আমার অবিশ্বাসী হয়ে ওঠা এবং একটি কবিতা(কপিরাইট মাহবুব(০০-০৬))

(ইনস্পিরেশন পাইলাম মাহবুব(০০-০৬) এর পোস্ট থিকা)

এই গল্পের শুরু অষ্টম শ্রেণীতে যখন আব্বু আমার জন্মদিনে বাউলমন প্রকাশনীর অনুবাদ “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” উপহার দিলেন। কার্ল সাগান এই বই এর ভুমিকায় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা লিখেছিলেন। “এই বইটি হতে পারে ঈশ্বরের অনস্তিত্ব সম্পর্কেও। এই মহাবিশ্বের কোন সীমা নেই এবং ঈশ্বরের কিছুই করার নেই“। আমাকে বইটি প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত করেছিল। মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং তার পরিণাম নিয়ে আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। নবম শ্রেণীর শুরুতেই নীলক্ষেত গিয়েছিলাম স্টিফেন হকিং এর কৃষ্ণগহবর এবং শিশু মহাবিশ্ব বইটি কিনতে। সেইসময় আরেকটি বই যা আমার চিন্তাভাবনাকে প্রচণ্ড আন্দোলিত করেছিল, আমি ফুটপাথ থেকে ৩৫ টাকায় কিনি। বইটি আখতারুজ্জামান স্যারের বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ঢাউস “বিবর্তনবিদ্যা”। এর আগে বিবর্তন সম্পর্কে একটু আধটু শুনে থাকলেও এই বইটি পড়ে আমার মাথা ঘুরতে থাকে। ওপারিনের মতবাদ কিংবা মনুষ্য বিবর্তনের বিষয় গুলো আমাকে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। অনেকটা ডিফেন্স মেকানিজমের কারনেই হয়ত আমি হঠাৎ করেই খুব ধার্মিক হয়ে পরি। পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াশুরু করি। ইত্যাদি। কে যেন বলেছিল আমাকে যদি ধর্মকে ভালো করি জানি তাহলেই দেখব সকল সত্য ধর্মের মাঝখানেই আছে। আমি আবার বাইবেল ফাউন্ডেশন থেকে বাইবেলের নতুন নিয়ম টা কিনি। পুরাতন নিয়মটা আমাকে আমার মেজ মামা জোগাড় করে দেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এর কাছ থেকে। আর কুরানের তাফসীর ছিল একটা মারেফুল কুরান। আরেকটা বই আমাকে একজন দেয় সেটা আল কোরান দ্যা চ্যালেন্জ। এইগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তে গিয়ে খটকা লাগা শুরু করে। বুঝতে পারি “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” কিংবা “বিবর্তনবিদ্যা” বইগুলোর তুলনায় এই প্রাচীন বইগুলো কতটা সাধারন এবং অযৌক্তিক। পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি ঝোক বেড়ে যাওয়ায় আমি আরও বই জোগাড় করি যেমন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা, পদার্থবিজ্ঞানের বিবর্তন, রাসেলের আপেক্ষিকতার অ আ ক খ, ওয়াইনবার্গের প্রথম তিন মিনিট। এর মাঝে দুটো বই আমি কলেজ লাইব্রেরী থেকে চুরি করেছিলাম। আমি ক্রমাগত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পরি। এসএসসির ছুটিতে আমার ধর্মবিশ্বাস পুরোপুরি আঘাতপ্রাপ্ত হয় রাসেলের কেন আমি খ্রীষ্টান নই পড়ে। একদিন রাতে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিলাম নামাজ পরব না। তারপর কলেজে এসে বন্ধুবান্ধবদের এসব বলা শুরু করি। কুরানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। তখন পোলাপাইন আমাকে বুঝানো শুরু করে, ধমকানো শুরু করে, সভাসমিতি শুরু করে। এদের মাঝে মুহাম্মদ তখন ডাকসাইটে মুসল্লী ছিল। সেও আমাকে ছবক দেয়। কিন্তু আমাকে কেউ কনভিন্স করতে পারে না। নিজের অবিশ্বাসের কথা সরাসরি যখন ঘোষণা করি তখন বুঝতে পারি মানুষ আসলে ধর্মে অবিশ্বাসীদের স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না। আমার অসংখ্য বন্ধু আছে যারা ধর্ম নিয়ে সন্দিহান কিন্তু স্বীকার করে না সামাজিক চাপে।

এই ছোট লেখটা শেষ করছি একটা কবিতা দিয়ে:)(এটাও আমার বিশ্বাসকে ছুড়ে ফেলার ঘোষণা দিয়ে লেখা)

কুয়াশা ছিটকে বেড়িয়ে আসুক ঘাতক তীড়

বিশ্বাস থেকে বাস্তুহারা ধুলোয় রুপান্তর মনের
চারদিক ঘোষনা করে কি কোনো প্রাথমিক কারন ধারনের?
মগজে কি আছে সব নিউরন আন্দোলন
ছোট অতিবিবর্তনহেতু সি্নাপ্সে প্রশ্নের প্রকরণ ?
এতকাল গেলো সেই সরীসৃপ সময়ের
কবে থেকে বুকে হেটে শক্ত পলিতে সময়ের পদচিহ্ন পতনের;
ইকুয়েশনের কাব্যিক সৌন্দর্যে
মনন আর মেধা চটকে
দুই বেলা ঘন আয়েশ জমে উঠল প্রাইমেট গোত্রপতিদের;
অথচ জনপদে পথে পথে কেবল বিভাজনের আইল ।
আরনল্ডের ডোভার সৈকত পাড়ের ক্ষারময় বালিতে
অজস্র শুদ্ধ সুন্দরের মানব অবয়ব
শুদ্ধ আগুন সুর্যে ঝলসাবে কবে
চামড়ার উপর মরা কোষের মত জমা
মস্তিস্কহীনবানরশ্রেনীর অপবিশ্বাসস্তবের স্তর ।

১,৮৭৮ বার দেখা হয়েছে

২১ টি মন্তব্য : “আমার অবিশ্বাসী হয়ে ওঠা এবং একটি কবিতা(কপিরাইট মাহবুব(০০-০৬))”

  1. তাইফুর (৯২-৯৮)

    লেখা ভাল লাগছে ... :goragori:
    (এই লেখায় আসন্ন কমেন্ট ঝড় নিয়ে ভাবছি ...
    "নিপাত গেল হোদল রাজা, নিপাত রাজা বুদ্ধু")


    পথ ভাবে 'আমি দেব', রথ ভাবে 'আমি',
    মূর্তি ভাবে 'আমি দেব', হাসে অন্তর্যামী॥

    জবাব দিন
  2. :grr: :grr: কাইলকাই উকিল নোটিশ পাঠাইতেসি!! 😀 কপিরাইট ভাঙলেই ১৪ বছর।
    ক্যাডেট কলেজে কিছু অসাধারণ বই পড়েছি। যথা-
    ১। আল-কোরান দ্যা চ্যালেঞ্জ- কাজি জাহান মিয়া।(বিজ্ঞানকে কোরান দিয়ে জাস্টিফাই করতে হবে এই মহান আপ্তবাক্য প্রথম এথা হতে প্রাপ্ত 😛 )
    ২। সহীহ বোখারী শরীফ। (মসজিদে থাকতো। পড়ার জন্য আমাদের মাঝে কাড়াকাড়ি পড়ে যেতো। কারণ?? 😕 😕 নাই বা বললাম 😀 )
    ৩। আরজ আলীর রিবটাল। বইটার নাম ভুলে গেছি। বুয়েটের কোনো একজনের লেখা শুধু এটুকুই মনে আছে। এই বই থেকেই প্রথম ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইনের ধারণা পাই।
    ৪। কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস- (ভয়াবহ কঠিন বই। আরো দশজনের এন্টেনা নিয়া একসাথে বইসা পড়া লাগছে!!)
    ৫। একটি বিজ্ঞান মাসিক পত্রিকা। এইটার নামও ভুলে গেছি। এখানেই প্রথম বিবর্তনবাদ নিয়ে বিশদ আলোচনা, স্ট্রিং থিওরি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর ধূসর জগতের পরিচয় পাই। এক দোস্তো মাসিক সাবস্ক্রাইবার ছিলো ওই পত্রিকার।

    জবাব দিন
    • রায়হান আবীর (৯৯-০৫)
      আরজ আলীর রিবটাল। বইটার নাম ভুলে গেছি। বুয়েটের কোনো একজনের লেখা শুধু এটুকুই মনে আছে। এই বই থেকেই প্রথম ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইনের ধারণা পাই।

      বইটির নাম সংশয়বাদী দর্শনের ভ্রান্তিসমূহ। আমার প্রিয় বই 😀

      জবাব দিন
    • হোসেন (৯৯-০৫)

      আলো কোরান দ্যা চ্যালেন্জ অবশ্য আমার মেজাজ বিশেষভাবে খারাপ করে দিয়েছিল একটি অংশে স্টিফেন হকিং এর নামে বিষাদগার করাতে। বিষাদগারটা অসভ্য ভাষাতে করা হয়েছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল বিগ ব্যাঙ্গ থিওরী তথা স্ট্যান্ডার্ড মডেল সম্পর্কে লেখকের হাস্যকর অজ্ঞতা। তিনি ধরে নিয়েছইলেন স্টিফেন হকিং ই এই তত্বের প্রবক্তা।


      ------------------------------------------------------------------
      কামলা খেটে যাই

      জবাব দিন
      • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

        মেজর কাজী জাহান মিয়ার বইয়ে "স্রষ্টার স্রষ্টা কে" প্রশ্নের উত্তর বলা আছে অনেকটা এভাবে( পুরো লাইন মনে নেই,ভুল হলে ধরিয়ে দিস)- একটা লবণের অনুর গঠন জানতে হলে তার প্রতিটি ক্ষুদ্রাংশের ত্রিমাত্রিক গঠন জানতে হবে।লবনের অনুতে কত লক্ষ জানি ত্রিমাত্রিক ক্ষুদ্রাংশ আছে আর আমাদের মস্তিষ্কে সেলের সংখ্যা তার চেয়ে কম।সুতরাং আমাদের মস্তিষ্ক যেখানে সামান্য একটা লবনের অনুর গঠনই জানতে সক্ষম নয়,স্রষ্টাকে জানতে চাওয়া সেখানে বিশাল অজ্ঞতা নয় কি? 😀 😀

        সেই বইটা পড়ে ক্লাস এইটের ধার্মিক আমি বিমলানন্দ লাভ করেছিলাম এবং সম্ভবত মসজিদে কয়েক রাকাত অতিরিক্ত নামাজও পড়েছিলাম 😀

        জবাব দিন
    • হোসেন (৯৯-০৫)

      আমরা মখসুদুল মোমেনীন বা বেহেশতের কুন্জীর ভক্ত ছিলাম। আমাদের আশেক লাইব্রেরীর একটা হাদিসের বই থেকে বের করেছিল যে বিশেষ সময়ে স্বমেহন জায়েজ আছে :grr: :grr: :grr:


      ------------------------------------------------------------------
      কামলা খেটে যাই

      জবাব দিন
  3. মেহেদী হাসান (১৯৯৬-২০০২)

    বিশ্বাস আসলে নিজের কাছে। আমি ধর্মে বিশ্বাস করি বলেই তোমাকে একঘরে করে রাখার পক্ষে নয়। তোমাদের যুক্তি গুলো পড়তে/জানতে ভালোই লাগে। উপভোগ করি।

    জবাব দিন
  4. সিফাত-ঈ-মুহাম্মদ (২০০১-২০০৭)

    শেষ পর্যন্ত দ্বিঘাত সমীকরণের ফলাফল দুইটাই
    ১।বিশ্বাস
    ২।অ-বিশ্বাস

    যদি কোনো কারণ বা যুক্তিকে মানদণ্ড ধরে বিচার করা হয় তবে তা ভুল
    সসীম কিছু দিয়ে অসীম বিচার করা যায় না
    এটা অসীমের অনস্ত্বিত্ব স্বীকার করে না
    সসীমের সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে

    যদি কারও বিশ্বাস কোনো কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে থাকে
    তবে সে কাঠামো ভেঙ্গে গেলেই বিপদ
    আর কোনো কাঠামো দিয়েই বিশ্বাসের মানদণ্ড নির্ধারণ করা যায় না।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।