প্রিয় পুষ্পিতা

প্রিয় পুষ্পিতা ,

তোর নামটা অনেক সুন্দর । ফেসবুকে তোকে প্রথম যখন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে যাব তখন কেন যেন তোর নামটা খুব ভালো লেগেছিল । আমি সাধারনত কোন মেয়েকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর সময়ে তার ছবি দেখি । কেন জানি তোরটার সময় এ কাজ করিনি । তুই মাঝে মাঝে গ্রুপ ছবি দেস । সিঙ্গেল ছবি কেন দেসনা – তুই জানিস । লজ্জা পাস বোধ হয় ? জিজ্ঞেস করাক হয়নি ।  আমি সেখানে লাইক দেই হয়ত । কিন্তু তোর সেই গ্রুপ ছবি থেকে তোকে খুজে বের করতে চাইনা কেন যেন । এমন না যে তোকে দেখতে ইচ্ছা করেনা । আসলে কল্পনায় তোর চেহারা ভেবে রাখছি । কালকে দেখব  কতটুকু মিলে ।

 

কাল তোকে দেখতে যাচ্ছি । আসলে কেমন যেন লাগতেছে । তোর জন্য হতে পারে কালকের দিনটা ফেসবুকে একমাস ধরে চ্যাট করা , ফোনে কথা বলা বেস্ট ফ্রেন্ডটার সাথে দেখা করার দিন । তবে আমার জন্য দিনটা অন্যরকম । এ চিঠিটা কাল আমি তোকে যখন আমার সামনে পড়তে দেব আমি জানিনা তুই কী বলবি । হয়ত তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি না হয় আমাকে কাছে টেনে নিবি । সেটা তোর ব্যপার । কিন্তু আমি আর পারছিনারে । বলতে পারিস না পেরে কথাগুলো বলছি ।

 

জানিস , তুই এমন একটা সময়ে আমার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলি যখন আমার পাশে একটা মানুষ ও ছিলনা । খুব অবাকজনকভাবে আমার জীবনে এসেছিস । আমাকে একটা নতুন অনুভুতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিস যে অনুভুতিটার নাম প্রশান্তি । এই অনুভুতিটা আমি কখনো পাইনি । জানিস যখন আমি খুব ছোট – ধর পাচ থেকে ছয় বছর বয়স । আমি দেখেছি আমার বাবা মার ডিভোর্স হচ্ছে । আমি কিছুই বুঝতে পারিনি আসলে ডিভোর্স ব্যপারটা আসলে কী জিনিস ? পরে দেখলাম বাবা মা আলাদা থাকছে ; আমি মার কাছে । মাকে প্রায়ই মাকে জিজ্ঞেস করতাম বাবা কোথায় । মা উত্তর দিতেননা । কিন্টারগার্ডেন স্কুলে ফাদার্স ডেতে রচনা প্রতিযোগিতা হয় । আমি ফার্স্ট হই । প্রাইজ দেয়ার সময় স্যার জিজ্ঞেস করছিলেন আমার বাবা কোথায় । আমি উত্তর দিতে পারিনি ।

 

যাই হোক বাদ দে সেসব কথা । কেন যেন খালি সেসব কথা মনে পড়ে । যা বলছিলাম আর কি , তুই আমার জীবনে এসে আমার জীবনের একটা অর্থ খুজে দিয়েছিস । Living for someone , for the beloved one. Doing something to make them smile. জানিস যখন ফোনে তোর ওই হাসির শব্দ শুনতাম আমার কেমন যেন একটা প্রশান্তি লাগত । মনে তোকে একটু হাসাতে পেরেছি । আমি জানিনা আসলে কিছু ব্যপার কীভাবে প্রকাশ করতে হয় । তুই আমাকে আর তোকে নিয়ে একটা জগত তৈরি করেছিস না – কল্পনার একটা জগত । সে জগতে আমরা যে প্রতিদিন কত কত জায়গায় ঘুরতে যেতাম । সাগরের তীরে একমনে বসে থাকতাম । কোন খোলা ময়দানে চুপচাপ শুয়ে থেকে আকাশের চাদটাকে দেখতাম । এসময়গুলোতে আমি কেন জানি নিজেকে অন্যভাবে খুজে পেতাম । মনে হত আমার ভেতরের কোন এক স্বত্বা অনেক আগে মরে গিয়েছিল । কিন্তু আজ তা আস্তে আস্তে আবার জেগে উঠছে । প্রান খুজে পাচ্ছে । নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে ।

 

তুই আমাকে প্রথম প্রথম বলতি আমি যখন বিয়ে করব তোর সাথে এরকম ফ্রেন্ডশিপ রাখব কিনা । আমি বলছিলাম কেন রাখবনা? অবশ্যই রাখব । কিন্তু জানিস আমি তখন কথাগুলো নিয়ে খুব ভাবতাম । আমি আমার পাশে একটা মেয়েকে বৌ হিসেবে দাড় করাতাম । আর তোকে বন্ধু হিসেবে দাড় করাতাম । কেন যেন হিসাব মিলতনা । আমি অনেক অবাক হয়ে দেখতাম কোনভাবেই সে হিসাব মেলাতে পারিনি । কিন্তু কিছুদিন পর সে হিসাব আমি মেলাতে পারি । কীভাব জানিস ? আমার পাশে যে মেয়েটাকে দাড় করিয়েছিলাম তাকে সরিয়ে তোকে সে জায়গায় দাড় করিয়ে । আমি তখন দেখতে পাই  আমার মন সে সমাধানে সায় দিয়েছে । সেদিন থেকে আমি বুঝতে পারি আমি তোকে শুধু আমার বন্ধু হিসেবে দেখিনা । Something more than that . Something like a part of life .অর্থাৎ জীবনের ও একটা অংশ ।  আমি প্রতিদিন তোকে আমার সে কথা বলতে চাই । কিন্তু কেন যেন পারিনা । ভাবি তুই হয়ত চলে যাবি । আমাকে বলবি আমি তোকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখি । আর কিছু না । তুই বিশ্বাস কর তুই যদি চলে যাস আমার আর নিজের বলে কিছু থাকবেনা । আমি তোমাকে হারাতে চাইনা । তোকে ছাড়া আমি আমার জীবন কল্পনা করতে পারবনা । চাই ও না সে কল্পনা করতে ।

 

আমি জানিনা চিঠিটা পড়ে তুই কী করবি । হয় একটা হাসি দিয়ে আমাকে গ্রহন করবি । না হয়  আমার এ কাজে খুব কষ্ট পাবি। আমার থেকে দূরে সরতে থাকবি । আমি জানিনা কী করবি । তবে আমার কেন যেন মনে প্রকৃতি হয়ত আমাদের নিয়ে বড় কোন পরিকল্পনা করেছে । নতুবা দুজন দুই গ্রহের মানুষকে একসাথে এনে দেবে কেন ? হতেও তো পারত তোর সাথে আমার কখনোই দেখা হতনা । আমরা কেউ কাউকে চিনতামনা । হয়ত একই রাস্তায় দুজন হেটে যাচ্ছি । আমরা কেউ কাউকে চিনিনা । আমি ভাবতে পারিনা তখন কী হত , ভাবতেও চাইনা । কারন আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা স্মৃতি হল তোকে বন্ধু হিসেবে পাওয়া । আমি আর ফিরে দেখতে চাইনা । আমি তোকে নিয়েই আমার জীবন গড়তে চাই । বাকিটা পথ সুন্দর করে হাটতে চাই । খুব ছোট্ট একটা সুন্দর সংসার গড়তে চাই তোকে নিয়ে । খুব বড় কোন চাওয়া পাওয়া নেই । শুধু পাশাপাশি থেকে একজন আরেকজনকে সবটুকু দিয়ে ভালোবাসা । শেষ বয়সে দুজন দুজনের হাত ধরে শুয়ে থেকে আমাদের নিজেদের নিয়ে জমান স্মৃতিগুলো রোমন্থন করা । এর বেশি কিছু না । এটুকুই ………………………

 

**************************************************************************************************************************************

 

প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে ধ্বংসস্তুপের এক কোনায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চিঠিটা দেখছে জাফর । তার হাতে খুব বেশি একটা সময় নেই । একটু দম নিয়ে নিচ্ছে । প্রায় এক ঘন্টা টানা ভিতরে ছিল সে । একটা সময়ে তার প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল । অনেকটা বাধ্য হয়ে সে এখন একটু বিশ্রাম নিচ্ছে । সেই ফাকে এ চিঠিটা পড়ে নিচ্ছে । কেন জানি খুব পড়তে ইচ্ছা করছিল চিঠিটা ।

 

গত পরশু রাতের বেলা এই বিল্ডিংটা ধ্বসে পড়েছিল । ২০ তলা বিল্ডিং । একটা সাইড ধ্বসে পড়ছিল । আপাতত ৫০-৬০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে । জাফর নিজেই ৫ জনকে জীবিত বের করে আনতে পেরেছে । ৪০জনের লাশ পাওয়া গেছে । আরো অনেকে আটকা পড়ে আছেন । একটা টেবিল সরাতে গিয়ে টেবিলের নিচে এই চিঠিটা পড়ে থাকতে দেখে সে । কী মনে করে যেন সে নিয়ে আসে । কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে তার  । তবে তার এখন বেশি টাইম নেই । আবার তাকে যেতে হবে । কোন মানুষ নিশ্চয় তাকে উদ্ধার করার জন্য ডাকছে । তাড়াতাড়ি না গেলে তারা মারা পড়বে । না আর দেরি করা যাবেনা , এই ভেবে চিঠি পকেটে নিয়ে আবার হন্তদন্ত হয়ে ধংসস্তুপের দিকে ছুটে যায় সে ।

 

[গল্পটা আরো বেশি সুন্দর করে লেখা যেত কিন্তু কেন যেন লিখতে পারিনি । এজন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।]

৪৮৫ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।