দূরের পাল্লা

আথেন্স-সভ্যতা সংস্কৃতি সৌন্দর্যের কেন্দ্রভূমি আথেন্স, আজ মৃত্যুভয়ে কম্পমান। বিশাল পারস্য বাহিনী ধেয়ে আসছে, ম্যারাথনের প্রান্তরে ক্ষুদ্র গ্রীক বাহিনী তাদের মখোমুখি। কিন্তু গ্রীসের কি সাধ্য মহাশক্তিধর পারস্যের বিজয় রথের চাকা রুখবে! পরাজয় মানেই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ আর ধ্বংসের বর্বর তান্ডব। এমনি ঘোর দুঃসময়ে হঠাৎ নগরদ্বারে এ কার কন্ঠ? এ যে সৈনিক ফিডিপাইডিস-ম্যারাথন প্রান্তরের মরনপণ লড়াইয়ের বার্তা নিয়ে ছুটে এসেছে। কি নিদারুন সংবাদ নিয়ে এসেছে সে? “উল্লাস করো হে নগরবাসী- আমরা জিতেছি!” এটুকু বলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে বীর সৈনিক।

পৃথিবীর ইতিহাস অসংখ্য যুদ্ধ বিগ্রহ বীরত্ব আর নিষ্ঠুরতার কাহিনীতে ভরপুর। তবুও কিছু কিছু ঘটনা যেন দেশ কাল পাত্রের সীমা ছাড়িয়ে সমস্ত মানবেতিহাসেরই অংশ হয়ে উঠে। সৈনিক ফিডিপাইডিসের কীর্তিও আজ সারা বিশ্বের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরন করে- দূর পাল্লার দৌড় প্রতিযোগীতা ম্যারাথনের মাধ্যমে। ম্যারাথন প্রান্তর থেকে আথেন্সের দূরত্ব প্রায় পঁচিশ মাইল। সেই থেকে ম্যারাথন দৌড়ের পাল্লা কুড়ি থেকে পঁচিশ মাইলের মধ্যে রাখার রেওয়াজ হয়েছে। অনেক দেশেই এখন এই দৌড়ের আয়োজন হয়, সবচেয়ে বিখ্যাত অবশ্যই আন্তর্জাতিক অলম্পিকের ম্যারাথন, এর পরেই আসে আমেরিকার বষ্টন ম্যারাথনের নাম।

ম্যারাথন নিছক একটি দৌড় প্রতিযোগীতা নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, আবেগ ও সম্মানের প্রশ্নও। শারিরীক সামর্থ্য, একাগ্রতা, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সমন্বিত রূপ। জেতা তো অনেক বড় ব্যাপার, শুধু দৌড়ের পাল্লা পুরোটা শেষ করাও যথেষ্ঠ কৃতিত্বের বিষয়। অলিম্পিকের যে দুটো ইভেন্টের দিকে সবচেয়ে বেশি মানুষ চেয়ে থাকে তার একটি ১০০ মিটার দৌড়, অন্যটি ম্যারাথন। অলিম্পিকে ম্যারাথন জয়ীরা তাই নিজ নিজ দেশে জাতীয় বীরের সম্মান পেয়ে থাকেন।

আমাদের স্কুল জীবনে, বাংলাদেশ যখন বিশ্ব মানচিত্রে নতুন, যখন আমরা অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি সূচক শেয়ারবাজার ইত্যাদি বড় বড় বিষয়ে মোটেই মাথা ঘামাই না, কিন্তু সারা বিশ্বকে কিছু একটা করে দেখিয়ে দেবার ইচ্ছেটা প্রবল, তখন আমাদের ধ্যানজ্ঞান ছিল ক্রীড়াঙ্গন। একমাত্র চাওয়া- আহা! যদি বাংলাদেশ কোন একটা আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে আসতে পারতো- সে ফুটবল ক্রিকেট হকি কিংবা অলিম্পিকের কোন একটা মেডেল- যাই হোক না কেন! তাই দেশসুদ্ধ মানুষের মনোযোগ ছিল খেলার মাঠে। আর ছিল খেলোয়াড়দের ব্যাপারে প্রবল কৌতুহল ও নিখাদ ভালোবাসা। এঁদের মধ্যে ফুটবলার ক্রিকেটার দৌড়বিদ সাঁতারু মুষ্ঠিযোদ্ধা সবই ছিলেন।

ক্যাডেট কলেজ শুধু লেখাপড়ার জায়গা নয়। এক এক জনের মধ্যে কত কি সম্ভবনা লুকিয়ে থাকে! সেগুলো বিকাশের জন্যই এই মহার্ঘ আয়োজন। ছেলেদের শক্তপোক্ত করে গড়ে তোলার জন্য চাই খেলাধূলা আর শরীর চর্চ্চা, যার অঢেল ব্যাবস্থা ওখানে আছে। প্রায় সকালে মাইল খানেক দৌড়ানো তো সাধারন ব্যাপার। আর বিকেলের বাধ্যতামূলক খেলা। সেনা প্রশিক্ষনের মত অবস্টাকল কোর্স- দড়াদড়ি বেয়ে এগাছ ওগাছ করা, লাফিয়ে খানা খন্দ পেরুনো, উঁচু দেয়াল ডিঙ্গানো ইত্যাদি। এতোকিছুর পরও, লম্বা দৌড়ের মর্ম বোঝাবার জন্য ছিল ক্রস কান্ট্রি রেস।

ক্যাডেট কলেজের আর পাঁচটা বিষয়ের মত এটাও তিন হাউসের মধ্যে প্রতিযোগীতা। আবার প্রত্যেক হাউসের তিনটি করে বিভাগ- জুনিয়র, ইন্টারমিডিয়েট ও সিনিয়র। দৌড়ের পাল্লা যথাক্রমে সাড়ে তিন, সাড়ে পাঁচ ও সাড়ে সাত মাইল। সত্যি ম্যারাথন না, তবে ওই বয়েসের জন্য একেবারে কম কিছুও না। কলেজের চৌহদ্দির বাইরে আশে পাশে গ্রামের ভেতর দিয়ে ফসলের মাঠ পুকুর জঙ্গল পেরিয়ে দৌড়ের পথ ঠিক করা। আগের দিন সবাইকে পায়ে হাঁটিয়ে পথ চেনানো হলো। অনেকদিন পর চার দেয়ালের বাইরে গ্রামের মেঠোপথে গাছের ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে বেশ ভালো লাগে। তবে “কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা” জাতীয় কান্ড চলবে না। পথের বাঁকে বাঁকে পাহারায় শ্যেনদৃষ্টি ওস্তাদ ও শিক্ষকেরা।
আজ সেই কঠিন পরীক্ষার দিন। শারীরিক ভাবে আমি তেমন শক্ত পোক্ত নই, অত লম্বা দৌড় পুরোটা কি পারব ভালয় ভালয় শেষ করতে! তাই এই দিনটি নিয়ে মনে বেশ ভয় ধরেছিল তা অস্বীকার করব না। বলতে কি, ছুটিতে বাড়ী গিয়েও সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে পাড়া পড়শীর অবাক দৃষ্টির সামনে একাকী দৌড়ের অভ্যাস করেছি। কৃষি কলেজের বিস্তীর্ন ক্যাম্পাসে দৌড়ুতে মন্দ লাগতো না, তবে পাল্লাটা কত মাইল হতো তা জানিনা। যাহোক, আজ একটু আগেভাগেই সবাইকে হাল্কা খাবার দেয়া হয়েছে। তারপর একেক গ্রুপ জড়ো হয়েছে বাস্কেটবল কোর্টে। পরনে হাল্কা পোশাক- সাদা হাফ শার্ট, হাফ প্যান্ট ও ক্যাম্বিসের জুতো। কড়া পাহারা, মাথা গোনা, এরপর বাঁশীতে ফুঁ। সবাই ছুটলো আগের দিনের চেনানো পথ ধরে।

একটু উৎসবের আমেজ দিতে মাইকের ব্যবস্থা হয়েছে। কলেজ ভবনের ছাতে, যেখান থেকে গ্রামের ভেতরে অনেকখানি দেখা যায়, ছোট চাঁদোয়া বানিয়ে বসেছেন কয়েকজন শিক্ষক ও ক্যাডেট। ওই ক্যাডেট কজন রেহাই পেয়েছেন শারীরিক কারনে। তবে কাউকে বেকার বসিয়ে রাখা ক্যাডেট কলেজের নীতি নয়- ওরা সবাই চমৎকার বক্তা, গায়ক কিংবা আবৃত্তিকার। সুতরাং ওখানে বসে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন “এই মাত্র জুনিয়র গ্রুপ কলেজের গেট পেরিয়ে গ্রামের রাস্তায় পৌঁছেছে…হ্যাঁ আমরা আরো দেখতে পাচ্ছি ক্যাডেট ওমুক এখনো পর্যন্ত সবার সামনে এগিয়ে…তাকে খুব কাছাকাছি থেকে অনুসরন করছে ওমুক আর ওমুক…প্রতিযোগীতা বেশ জমে উঠছে…” ইত্যাদি। মাঝে মাঝে গান, আবৃত্তি। আবার রেকর্ডের গানও বাজছে। ওদিকে কলেজের ডাক্তার মহাশয় তাঁর দলবল ও এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তৈরি। বোঝা গেল কর্তৃপক্ষ সবদিক ভেবে রেখেছেন।

ধীরে ধীরে প্রায় শ’খানেক ছেলের দলটি কলেজের চৌহদ্দি পেরিয়ে গ্রামের মেঠো পথে এসে পড়ে। গ্রামের লোকজন প্রতি বছরই এই দৃশ্য দেখে থাকে। তারপরো সেই অপরূপ দৃশ্য দেখার লোকের অভাব হয়না। পথের বাঁকে বাঁকে মোতায়েন আমাদের ওস্তাদেরা, যাঁদের কাজ ছেলেদের উদ্দেশ্যে লাগাতার ধমক দেয়া, যেন কেউ কিছুটা আরামের আশায় গাছের ছায়ায় দুদন্ড দাঁড়িয়ে জিরোতে বা হাঁটতে না পারে। ইতোমধ্যে ছেলেরা কয়েকটা দলে ভাগ হয়ে গেছে। শিরোপা প্রত্যাশীদের গুচ্ছটা সবার আগে, প্রানপনে ছুটছে তারা। মাঝের দলটা বেশ বড়, ছুটছে মন্দ না। আমি একেবারে শেষেরটাতে। অভিজ্ঞ সিনিয়র ক্যাডেট এবং শিক্ষকরা আগে ভাগেই বেশ কিছু দামি কথা বলেছিলেন। মোদ্দা কথা ছিল- নিজের ক্ষমতা বুঝে ছোটা, যেন শেষ পর্যন্ত গায়ে শক্তি থাকে। আমি সেভাবেই যাচ্ছি, তবুও মাইকের আওয়াজ ছাপিয়ে নিজের নিঃশ্বাস আর বুকের ধুকপুকানির শব্দই জোরালো হয়ে উঠছে ক্রমশঃ।
পথে এক অদ্ভুত দৃশ্য। এখানে পথের দুপাশে দুটি পকুর। তারই একটির ঢালে, যেই ক্যাডেট ওমুক সবার আগে ছিলেন, তিনি ভূমিশয্যা নিয়েছেন। মুখ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে, চেতনা আছে কিনা বোঝা যায় না। অবশ্য ওখানে দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখার হুকুম নেই, আমরা ধীরে ধীরে দৌড়ে জায়গাটা পেরিয়ে যাই। খানিক পরেই স্ট্রেচার বাহকেরা এসে তাকে তুলে নেয়। মজার ব্যাপার হলো, পরে যতবারই ঐ দৌড়ে নেমেছি, প্রত্যেকবারই ওই ক্যাডেটকে ঠিক ঐ জায়গাটাতেই ঠিক ওভাবেই পড়ে থাকতে দেখেছি।

এ ঘটনা থেকে একটা বড় শিক্ষা আমি পেয়েছি- জীবনের লম্বা দৌড়ে কখনো শুরুতেই বেশী চাপ নিতে নেই। পড়াশোনাও আসলে তেমনি ব্যাপার। প্রথম শ্রেনী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বা আরো উপরে- এতো ম্যারাথন দৌড় ছাড়া কিছু নয়। তাই আজ যখন দেখি, ইশকুলের ছোট শিশুদের ওপর পাঠ্যতালিকার যে গন্ধমাদন চাপানো হচ্ছে, তখন শঙ্কিত না হয়ে পারি না। এসবের উদ্দেশ্য যদি হয় অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের শিশুদের এগিয়ে রাখা, তবে আমি জোরের সাথে বলতে চাই এটা সম্পূর্ন ভ্রান্ত নীতি। কেউ যদি ভাবেন পঞ্চম শ্রেনীর সিলেবাস চতুর্থ শ্রেনীতে নিয়ে এলে আমরা এক বছর এগিয়ে যাব, তবে তিনি জীবনের ম্যারাথন দর্শনটা বোঝেন নি। ফলাফল হবে সেই দম ফুরিয়ে মাঝপথে হুমড়ি খেয়ে পড়া।

যাহোক, কোন অঘটন ছাড়াই জীবনের প্রথম দূর পাল্লার দৌড় শেষ করতে পেরেছিলাম। সমাপ্তি রেখা পেরোবার সাথে সাথেই কয়েকজন ক্যাডেট একখানা কম্বল দিয়ে আপাদ মস্তক পেঁচিয়ে মাটিতে পেড়ে ফেলল। আরেকজন শুরু করলো প্রানপনে হাত পায়ের পেশীগুলো দলাই মলাই করা। এরমধ্যে কখন যেন গোটা এক মগ লবন গোলা পানিও খেয়ে ফেলেছি। এসব কান্ডকারখানা আমার কাছে একেবারে নতুন। তবে এসব কিছুরই বৈজ্ঞানিক কার্যকারন রয়েছে। একজন একজন করে প্রায় সবাই দৌড় শেষ করে। যারা পারেনি তাদেরকেও নিয়ে আসা হয়েছে। এরপরে কলেজ প্রিন্সিপালের উদ্দীপনাময়ী ভাষন ও পুরষ্কার ঘোষনা। আমাদের জীবনের প্রথম সেই দূর পাল্লার দৌড়ে বিজয়ীর বরমাল্য পেয়েছিল আমাদেরই সহপাঠী মিকাইল শিকদার!

মিকাইল মাত্র চারবারের জন্য এই কঠিন পাল্লায় নামতে পেরেছিল- প্রত্যেক বারেই প্রথম! মাধ্যমিক পরীক্ষার ছুটিতে সবাই যখন বাড়িতে, তখন এক চক্রান্তমূলক ঘটনায় আমাদের এই অপরাজেয় ঈগলের জীবনের অকাল সমাপ্তি ঘটে। ম্যারাথনের যে ঐতিহাসিক গৌরব গাঁথা, যে সম্মান, তার অংশবিশেষ বীর কিশোর মিকাইলের প্রাপ্য বলে আমি বিশ্বাস করি। কে যানে, সু্যোগ পেলে হয়তো তার নাম এদেশের ঘরে ঘরে একদিন উচ্চারিত হতো!

১৯৭ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।