নস্টালজিয়া-৩

নস্টালজিয়া-১
নস্টালজিয়া-২

পানির জগ
কলেজে আমার দ্বিতীয় দিন। তার আগেরদিন একটা ঘোরের মধ্যেই কেটে গেল। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষজন, নতুন নতুন কালচার, বড় ভাইয়াদের কাছ থেকে নানান আচার ব্যবহার শিখতে হচ্ছে। শিখতে গিয়ে ব্যাপারগুলো যেমন কঠিন লাগছিল তেমনি ভয়ও লাগছিল। এতো নিয়ম-কানুন কিভাবে মনে রাখব? মনে মনে ভাবছিলাম “হালার কোন আজব জায়গায় আইলাম”। এইসব নিয়ম কানুন শিখানোর জন্য দুইজন ডেডিকেটেড ইমিডিয়েট সিনিয়র বিদ্যমান এক. রুম গাইড দুই. টেবিল গাইড। কপালগুনে দুইজন গাইড ভাইয়াই ছিলেন অনেক ভালো।
ডাইনিং টেবিলে কি করতে হবে, কি করা যাবে না সব কিছুই মোটামুটি আমাকে বলে দেয়া হল। গতদিন প্রথমদিন ছিল বিধায় আমাদের হাতে খেতে দেয়া হয়েছিল। আজ চামচ দিয়ে খেতে হচ্ছে। কলেজে আসার আগে এক সপ্তাহ ধরে বাসায় চামচ দিয়ে খাওয়ার অনুশীলন করেছিলাম তদুপরি দুপুরে চামচ দিয়ে খেতে বেশ কষ্টই হয়েছিল।

মূল ঘটনা ঘটল ডিনারে। কিভাবে টেবিল গোছাতে হবে তা টেবিল গাইড একটু আর্লি ডাইনিংএ নিয়ে গিয়ে শিখিয়ে দিচ্ছিলেন। টেবিল লিডারকে সবার আগে ভাত বেড়ে দিতে হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে সবাইকে। কোন সিনিয়র কোন কিছু চাহিবা মাত্রই উনাকে যোগানদিতে সচেষ্ট থাকতে হবে। আরো অনেক অনেক নিয়ম। যাইহোক ভালোভাবেই সবকিছু হচ্ছিল। প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে গিয়ে কবজি সামান্য ধরে আসছিল। নিজের খাবারের দিকে মনযোগ না দিতে পারলেও কান খাড়াছিল কখন কোন ভাই হঠাৎ কিছু চাচ্ছেন কিনা?

হঠাৎ টেবিল লিডার ডাল চেয়ে বসলেন। ডালের বাটি তখন আমার সামনেই। বাটি হাতে নিয়ে টেবিল থেকে উঠে গিয়ে ভাইয়াকে দিয়ে আসলাম। এছাড়া আমার আর অন্যকোন উপায়ও ছিল না। দেখলাম টেবিলের সকলেই হেসে উঠলেন। ব্যাপার কি? বুঝলাম কিছু ভুল হয়েছে। বেঞ্চে বসতে বসতে গাইড ভাইয়ার কাছ থেকে শুনতে হল কড়া নির্দেশ “টেবিলে একবার বসলে খাবার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর উঠা যাবে না।”

কিছুক্ষন পরই আরেক ভাইয়া চেয়ে বসল পানির জগ। আমার সর্বশক্তি দিয়েও ভরা ভারী জগ উঠাতে পারলাম না। শেষ অবধি আবারো ভুল করে বসলাম। দুই হাত দিয়ে শক্তভাবে ধরে জায়গাতে দাড়িয়েই পানির জগ পৌছে দিলাম। তবে ভারী জগ জাগাতে বেশ কষ্টই হয়েছিল। তারপর আবার আরেক জন, “এই পানির জগটা দাও।” ঠিক একইভাবে দুইহাত দিয়ে জগ জাগাতেই পানি ছিটকে বেড়িয়ে চারদিকে পড়ল। বড় ভুল হয়ে গেছে…… আমি কি জানতাম জগে আর আগের মতন ভরা পানি নেই, ছিল তলায় সামান্য কিছু মাত্র।

চিকি
কলেজের যোগদানের কয়েক দিন পর। কমনরুমে গেলাম ক্যারম খেলতে। এক সুন্দর মত ভাইয়া ডাকলেন। কছে গেলে উনার সাথে কথোপকথন হচ্ছিল….
-তোমার নাম কি?
-জ্বী ভাইয়া, মহিউদ্দিন।
-তুমি কি জান, তুমি যে একটা চিকি?
-জ্বী ভাইয়া, চিকা?
-(হেসে দিয়ে) না না, তুমি হইলা চিকি।
-জ্বী ভাইয়া, চিকি কি?
-চিকি কি তুমি জান না?
-জ্বী ভাইয়া, না ভাইয়া আমি জানি না।
-তোমার রুম গাইড কে?
-জ্বী ভাইয়া, আমার রুম গাইড আরাফাত ভাই।
-তারে গিয়ে বলবা ফয়সাল ভাই বলেছে আমি নাকি একটা চিকি। যাও, এখনি যাও। তোমার আরাফাত ভাই কি বলছে কিছুক্ষনের মধ্যে আমারে এসে জানাবা।
-জ্বী ভাইয়া।

রুমে এসে আরাফাত ভাইয়াকে পেলাম। যা যা বলার খুলে বল্লাম। আরাফাত ভাই বল্লেন “তোমার এইসব জানার দরকার নাই, আর ঐ ভাইয়ার ধারে কাছে যাবা না।”
কি মুশকিল, চিকি কি তাতো জানা হল না। মনের মধ্যে একটা খটকা রয়ে গেল। যাইহোক আরাফাত ভাইয়ের কথা মতন ফয়সাল ভাই থেকে একটু আড়ালে চলাফেরা করছিলাম। আর মনের মধ্যে সেই প্রশ্ন, হোয়াট ইজ চিকি? বন্ধু তাওফিক-হালায় চরম জিনিয়াস, ধরলাম তারে।
-এই তাওফিক আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিবা?
-বলো।
-চিকি কি তুমি জানো?
-হুম, সুন্দর ছেলেদের কে চিকি বলে। দেইখ ভুল কইরাও সিনিয়দের কে এই কথা তুমি বলতে যেও না।
-আচ্ছা বলব না, শুনো আরেকটা জিনিস বল, তাইলে আমি কি চিকি?
-দূর, তুমি হইলা কালো, তুমিতো চিকি না, তুমি হইলা হরর।
-ও আচ্ছা।

হরর মানে যে কি তাও তখন আমার জানা ছিল না। তবে ধারনা করেছিলাম অসুন্দর মানুষ মানেই হরর।
পরের দিন আবার ফয়সাল ভাইয়ের কাছে কট।
-এই চিকি এই দিকে আস। তোমারে না বলছিলাম তোমার গাইড কি বলছে জানাইতে।
-জ্বী ভাইয়া, সরি ভাইয়া। তখন আরাফাত ভাইকে খুজে পাই নাই। (মিথ্যা জবাব)
-পরে কি জানতে পারছ।
-জ্বী ভাইয়া, ভাইয়া আপনি মনে হয় ভুল করতেছেন। আমিতো চিকি না, আমি হরর।
-(বেদম হাসি) হরর? তাইলে চিকি কেডা?
-জ্বী ভাইয়া, আপনি।
-(থ মেরে) যা ভাগ এখান থেকে।

১,০৭৪ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “নস্টালজিয়া-৩”

  1. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)
    -জ্বী ভাইয়া, ভাইয়া আপনি মনে হয় ভুল করতেছেন। আমিতো চিকি না, আমি হরর।
    -(বেদম হাসি) হরর? তাইলে চিকি কেডা?
    -জ্বী ভাইয়া, আপনি।

    :gulti:


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।