বাচ্চা বাবার মোটিভেশন

FB_IMG_1439935448705

“স্যার, হেরোইন কোকেনের মতোন হার্ডকোর ড্রাগ বাদ দিয়ে আপনি ফেন্সিডিল আর ইয়াবার মতোন সফটকোর ড্রাগ নিয়ে কথা বললেন কেন?” প্রায় দুই ঘন্টাব্যাপী প্রেজেন্টেশনের পর চা পানের সুযোগে ফাতেমী স্যারকে মনের ভিতর উঁকিঝুঁকি মারতে থাকা প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেই ফেললাম।

জবাবে স্যার যা বললেন তার মূল বক্তব্য এরকম: “দেখ, সহজলভ্যতা আর সামগ্রিক প্রভাবের কথা যদি বল তাহলে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ফেন্সিডিল বা ইয়াবা অন্যান্য যে কোন ড্রাগের চাইতে বেশি শক্তিশালী ও ভয়াবহ”। মনে করতে পারলাম স্যার প্রজেক্টরে বিগত কয়েক বছরের ইয়াবার চালান ধরা পড়ার যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলেন তা শুরু হয়েছিল মাত্র ৪০ হাজার দিয়ে। আর এই বছর মাত্র পাঁচ মাসের ভিতরেই তা কোটির ঘর ছুঁই ছুঁই করছিল। সারা দেশতো বটেই বিশেষ করে বর্ডারের জেলাগুলোর অবস্থা বেশি সঙ্গীন।

বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি’র (BAUST) সৈয়দপুর ক্যাম্পাসে কর্ণেল নেয়ামুল ফাতেমী স্যার একটা মোটিভেশন সেশন কন্ডাক্ট করবেন বলে সার্বিক আয়োজনের দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে এসে পড়েছিল। আর বাধ্যতামূলক উপস্থিতির চক্করে পড়ে নিজের ভাগ্যকে গালমন্দ করছিলাম। কিন্তু স্যারের লেকচারের খানিক্ষণ যাবার পর প্রদানকৃত সমস্ত গালমন্দ ফেরত নিতে বাধ্য হলাম। মনে মনে স্যারকে লাগাতার ধন্যবাদ দিতে থাকলাম।

মোটিভেশন সেশনটির টার্গেট গ্রুপ ছিল ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা। স্যারের চাকুরী জীবনের বৈচিত্রময় অভিজ্ঞতা (বিশেষ করে বিজিবি’তে প্রেষণে নিয়োজিত থাকাকালীন) এবং ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় নিরলস গবেষনার উপর দাঁড় করানো পুরো সেশনটাতে মাদকের প্রভাবের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসল। আমি আবিষ্কার করলাম টার্গেট গ্রুপ ছাত্রছাত্রীরা হলেও প্যারেন্টসদের জন্যও এটা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমি এক “বাচ্চা বাবা” (অথবা “বাচ্চার বাবা” – মানে আমার বাচ্চারা এখনও নিতান্তই বাচ্চা) তবুও অনুভব করলাম এখান থেকে মোটিভেটেড হয়ে শিক্ষাটা কাজে লাগানোর সময় আমার এখনই।

মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসারত এক কিশোর প্রতিদিন তিন বোতল ফেন্সিডিলে অভ্যস্ত ছিল। অনুসন্ধানে বের হয়ে আসল তার বাবা তাকে প্রতিদিন ২০০০ টাকা করে হাত খরচ দিতেন!! বাবা মা যদি বাচ্চার মাথায় কোন রকমে ঢুকিয়ে দেন যে, “টাকা পয়সা ইজ নট এ প্রবলেম” – তাহলে নিশ্চিত থাকা যায় যে সেটাই সকল প্রবলেমের ভিত্তি হতে যাচ্ছে। মনে পড়ে গেল, “অর্থই সকল অনর্থের মূল”।

ক’দিন বাদে মেয়ের হাত ধরে “শপ ট্রিপল টু”তে গেলে একটা খেলনা ধরে টান দিয়ে বোঝালো এটা তার চাই। মেয়ের আবদারে বাবার মন দ্রবীভূত হতে সময় নিল না। ভাবছিলাম, কি আছে দুনিয়ায়? দিই কিনে…। পরমুহূর্তে শাসালাম নিজেকে। মেয়েকে বোঝালাম যে এই মাসে ইতিমধ্যে তাকে দুইটা খেলনা কিনে দেয়া হয়েছে। বাবার কাছে এখন পর্যাপ্ত টাকা নেই। এটা পরবর্তী মাসে তাকে কিনে দেয়া যেতে পারে। মেয়েটা আমার লক্ষী – মেনে নিল। ওর মা আমার চাইতে কয়েক কাঠি সরেস! মেয়ের আবদারে সে আবার একটা করে কন্ডিশন জুড়ে দেয়, “ক্লাস টেস্টে ১০ এ ১০ পেয়ে আসবি তারপর খেলনা হবে”।

গ্যাব্রিয়েল ইগলেসিয়াসের স্ট্যান্ড আপ কমেডি ফিল্ম “দ্যা ফ্লাফি মুভি” দেখেও পুনরায় ব্যাপারটা হৃদয়াঙ্গম করলাম। না চাইতেই পাওয়া জিনিসে বাচ্চা তো বাচ্চা, বড় মানুষও দাম দিতে শেখে না, মর্মটাই বোঝে না। কষ্ট করে পাওয়া যে কোন জিনিস বা অর্জনে আনন্দ থাকে শতভাগ। মানুষ তাতে এ্যাপ্রিশিয়েট করতে শেখে। সাজ্জাদ (জুনিয়র কলিগ) কলেজে উঠে বাবার কাছে মোবাইল চেয়েছিল বলে বাবা পরামর্শ দিয়েছিলেন, “কলেজে উঠেছ না? নিজেরটা নিজেই কামাই করে কিনে নাও না কেন?” মনে মনে তাকে সালাম জানাই বার বার।

মনে প্রাণে চাই আমার বাচ্চারা তাদের যে কোন কিছু পাওয়ার জন্য জন্য এ্যাপ্রিশিয়েট করতে শিখুক, বাবা মা’র কষ্ট করে কামাই করার মূল্য বুঝুক। কষ্ট করে নিজেরটা নিজে অর্জন করে নিক। নিজ পায়ে দাঁড়াক, আর তাতে গর্বিত হোক।

১,০৫৩ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “বাচ্চা বাবার মোটিভেশন”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।