আসমত ভাইয়ের শিঙ্গা

গিডিয়নের শিঙ্গা নামে এক খানা বিখ্যাত উপন্যাস আছে। লেখার নামটি ধার করেছি সেখান থেকে। বিষয়বস্তু অবশ্য একেবারেই ভিন্ন। শিঙ্গা অর্থাৎ বিউগল যথেষ্ট পুরোনো জিনিষ, সেই আদ্দিকাল থেকে যুদ্ধের ময়দানে এটার ব্যবহার হয়ে আসছে। যন্ত্রটা বাজানো বেশ কঠিন, এতে দম ও কৌশল দুটোই লাগে। যুদ্ধের ময়দান আর সামরিক কুচকাওয়াজ ছাড়াও শিঙ্গার বাদন যে অন্য কাজেও লাগে তা জানলাম আসমত ভাইয়ের কল্যাণে।

ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ- দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ। শুধু লেখা পড়া নয়, খেলাধূলা শরীর চর্চা গানবাজনা সবই এখানে গুরুত্ত্বপূর্ন। অসাধারন এই কলেজের পরিসর বেশ বড়, বৈচিত্র অনেক। সবচেয়ে সুন্দর বুঝি খেলার মাঠখানি। প্রকান্ড সেই মাঠে সারা কলেজের ছেলেরা এক সাথে খেলতে পারে। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, ভলিবল, বস্কেটবল- কি নেই সেখানে! সকালে পিটি প্যারেডের মত বিকেলে খেলাধূলাও এখানে বাধ্যতামূলক। বিকেলে একেবারে ঘড়ির কাঁটায় সবাই জড় হয় বাস্কেটবল কোর্টে। সেখানে কে কি খেলবে কোথায় খেলবে এসব ঠিক করে দেয়া হয়। এরপরেই ছুট- পরের দেড়-দু ঘন্টা কেটে যায় মহা আনন্দে!

তো, সেই প্রকান্ড মাঠে এত রকম খেলার সাজ সরঞ্জাম ঠিকঠাক পৌঁছে দেয়া এবং পরে সেগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে আনা মোটেই সহজ কাজ নয়। এই কাজটি দিনের পর দিন পরম ধৈর্যের সাথে করতেন আমাদের আসমত ভাই।

আসমত ভাইয়ের বয়েস কত তা আন্দাজ করা অসম্ভব। পঞ্চাশ থেকে সত্তুর- যে কোনটাই হতে পারে। শোনা যায় তিনি নাকি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সৈনিক ছিলেন। ওই বয়েসেও তাঁর চাল চলনে কোন জড়তা ছিল না। তাল গাছের মত লম্বা ও খাড়া দেহ, একেবারে স্বল্প বাক। তাঁকে কারো সাথে গল্পগুজব করতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। খেলার মাঠে ব্যাট বল এসব ছাড়া আরো অনেক কিছু থাকে। প্রায়ই দেখেছি তিনি পরম যত্নে কতগুলো সাদা কালো রঙ করা লাঠি গুছিয়ে রাখছেন। মহাবিজ্ঞানী আইনষ্টাইন নাকি বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেমন হবে জানিনা, তবে চতুর্থটি হবে লাঠি দিয়ে। আমাদের বিশ্বাস, সৈনিক আসমত ভাই আসলে একবারে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছেন।

খেলার মাঠের দেখভাল করা ছাড়াও আসমত ভাইয়ের আরেকটি কাজ ছিল দু বেলা শিঙ্গা বাজানো। ক্যাডেট কলেজে দিনে দু বার শিঙ্গা বাজানো হয়। একবার সেই কাক ডাকা ভোরে, যাকে বলে রিভেলি- জাগরন। তখন জাতীয় পতাকা তোলা হয়। আরেকবার সন্ধ্যে বেলা, যখন পতাকা নামানো হয়। দু বেলার বাদনের সুর আলাদা। মিনিট খানেক ধরে বিচিত্র সুরে চলে সেই বাজনা। কলেজের কঠিন নিয়ম, সেই বাজনা শোনার সাথে সাথে যে যেখানেই থাকুক, স্থির এটেন শান হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। অবশ্য হাউসের ভেতরে থাকলে তার প্রয়োজন নেই। সকালে শিঙ্গা বাদনের প্রতিক্রিয়া তেমন একটা বোঝা যেতো না। কিন্তু সন্ধ্যেবেলায় ব্যাপারটা ভালোই টের পেতাম সবাই। তবে সবচেয়ে বেশি নাটকীয় ব্যাপার হতো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতার সময়।

ক্যাডেট কলেজে সবচেয়ে জমজমাট উত্তেজনায় ভরপুর ঘটনা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা। ডিসেম্বর মাসে, পরীক্ষার পালা শেষে, তিন দিন ধরে চলতো সেই অনুষ্ঠান। তিনটি হাউসের মধ্যে হাড্ডা হাড্ডি লড়াই। দৌড় ঝাঁপ নিক্ষেপ আরো কত কি, ছোটখাট এক অলম্পিক যেন। তৃতীয় দিনে পুরষ্কার বিতরনী।

কলেজের চেহারাই বদলে যেত সেদিন। সারা কলেজ সুন্দর ভাবে সাজানো। লাল নীল ও সবুজ পতাকা, বেলুন, রাস্তায় আলপনা, গাছের গোড়ায় সাদা রঙ, মাঠে সাদা চুনের নক্সা। মাঠের একপাশে বিরাট শামিয়ানা। চ্যাম্পিয়ন হাউসে সাজের ঘটা সবচেয়ে বেশি। এই দিন অভিভাবকেরাও এসেছেন। শামিয়ানার নীচে তাঁরা বসে। তাঁদের বিস্মিত বিমুগ্ধ দৃষ্টির সামনে ক্যাডেটরা দেখিয়ে যাচ্ছে নানা কলা কৌশল। সবশেষে প্রধান অতিথির হাতে পুরষ্কার বিতরন। দীর্ঘ অনুষ্ঠানের পর সমাপ্তি ঘোষনা। সাথে সাথে ক্যাডেটদের এক দল ছুট দেয় শামিয়ানার দিকে- তাদের অভিভাবক এসেছেন। বাকীরা হাউসের পানে দৌড়।

ঠিক এই সময়, চরম নাটকীয় ভাবে, বেজে উঠে আসমত ভাইয়ের শিঙ্গা। সাথে সাথে- যেন কোন মন্ত্রবলে, ছুটন্ত ক্যাডেটরা সবাই নিশ্চল যে যার জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়। সারা মাঠে আর কোন শব্দ কোন নড়া চড়া নেই- শুধু করুন সুরে শিঙ্গা বাজছে, তার সাথে ধীরে ধীরে নেমে আসছে পতাকা। সময়টা খুব দীর্ঘ নয়, তবে তার রেশ থাকে অনেকক্ষন। বাজনা থামার সাথে সাথে আবার ঘুমন্ত পূরী জেগে উঠার মত ছোটাছুটি শুরু হয়। এই অপূর্ব ব্যাপার দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। কলেজের স্বল্প বেতনের কর্মচারী আসমত ভাই তখন যেন কোন রহস্যময় পৌরনিক চরিত্রের মহিমায় দেখা দিতেন। যার শিঙ্গায় আছে মারণ কাঠি জীয়ন কাঠির মত যাদুকরী কোন শক্তি।

১,৪০৮ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “আসমত ভাইয়ের শিঙ্গা”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।