মাই এ্যাডজুটেন্টস

এ্যাডজুটেন্ট শব্দটি প্রথম শুনি বড় ভাই এবং আব্বা কথা বলার সময় ৮৭ কিংবা ৮৮ সালের দিকে। সেই এ্যাডজুটেন্টের নাম ছিল মেজর কীর্তন রঞ্জন চাকমা। তিনি রংপুর ক্যাডেট কলেজের এ্যাডজুটেন্ট ছিলেন। আমার ভাই তাকে খুব পছন্দ করতেন। তিনিও আমার ভাইকে খুব স্নেহ করতেন। আমার আব্বাও কীর্তন রঞ্জন চাকমাকে মানুষ হিসাবে পছন্দ করতেন, সেটি অকোপটে বলতেন। বলতেন, চাকমারা মানুষ ভাল। আমার এ্যাডজুটেন্ট শব্দটি শুনতেই কেমন একটু শিহরণ জাগতো। তারপর একদিন আমিও ক্যাডেট হবার গল্প বানালাম জীবনে। ছয় বছরে চারজন এ্যাডজুটেন্টের মগজ ধোলাই খেলাম। লাভ যদিও খুব বেশি হয়েছে কিনা জানিনা। কিন্তু তারপরও আমার কৈশোরে তাদের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা ছিল বড় হবার প্রক্রিয়ার সাথে। মাই এ্যাডজুটেন্টস আসলে সেই চারজন এ্যাডজুটেন্টের গল্প – আমি কেমন দেখেছিলাম এ্যাডজুটেন্ট চরিত্রটিকে। কেমন ভেবেছিলাম তাদের এ্যাডজুটেন্ট ছাপিয়ে মানুষ হিসেবে। তবে তাদের নাম সন-তারিখ এসব পাল্টে দেয়া হয়েছে।

মেজর ম্যাকডারমেট
মেজর ম্যাকেঞ্জি ম্যাকডারমেট, বিএ নম্বর – ০০৭, ফোর্থ বিএমএ লং কোর্স, কোর – আর্টিলারি। ম্যাক, মানে আমার প্রথম এ্যাডজুটেন্ট মেজর ম্যাকডারমেটকে মানুষ মনে রাখবে নিশ্চিত তার কলোনিয়াল এটিচুউডের কারণে। ম্যাক আমাদের মাঝে তার সম্বন্ধে কলোনিয়াল মাস্টারদের মতো একটি ইমেজ বানিয়ে রেখেছিলেন। ম্যাক সাধারনত আমাদেরকে কখনো সহজে তার দুটো চোখ দেখতে দিতো না। অনেকদিন সন্ধাতেও তাকে সানগ্লাস পরে থাকতে দেখতাম। ম্যাক খুবই সাংঘাতিক ধরণের এবং রহস্যময় একজন মানুষ ছিল। কেমন যেন একটা নিরাবেগ ইমেজ তৈরি করেছিল। নিজেকে ক্যাডেটদের থেকে দূরে দূরে রাখতেন। সবকিছু আবার দূর থেকে ঠিকই দেখতো। ম্যাককে দূর থেকে দেখা মাত্রই কলেজ অর্থাৎ ক্যাডেট কমিউনিটি, স্টাফরা, এমনকি শিক্ষকরা পর্যন্ত সোজা হয়ে যেতো। ম্যাক কথা বলতো খুব কম। তার ব্যক্তিত্ব ছিল সাংঘাতিক। সিএইচএমের নাম ছিল হাজারি। দরাজ গলায় একবার শুধু ডাকতো – হাজারি, কাম হিয়ার। তারপর যা বলার অনতিউচ্চ স্বরে হাজারিকেই বলতেন। তারপর দুই-চারটা টুয়েলভ আর ইলেভেন টপাটপ ধরাশায়ী হতো। ম্যাক ক্লাস নাইনের নিচে ধরে সাধারনত হাত গন্ধ করতেন না। দূর থেকেই ক্লাস টুয়েলভের অবস্থা কাহিল করে দিতে ওস্তাদলোক ছিলেন। শিক্ষক এবং স্টাফদের মধ্যে দৃশ্যত ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ম্যাক। আমার ধারণা ম্যাক ট্যাকটিকস এবং ইন্টেলিজেন্স কোর্স খুব ভাল রপ্ত করেছিলেন এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতেন সাফল্যের সাথে।

হাউজ ইনেসপেকশনে আসতে দেখা যেতো না ম্যাককে। স্পেশাল ডিনারেও অনেক সময় থাকতো না। কখনো আসলে খেতো না তেমন। প্রায়ই দেখতাম সিভিল ড্রেসে অফিস করতো। বেশিরভাগ দিনই অনেক ঘুরানো পথ দিয়ে কোয়ার্টার থেকে অফিসে যেতো। আমাদের হাউসের সামনের পথটা লাঞ্চ টাইম ছাড়া এড়িয়ে চলতো। মসজিদে আসতো না। ম্যাক স্বাস্থবান ক্যাডেট মোটেও সহ্য করতে পারতো না। লাগাতার কম্বল প্যারেড চলতো মোটু ক্যাডেটদের। মোটুদের কোন পিটি, প্যারেড, গেমস ছিল না। কম্বল প্যারেড আর শুধু কম্বল প্যারেড। তার হাজারো খোয়ায়েশহে এইসির বাকিটা পূরণ করে দিতো মেডিক্যাল অফিসারেরা। মোটুদের সাপ্তাহিক ওজন মাপা এবং কম্বল প্যারেডের তদারকি তাদের আনুষ্ঠানিক কাজের তালিকায় যুক্ত হয়েছিল। ম্যাক মেডিক্যাল অফিসারদের নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে রাখতেন। কারণ তিনি হয়তো হাবিজাবি কাজ তেমন পছন্দ করতেন না। কালেভদ্রে কোন কোন দিন ম্যাক পিটির সময় আসতো এবং সেদিন গোটা বিশেক পোলাপান পিটির বাঁশি বাঁজলে ড্রেনের ভিতর থেকে বের হতো। তবে সান্তনার কথা এটুকুই, ড্রেনটা পরিষ্কার ছিল। কারণ ড্রেনটা ছিল মূলত ফুটবল ফিল্ডে পানি যেন না জমে সেজন্য। ম্যাককে মূলতঃ একটি কারণে আমি শ্রদ্ধা করি।আমাদের কলেজ মসজিদে জামাত অনুগত একজন ইমাম ছিলেন। ম্যাক স্বপ্রণোদিত হয়ে তাকে চাকরি থেকে ফায়ার করার ব্যবস্থা করেছিলেন। অভিযোগ এনেছিলেন ক্যাডেটদের আরবি শিক্ষার নামে ধর্মীয় রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করা। দৃশ্যত তাকে একটি পুলিশ কেস সামাল দিতে হয়েছিল এজন্য। শেষ খবর জানতাম ম্যাক আর্মির একজন মেজর জেনারেল।

মেজর স্যান্ডি
ম্যাকের পর স্যা্ন্ডি ছিল যেন শরতের সন্ধেতে খানিকটা মোলায়েম ঝিরঝিরে বাতাস। আমরা অনেক জল্পনাকল্পনা করেছিলাম যে পরের নতুন এ্র্যাডজুটেন্ট কেমন হতে পারে। স্যান্ডিগেইল গিভেনারের মতো এতো ভালাভোলা মানুষ আমরা মোটেই আশা করিনি। লাজুক প্রকৃতির পারফেক্ট জেন্টেলম্যান। স্যান্ডি এমনিতে বেশ স্মার্ট ছিল। স্যান্ডিকে বলা হতো ফ্রেন্ড অব ক্লাস টুয়েলভ। এসময়ে এক্সট্রা ড্রিলগুলো মহা ঢিলেঢালা হয়ে গেল। নামেই তখন ইডি হয়, স্টাফরাও নামকাওয়াস্তে পানিশমেন্ট দিয়ে ছেড়ে দিতো। ইডির সময় স্টাফরা ক্যাডেটদের সাথে গল্প করে কাটাতো। স্টাফরা একটু হতাশ হয়েছিল – এ আবার কেমন এ্যাডজুটেন্ট! কোথায় এ্যাডজুটেন্ট দেখে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে পানি খাবে। আর এরা এ্যাডজুটেন্টকে ডাকে “স্যান্ডি ভাই”।স্যান্ডি ব্যাপক ফুটবল খেলতো এক নম্বর ফিল্ডে। স্যান্ডির সময়টা ছিল আসলে সিভিলিয়ান রেজিইম। শিক্ষকরা স্যা্ন্ডির উপরে খুবই নাখোশ ছিল। কলেজে ডিসিপ্লিনের অবনতি, সেদিকে স্যান্ডির কোন খেয়াল নাই। স্যান্ডি বরং সবার সাথে “নাইস-নাইস” সম্পর্ক রেখে চলে। ব্যাপারটা সবাই পছন্দ করতো না। স্যান্ডি তখন বেশ দুঃখী একজন মানুষ ছিল। তার প্রেমিকার সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাবার কারণে সে একাকীত্বের ক্রাইসিসে ছিল। তার কোর্সমেটদের তখন সন্তানসন্ততি হচ্ছে মুড়িমুড়কির মতো। সে তখনো একা। তারপর পারিবারিকভাবে স্যান্ডি একদিন বিয়ে করে ফেললো। এবং তার কিছুদিন পর কলেজ থেকে ট্রান্সফার হয়ে নিয়মিত একটি ইউনিটে ফেরত চলে গেল। আমাদের কপালে সু্খ সইলো না বেশিদিন। স্যান্ডি আসলে খুব অল্পদিন ছিল এ্যাডজুটেন্ট হিসাবে। শান্ত স্যান্ডি এমনিতে বেশ উইটি ছিল। স্যান্ডির পরিচিতরা সমসময় বলতো, বেসামরিক কোন চাকরি করলে স্যান্ডিকে বেশি মানাতো।

মেজর জাস্টিন
জাস্টিন ব্রায়ান ছিলেন বীর প্রতীক। আদিবাসী মারা ‘বীরপ্রতীক’ আর কি। জানি, পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিস্থিতিটা তখন অন্যরকম ছিল। কিন্তু নিজের দেশের মানুষ মেরে বাহাদুরীর খেতাব আমি কোনদিন সমর্থন করতে পারি নাই। কোনদিন পারবোও না। জাস্টিনের এটা নিয়ে চাপা অহংবোধ ছিল । নানাকায়দায় এই গল্প আমাদের শোনাতেন। আর বলতেন – আই এ্যাম এ্যা কিলার! জাস্টিন আমাদের মিলিটারি সাইন্স ক্লাস নেয়া শুরু করেছিল।সেখানে এইরিয়াল ফটোগ্রাফি, রেকি করা, স্পাইংয়ের উপর লেকচার দিতেন। আমার জাস্টিনকে কেন যেন খুব সিনিক্যাল মনে হতো। তাকে কেউ তেমন পছন্দ করতো না। জাস্টিন সব ক্লাসে কিছু কিছু স্পাই পয়দা করা শুরু করেছিল। শিক্ষকরা তার বন্ধু এবং ক্যাডেটরা তার শত্রু।

কলেজ মোটামুটি একটা জাস্টিন’স প্লেসে পরিণত হলো। আমি অবশ্য জাস্টিনের সময়টা মোটামুটি নিঃঝঞ্জাট কাটিয়েছি। একটি মাত্র ঘটনা ছাড়া। কলেজ মসজিদে একটা মাগরিবের নামাজের সময় কখনো কখনো একটি সংক্রামিত কৃত্তিম কাশির ওয়েভ তৈরি হতো। সেরকম একদিন জাস্টিন ছিল মসজিদে। র্যা নডম সব মুমীন-ইমানদার ক্যাডেট ধরা হলো প্রথম তিন কাতার থেকে। র্দূভাগ্যজনকভাবে আমি ধরা পড়ে গেলাম সেই দলে। অবশ্য আমি আসলেও কাশি দিয়েছিলাম। এমন মজার ইভেন্টে অংশ না নেবার কোন কারণ ছিল না। পরপর কয়েকদিন “শেল প্যারেড” দেয়া হলো আমাদের। ক্লাস টাইমে একুশ কেজি ওজনের বন্ধুকের কার্টুজের আকারের দেখতে সিমেন্টের বড় বড় একটা বা দুইটা শেল কাঁধে করে দাড়িয়ে থাকতে হতো। শেলটা ছিল বোধহয় কলেজে জাস্টিনের আমদানি। আমাদানি যদি নাও হয়, শেলের প্রসার এবং জনপ্রিয়তা জাস্টিন রেজিইমেই হয়। ক’দিন একাডেমি টাইমে এমন থাকার পর জাস্টিন একদিন আলাদা করে ডেকে পাঠালো আমাকে তার অফিসে।

তারপর খুব মিস্টি করে বললো, প্লিজ হ্যাভ এ্যা সিট, জেন্টেলম্যান। বলো, কেমন আছো?
বললাম, আই এ্যাম সরি, স্যার।
জাস্টিন: অলরাইট। টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড দ্যাট ডে ইন দ্য মক্স?
আমি আমতা আমতা করে আমার মতো বললাম।
জাস্টিন: টেল মি, হু ওয়াজ দ্য রিংলিডার? ইউ উইল হেল্প ইচ-আদার।
বললাম: জানিনা স্যার। তবে সবাই শুরু করার পর আমিও কাশি দিয়েছিলাম।
জাস্টিন: ইউ আর নট কোয়াপাটেং মি! আমাকে নামগুলো বলো।কেউ জানবে না।
বললাম: সরি স্যার, সত্যি জানিনা।
জাস্টিন: ইফ ইউ টেল মি দ্য নেমস, ইউ ইউল বি এক্সকিউজড ফ্রম পানিশমেন্ট। আই ইউল কিপ ইউ ইন মাই গুড বুক। কেউ কিছু জানবে না, বলে ফেলো। দিজ ইউল বি বিটুইন ইউ এন্ড মি। আন্ডারস্টুড?
কাকুতি মিনুতি করে বলালাম: স্যার, আমি সত্যি জানিনা।
জাস্টিনের একটি বাহারি মিলিটারি স্টিক ছিল যেটি নিযে সে শৌচাগার থেকে কাঁঠাল বাগান সবখানেই ঘুরে বেড়াতো।সেদিন জাস্টিন সেটি আদ্যোপান্তো তার হাতের ভেতর নানাভাবে নাঁচিয়ে আমাকে পরখ করতে লাগলো। তারপর বললো – উই আর ইনভাইটিং ইয়োর ফেইট! গেট লস্ট।

জাস্টিন আমাকে পড়ে ফেলেছিল অল্প কথায়, আমাকে দিয়ে তার মাকসাদ পূরন হবে না। ঘটনা, এটা আসলে তেমন কোন ঘটনাই ছিল না, মূল ব্যাপার ছিল সাইকোলোজিক্যাল ট্রিটমেন্টটা। কিন্তু আমি নিশ্চিত সেই মুহুর্তে আমি দূর্বল চিত্তের পরিচয় দিলে ঠান্ডা মেজাজের পরাকাষ্ঠার আড়ালে সাংঘাতিক জাস্টিনকে মোকাবিলা করা মোটেই সহজ হতো না। জাস্টিন এমনই ছিল। সে ক্লাসে ক্লাসে স্পাই বানাতো। সিনিয়র কয়েকজনকে নির্দয় পশুর মতো মেরেছিল। এই রেজিইমেই বাড়লো ক্যাডেটদের ডিসিপ্লিন গ্রাউন্ডে জরিমানা এবং অভিভাবকদের সন্তান বহিষ্কারের ওয়ার্নিং লেটার পাবার হুজুগ। জাস্টিন ছুটির দিনে একটা কাবলি ড্রেস পরতো এবং আফগানি টুপি পরতো। সেটা আমার মোটেই পছন্দ ছিল না। জাস্টিন রেজিইমে সাধারণভাবে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে আমি বেশ আরামে কাটিয়েছি। কিন্তু তারপরও জাস্টিন সর্ম্পকে কেন যেন ভাল কথা আসে না বেশি। হয়তো জাস্টিন আমাদের মর্যা্ল অনেক নামিয়ে দিয়েছিল তাই। এমনিতে জাস্টিন আসলে খুবই ছাপোষা মানুষ। সাধারণ মানের অফিসার।

মেজর চার্লস
মেজর চার্লস গিবনে। চার্লস গিবনে ছিল আমাদের জন্য একজন গিফটেড এ্যাডজুটেন্ট। কলেজে পা রাখার সাথে সাথে হুলুস্থুল কান্ড শুরু করে দিল। ভাবতে শুরু করলাম, যায় দিন ভাল, আসে দিন খারাপ। আমরা তাকে চার্লি বলতাম সংক্ষেপে। আমরা চার্লির ২৪ ঘন্টার বিজনেসে পরিনত হলাম। চার্লি আমাদের শেখালো এবং রিইটিরেইট করতে থাকলো সেলফ ইস্টিইম, ডিগনিটি, কারেজ, অনেস্টি, লিডারশিপ বলে কিছু ব্যাপার আছে জীবনে। চার্লি ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের। ইবির প্রতীকে যে বাঘটা ছিল। ওটাই চার্লির চরিত্র প্রতিনিধিত্ব করতো। চার্লি আসার পর আমার ক্যাডেট লাইফ ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরা শুরু হয়। আমার আরামের ক্যাডেট লাইফ চার্লি একদম হারাম বানিয়ে ছেড়ে দিলো।

চার্লি ছিল এফসিসির। সে সবসময় বলতো, ইউ নো, আই এ্যাম ইয়োর গ্রান্ড পাপা! আই এ্যাম ফ্রম এফসিসি। পিসিসি ইজ আটারলি এ্যা মাদ্রাসা! আমাদের খুব আঁতে ঘা লাগতো এসব শুনে। চার্লি এটাই চাইতো। চার্লি দেখলো যে কিছু বললে আমরা কুনো ব্যাঙের মতো আচরণ করি। আমাদের মর্যািল এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব। চার্লি আমাদের উপর দিয়ে নানা রকম স্টিম রোলার চালালো। নানারকম মিলিটারি এটিকেটস শেখানো শুরু করলো। গেমস টাইমে ধরে নিয়ে গিয়ে কমান্ড প্রাকটিস করানো শুরু করলো তার অফিসের পিছনে। এ্যাপোযেন্টমেন্ট হোল্ডারদের সাথে প্রায় ক্লাস সেভেনের মতো ট্রিট করা শুরু করলো আড়ালে। আবার জুনিয়রদের সামনে সব ঠিকঠাক। বলে দিল, আমরা তার সাথে যখন কথা বলবো তখন যেন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলি এবং জোরে জোরে। চোখে চোখ রেখে। কোন মিনমিন করা চলবে না। সবচেয়ে চেয়ে যেটা ভাল লেগেছিল রিক্রেয়েশনাল সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছিল – যেমন মুভি শো, ফ্রাইডেতে অপশোনাল গেমস।

আমি একদিন আমাদের সিএইচএম হাবলু সিংয়ের সাথে গিয়ানজাম পাকালাম। খানিকটা ইচ্ছে করেই। কারণ সিএইচএম আগের রেজিইমের মতোই আমাদেরকে ট্রিট করছিল বেশ অপমানজনকভাবে। প্রতিবাদ জানালাম। সিএইচএম আমাকে উল্টা পানিশমেন্ট দিতে চাইলো। টুয়েলভের একটা ছেলেকে গেমসটাইমে জুনিয়রদের সামনে পানিশমেন্ট দিলে যে ডিজওবে করতে পারে এটা হাবলুর মাথায় ছিল না। যেখানে মূল ইস্যুটাই আত্মসম্মান বিষয়ক। রেগে গিয়ে আমি তার কমান্ড ফলো করলাম না। ব্যাপারটা এ্র্যাডজুটেন্ট অফিস পর্যন্ত গড়ালো। চার্লি আমাকে বললো, আই লাইক ইয়োর স্পিরিট এন্ড কারেজ। কিন্তু তুমি হার্ডটাইম পেতে যাচ্ছো। দিস ইজ বিটউইন সিএইচএম এন্ড ক্যাডেট। নিয়মকানুন মেনে বিষয়টি দেখা হবে। যে দোষী হবে সে শাস্তি পাবে। তারপর আমাকে প্রায় ২০ দফা স্টেটমেন্টস লিখে দিতে জমা হলো। সিএইচএমও তার প্রয়োজনীয় মেডিসিন যথার্থ পরিমানে পেয়েছিলো সম্ভবত। কারণ আমার সাথে এক স্টাফ হাসতে হাসতে বলেছিল, তুমি তো সিএইচএমকে তেরো সিকে চেনায় ছাড়ছো। সেই স্টাফ খুশিই হয়েছিল এঘটনায়, কারন তার সাথে হাবলু সিংয়ের দ্বন্ধ ছিল। এই ঘটনায় আমাকে এক মাসের রেসট্রিকশন দেয়া হয়েছিল। আমি সবসময় খাকি ইউনিফর্মে থাকলাম সকাল থেকে লাইটস আউট পর্যন্ত। প্রথম প্রায় এক সপ্তাহ দু’ঘন্টা পরপর “সাইন এন্ড ব্যাক” করানো হলো – এক নম্বর গেটে গিয়ে একটি রেজিস্টার খাতায় সই করে সময় লিখে আসতে হতো। ছুটিতে বাসায় একটি ‘লাভ লেটার’ পাঠালো কলেজ অথোরিটির পক্ষ থেকে আমার অভিভাবক বরাবর যে আপনার পোষ্য বা পুত্রকে কলেজে খুব খিয়াল করে চলতে বলুন অন্যথায় বহিষ্কার করা হবে। মজার ব্যাপার হলো সেবার আবার রেজাল্টের সাথে ডিসিপ্লিনে ‘অনন্য সাধারণ’ বা কাছাকাছি কিছু পেয়েছিলাম। যাইহোক, ব্যাপার হলো, সিএইচএম এবং অন্য কোন স্টাফ আর কোনদিন আমি বা আমাদের সাথে এই ঘটনার পর যাচ্ছেতাই ব্যবহারের সাহস করেনি। তো চার্লস আসলে কাউকেই লাই দেয় নাই। কিন্তু দু’জনকেই ‘সোজা-ফাই’ করেছিল।

পূর্ববাংলা কমিউনিষ্ট পার্টির লোকজন পাবনাতে ততোদিনে শক্ত সাংগঠনিক অবস্থান করার চেষ্টা করছে। আমাদের কলেজের আমবাগান লিজ নেয় তাদের কিছু কর্মী-সমর্থক। তখনকার নতুন অধ্যক্ষ ঠিক করেন কলেজের আয় বাড়াতে হবে। তাই সেই বছর প্রথম আমবাগান লিজ দেওয়া হয়। যারা লিজ নিয়েছিল তাদের সাথে আমাদের মাঝে মাঝে কথা হতো। তারা বলতো যে তারা নাকি ‘সর্বহারা’। আমাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করতো যে তারা কারা এবং কি তাদের উদ্দেশ্য। কলেজে আমাদের ব্যাচের আতিয়ার ছিল মার্কসীয় রাজনীতির সমর্থক সেই বয়সে চুয়াডাঙ্গাতে তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে। আমরা তাকে “নেতা” বলে ডাকতাম। আমরা ক্ষেপাতে শুরু করলাম নেতার বন্ধুরা এসে গিয়েছে। এবার কলেজে রিভ্যুলিউশন হবে। পাবনা হবে পিকিং। তো আমরা প্রকৃতপক্ষে সর্বহারাদের কোন কথা তো শুনলামই না। বরং আমবাগান সাফা করতে লাগলাম আগের বছরগুলোর এতিহ্য রক্ষা করে। তারা আমাদের উপর একারণে ক্ষেপে ছিল। আমরা মাসে এক বা দুই বৃহস্পতিবার কলেজ পালিয়ে গ্রুপ করে করে পাবনায় বেড়াতে যেতাম ডিনারের পর। সিনেমা দেখা, যাত্রাপালা দেখা, ভাল খানাপিনা করা, উইন্ডোশপিং নানারকম কাজকর্ম থাকতো। তখন ভাবতাম এসব করলে ‘বড় হওয়া’ হলো। এটা তারা জানতো। একদিন সুযোগ মতো এমন একটি দলকে ধরিয়ে দিল। আমি সেদিন যাইনি। সে ঘটনায় আমাদের ছয় বন্ধু কলেজ থেকে বহিষ্কার হলো।

চার্লি চায়নি আমার বন্ধুরা কলেজ থেকে বহিষ্কার হোক। অধ্যক্ষ আমাদের উপর নানা কারণে নাখোশ ছিলেন। অধ্যক্ষ এবং এ্যাডজুটেন্টের সর্ম্পকের সংকট ছিল ভিতরে ভিতরে। চার্লি ছিল প্রকৃতপক্ষে অনেক বেশি প্রো-ক্যাডেট। অধ্যক্ষ এবং কিছু শিক্ষকের জন্য এটি মোক্ষম সুযোগ ছিল ক্লাস টুয়েলভকে একহাত দেখে নেবার। কারণ যারা ধরা পড়েছিল তাদের কাছে ছিল কয়েক কার্টুন সিগারেট এবং এক বোতল কাশির ওষুধ। আমাদের এক বন্ধুর ঠান্ডার অসুখ ছিল। সে ঢাকায় ভাল প্রাইভেট ডাক্তার দেখালে তাকে একটি শক্তিশালী কাশির সিরাপ দেয়া হয়। সেই প্রেসক্রিপশন কলেজের মেডিকেল অফিসারকে দেখালে সে বাতিল করে পিরিটন সিরাপ দিয়েছিল। তাই সেই বন্ধু যারা পাবনায় গিয়েছিল তাদের কাছে সেই সিরাপটি আনতে দেয়। তাকেও নেশা জাতীয় দ্রব্য আনানোর অভিযোগে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হয়। সেটা লঘু অপরাধে আসলে গুরুতর শাস্তি ছিল। সেই বন্ধু এখন নেভাল সিল এবং সেই অধ্যক্ষ আমরা বের হয়ে আসার পর দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন। আর, সর্বহারা কাশেম পরের বছরও কলেজের আমবাগান লিজ নেয়।

আমরা কলেজ থেকে বেরিয়ে আসার আগ দিয়ে চার্লি তার আসল চেহারা দেখাতে শুরু করলো। রাগী রাগী ভাব করে থাকা চার্লিকে দেখলাম কেমন যেন শিশুতোষ একজন মানুষ লুকিয়ে থাকে তার ভেতর। পরীক্ষা কেমন দিচ্ছি সেসব খোঁজখবর নিতেন। তার বাসায় নিজে থেকে আমাদের ফেয়ারওয়েল দিলেন এক বিকেলে। যারা বহিষ্কার হয়েছিল, তাদেরকেও আমন্ত্রণ জানালেন। এসব চল আমাদের কলেজে আগে ছিল না। হাউজ ফেয়ারওয়েল এবং কলেজ ফেয়ারওয়েল – তারপর ব্যাগ গুছিয়ে খোদাহাফেজ। চার্লির স্ত্রী মেলিসাও খুব ভাল ছিলেন। সদালাপী। দু’জন আমাদেরকে আপ্যায়ন করলেন। প্রথমবারের মতো ছয় বছরের কলেজ জীবনে এ্যাডজুটেন্টের বাসায় ঢুকলাম। আমরা অনেক ফান করার সুযোগ পেলাম। প্রথম বারের মতো দেখলাম, চার্লিরও আদেশ পালন করে চলতে হয়। আদেশ মতো আমাদেরকে খাবার তুলে দিলেন নিজে। তারপর তাদের মজার মজার গল্প বললেন। মেলিসা আমাদের কিছু এক্সক্লুসিভ চার্লির বাহাদুরীর (!) গল্প বললেন। চার্লি লজ্জায় লাল। চার্লি বের হবার আগে শুধু বললেন, বয়েজ প্লিজ ডোন্ট ডিজক্লোজ দিজ স্টোরিজ। কথা রাখলাম। নাহলে হয়তো সেসব গল্পও বলা যেতো।

চার্লির দেখাদেখি অধ্যক্ষকেও তার বাংলোতে আরেকটা ফেয়ারওয়েল পার্টি থ্রো করতে হলো সম্মান রক্ষার্থে। আমরা কলেজ থেকে বের হবার আগ মূহুর্তে চার্লি বললো, এটাই শেষবারের মতো তোমরা সবাই একত্রে। আর কোনদিন এই মূহুর্তটি ফেরত পাবে না। প্রথমে বিশ্বাস করিনি। অদ্ভুতভাবে আমরা সবাই অনেক চেষ্টা করেও একসাথে হতে পারিনি কোনদিন। এখন তো আর কোনভাবেই সম্ভব না। চার্লি এখন যদি এমন ধ্রুব সত্য আবার বলতেন, তাহলে শুধু চিৎকার করে এটুকুই বলতাম – “স্যার ইয়েস স্যার,” “স্যার ইয়েস স্যার,” “স্যার ইয়েস স্যার।” এটা ছিল এ্যাডজুটেন্ট’স অফিসে কথা বলার একটা চার্লি সিগনেচার এটিকেট। চার্লির ভেতর কেমন যেন “ডেড পোয়েটস সোসাইটি’র” জন কিটিং-এর মতো একটি ইন্সপেরেশনাল চরিত্র ছিল খুবই ভিন্ন তরিকায় যদিও।

এবং একটি আপডেটঃ শুধুমাত্র চার্লির সাথেই যোগাযোগটা আছে। সেটাই থাকার কথা ছিল। দেখা হলে চার্লির সাথে হাহাহিহি, সিগারেট ফোঁকা এসব চলে। বাসায় যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করে। চার্লি আর্মির চাকরিবাকরি নিয়ে অনেক হতাশ, সেসব অকোপটে বলেন।

ডিসক্লেইমার: এখানে যা কিছু লেখা হয়েছে তা একান্তভাবে আমার মত এবং অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। এগুলি হয়তোবা অভিজ্ঞার সীমাবদ্ধতার কারণে একটি খন্ডিত চিত্র ব্যক্তির সামগ্রিক চরিত্রের। তাই ছদ্দনামের আড়ালে বাস্তবজীবনের ব্যক্তিমানুষকে খুঁজলে নাও পাওয়া যেতে পারে। আর শুধুশুধু খুঁজেই বা কি লাভ!

৩,৮৬৩ বার দেখা হয়েছে

৫৯ টি মন্তব্য : “মাই এ্যাডজুটেন্টস”

  1. পিয়া(০৩-০৯)

    :clap: :clap: :clap: প্রথম নাকি আমি ? 🙂
    ভাল লাগলো ।নিজেদের সব এ্যাডজুটেণ্ট এর কথা মনে পরে গেল।
    সবাই ক্যাডেটবান্ধব এ্যাডজুটেণ্টদের পছন্দ করে।আমার কেন যেন তাদের পছন্দ ছিল, যারা আমি কি,আমি কেন এইটা বুঝতে হেল্প করেছে। :hatsoff:

    জবাব দিন
  2. মনজুর (৮৯-৯৫)

    নস্টালজিক কইরা দিলা .. 🙁 🙁
    এই জাস্টিন ব্রায়ানের মতো এক হারামজাদার কারণে আমরা ৫০ জন শেষ কবে একত্রে আড্ডা দিয়েছি মনে করতে কষ্ট হয়।
    লেখাটা বরাবরের মতো বরমাল্য পাবার যোগ্য।

    জবাব দিন
  3. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    দুর্দান্ত স্মৃতিচারণ।
    বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেলো এই লেখা।
    সেগুলো নিয়ে আমি পরে আড়ো ডিটেইলস বলবো। বিয়াপক ব্যস্ত আমি।
    কিন্তু ডিটেইলস বলবো অবশ্যই।

    জবাব দিন
  4. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    রাব্বী ভাই আসার আগেই ডিটেইলস মন্তব্যের সুযোগ পাওয়া গেলো।
    যে ব্যাপারটাতে ধাক্কা খেলাম সেটা হলো তৃতীয় এডজুট্যান্টের গল্প পড়তে গিয়ে। আমার জানা মতে এডজুট্যান্ট রাও এক্স ক্যাডেট। তাহলে তো তারা ভালো করেই জানে ক্লাশমেট ফিলিংস জিনিসটা কী? তাহলে তারপরেও স্পাইয়িং ঢুকানোর চেষ্টা করে আর স্পাইদের আলাদা সুবিধা দদেয়ার চেষ্য়টা করে কেন??
    এটার পিছনে ঠিক কি রকম ফেনোমেনা কাজ করে বুঝার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। এটা কি অথোরেটিভ পাওয়ার প্রকাশের ধরণ নাকি অন্য কিছু। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য স্পাইয়িং প্রমোট করা এডজুট্যান্ট নিজে স্পাইয়িং করতেন ক্যাডেট লাইফে এ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সেভেনে জুনিয়র থাকা অবস্থায় চরম ক্লাশমেট ফিলিংস দেখানো বন্ধুকে আমি দেখেছি ক্লশমেট ফিলিংস দেখানোর কারণে জুনিয়রদের উপর চড়াও হতে। এর কোন সোসিওলজিক্যাল ব্যাখ্যা কি আছে?

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      সোসিওলজিক্যাল ব্যাখ্যা আমি জানি না। এলেম নেই 🙁

      একজন এ্যাডজুটেন্ট যখন দায়িত্ব পালন করেন তখন তিনি একজন প্রশাসক। তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন ক্ষমতা ব্যবহার করে। প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার ব্যক্তির শিক্ষা+অভিজ্ঞতা+মনস্তত্ত্ব+পারিপার্শিকতা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে নিয়ন্ত্রিত হয়। অনেক প্রশাসক তার অধীনস্তদের সংগবদ্ধ অবস্থান তার কাজের জন্য হুমকি মনে করেন।

      তাছাড়া এটা একটি কলোনিয়াল এ্যামিনিস্ট্রিটিভ পলিসি - 'ডিভাইড এন্ড রুল'। এরফলে সাবজেক্ট পপুলেশন কখনো একত্রিত হতে পারে না, ইউনিটি থাকে না। ইউনিটি না থাকা মানে তারা দূর্বল, তখন প্রশাসকের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। এটা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে এসেছি। তবে একজন ভাল প্রশাসক ক্ষমতা সম্পর্কের ভারসম্য রক্ষা করে চলেন এবং সতর্ক থাকেন যাতে ক্ষমতার অপব্যবহার না হয়।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  5. সামিয়া (৯৯-০৫)

    চমৎকার লাগলো, খুবই চমৎকার! তবে ইংরিজি নাম দেখে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম অবশ্য...লেখার ডিটেইলগুলো অনেক ভাবিয়েছে, আর আপনার লেখা, বরাবর... 😀
    নিজের এডজুটেন্টদের কথা মনে পড়ল, এডজুটেন্টের পলিসি ক্যাডটদের ওপর খুবই প্রভাব ফেলে।

    জবাব দিন
  6. ফয়েজ (৮৭-৯৩)

    বিশ্লেষন ভালো হয়েছে রাব্বী।

    বাকী একটা কথা বলেও মুছে ফেললাম, 😛 ক্যাডেট-এ্যাডজুটেন্ট বইলা কথা, টম এন্ড জেরী কেস 😉


    পালটে দেবার স্বপ্ন আমার এখনও গেল না

    জবাব দিন
  7. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    যথারীতি অসাধারণ লেখা রাব্বী। ক্যাডেটদের জীবনে অ্যাডজুটেন্টদের প্রভাবটা ভীষণ থাকে। আর তাদের চরিত্র নিয়ে এরকম বিশ্লেষণ, সত্যি মুগ্ধ। সিসিবিতে এই লেখাটা একটা ভিন্ন মাত্রা যোগ করলো বলেই আমার ধারণা।

    আমিনের ডিটেইল মন্তব্যটা পড়ে মজা লাগলো। অ্যাডজুটেন্টদের চরিত্রের একটা দিক নিয়ে তার শিশুসুলভ প্রশ্নটার জবাব হতে পারে এরকম, তুমি তোমার চারপাশের মানুষগুলোকে দেখো। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আমলা অথবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রধান নির্বাহী- সব জায়গায় এরকম চরিত্রের মানুষ আছে। এসবই মানুষের চরিত্রের ভালো বা মন্দ দিক। একেকজনের চিন্তা-ভাবনা, কাজ করার ধরণ আলাদা। অনেকেই 'বিভক্ত করো, শাসন করো' পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। আর শাসক সে যতো ক্ষুদ্র গোষ্ঠিরই হোক না কেন তাদের মধ্যে এটা খুব জনপ্রিয় নীতি।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      আমার তো মনে হয় ক্যাডেটদের পরবর্তী জীবনেও এ্যাডজুটেন্টের ছায়া থাকে। এ্যডজুটেন্ট ক্যাডেট জীবনের মূখ্য চরিত্র। আপনাকে অনেকদিন পর সচল থেকে ভাল লাগলো।

      আরে! আপনি তো আমিনের ডিটেইলের চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়েছেন। এটাই সই! 'আমিনের ডিটেইল' কিন্তু সিসিবিতে অনেকটা 'রকিবের চায়ের' মতোই সিসিবি স্পেশাল। কি বলেন?

      ধন্যবাদ, লাবলু ভাই।


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  8. রাব্বী আহমেদ (২০০৫-২০১১)

    অদ্ভুত সুন্দর লেখার জন্য অজস্র ধন্যবাদ।


    নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কাঁদতে নেই
    খুব সহযে বিশ্বাসে বুক বাঁধছ কেন, বাঁধতে নেই
    বুকের কিছু গভীর কান্না চোখের মাঝে আনতে নেই
    কিছু অতীত স্মৃতির কথা জানার চেষ্টা বৃথাই, জানতে নেই...

    জবাব দিন
  9. নাফিজ (০৩-০৯)

    দারুণ লেখা ভাই।।

    নিজের আমলের অ্যাডজুটেন্টদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমাদের সময়ের কোন অ্যাডজুটেন্টকেই ছাপোষা টাইপ বলা যাবে না।প্রত্যেকেই কেমন যেন "অন্যরকম ছিলেন"।

    একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে- আমরা ক্লাস টেনে পড়ার সময় এক অ্যাডজুটেন্ট স্যারের আমাদের কলেজ থেকে বদলি হয়ে যায়। এই গত বছর একটা বাসে করে ঢাকায় ফেরার সময় হঠাৎ শুনি পেছন থেকে কে যেন ডেকে উঠলো- তুমি নাফিজ না ? তাকিয়ে দেখি সেই অ্যাডজুটেন্ট স্যার।
    চার বছর পর এক অ্যাডজুটেন্ট স্যার একটা ক্লাস টেনের নাম মনে রাখলেন কিভাবে এটাতেই আমি টাশকিত।


    আলোর দিকে তাকাও, ভোগ করো এর রূপ। চক্ষু বোজো এবং আবার দ্যাখো। প্রথমেই তুমি যা দেখেছিলে তা আর নেই,এর পর তুমি যা দেখবে, তা এখনও হয়ে ওঠেনি।

    জবাব দিন
  10. নিয়াজ (৯০-৯৬)

    রাব্বী,
    অসাধারণ লেখা। আমাদের একজন এখন নাকি MGCC র অ্যাডজুটেন্ট। খুব জানতে ইচ্ছা করে ওকে নিয়ে বর্তমান ক্যাডেটরা কি বলাবলি করে।
    তুমিতো দেশান্তরি, কোথায় আছ এখন?

    জবাব দিন
  11. রকিব (০১-০৭)

    দারুণ লিখেছেন (বরাবরই দারুণই লেখেন :grr: )
    মন্তব্যে একটা লাইন পড়লাম- আমার তো মনে হয় ক্যাডেটদের পরবর্তী জীবনেও এ্যাডজুটেন্টের ছায়া থাকে। এ্যডজুটেন্ট ক্যাডেট জীবনের মূখ্য চরিত্র।
    কথাটা বোধহয় খুব একটা ভুল না।
    সর্বসাকুল্যে মোট ৩ জন অ্যাডজুটেন্ট পেয়েছিলাম। প্রথমজন বেশ ডাকসাইটে ছিলেন; মাত্র ৬-৭ মাসের মতো পেয়েছি উনাকে, একটু পাগলাটে গোছের, কিন্তু আবার সময়ে সময়ে মাই ডিয়ার টাইপ। দারুণ ভলিবল খেলতেন।
    পরের জন তুলনামূলক নিরীহ ব্যক্তি। আর শেষের জনকে পেয়েছি শেষ ২ বছরে। উনাকে বহুদিন মনে থাকবে। ভরাট ব্যক্তিত্ব্ব ছিল বলেই মনে হয়েছে। বলতে গেলেই অনেক বলা হয়ে যাবে। ক্ষ্রান্ত দেই এবেলা।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      আমি বের হবার পরও অনেকসময় স্বপ্ন দেখেছি যে এ্যাডজুটেন্ট এসে ধরছে আমাকে সিনেমার ভিলেনের মতো 😛

      সামারে কার কথা যেন একবার শুনলাম, সেমিষ্টার যখন চলে, সে নাকি লেখালেখি করে কিবোর্ডে ঝড় তুলে ফেলে 😕 নমুনা কই? :grr:


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  12. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    আমি আসলে ক্যাডেট কলেজের কিছু না বুঝেই কলেজ পার করছি। আর আমাদের সময় বোধহয় মগকক তেমন কড়া ছিল না। তাই আবেগটা ধরতে পারলাম না।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
  13. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)

    নষ্টালজিক করে দেওয়া একটা লেখা।

    বীর প্রতীকরে নাইন+টেন এ' পাইছিলাম। খবিস......

    চারজন এডুর মধ্যে মেজর আজিজুল হাকিমকে মনে পড়ে, খুব...


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  14. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    আজ অনেক কাজ ছিল। সেই কাজ শিকেয় তুলে তোমার লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। অসাধারণ! সত্যিই অসাধারণ!!
    পুরণো অনেক স্মৃতি মনে করিয়ে দিলে। আমরাও চারজন এ্যাডজুট্যান্টকে পেয়েছিলাম। এদের মধ্যে আবার একজন বীর প্রতীক ছিলেন।

    জবাব দিন
  15. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)

    এ লেখাটা আসার পরপরই পড়ে ফেলেছিলাম, আর পড়েই ভাললাগায় বূঁদ হয়ে ছিলাম।
    ক্যাডেট কলেজ স্মৃতিচারণে অ্যাডজুটেন্ট একটি অনন্য অনুষঙ্গ; ফিরে ফিরে আসতে চায়, তবু সিসিবিতে খুব কমই অ্যাডজুটেন্ট প্রসংগ এসেছে। পিটি প্যারেড আর ডিসিপ্লিনের কঠোর অনুশাসনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ক'জনই বা ক্যাডেটদের হৃদয়ের কাছাকাছি আসতে পারেন। তবু রক্তমাংসের মানুষ তো ওঁরা। আজ নিজের দিকে তাকালে টের পাই, ক্যাডেট কলেজের আ্যডজুটেন্ট তো আসলে অত্যন্ত নবীন একজন মানুষ (যে বয়সের ছেলেদের আজকাল অবলীলায় বাচ্চাছেলে বলে ফেলি)।
    ওই বয়সে আশেপাশে সমবয়সী কেউ নেই তাঁর, থাকলেও প্রশাসনিক খোলস থেকে বেরিয়ে এসে মেশা প্রায় দুঃসাধ্য। বন্ধুবিহীন অবস্থায় তিনশ ছেলেকে একহাতে সামলানো, বয়সের দুস্তর ব্যবধান থাকলেও শিক্ষক (বা শিক্ষকসমান ব্যক্তিত্ব) দের সংগে কমিউনিকেট করা সত্যি অনেক কঠিন। সবাই এমান চাপ ঠিকভাবে যে সামলে নিতে পারেননা তা বলাই বাহুল্য।
    আর বাড়তে থাকা দুষ্ট ছেলের দল এসব নিয়ে থোড়াই ভাবার জন্যে উপযুক্ত। তবু আমার মনে হয়েছে, ক্যাডেটদের ছোটভাই যারা ভাবতে পেরেছেন তাঁরাই দক্ষতার সাথে সামলাতে পেরেছেন, তাদের মনজয় করতে পেরেছেন ও কিছু বন্ধু পেয়েছেন যারা আজীবন মনে রাখে।

    সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, ক্যাডেট কলেজের অ্যাডজুটেন্ট যেন একটি আবেগবর্জিত বাহুল্যহীন কাঠখোট্টা সত্তা। শিক্ষকরা যতটা মূল্যায়িত হন, এঁরা ততটা হননা। কেন?

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      দেরি হয়ে গেলো, নূপুরদা। আপনার মন্তব্যে বিশ্লেষণগুলো দারুণ। এ্যাডজুটেন্ট আসলেই নিঃসঙ্গ বন্ধুহীন থাকে কলেজে। তার বয়সটাও এমন কিছু না। অথচ সেই বয়সে কত কি মনে হতো। কথাটা ঠিক, তখন এ্যাডজুটেন্টকে যেন সত্যিই একটি আবেগবর্জিত কাঠখোট্টা সত্তা মনে হতো।

      এ্যাডজুটেন্টরা কম মূল্যায়িত হন হয়তো তারা ধরাছোঁয়ার বাইরের চরিত্র তাই।শিক্ষকদের সাথে যতোটা মিথষ্কিয়ার সুযোগ থাকে, সেটি এ্যাডজুটেন্টের সাথে থাকে না। আবার তাদের কাজের ধরণ এবং বিষয়গুলি অনেকসময় এমন যে সবসময় একটি দূরত্ব বজায় থাকে। এ্যাডজুটেন্টের কাছাকাছি হওয়া ক্যাডেট জীবনে খানিকটা এক সুঁতোর উপর হাঁটা!


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
  16. কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

    দুর্দান্ত লেখা!
    আমার দোস্ত সবসময়েই রক্স! :boss:

    তিনজন এডজুট্যান্ট পেয়েছিলাম আমরা, প্রথমে মেজর ইউসুফ, ফৌজিয়ান। এরপর মেজর ফিদা নূর, পাবনা এবং সিলেটের এক্স। সবশেষে মেজর রেজা, আর সি সি'র। আপন আপন স্বকীয়তায় তিনজনই ভাস্বর হয়ে থাকবেন স্মৃতিতে আজীবন আমাদের দুর্দান্ত কলেজ লাইফের অন্যতম অনুঘটক হয়ে। :salute:

    এখন এফসিসিতে এডজুট্যান্ট আমাদেরই ইমিডিয়েট সিনিয়র আমার হাউসেরই আনোয়ার ভাই। আরেকজন দুর্দান্ত চমৎকার একজন মানুষ! :salute:


    সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

    জবাব দিন
    • রাব্বী (৯২-৯৮)

      কেমন আছিস?

      ফিদা নূর ভাইকে চিনতাম। আমার ভাইয়ের রুমমেট ছিলেন একসময়। ওনার বাবা অধ্যাপক আবুল আশরাফ নূর আমাদের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাছাড়াও নূর স্যার নানা কারণে বিখ্যাত এবং স্বনামধন্য। সাইফ ভাই, লাবলু ভাইরা নূর স্যারকে চিনবেন।

      আর এ্যাডজুটেন্ট নিয়ে কি বলি? এ্যাডজুটেন্টরাও মানুষ! 😀


      আমার বন্ধুয়া বিহনে

      জবাব দিন
      • কাইয়ূম (১৯৯২-১৯৯৮)

        ফিদা নূর স্যারের বাবা আবুল আশরাফ নূর স্যারকে আমরাও চিনতাম তখন 😀

        ফৌজিয়ান ইউসুফ স্যারের একটা ঘটনা বলি।
        আমরা ২১শে মে জয়েন করার পর ওই টার্মে বা পরের টার্মে [নভিসেস ড্রিল এর আগে ] কোন এক পিটিতে উনি আমাদের ক্লাশকে নিয়ে জগিং করিয়ে কলেজের বাইরে সামনে সী বিচে নিয়ে গেলেন। পুরো পিটি টাইম ওখানে কাটিয়ে ব্যাক করার সময় কলেজে ঢুকার আগে ফলইন করা হলো। ততদিনে আমরা জেনে এবং বুঝে গেছি এডজুট্যান্টই কলেজের আসল রাজা। তো সেই লোকই যখন পুচকে সেভেনের সাথে পুরো পিটি টাইম পার করলেন আমরাতো খুব খুশি। কলেজ গেটের আগে ফলইন করে হঠাৎই জিজ্ঞেস করলেন, সিনিয়ররা পানিশমেন্ট দেয়? সু পলিশ করায়? প্র্যাক্টিক্যাল খাতা লিখতে হয়? এমন সব প্রশ্ন যেগুলো কোনদিন মুখ ফুটে কারও কাছে স্বীকার করা যাবেনা বলেই সিনিয়রদের কড়া নির্দেশ ছিলো! তো কেউ বলছেনা কিছুই। তখন উনি বললেন বলতে পারো আমাকে আমিতো এমনিতেই সব জানি তবুও কারও নামতো বলতে বলছিনা, এসব করায় কোন সিনিয়র? স্বয়ং এডজুট্যান্ট বলছেন তাই হঠাৎ করেই কারও কারও মনে হলো এই লোকই পারবেন সিনিয়রদের ভয়াল থাবা থেকে বাঁচাতে। অনেকেই এক ধাক্কায় জ্বি স্যার জ্বি স্যার বলে সব স্বীকার করে ফেললাম। উনিও শুনলেন চুপ করে। তারপর শেষে বোমাটা ফাটালেন। "এসব হবেই। দিস ইজ এফসিসি।" 😀 আমিও এফসিসি'র ক্যাডেট ছিলাম। আমাদের সময় আরও টাফ ছিলো এফসিসি। সেই মুহুর্তে বুইঝা গেসিলাম, কি জায়গায় আইসা পড়লামরে বাবা, কেউ নাই বাঁচানির মতো 😛 ইউসুফ স্যার দারুন লোক ছিলেন। এখনও আছেন। স্যারকে :salute:

        বেঁচে আছি দোস্ত। পরের বার আসলে অতি অবশ্যই টোকা দিস। আমরাওতো মানুষ 😀


        সংসারে প্রবল বৈরাগ্য!

        জবাব দিন
  17. রাববি ভাল লাগল। ম্যাকডারমেট retired as Colonel, not as Maj General. General ******* was also from 1st L/C & a coursemate of ম্যাকডারমেট।

    "আমার ধারণা ম্যাক ট্যাকটিকস এবং ইন্টেলিজেন্স কোর্স খুব ভাল রপ্ত করেছিলেন এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতেন সাফল্যের সাথে।" - he was one of the trusted DGFI officers of Gen Ershad. After fall of Ershad, he was sent to PCC to tight us :(( Shell was introduced by ম্যাকডারমেট। আমাদের এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে ম্যাকডারমেট Shell Punishment দিয়েছিল। x-(

    Well ম্যাকডারমেট was rough. But জাস্টিন ছিল min minded.

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।