ করছি।

          ক) মেডিকো-লিগ্যাল পয়েন্টঃ রোগী মারা গেলে শবদেহের উপর ক্লেইম থাকে, হাসপাতালের নথি-পত্রে যিনি রোগীর দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁর। তিনি যদি রোগীর স্ত্রী হন তা হলে ক্লেইম সম্পূর্ণ ভ্যালিড। রোগীকে সমাহিত করার জন্য তিনি শবদেহ বুঝে নিতে পারেন। রোগীর পরিবারের অন্য কেউ ক্লেইম করতে চাইলে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীর দায়িত্বে অংশগ্রহণ করা উচিৎ ও রোগীর মৃত্যুর পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে সেই অনু্যায়ী ক্লেইম করা উচিৎ। এটা না করে থাকলে ধরে নিতে হবে, শবদেহের প্রতি অন্য কারো কোন ক্লেইম নেই।

          খ) মেডিক্যাল এথিক্স ও পেসেন্ট রাইটঃ রোগীর বা তার পরিবারের বিনা অনুমতিতে রোগীর তথ্য, রক্ত-মল-মূত্র বা তার শরীর কিংবা শরীরের কোন অংশ অন্য কোন উদ্দেশ্য, যেমন রিসার্চ, স্টাডি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোন ভাবেও এক্সপ্লয়েট করা যাবে না। সমাহিত করার জন্য লিগ্যাল ভাবে স্ত্রী শবদেহ বুঝে নেবার পরে তাতে ইমোশনাল গ্রাউন্ডে ক্লেইম এনে একটা সামাজিক সিন ক্রিয়েট করা হলে, সেখানে শবদেহ এক্সপ্লয়েট করার প্রশ্নটিও এসে পড়ে।

          গ) আমি যে ভাবে দেখেছিঃ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীর চিকিৎসা একটি সম্মিলিত টীমওয়ার্ক। সেখানে একদিকে যেমন হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স আছে, অন্য দিকে আছেন রোগীর স্ত্রী ও পরিবার। ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ রোগী একাই করেন না। উপরোক্ত টিমের সবাই করেন। চিকিৎসা প্রক্রিয়া দীর্ঘ মেয়াদী হলে, হাসপাতাল স্টাফদের সাথে রোগীর স্ত্রী ও পরিবারের একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। আপ্রাণ চেষ্টার পরেও যখন রোগী মারা যান, তখন স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের মতো হাসপাতালের স্টাফরাও কষ্ট পান। তাঁদের চোখের জলের সাথে (রোগীর অগোচরে) অনেক সময় ডাক্তার-নার্স ও চোখের জল মোছেন। সেই সূত্রে রোগীর সেবায় নিয়োজিত স্ত্রীর বা পরিবারের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি থেকে যায় ডাক্তার-নার্সদের।

          ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রোগীর পাশে স্ত্রীর সার্বক্ষনিক উপস্থিতিতে তাঁর প্রতি আমার সহানুভূতিটা একটু বেশী প্রকাশিত হয়েছে। সেটা পক্ষপাতিত্ব নয়। তিনি আমার পরিচিত নন। (সম্পাদিত)

          জবাব দিন
  1. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    গুলতেকিন কে নিয়ে মূল্যায়নটা ভালো লাগলো না। একপেশে এবং খাপছাড়া লেগেছে।

    ইনফ্যাক্ট আমি অবশ্য এসব ব্যক্তিগত ব্যাপারে আগ্রহী নই মোটেই। আপনি লিখেছেন বলে পড়লাম, অন্য কেউ হলে পড়তাম না।

    হুমায়ূনের প্রথম দিকের লেখা খুব আগ্রহ নিয়েই পড়তাম, আগ্রহ নিয়ে তার নাটক দেখতাম। পরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, শেষ দুয়েকটি নাটকে মুখ-ভর্তি বমি এসেছিল, একটা দৃশ্যে সাপকে রান্না করা দেখে, আরেকটা দৃশ্যে আস্ত এক গরুর কাটা মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাতার বাশি শুনার দৃশ্য দেখে। আমার মনে হয়েছে এটা একধরনের "বিকৃতি"।

    ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক ব্যাপারে আলাপ করতে চাই না, বরং কেউ করতে চাইলে নিরুৎসাহিত করি। কারন তাদের নিজেদের অনেক ব্যাপার আমরা জানি না, না জেনে, শুধু ধারনা থেকে মন্তব্য করাটা অন্যায়। শাওন, গুলতেকিন এবং তাঁর সন্তানদের নিয়ে আপনি করেছেন এখানে। আমি অবশ্য নিশ্চিত নই, আপনার সংগে তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ আছে কিনা।

    পাঠক সৃস্টির ব্যাপারে তাঁর অবদান অনেক। তিনি পাঠককে দুহাত ভরে দিয়েছেন, পাঠকও দুহাত ভরে প্রতিদান দিয়েছেন। তাঁর লেখা বই এর ত্রয়োদশ সংস্করন বের হয় এক বইমেলাতেই। অকল্পনীয়! যাকিছু চেয়েছেন তাঁর থেকে বেশীই পেয়েছেন পাঠদের কাছে। নয় কি?

    কিন্তু ভাইয়া, আপনিই আমাকে বলুন তো, তিনি নিজেই কি তাঁর প্রতিভার সঠিক ব্যবহার করেছেন? শুধুই কি নিজের শখের পিছনে ছোটেননি? অন্য কোন কর্তব্য কি পালন করেছেন ঠিকঠাক? পাঠক কে নিয়ে ছেলেখেলায় মাতেননি তিনি?


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    দেশের সব স্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হলেও সব চেয়ে নন্দিত ছিলেন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে। ছিলেন মধ্যবিত্তের অন্যতম প্রতিনিধি

    - এই একটা কারণেই মধ্যবিত্তের পুজার বেদী থেকে হুমায়ুন আহমেদের পতন শুরু হয় শাওনকে বিয়ের ফলে। প্রথম স্ত্রী যতই তার জন্য অসম্পূর্ণ হোন না কেন, আমাদের মধ্যবিত্ত মন কিছুতেই তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে মেনে নিবে না। ফলে, শুরু থেকেই শাওনের জন্য বরাদ্দ ভিলেনের রোল। বেচারী!

    তবে যে যা'ই বলুক, হুমায়ুন আহমেদের জীবনে কে ভীলেন আর কে নায়িকা সেই বিতর্কে আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি এখনো হুমায়ুন আহমেদের লেখার মধ্যেই তাকে দেখতে চাই। হুমায়ুন আহমেদের অসংখ্য লেখার মধ্যে দিয়ে যে হুমায়ুনকে পাওয়া যায়, আমি তার অনুরাগী, ব্যক্তি-হুমায়ুনের না।


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
    • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

      মাহমুদ,
      সমস্যাটা যতটা না দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে তাঁর চাইতে বেশি শাওন তাঁর মেয়ের বান্ধবী।
      আর এইটা তো অস্বীকার করতে পারবি না ঘরে বউ রাইখা সে শাওনের সাথে প্রেম চালাইয়া গেছে! কোন এথিকে এইটা যায়?
      আমার নানার তিন বিয়া, দাদারও তিনখান। কিন্তু এই যুগে আইসা এইসব অচল। ধর্মের চাই সমাজ, আচার এখানে বড়।


      এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

      জবাব দিন
      • নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

        মানুষ একজন লেখকের শুধু লেখার সমালোচনা করবে, তাই না?
        তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বড়জোর কৌতূহল দেখাবে, কিন্তু তাই বলে তার ভুল/ঠিকগুলো নিয়ে 'মূল্যবান' মতামত দেয়া, তার শোবার ঘরে প্রবেশ করে যাওয়া একেবারে, পাবলিক প্রপার্টি মনে করা -- এগুলো আমার কাছে অরুচিকর মনে হয়।
        হুমায়ুন, তসলিমা, হক, রাহমান, আজাদ, সুলতান, রবি, পিকাসো, ভিঞ্চি-- কারো ব্যক্তিগত বলয়ে আমাদের যে তিলমাত্র অধিকার নেই তা আমাদের মনে থাকেনা। আমাদের অধিকার আমাদের জন্যে তাঁরা যা রেখে গেছেন ওই পর্যন্তই।

        বাংলাদেশের মানুষ 'সাহিত্য' পড়েছে প্রচুর হুমায়ুনকে পেয়ে, সাহিত্যের রুচিকে ধারণ করতে পারেনি।

        জবাব দিন
        • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

          দাদা খারাপ বলেন নাই।
          কিন্তু পাবলিক তো জানতে চাবেই।
          নেপোলিয়নের লেখা (জোসেফিন কে) প্রেমপত্র গুলির কথা ভাবেন? আমার কেনো জানতে হবে।
          নেপোলিয়নের পার্সোনাল পার্ট ক্ষুদ্র হয়ে গিয়েছিলো বিষ প্রয়োগে তাও কি জানার দরকার আছে?
          অন্য উদাহরণ দেই, জয়নাল হাজারী, হাজী সেলিম এরা যে সন্ত্রাসী তাতে কি আসে যায়? এরা সাংসদ হিসাবে তো ফেইল না।
          তারপর ধরেন আমি নারী মুক্তি ইত্তাদির কথা বললাম আর বাসায় গিয়া বউ পিটাইলাম আর রাতের বেলায় কাজের মেয়ের ঘরে ঢুক্লাম তাইলে হইলো?
          তারপর ধরেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সুবিধা নিতেন তাইলে কি তাঁর কম্যুনিস্ট ইমেজটা থাকতো?
          আসলে বিষয়টা অনেক জটিল। তবে অনেকেই আছে যারা প্রাইভেসি বোঝে না।
          যেমন ধরেন জীবনানন্দ কে তাঁর এক ভাড়াটিয়া মহিলা কে নিয়ে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিলো। (আত্মহত্যার আগে)


          এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

          জবাব দিন
  3. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    আলীমুজ্জামান ভাই - আপনার সাথে প্রথম এবং শেষ দুটো ব্যাপারে আমি একমত। হুমায়ূন আহমেদ অনেক আগে থেকেই তাঁর মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করবেন যে গুলতেকিনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ডিভোর্সের (২০০৩) পরই উনি মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। হার্ট এট্যাক হয় ২০০৪ এ। আর মাই্কেল জ্যাকসন আর হুমায়ূন আহমেদের জীবনের শেষ পরিণতির মিল দেখে আমিও অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জ্যাকসনের প্রাক্তন ওয়াইফের মতে (এলভিস প্রিসলীর মেয়ে) জ্যাকসনের চারপাশে সব রক্তচোষা ভীড় করছিল। জ্যাকসন যা শুনতে চাইতো তারা তাকে তাই শুনিয়ে সুবিধা আদায় করে নিত।

    এখন হুমায়ুন আহমেদের ব্যক্তিগত প্রসংগে আসি। এইসব পশ্চিমা দেশে রাজনীতিবিদ, লেখক, দার্শনিক, সমাজসংস্কারকদের জীবনী পুংখানুপুংখ ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। পাঠপুস্তকে কিছুই শেখা যায় না, যতটা না যায় কারও জীবন দেখে এবং পড়ে। এদেশে তাই রাজনীতিবিদদের আত্মজীবনী লিখতে হয়।

    একজন শরৎচন্দ্রএর আত্মজীবনী জানলে একজন লেখককে তা সাহায্য করতে পারে। এখন হয়তো পত্রিকাগুলো কাটতির জন্য অনেক খবর লিখবে কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য এখানে অনেক শিক্ষনীয় ব্যাপার ছিল। তা হলো ক্যান্সায়ার এবং তার চিকিৎসা নিয়ে। যেমন স্টেজ ৪ এ কোলন ক্যান্সারের লাইফ এক্সপেক্টএনসি কতো? দু-একটা মিরাকল বাদ দিয়ে পরিসংখ্যাণ কি বলে? গত কয়েক বছর ধরে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে হঠাৎ করে আত্মবিশ্বাসী হলেই কি সব বাঁধা দূর করা যায়?

    আর শাওনের ব্যাপারে বলবো সে প্রথম থেকেই যে কাজটি করেছে সেটা এথিক্যালি রং - প্রচণ্ডভাবে রং। এটা স্পষ্টতই পরিষ্কার যে বিখ্যাত হওয়ার পর আনুষংগীক যে সাইড-ইফেক্টগুলো জীবনে প্রবেশ করতে থাকে তা নিয়ে স্বামি- স্ত্রঈর মধ্যে দ্বন্ধ চলছিল - শাওন শুধু মাথা বাড়িয়ে এই অবস্থার সুযোগ নিয়েছে। এখানে কোন বিশাল লাভ-স্টোরি আছে বলে মনে হয়না। আর থাকলেও তা কেমন ভালবাসা যা মানুষকে তাঁর জীবন সম্পর্কে অনাগ্রহী করে তুলবে। বরং মনে হয়েছে গুলতেকিন ছাড়া হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন পানি ছাড়া মাছ। যেভাবে সন্তানদের মানুষ করেছেন তাতে মহিলাকে শ্রদ্ধা না করে থাকা যায় না।

    পরিশেষে বলব হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন তাঁর কবরের জায়গা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাবেন এমনটা ভাবলে হুমায়ূন আহমেদকেই অশ্রদ্ধা করা হয়।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • শেখ আলীমুজ্জামান (১৯৭০-৭৬)

      ওয়াহিদা, ধন্যবাদ।

      গুলতেকিনকে খাটো করার ইচ্ছা আমার নেই। গুলতেকিন না থাকলে হুমায়ুন আহমেদ আজকের হুমায়ুন হতে পারতেন না, কথাটা আমি অস্বীকার করছিনা। আমি হুমায়ুনের শেষ দিনগুলির কথা বলতে চেয়েছি। লেখক হুমায়ুন, শুধু লেখক হিসাবে থাকলে পারিবারিক সমস্যাগুলো হতো না বলেই আমার বিশ্বাস। তিনি তা থাকেন নি। টিভিতে গেছেন, ফিল্মে গেছেন। লেখক হিসেবে নয়, একেবারে পরিচালক হিসেবে। রূপালী পর্দার জগতে গসিপ-স্ক্যান্ডাল এক ধরণের পুঁজি, সেখানে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার স্কান্ডাল রটে যাবে, বা তিনি জড়িয়ে পড়বেন সেটাই স্বাভাবিক। যে সময়ে পারিবারিক কলহের শুরু, সেখান থেকে ফিরে আসা খুবই কঠিন, কারণ ততদিনে তিনি আর গুলতেকিনের প্রাইভেট প্রপার্টি নেই, পাবলিক প্রপার্টি হয়ে গেছেন। এই পাবলিক কি বলে, আমরা জানি। সেদিন এক হালাল ফুডের দোকানদার আমাকে বলে, ‘গুলতেকিন না থাকলে হুমায়ুনের গুলিস্তানে বাদাম বেচা লাগতো’। জিজ্ঞাসা করলাম ‘কেন?’ বলে, ‘চাকরী নাই, ব্যবসাপাতি করে না, লেখালেখি না পারলে করার আর কিছু থাকে!’ এ ধরণের কথা কি হুমায়ুন আহমেদ নিজের কানে শোনেন নি? তিনি খুব কৌতুহলী মানুষ ছিলেন, খেয়ালী ছিলেন। এ ধরণের কথা শুনতে শুনতে তিনি হয়তো একটা এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেছিলেন, ‘দেখি না, সত্যি আমার বাদামা বেচা লাগে কি না?’ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, গুলতেকিন বা শাওন নয়, হুমায়ুনের নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায়।

      গুলতেকিন তার নিজের কীর্তিতেই মহিমান্বিত। তাকে বড় করার জন্য শাওনকে ছোট করার কোন প্রয়োজন নেই। শাওন দুই দিনের স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে, নিজে বিখ্যাত হয়ে কেটে পড়েন নি। দীর্ঘ আট বছর হুমায়ুনের সংসার করেছেন, হুমায়ুনের দুই সন্তানের জননী, তাঁর জীবনের সবচেয়ে সঙ্কটময় সময়ের সাথী। তাকে ছোট করা মানে হুমায়ুনকে কষ্ট দেওয়া। তাতে গুলতেকিনের মহিমা বাড়বে না, বা সেভাবে বাড়ানোও ঠিক নয়।

      উপরে মাহমুদ যেটা বলেছে, ‘আমাদের মধ্যবিত্ত মন কিছুতেই তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে মেনে নিবে না’, পাবলিক প্রপার্টি হুমায়ুনের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। তিনি দেশের সবচেয়ে বড় সেলিব্রিটি। তার চিকিৎসা, মৃত্য, কবর এ সব নিয়ে স্টোরি চেয়েছে পাবলিক। সবাই একটুকরো হুমায়ুন চায়, মজাদার, সুস্বাদু হুমায়ুন। সেই সুযোগ নিয়ে তাঁকে দেদার বিক্রি করে চলেছে মিডিয়া। বাড়াবাড়ি না করলে একসময় এটা থেমে যাবে।

      জবাব দিন
  4. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    লেখক হুমায়ুন আর ব্যক্তি হুমায়ুনের মধ্যে একটা রেখা টানতে না পারার অক্ষমতা তাঁর ভক্ত বা পাঠকদের, আমাকে কষ্ট দ্যায়।আমরা বোধ হয় এমনই, মানুষকে স্বল্প পরিচয়ে জিজ্ঞেস করে বসি সে বিবাহিত কি না বা বান্ধবী আছে কি না বা কত বেতন পায়।স্বাভাবিক ভব্যতার আড়াল তো এই লোকটিকে আমরা দিতে পরিনি।এখনো দেখুন, মিডিয়া কেমন অসভ্যের মতো ছবি দেখিয়ে যাচ্ছে গুলতেকিন কতটা কাঁদলেন।

    ক্লাস এইট নাইনে গোগ্রাসে হুমায়ুনের ৮-১০টা 'উপন্যাস' পড়েই বুঝে গিয়েছিলাম নতুন কিছু দেয়া এঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়।চর্বিত চর্বনই করে যাবেন তিনি, তা তিনি যাই বানাননা কেন- কি নাটক, গল্প কি সিনেমা। সেই একই ফর্মুলা।

    তবু কোথায় একটা আত্মীয়তা তৈরী হয়েছিলো ভেতরে ভেতরে। তাঁর টিভি নাটিকের জন্যে অস্থির প্রতীক্ষা আর শ্যামল ছায়া বা অগুনের পরশমণির মতো লেখাগুলোর সংস্পর্শে কৈশোর আর তারুণ্যের শুরুর দিনগুলো কেটেছিলো তো!

    ইদানিং তাঁর লেখাগুলো আমার একেবারে অখাদ্য মনে হলেও, পরিপূর্ণ ব্যবসায়ী/বাজারে লেখকের পতিত জীবন বেছে নিলেও তাঁর মৃত্যুতে কেমন শুন্য একটা অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি আমি। কালই তাঁর কিছু অনবদ্য ছোটগল্প পড়ে আমার বিশ্বাস হচ্ছিলোনা এই সেই একই হুমায়ুন। বিশ্বাস হচ্ছিলোনা তিনি আর নেই।

    মনে হচ্ছিলো, একজন অসম্ভব বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে তিনি সচাতনভাবেই এমন বাজারমুখী করে তুলেছিলেন নিজেকে। সাহিত্যে এর চে' বেশি তাঁর আর কিছু দেয়ার ছিলো কি না জানিনা তবে গার্বেজই হয়তো লিখতে চেয়েছিলেন আরো বেশি করে অর্থ আর পাঠকপ্রিয়তার বিনিময়ে।জীবনকে নিজের মতো করে উপভোগ করেছেন, সেই আর্থিক সাধ্য অর্জন করে। এদেশে তাঁর মতো করে আর ক'জন এমন পেরেছেন? একজন দুঃস্থ, করুণাকাঙ্খী লেখকের তিলে তিলে শেষ হয়ে যাবার চেয়ে এভাবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকে চট করে নিভে যাওয়া হুমায়ুনের পক্ষেই সম্ভব।

    তাঁর লেখালেখি অধ্যায় শেষ হবার পর এখন নির্মোহ আলোচনা করা যাবে কাজগুলো নিয়ে।ভক্তদের উন্মাদনা ফুরিয়ে এলে হয়তো ব্যক্তিগত কথামালাগুলো ঝিমিয়ে যাবে, ট্র‍্যাশের আড়ালে যেসব মণিমুকতো লুকিয়ে আছে সেগুলো চোখে পড়বে আমার মতো মানুষদের যাঁরা অবজ্ঞায় মুখ ঘুরিয়ে ছিলাম তাঁর জীবদ্দশায়। দেখা যাক।

    শেষে: আপনার লেখার জবাবে লেখা কোন মন্তব্য নয় এটা আলীম ভাই। হঠাৎই কথাগুলো মাথায় এলো এখানে লিখে ফেললাম।ভালো আছেন? আপনি যে প্যাথলজিস্ট এই জানলাম।

    জবাব দিন
    • শেখ আলীমুজ্জামান (১৯৭০-৭৬)

      নূপুর, ধন্যবাদ।

      হুমায়ুন আহমদের অনেক লেখাই রাবিশ, স্বীকার করি। তবে, বিশ বছর আগে, সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য বলেই গণ্য হতো না, এখন কিন্তু অবস্থা পাল্টেছে। এই যে সায়েন্স ফিকশন রাইটার ডঃ জাফর ইকবাল, বাংলাদেশের অন্যতম জন্যপ্রিয় লেখক। তার জন্য রাস্তাটা কিন্তু তৈরী করে দিয়ে গেছেন তার দাদাভাই। আমাদের সাহিত্য বোদ্ধাদের বিজ্ঞান বিমুখতা অনেকটা মূর্খতার পর্যায়ে পড়ে। ওদের সাথে ঝাকের কই হিসাবে মিশে গলা মেলানোও কিন্তু ঠিক হবে না।

      জবাব দিন
      • নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

        আলীম ভাই,
        হুমায়ুন বাংলা সাহিত্যকে কি দিয়েছেন সেটা তাঁর ওই ছোটগল্পগুলো পড়েই টের পেলাম।
        সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন, একে জনপ্রিয়তাও দিয়েছেন আকাশচুম্বী।দ্বিমতপোষণ করার সুযোগ নেই।
        যেটা আমি নিতে পারিনা সেটা হচ্ছে হুমায়ুনের পরিমিতিবোধের অভাব।একই গল্প একশ বার বলে বাজারের তুঙ্গে থেকেছেন, সাহিত্যে আর এগুনো হলোনা তাঁর। আমার মনে হয়েছে, নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতা তাঁর ছিলোইনা।সেই অক্ষম কলম দিয়ে দিনের পর দিন পাঠকের ভাবালুতাকে পুঁজি করে ব্যবসা করে যাওয়াটা ছিলো অসততা।দশ-বারোটা বইতেই যার লেখার ক্ষমতা পূর্ণতা পেয়ে নিঃশেষিত হয়ে গেছে, তার তিনশোটা বই লেখার কোন মানে হয়না।

        আমাদের ভক্তকূলের অবশ্য পীর দরকার, পূজা করার মতো একটা কিছু চাই তাদের।
        ভদ্রলোকের মৃত্যুর সুযোগে যদু মধুরা এসে সাহিত্য নিয়ে নানান বুলি কপচে যাচ্ছে, হিমুরা হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে শোক উদযাপন করছে।ভালোই লাগছে দেখতে।

        মাহমুদুল হক, ইলিয়াস, রশীদ করিম, শামসুল হক, শওকত ওসমান যাদের কাছে দুষ্পাচ্য তারা হুমায়ুনকে রবীন্দ্রনাথের সাথে তুলনা করছে।নোবেল পাবার যোগ্য মনে করছে। হুমায়ুনীয় সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয়ে এদেশ নাকি বিপুল পাঠককূল তৈরী হয়েছে, প্রকাশনাশিল্পে নাকি ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে - এসব শুনলে আমার বিবমিষা হয়। সেই বিপুল পাঠককূল হুমায়ুনের হাত ধরে সেখানেই আটকে আছে, প্রকাশনাও হুমায়ুনকে ছিবড়ে করে ছেড়ে দিয়েছে। হুমায়ুন নিজে ছিবড়ে হয়েছেন। পাঠকের রুচির কোন পরিবর্তন হয়নি।

        হুমায়ুনের যুগ ছিলো একটা নেশগ্রস্ততার যুগ। একটা মাঝারিমানের লেখক কি করে অপাঠক/সাহিত্যমূর্খ একদল মানুষকে তার পুনরাবৃত্তিপরায়ণ স্টাইলে বন্দী করে রাখলেন তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে অবশ্য।

        বাদশাহ নামদার অবশ্য হুমায়ুনকে বলাই যায় নিজের মত করে জীবনকে যাপন করতে পেরেছেন বলে, অঢেল অর্থ কামিয়ে কিছুটা হলেও সম্রাটের মতো জীবনকে উপভোগ করেছেন। ক'জন পারে। এজন্যে তাঁকে আমার ঈর্ষা হয় খুব। জীবন তো একটাই।

        জবাব দিন
        • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)
          নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতা তাঁর ছিলোইনা।

          নূপুরদা আপনার এই কথার সাথে আমি একমত। তাই অনেকে বলে হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ক্ষমতার সদ্বব্যবহার করেননি সেটা আমার মনে হয়না। ফিকশন লেখা খুবই কষ্টের। একটা মানুষ তাঁর চারপাশে যা দেখে এবং পড়ে তাই নিয়ে লেখে। মানুষের লিমিটেশন তো থাকবেই। সেই সাথে অবাক করে দেখেন আরেকজন হুমায়ূন তো বের হয়ে এলো না। ফিকশন সাহিত্যের প্রধান উপজিব্য চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রাণ ভরে দেওয়া - যারা এই বিষয়টি করতে পারে তাঁরাই জনপ্রিয় বা পাঠক প্রিয়তা পায়। বিশ্ব সাহিত্যের দিকে তাকালেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে উঠে।
          গদ্য নির্ভুল লিখলেই, শব্দ জ্ঞান অফুরন্ত থাকলেই কিন্তু ভাল ফিকশন লেখা যায় না। তাই অসম্ভব ভালো প্রবন্ধ ্লেখক ফিকশন রাইটার হিসেবে মোটামুটি ব্যর্থ মানে পাঠকের মনে স্থান নিতে পারেননি।
          আরেকটা কথা আমি যখনই কোন ফিকশন পড়তে শুরু করি প্রথমেই সেই ফিকশন রাইটারের জীবনী খুঁজে পড়ে নিই। টলস্টয়ের জীবনী নিয়েই তো ছবি করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের রচনার থেকে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তি জীবন উঠে আসে বেশি। পশ্চিমেও একই অবস্থা। এটা হচ্ছে জনপ্রিয়তার একটা মাপকাঠি। লোকে ব্যক্তি কেনেডির বই নেড়েচেড়ে দেখে, পাশে নিক্সন বা বুশের বই থাকলে তা দেখে না। হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তি জীবন নিয়ে পাঠকের যে আগ্রহ তা তাঁর জনপ্রিয়তারই মাপকাঠি। এই রকম জনপ্রিয় তো কেউ সহজে হয়না। যাদের নাম উলেখ করলেন তাঁদের কথা তেমন কেউ পড়তে যাবে বলে মনে হয়না। এই কিছুদিন আগে সতৎজিৎ রায়ের ব্যক্তি জীবনের ুপর ভিত্তি করে একটা ছবি হচ্ছে বলে শুনেছি যা কিনা উনার ছেলে চাচ্ছে না।
          আরেকট কথা হুমায়ূন আহমেদ নিজেই তাঁর জীবনকে ওপেন বুক করে দিয়েছিলেন।


          “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
          ― Mahatma Gandhi

          জবাব দিন
          • নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

            হুমায়ুনের ব্যক্তিজীবন নিয়ে আমাদের আগ্রহটি স্বাভাবিক নেই, পার্ভার্সনে রূপ নিয়েছে। বিখ্যাত লোকদের উল্টাপাল্টে এভাবে দেখতে না পারলে আমরা শান্তি পাইনা।
            আর বাংলাদেশের আমপাঠকরা ভালো করে বাংলাই জানেনা, পড়বে কি। হুমায়ুন টাইপ লেখার জনপ্রিয়তা এখানে অবধারিত।সাহিত্যপাঠ করতে তো কিছু শিক্ষা লাগে, আমাদের সেটা নেই।ওই যে বললে "তেমন কেউ পড়তে যাবেনা" ওতে একটি তাচ্ছিল্য লুকিয়ে আছে, আর তা দিয়ে একটা 'চূড়ান্ত মতামত' দেবার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাতে 'জনপ্রিয়তা' আর 'সাহিত্যমাপ' সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদেশে টলস্টয়ের জন্ম হবেইনা কারণ অত পেটমোটা বই কে-ই বা পড়বে, কে-ই বা ছাপবে।

            জবাব দিন
            • ফয়েজ (৮৭-৯৩)
              নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতা তাঁর ছিলোইনা।
              নূপুরদা আপনার এই কথার সাথে আমি একমত।

              আমার কেন জানি তা মনে হয় না। আমার মনে হয় তিনি পারতেন। মিসির আলী, হিমু, শুভ্র, ফিহা, আলাদা চরিত্র, আলাদা ডাইমেনশন। তিনি আরও পরিপূর্ন উপন্যাস লিখতে পারতেন। জলিল সাহেবের পিটিশন, শ্যামল ছায়া, আগুনের পরশমনি এগুলো থেকে ১৯৭১ নিয়ে আরও সুন্দর উপন্যাস আসতে পারত। কিন্তু তিনি লিখলেন "জ্যোৎস্না আর জননী" অল্প কিছুদূর পড়েছি এইটার। বেশী মন্তব্য করতে পারবো না।

              আমার মনে হয় তিনি ভাংতে চাননি উপন্যাসের এই ডাইমেনশনটা। পয়সা তো পাচ্ছেন উপন্যাসের ফটোকপি করে, খামোখা মাথা নস্ট করে কস্ট করার কি দরকার।


              পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

              জবাব দিন
              • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

                ফয়েজ - আমাদের অনেককেই বলতে শোনা যায় ঐ ছেলেটা খুব ব্রেইনী, পড়লেই ক্লাসে ফা্র্রস্ট হতো। কিন্তু আসল ব্যাপার হচ্ছে প্রথম হওয়ার জন্য ব্রেইনের থেকেও যেটা প্রয়োজন সেটা হলো ্ডিসিপ্লিন। ঠিক তেমনি বড় উপন্যাস লেখার জন্য যেটা দরকার সেটা হলো মানসিকতা। উনি সরাসরিই বলেছেন যে এইসব দিনরাত্রি লিখেছেন টিভি কেনার জন্য। অর্থাৎ উনার কাছে টাকা আর লেখা ্দুটোই সম্পর্কিত ছিল। কারও নৈতিকবোধ এবং মানসিকতার সাথে আউটপুট সরাসরি সম্পর্কিত।
                লেখা ব্যাপারটা কনসিভ করবার মতো। এবং যার যতটুকু ক্ষমতা তাঁর থেকে ততটুকুই বেড়ুবে। ব্রেইনি ছেলে যেমন ডিসি্পলিনের অভাবে প্রথম হতে পারে না ঠিক ্তেমনি লেখকের মানসিকতার কারণে অসাধারণ লেখার ক্ষমতা থাকলেই যে খুব ফাটাফাটি উপন্যাস লিখতে পারেন না।


                “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
                ― Mahatma Gandhi

                জবাব দিন
              • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

                ফয়েয ভাই
                জ্যোৎস্না ও জননী অক্ষম চেষ্টা।
                একটা উদাহরণ দেই।
                হু আহমেদের লেখা হইল ২০-২০ ওভারের ক্রিকেট ম্যাচ।
                আমার পছন্দ ৫ দিনের টেষ্ট।
                আবার দেখেন ২০-২০ তে পয়সা বেশি।
                তবে হু আহমেদ কে পছন্দ করা ভালো, না করলে আতেল ব্রান্ডেড হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে।


                এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

                জবাব দিন
            • ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

              আপনার কাছ থেকে আপনার পছন্দের বাংলা উপন্যাসগুলোর একটা সমালচনা আশা করছি। ফিকশনের প্রধান উপজীব্য প্লটের আকর্ষনীয়তা এবং চরিত্রের বিশ্বাসযোগ্য রূপায়ন এই দুটো বিষয়ে আলোকপাত করলে ভাল হয়। একটা অনুরোধ রইলো আরকি।


              “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
              ― Mahatma Gandhi

              জবাব দিন
        • রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

          দাদা ৯০ এর দশকে তথাকথিত বাংলাদেশ নিয়া দেশ বন্ধ হয়।
          বইমেলায় ভারতীয় বই এক কথায় নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও এখনো দেদারসে পাইরেটেড কপি ছাপা হচ্ছে।
          টিভি নাটক, শুধুমাত্র বিটিভি সম্বল হওয়ায় সবাই নাটকগুলি দেখতো। লোকজনের বাসায় টিভি কেনা হতে থাকে।
          বাংলাদেশের বইএর ছাপা, কাগজ, প্রচ্ছদ সুন্দর হতে থাকে।
          ইত্যাদি, ইত্যাদি।
          তাঁর কিছু চরিত্র বিশেষ করে মিসির আলি অনবদ্য।
          ছোটগল্প অসাধারণ।
          কিন্তু আমি গাটের পয়সা খরচ করে কখনো হু আহমেদ কিনবো না।
          আর ভাইয়া মানুষ চায় আনন্দ। চিন্তার সময় কোথায়?
          একটা বাঙলা ছবি দেখার যে আনন্দ, হু আহমেদের বই পড়াও অনেকটা সেরকম। মজা আর মজা।
          আর সায়েন্স ফিকশন নিয়ে যে কথা। হ্যাঁ হু আহমেদের সায়েন্স ফিকশন ভাল, তবে তার চাইতে আসিমভ পড়া ঢের ভালো। এমনকি জুল ভের্ণ।


          এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

          জবাব দিন
  5. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    ভাইয়া মেডিক্যাল টার্ম নিয়া যা লিখেছেন তা অসাধারণ হয়েছে। শেষে এসে হোঁচট খেলাম। গুলতেকিন, হুমায়ুন আর শাওনকে নিয়া বিশ্লেষণ নিয়া আর কি?
    অবশ্য নানা মত তো থাকবেই।

    কিন্তু একটা কথা অস্বীকার করা যায় না দ্বিতীয় বিয়ের মাধ্যমে হু আহমেদ নিজেকে অনেকখানিই বিতর্কিত করে ফেলেছিলেন। বড় সমস্যাটি হচ্ছে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর মেজ মেয়ের বান্ধবী। অবশ্যই তিনি একটা সময় শাওন কে নিজের কন্যাসমা দেখেছেন।
    বাজারে বেশ কিছু বই পত্র আছে গুলতেকিনের পক্ষে লেখা, কিছু আবার হু আহমেদের পক্ষে লেখা।
    কিন্তু এভাবে দেখি তো ভাবা যায় কিনা?
    গুলতেকিন সন্দেহপ্রবণ ছিলেন। হু আহমেদের উপর অত্যাচার করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সবই মানলাম।
    চারখান পোলাপান + এক জন (যতদূর মনে পড়ে গুলতেকিনের ও এক সন্তান মারা গিয়েছিলো, ভুল হতে পারে, মনে হয় অয়োময়ের সময়) আর ত্রিশ বছর সংসার করতে হবে সেটা বুঝার জন্য।
    তাও না হয় মানলাম উনি চেষ্টা করেছেন। কিন্তু শেষে এসে ব্যর্থ হয়েছেন।
    তালাকে গিয়েছেন।
    কিন্তু এটা তো সত্য ঘরে স্ত্রী বর্তমান থাকার পরও তিনি প্রেমে জড়িয়েছেন, তাঁর কোন কোন লেখায় পাওয়া যায় তিনি শাওনকে কবিতা লিখতেন। শাওনের সাথে বিয়ের পর তিনি কবিতা লিখতে পারেন না বললে শাওন তার চিঠির বাক্স থেকে হুমায়ুনের লেখা চিঠি এনে দেখান।
    বিমানের বিজনেজ ক্লাস নিয়া তেমন কিছু জানি না। তবে স্বামী মারা গেলে মাথা আউলাইয়া যাওয়া অস্বাভাবিক না। তবে ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণেই বা সমস্যা কি? এতোই যদি অর্থের গরম থাকে তাইলে হুমায়ুনের চিকিৎসার জন্য অন্যের সাহায্য লাগে কেনো? বই বিক্রির কোটি টাকা কই?
    আর হুমায়ুনের সাক্ষাৎকার দেখলেই বুঝা যায় যে তিনি নুহাশ পল্লী কবর বানাতে চান নি। আরো একটা কথা কিন্তু বলেছেন যে তিনি চাননি তার সন্তানেরা নুহাশ পল্লী নিয়ে মারামারি করুক। তার মানে কিন্তু নুহাশ পল্লী উনি কাউকে লিখে দেন নি। আর তার প্রথম পক্ষের তিন মেয়েই তো মনে হয় ইউ এস এ তে। গুলতেকিন ও যাবেন না ওখানে মনে হয়। আরেকটা জিনিস কিন্তু মাথায় রাখতে হবে হুমায়ুনের নাটক, সিনেমার সাথে কিন্তু শাওন জড়িত। তাইলে কি হইলো!
    শাওনের সাক্ষাৎকার দেখে মনে হয়েছে অভিনয়। (সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে যে বলেছে আপ্নারা নাকি চান না)
    এখানে একটা/দুইটা কথা ক্লিয়ার বলি, অনেক আগেও বলেছি।
    ০১ হুমায়ুন- শাওনের বিয়ের জন্য আমি কখনো শাওনকে দোষ দেই নি। হু আহমেদের যে খ্যাতি তাতে তার প্রেমে না পড়াটাই অস্বাভাবিক।
    ০২ কিবা হাড়ি, কিবা ডোম; যেথা যার ম'জে মন। কিন্তু প্রেমে পড়া আটকানো যায়। ক্লোজ দা ডোর।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  6. শেখ আলীমুজ্জামান (১৯৭০-৭৬)

    সিসি ব্লগের বন্ধুরা,

    সবাইকে মতামত দেবার জন্য আবারো ধন্যবাদ।
    তবে এই ব্লগটিতে আর কোন মতামত না দেবার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

    বিনীত,
    শেখ আলীমুজ্জামান

    জবাব দিন
  7. শেখ আলীমুজ্জামান ভাই ধন্যবাদ আপনাকে । লেখাটি পড়ে ভালো লাগলো । তবে উপরে যারা মন্তব্য করেছেন , তারা সবাই বলেছেন ব্যাক্তিগত বিষয় না টানাই ভালো । কিন্তু আবার প্রায় সবাই ব্যাক্তগত বিষয়টি টেনেছেন । আসলে আমাদের মধ্যবিত্ত মন তো, কোন লিমিট থাকেনা । ক্ষমা করবেন আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাই নি ।
    আমি বিশ্বাস করি --------- প্রেম যদি ধর্মকে না মানে তবে বয়স টা কি খুব বেশি মানা প্রয়োজন ?
    ------------ গুলতেকিন ও শাওন দুজনেই স্ব স্ব অবস্থানে সঠিক ছিলেন
    ------------ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অনেকেই গালি দেয়,, তাই বলে সে কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসতে পারেনা । হুমায়ন আহমেদের লেখা একই টাইপ থাকলে ও পাঠক কিন্তু কমে যায়নি । যেহেতু আমি হূমায়ন আহমেদ এর মত লেখক নই, তাই তাহার লেখাকে ছোট করে দেখা ঠিক না । 🙂

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।