ডিজিটাল সুখ দুঃখ

পাঁচ মাস ফেইসবুক আর জিমেইলে ইলেক্ট্রনিক বার্তা চালাচালির পর অবশেষে স্কাইপে দেখা হলো রোদেলার সাথে।

: হ্যালো বিউটিফুল! ফাইনালি পাওয়া গেলো তোমাকে

আমি হাত নেড়ে বলি

: হাই, প্রিন্স অব নোভাই!

দুই হাত আর একমাথা ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে রোদেলা আমাকে উইশ করে

রোদেলাকে ভড়কে দিতে আমার চুলগুলোকে অনেক কায়দা করে একটা মোহক স্টাইল দিয়েছি একটু আগেই, যদিও এখন মনে হচ্ছে রাজকুমারেরা আর যা’ ই করুক না কেনো তারা মোহক মার্কা চুলের ফ্যাশন করে না! এদিকে রোদেলা মেয়েটা বেশ সাদামাটা দেখছি। এই মেয়ে কোন সাজ পোশাকের ধার ধারেনা, চোখে একটু কাজল নেই, লিপস্টিক তো নয়ই! এইচএন্ডএম এর ম্যাটমেটে রঙের কী একটা টি-শার্ট পরে বসে আছে রোদেলা, অন্যদিকে তিনটা টি-শার্ট পাল্টে অবশেষে আমি পরেছি ছাই রঙা পোলো আর ফেডেড জিনস। বাম হাতে নিরীহ গোছের একটা ব্রেসলেটও আছে আমার। রবিবারের ঝলমলে সকাল আমাদের নোভাই শহরে, অন্যদিকে আবহাওয়া দফতর বলছে তিনদিনের বৃষ্টিতে বিচ্ছিরি অবস্থা রোদেলাদের লুইসিয়ানায়! আমরা দুজনেই বেশ দিলখুশ দুজন কে দেখতে পেয়ে।

ওয়েব ক্যাম ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রোদেলা ওর রুম দেখায়। পেছনে সাদা দেয়াল জুড়ে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের কাশবনের ছবি। ওর ছোট রুমটায় একটা টুইন বেড, ছোট বড় দুটো বুক শেলফে দেশী বিদেশী নানান বই, আর একপাশে এল শেপের একটা পড়ার টেবিল। অনেক ছবি সাজানো কালো ফ্রেমে বন্দী করে। বোনেরা, বন্ধুরা এমনকি ওদের ঝুল বারান্দা আর অর্কিডের ছবিও। স্টাডি টেবিলটার একটা র‍্যাক জুড়ে বাবা-মায়ের ছবি, বাংলাদেশের ফ্ল্যাগ, মিনিয়েচার দোতরা, আর কাঁচের চিমনিওয়ালা একটা হারিকেন। আছে ওর প্রিয় অবসেশন আর হোয়াইট ডায়মন্ডের শিশি, মাটির পুতুল এমনকি গীতাঞ্জলীও! বেড সাইড টেবিলে ছোট একটা ক্রিস্টালের জারে ওদের রঘুনাথপুরের এক মুঠো মাটি আছে লাল মখমলে জড়িয়ে। বিছানায় এপ্লিকের চাদরে সাদা একটা পোলার বেয়ার বসে আছে হাসি হাসি মুখে। বালিশের নীচে মায়ের শাড়ীতে বানানো কাঁথা, হলদে পাড় আর সাদা জমিনে।

এদিকে নোভাইতে আমি একাই থাকি, কর্পোরেটে কাজ করি। ন’টা পাঁচটা অফিসের বাইরে বিকেলে ডেকে বসে জিন আর লাইম হাতে ঐ থোড়বড়িখাড়া আর খাড়াবড়িথোড়। বছর দুয়েক আগে বউ রূপসা চলে গেছে আমার এক বছরের মেয়ে প্রিয়ন্তিকে নিয়ে। নোভাই শহরে শ খানেক বাঙালী ফ্যামিলি থাকলেও এই দেশে আমার আপনজন বলতে কেউই নেই। বেইসমেন্টের সেলারে নানান রকমের সব পানীয় আছে সাজানো যদিও কিচেনে রেফ্রিজারেটর শূন্য থাকে হামেশাই। নিজের যাবতীয় দীনতা লুকিয়ে আমি বলি,

: কি খেলে আজ সকালে পরীটুশ মেয়ে?

: ডিম আর ঘিয়ে ভাজা টরটিয়া, সবশেষে দার্জিলিং চা।

ছুটির দিনে আমি দেশী খানা খাইগো, মিস্টার নোভাই, মিশিগান।

তুমি কি একই বোরিং সসেজ আর সাদা ব্রেড খেয়ে এলে মোড়ের দোকান থেকে?

আর বাড়ী ফিরে চায়ের বদলে গরম ব্রান্ডি??

: আগামী সপ্তাহে বেঙ্গালরে যাচ্ছি, রোদেলা। নীতু আপার জন্য মাইশোর সিল্ক কিনতেই হবে ফেরার আগে, ভাইয়ার জন্য জারদউসি পাঞ্জাবী আর আচকান

: বিকেলে গ্রেসের সাথে মুভি ডেট আছে আমার। ফেরার পথে বাবা গানুজে শিশ কাবাব খাবো পিটা ব্রেডের সাথে। জানো, রুমাইয়া বলছে রবার্ট কে ও এত্তো ভালবাসে যে ওকে না পেলে বেঁচে থাকার কোন মানেই হয়না! লুসিল তার বয়ফ্রেন্ড কে ফেলে কোলনে চলে গেছে গত সপ্তাহের মাঝামাঝি। দানিয়েলের সোনালী চুল আর সবুজ চোখের দাবী না থাকলে কে বলবে ও রাশান, বলো? আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না মিস্টার পাগানী কচের আপন ভাই? কিম কে তো আমার বরাবরই দেবযানী মনে হয়, বলেছি তোমাকে আগেই। এন্ড্রু বলেছে জেনিফার কে এই সেমেস্টারেই প্রপোজ করবে ক্লাস শেষে! তুমি তো ভাল কিছু খাবে না এই জীবনে, ফয়সাল… কী আছে বলো ঐ কনিয়াক অথবা স্কচে?

ফ্রেঞ্চ মেনিকিউরড হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কত কথাই না বলে যায় রোদেলা। একাই হাসে, একাই ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমান করে আমার সাথে। কত যে গল্প আছে রোদেলার ঝুড়িতে! ওর গল্প শুনে বহুদিন পর মারগারিটা ছাড়াই নেশা লাগে আমার চোখে!!

২,৩৬৮ বার দেখা হয়েছে

৩০ টি মন্তব্য : “ডিজিটাল সুখ দুঃখ”

  1. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    এই না হলে, গল্প?
    এক মুহুর্তের জন্যেও চোখ ফেরাতে দেয় নাই কোন দিকে।
    আর শেষটা পড়ে মনে হলো, "সেকি? শেষ নাকি?"
    দারুন ! দারুন !!


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  2. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    সম্ভবত যায় না কিন্তু লেখাটা পড়েই এই গানটির কথা মাথায় আসলো। 😕


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  3. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    ডিজিট্যাল সবকিছুই (ইমোশন, রিলেশনশীপ, কমিউনিকেশন ইত্যাদি) আমার কাছে খুব শ্যালো লাগে... 🙁

    যাই হোক, সাবিনাপা, তোমার উপস্থাপনা, বিশেষ করে প্রথম পুরুষে ছেলে চরিত্রের ব্যবহার- অসাধারণ!! :clap: :thumbup:
    সশস্ত্র সালাম... :gulli: :salute:


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  4. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    এত সুন্দর লিখতে তুমি! অথচ কত দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি থেকে উধাও হয়ে আছো!
    এত কম কথায় মনে হয় এর চেয়ে ভাল করে গল্পটা লেখা যেত না। গল্প ছাড়াও, শিরোনাম আর সমাপ্তিটুকু আলাদা করে ভাল লেগেছে। আরো কিছু ভাল লাগা চিত্রকল্পঃ
    পেছনে সাদা দেয়াল জুড়ে ব্রহ্মপুত্র পাড়ের কাশবনের ছবি - ছবিটা যেন দেখতে পেলাম, চেনা ছবি।
    বালিশের নীচে মায়ের শাড়ীতে বানানো কাঁথা, হলদে পাড় আর সাদা জমিনে - কোন কাঁথা গায়ে দেয়ার সময় আমার কাঁথা সেলাইকারীর কথা ভাবনায় আসে। এ নিয়ে আমার বাংলায় এবং ইংরেজীতে দুটো কবিতাও আছেঃ
    বাংলায়ঃ- এখানেই প্রকাশিত হয়েছিলো, নাম- স্বপ্নমাখা নক্সীকাঁথা, লিঙ্কঃ //cadetcollegeblog.com/khairulahsan/49496
    ইংরেজীতেঃ- An Embroidered Quilt And The Woven Dreams লিঙ্কঃ //www.poemhunter.com/poem/an-embroidered-quilt-and-the-woven-dreams/

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।