অধ্যায় : তুমি

তোমার নিঃশ্বাসে আমার নির্ভেজাল অধিকার,
তোমার আলিঙ্গনে আমার মুক্তির স্বাদ –
প্রজাপতির পাখার স্মৃতি।

তোমার পদশব্দে  সাত-সমুদ্র-তের-নদির ওপারের হাতছানি,
তোমার কণ্ঠ যেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘প্রেমের কবিতা সমগ্র’।
তোমার কপালের ভাজে আমাদের আগামির চিহ্ন –
ভ্রু-যুগলের প্রশ্রয়ে আমার যত ছেলেমানুষি,
গ্রীবার কাঠিন্যে নির্ভারতার নির্ভরতা –
আমার অস্তিত্বের সমর্পণ।

তোমার দৃষ্টিতে আমার আনন্দ-মৃত্যু –
তোমার ঠোঁটে আবার ফিনিক্সের মত বেঁচে ওঠা,
তোমার স্পর্শে জন্মান্তরের শপথ, হৃদস্পন্দনে শুনি
পৃথিবীর দেখা প্রথম স্বপ্নটির গল্প –
তোমার হাত ধরে যে স্বপ্ন আকাশ ছোঁয় –

ধ্রুবতারা হয়ে সাক্ষী দেয় আমাদের প্রণয় উপাখ্যানের।
তা দেখে হিংসে হয় সূর্যের,
গাল ফুলিয়ে একরাশ মেঘ পাঠিয়ে দেয় আমাদের জানালায় –
আমাদের ছুঁয়ে ওরা তখন পূর্ণ –
ঝরে পরে বৃষ্টি হয়ে –
প্রকৃতির সব রঙে তাই তোমার-আমার গন্ধ।
সূর্যের তখন সে কী রাগ!
হাজার সূর্যাস্তের বার্তা পাঠায় হুমকি দিয়ে।
বেচারা –
আমার উঠোনে দেখে ভোরের পাখিদের মিছিল –
আমার কোলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত আলোর মাখামাখি –
অগত্যা, সেইদিন থেকে, তোমাতে-আমাতেই সূর্যদেবতার
সূর্যস্নানের ইতিহাস।

৯৭৪ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “অধ্যায় : তুমি”

  1. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    ফেসবুকে তিশার এই লিখাটি এলে
    কি কি যেন বলেছিলাম। তিশা তা জানে
    তাই আর নতুন করে লিখলাম না এখানে
    কথা দিয়েছিলাম পড়ে দেবো সিসিবিতে দিলে

    সিসিবিতে দিয়েছ যখন
    পড়তে তো হবেই তখন


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
    • তানজিনা (১৯৯৮-২০০৪)

      বাহ ভাইয়া! নতুন মাত্রা পেলো আমার চেষ্টাটুকু... :shy:

      অজস্র ধন্যবাদ!!

      (আপনাকে পড়তে দেখে আমারও একটু আধটু লোভ জাগছে কবিতা পাঠের... 😛 )


      For most of history, Anonymous was a woman. [Woolf, Virginia]

      জবাব দিন
      • পারভেজ (৭৮-৮৪)

        আরে এত ভাবাভাবির কি আছে?
        জাস্ট স্টার্ট। শুরু করে দাও...
        আমিও কি কোন প্রোফেশনাল নাকি?
        মনের আনন্দে কবিতা পড়ি।
        পঞ্চাশে পৌছেও যদি মনের আনন্দে কবিতা পড়তে সংকোচ না থাকে, তোমারা তা করবা ক্যান?
        তাছাড়া তুমি তো বিশাল প্ল্যাটফর্মের স্বীকৃত পারফর্মার।
        গো গো গো.........
        বিকজ, আই এম ওয়েটিং ফিঙ্গারস ক্রসড!!!!!!


        Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

        জবাব দিন
  2. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    তোমার দৃষ্টিতে আমার আনন্দ-মৃত্যু –
    তোমার ঠোঁটে আবার ফিনিক্সের মত বেঁচে ওঠা,
    তোমার স্পর্শে জন্মান্তরের শপথ, হৃদস্পন্দনে শুনি
    পৃথিবীর দেখা প্রথম স্বপ্নটির গল্প –

    আমার উঠোনে দেখে ভোরের পাখিদের মিছিল –
    তোমাতে-আমাতেই সূর্যদেবতার
    সূর্যস্নানের ইতিহাস।

    বাঁধভাঙ্গা আবেগের অনবদ্য প্রকাশ । নিটোল ।
    ভালো লাগলো ।

    জবাব দিন
  3. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    তিশা,
    বহুদিন পর ফিরে আসার জন্যে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন!
    তোমার লেখার একটি বৈশিষ্ট্য নজরে এলো -- সেটি হচ্ছে গতিময়তা। গড়িয়ে চলার একটা ব্যাপার আছে।
    এ লেখার প্রথম অংশটুকু টিপিকাল প্রেমের কবিতাই। কিন্তু তার মধ্যেও কিছু কথা অনন্য, যেমন --

    তোমার কপালের ভাজে আমাদের আগামির চিহ্ন

    এছাড়াও কিছু আপাত বৈপরীত্য আছে -- যেটা আসলে রহস্যময়তা সৃষ্টি করছে। যেমন -- 'প্রজাপতি পাখার স্মৃতি'। স্মৃতি কেন -- সে প্রশ্নে যাবার দরকার নেই। কিন্তু এ শব্দের উল্লেখমাত্র নস্টালজিক আবহ তৈরি হয়, যেনবা চলে যাওয়া দিনের কথা হচ্ছে।

    গতিময়তার কথা যেটি বললাম এ লেখায় তা দেখতে পাচ্ছি শেষার্ধের দিকে। এবং সূর্যের সঙ্গে ঈর্ষাকে মিলিয়ে সূর্যস্নান দিয়ে শেষ করাটা ভালো লেগেছে খুব।
    কিন্তু সেইসাথে কিছু কথা সেকেলে মনে হোল, যেমন -- 'তোমাতে আমাতে'; 'বিশ্বব্রহ্মাণ্ড"।
    আবার 'নির্ভারতার নির্ভরতা' ততটা ক্যারিশমা দিতে পারছেনা যেন।

    কিন্তু শেষে এসে

    সূর্যদেবতার
    সূর্যস্নানের ইতিহাস।

    --- অভিনব। এ কথায় এসে সম্ভাবনাটুকু অনুভব করা যায় --- কল্পনার জোরটাকেও।
    শেষকথা -- তোমার যে ক'টা লেখা পড়লাম সবগুলো মোটামুটি কাছাকাছি ধাঁচের মনে হল -- ভাবনা এবং ভাষা দুয়েতেই। এবারে তাকে ছাড়িয়ে (অথবা ভুলে গিয়ে ) পাঠককে নতুন কিছু বলে/দেখিয়ে চমকে দাও দেখি! (সম্পাদিত)

    জবাব দিন
  4. মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

    প্রথমত বলে নেই তোমার লেখা খুব ভাল লেগেছে। তোমার ভেতরে বাগদেবী কাব্যের বীজ বুনে দিয়ে গেছেন। সময়ে-অসময়ে তোমার হৃদয় ও বোধের মজ্জা ফুঁড়ে সেটির অঙ্কুরোদগম হবে একথা নিশ্চিত করে বলে দেয়া যায়।

    তোমার লেখায় ইন্দ্রিয়ানুভুতির প্রাবল্য ও অবাধ প্রবাহ অনুভব করলাম। সাদা চোখে যদি দেখি, তবে লেখাটিকে তিনটি অংশে ভাগ করে ফেলতে পারি। লেখার শরীরকে নয়, অন্তর্নিহিত ভাবনাকে। প্রথম অংশে প্রেমের প্রভাবে প্রেমিকার ইন্দ্রিয়ানুভবের ঝিল্লী কিভাবে অনুরণিত হচ্ছে সে কথা বলা হয়েছে। নিঃশ্বাস, আলিঙ্গন, পদশব্দ, কণ্ঠ, কপালের ভাঁজ (তুমি লিখেছ ভাজ), ভ্রু-যুগলের প্রশ্রয়, স্পর্শ, গ্রীবার কাঠিন্য, দৃষ্টি, ঠোঁট, হাত ধরা এসবই প্রেমেরই অনুষঙ্গ। তুমি খুব যত্ন করে হৃদয়ের জারক রসে চুবিয়ে এই অনুষঙ্গগুলোকে উপস্থাপন করেছ। সেইসাথে সেগুলোর প্রভাবে প্রেমিকার ভেতরের রূপান্তরগুলো। গতানুগতিকতার সীমানা ছাপিয়ে কতটুকু অভুতভাবিত হয়েছে তা বলবো না, তবে সুখপাচ্য হয়েছে।

    তুমি বলেছ, 'তোমার আলিঙ্গনে আমার মুক্তির স্বাদ' তারপর '–' চিহ্ন দিয়ে বলেছ 'প্রজাপতির পাখার স্মৃতি'। ধারণা করছি, 'আলিঙ্গনে মুক্তির স্বাদ' এই অভিব্যক্তিকে প্রলম্বিত করার প্রয়াসে এক্সটেনশন চিহ্নটি ব্যবহার করে 'প্রজাপতির পাখার স্মৃতি'-র প্রতি দিকনির্দেশ করেছ। স্বভাবতঃই পাঠক 'প্রজাপতির পাখার স্মৃতি' এই শব্দপুঞ্জের ভেতরে 'মুক্তির স্বাদের' একটা গ্রহনযোগ্য সাযুজ্য কিম্বা বিরোধাভাস খুঁজে পেতে চাইবে। দেখ, ঘটেছেও তেমনটি। নূপুরের মন্তব্যে তা সশরীরে সপ্রমাণ।

    দ্বিতীয় অংশটুকু এককথায় অসাধারণ। প্রকৃতই কাব্যগন্ধী হয়ে উঠেছ এখানে। এমনটাই চাচ্ছি। তাই আবারো পড়তে মন চাইছে,

    তোমার হাত ধরে যে স্বপ্ন আকাশ ছোঁয় –

    ধ্রুবতারা হয়ে সাক্ষী দেয় আমাদের প্রণয় উপাখ্যানের।
    তা দেখে হিংসে হয় সূর্যের,
    গাল ফুলিয়ে একরাশ মেঘ পাঠিয়ে দেয় আমাদের জানালায় –
    আমাদের ছুঁয়ে ওরা তখন পূর্ণ –
    ঝরে পরে বৃষ্টি হয়ে –
    প্রকৃতির সব রঙে তাই তোমার-আমার গন্ধ।
    সূর্যের তখন সে কী রাগ!
    হাজার সূর্যাস্তের বার্তা পাঠায় হুমকি দিয়ে।
    বেচারা –
    আমার উঠোনে দেখে ভোরের পাখিদের মিছিল –
    আমার কোলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত আলোর মাখামাখি –

    প্রথম চরণটি পুর্বের অনুচ্ছেদের অন্তর্গত হয়ে গেলেও ক্ষতি নেই, চরণটির শেষে জুড়ে দেয়া '-' চিহ্ন পরবর্তী অনুচ্ছেদের সাথে সংযোগ রক্ষা করছে।

    এবার শেষ অংশে আসি,

    অগত্যা, সেইদিন থেকে, তোমাতে-আমাতেই সূর্যদেবতার
    সূর্যস্নানের ইতিহাস

    'ইতিহাস' কেন?
    এমন করে লিখলে কেমন হয়?

    অগত্যা, সেইদিন থেকে, সূর্যদেবতার সূর্যস্নান
    তোমাতে-আমাতে।

    আর হ্যাঁ, নূপুরের মত আমার কিন্তু আপত্তি নেই, 'তোমাতে-আমাতে'-তে। খোলস পাল্টে সাপ যেমন নোতুন হয়, তেমনি কবিত্বের শক্তিতে বিস্ময়কর বিভা ফোটানো সম্ভব পুরাতন শব্দের শরীরেও। সুধীন্দ্রনাথ পড়লে আমরা তা মর্মে-মর্মে উপলব্ধি করি।

    'নির্ভারতার নির্ভরতা' নাকি 'নির্ভার নির্ভরতা'?

    তোমার ভেতরে যে সম্ভাবনার অঙ্কুর অনুভব করি, সেই অঙ্কুর যাতে সাবলীল বিকাশের সুতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে সম্পন্ন বিটপিতে রূপ নিতে পারে, সেজন্যই এতকিছু বলা। আশাকরি সেভাবেই নেবে তুমি।


    দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

    জবাব দিন
    • তানজিনা (১৯৯৮-২০০৪)

      অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ, ভাইয়া! এত চমৎকার গঠনমূলক মন্তব্য, বিশ্লেষণ - সত্যিই ভীষণ সম্মানিত বোধ করছি আমি! প্রত্যেকটা পয়েন্ট মাথায় রেখেই পরবর্তী লেখা টা লিখবো ইনশাআল্লাহ। এবং, অবশ্যই আপনার মন্ত্যব্যের জন্য অপেক্ষা করে থাকবো এর পর থেকে... 🙂


      For most of history, Anonymous was a woman. [Woolf, Virginia]

      জবাব দিন
  5. সাইদুল (৭৬-৮২)

    ধ্রুবতারা হয়ে সাক্ষী দেয় আমাদের প্রণয় উপাখ্যানের।
    তা দেখে হিংসে হয় সূর্যের,
    গাল ফুলিয়ে একরাশ মেঘ পাঠিয়ে দেয় আমাদের জানালায়

    এই ক'টি লাইন অনেক বার পড়লেও নতুন মনে হয়।


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
  6. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    তোমার এ কবিতাটা আগেই একবার পড়েছিলাম। আজও আবার পড়লাম। আগেও খুব ভালো লেগেছিলো, আজও লাগলো। নুপূর আর মোস্তফার সুচিন্তিত মন্তব্য আগে পড়া হয়নি, এখন পড়লাম। খুব ভালো লাগলো। নুপূর আগের চেয়ে এখন এ আসরে অনেকটা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, আর মোস্তফা তো কি কারণে যেন একেবারে অনুপস্থিত। ব্লগারদের লেখায় মোস্তফার প্রাজ্ঞ মন্তব্যগুলো খুব মিস করি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।