উপরেই থেকে গেলি?

আশরাফের সংগে আমার শেষ দেখা হওয়ার দিনটা আমার মনে আছে । ১২ নভেম্বর ২০১০ । ওর ছোট ভাই আফজালের সলো ফটোগ্রাফি এক্সিবিশনের ওপেনিং এর দিন । আমি সাভার থেকে ঢাকায় গিয়ে এক্সিবিশনে গিয়েছি শুনে খুব খুশি হলো । ওর ছোট ভাই লুমিক্স ক্লিক টু ফেম বিজয়ী আফজালের সংগে আমার নিয়মিত যোগাযোগ আর টুকিটাকি ফটোগ্রাফির কারনেই আমার সংগে ওঠাবসাটা খুব কম ব্যবধানেই ইদানিং হচ্ছিল । আমাকে দেখে সেই চেনা হাসি – “তুমি তো শালা আজকাল ভি আই পি হয়ে গেছ, ফটোগ্রাফার নিয়ে ঘুরো” । আমার সংগে আমার বউ ছিলো । ওর সংগেও ওর বউ । একত্রে আড্ডা দিলাম বেশ খানিকক্ষন । এর মধ্যে কথা প্রসংগে ১৬ ডিসেম্বর প্যারেডের কথা উঠলো । আমি প্যারেড করছি শুনে ও খুব খুশি হলো । “দোস্ত,আমিও তো আসতেছি প্যারেডে । ভাবি, ও যাবে নীচ থেকে আর আমি যাবো উপর থেকে “- আমার বউকে ও বললো । আমি জানতাম ও না ,আমাদের আশরাফ শেষ পর্যন্ত সেই উপরেই উঠে যাবে । যে পি টি-৬ দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বরের ফ্লাইপাষ্ট করলো ও , সেই এয়ার ক্রাফট নিয়েই………………………

আশরাফ পাবনা ক্যাডেট কলেজের ১৬ তম ব্যাচের এক্স ক্যাডেট । অসাধারন হাসিখুশি আর আলাপি এই ছেলেটা যে এভাবে না বলেই না ফেরার দেশে চলে যাবে একদমই না ফেরার দেশে আমি কোনভাবেই কল্পনাও করিনি । তা না হলে গত ১৫ ডিসেম্বর আমি নিউ মার্কেট আর ও এলিফ্যান্ট রোডে-এটা জানা সত্তেও আমি ওর সংগে গিয়ে একবার দেখা করে আসতাম না ? আমি,আমার বউ আর আফজাল মিলে নিউ মার্কেটে প্যানিনি বার্গার খেয়েছি । ওকে কি খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম না? অফিস থেকে বাসায় পৌঁছার সংগে সংগেই বউ বললো এয়ার ক্রাফট ক্রাশের খবর । সেই সংগে আশরাফের নামটাও বললো । আমার বুকটা ধক করে উঠলো । প্রথমে খুব করে চেয়েছি খবরটা ভুল- এটা যেন হয় । পরে ভেবেছি যদি সত্যিই হয় তবুও আশরাফ তো অনেক আছে । আমাদের আশরাফ নিশচয়ই না ; কিন্তু এরপর যেখানেই ফোন করি আমার আশার উল্টোটাই শুনি । ফোন করি আফজালকে । বুঝলাম, ওরা এখনো কনফার্ম না । আথবা আমারই মতো শুনতে চাইছে খবরটা ভুল । আর কথা বাড়াই নি । এ রকম সময়ে আমি সাধারনতঃ কাউকে ফোন করি না । কারন কি বল্বো খুঁজে পাই না । বরং অনেক সময়ে কেঁদে ফেলি । তাই ফোন কেটে দিলাম ।

আশরাফের বউ শাহনাজ জাহান । এম জি সি সি’র ২০০২ এইচ এস সি ব্যাচ । ওর কথা চিন্তা করলে আমি কোন কূল কিনারা পাই না । আল্লাহ ওকে রহমত করুক । আমি আসলে এখনো বুঝতে পারছি না কি করবো, কি করা উচিত । আজ দুপুর ২ টায় এয়ার হেড কোয়ার্টারের প্যারেড গ্রাউন্ডে আশরাফ আর মাহমুদ স্যারের নামাজে জানাযা । পারলে শরীক হবেন সবাই । আর দোয়া করবেন ।

ওর ওই কথাটা এখনো কানে বাজে । আমি যাবো নীচ থেকে আর ও যাবে উপর থেকে । উপরে যেতে যেতে একদম উপরেই চলে গেলি রে দোস্ত ? আমাদের জন্য একটুও মায়া হলো না ? আমি জানি না, ওর মুখটা দেখতে দেয়া হবে কিনা । কিন্তু আমি নিশ্চিত ওর হাসিমুখটাই দেখা যেত তাহলে । আশরাফের কথা কেউ কল্পনা করেছে আর তার চোখের সামনে ওর হাসিমুখটা ভেসে উঠেনি এমন কি কারও হয়েছে ? সম্ভব না ।

এলোমেলো একটা পোষ্ট দিলাম । মাথা এখনও কাজ করছে না । সবাই দোয়া করবেন……………

৭৯৯ বার দেখা হয়েছে

৬ টি মন্তব্য : “উপরেই থেকে গেলি?”

  1. R

    আপু আর ভাইয়ার একসাথে তোলা হাসি মাখা ছবিটা দেখে নিজের অজান্তেই কান্না চলে আসছে। কিছুদিন আগেও আপুর সাথে কথা বলছিলাম তার যশোর থেকে ঘুরে আসার গল্প। মাঝে মাঝে আশরাফ ভাই এর কথা। আপুর কথা চিন্তা করলে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমী'ন......

    জবাব দিন
  2. আব্দুল্লাহ্‌ আল ইমরান (৯৩-৯৯)
    আমি যাবো নীচ থেকে আর ও যাবে উপর থেকে ।

    এই ধরনের ব্লগ পড়তে ইচ্ছা করেনা।সব কেমন শুন্য মনে হয়।
    আমি অনেক কলেজের অনেকের সাথেই মিশি।২০মে বছর দুয়েক আগে হবে পিসিসির জিটুজিতে গেলাম।আশরাফ বউ নিয়ে আসলো,পরিচয় হলো।তারপর বললাম আমার কাজিনও আছে পাইলট।দেখলাম ওদের সাথেই।তারপর বলেছিল একদিন ওদের মেসে যেতে,আর যাওয়া হয়নি।সেই প্রথম এবং শেষ দেখা।কেন জানিনা,নিজেকে সামলাতে পারছিনা।আসলে ক্যাডেটদের ফ্রেন্ডশীপ ১দিন/১মিনিট এভাবে বিচার করা যাবেনা।আজ সেই আড্ডা আর হাসিমুখই বারবার মনে হচ্ছে।

    জবাব দিন
  3. বিদেহীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

    এর একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এটা বিচ্ছিন্ন কোন দুর্ঘটনা নয়, এ বছরই কমপক্ষে ৪/৫ টা প্লেন ক্রাশের ঘটনা ঘটেছে। ভাগ্যজোরে কয়েকজন বেঁচে গেছেন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পাইলট হলে ক্রাশই যেন আমোঘ নিয়তি, অথচ তিনবাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে সেরা ছেলেগুলো যায় বিমানবাহিনীতে। বন্ড সাইন নিয়ে মুখ বন্ধ করার দিন শেষ, আমরা অত্যন্ত মেধাবী কিছু মানুষকে আর ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না। তাঁরা দেশের জন্য ফাইট করতে গিয়ে মারা গেলে না হয় মানা যেতো কিন্তু তাঁদের মরতে হচ্ছে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। প্রত্যেকবার সেই একই চক্র ক্রাশ--তদন্ত--যান্ত্রিক ত্রুটি। যদি আমাদের উন্নত বিমান কেনার সামর্থ না থাকে তবে আপাতত বিমানে লোক নেয়া বন্ধ থাক। আমি আশা করবো ক্যাডেট কলেজ ব্লগ থেকে এ ব্যাপারে (মানসম্পন্ন বিমান ক্রয় ও মুড়ির টিনা মার্কা বিমান বাদ দেয়া) আন্দোলন শুরু করার এখনই সময়। তা না হলে আমাদের এই ডাবল ক্ষতি(মূল্যবান জীবন ধ্বংস+বিমান ধ্বংস) চলতেই থাকবে। এ ব্যাপারে গঠনমূলক পোস্ট আশা করছি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।