অসমাপ্ত এক চিঠি

[ আজ হুমায়ুন আহমেদ স্যারের জন্মদিন । তাই আজকের ব্লগটা উনাকে উৎসর্গ করতে চাই । স্যারকে খুব সামনা সামনি দেখার ইচ্ছা ছিল । সে ইচ্ছা পুরণ হয়নি বলে বড়ই খারাপ লাগছে । কিন্তু কী আর করা । তবুও স্যারের কাছে একটা চিঠি । হয়তবা এ চিঠিটা স্যার পাবেন না । তবে হয়ত অনেক দূরের সেই দেশ থেকে তিনি হয়তবা এ চিঠিটা দেখবেন । তার খুব নগণ্য এক ভক্তের কিছু পাগলামি । ]

স্যার,       
আমি জানি আপনাকে চিঠি লেখার যোগ্যতা আল্লাহ্‌ আমাকে দেন নাই । আপনি যে মাপের মানুষ, আপনার মত একজন মানুষের কাছে লিখব এটা আমার হয়তবা সপ্ন। স্বভাবতই আমি আপনার মত লিখতে পারিনা । আপনি যেভাবে লেখেন , আপনার সে উচ্চতা দেখবার ও সাহস আমি পাইনা । তবু ও আমি লিখছি। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ।

আপনি কেন অভিমান করে আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেলেন । আমি যখন এ খবর টা পেলাম ভাবলাম এটা হয়তবা আমার সপ্ন । হয়তবা ঘুম থেকে উঠেই শুনতে পাব আপনার নতুন বই বাজারে এসেছে । সে বইটা পড়ে আপনাকে নকল করে লেখার চেষ্টা করব । কোথায় কী …… দেখি আপনি সত্যি চলে গেছেন । আপনি কেন চলে গেলেন । আমরা ভক্তরা কি বেয়াদপি করেছি ? যদি করে থাকি আপনি প্লিজ মাফ করে দিন । প্লিজ আপনি ফিরে আসুন । আমরা আপনার লেখা আপনার সৃষ্টি দেখে যেতে চাই । আমি এখন ভাবতে ও পারিনা আগামী বইমেলায় যখন শুনব আপনার কোনো বই বের হয়নি । বিশ্বাস করতে পারবনা ।

জীবনের একটা ইচ্ছা ছিল আমি আপনাকে সামনা সামনি দেখব । আপনার সাথে কথা বলব । আড্ডা দিব । শুনেছি আপনি নাকি আড্ডার মধ্যমনি । আপনার এই নগণ্য ভক্তের সে প্রত্যাশা কেন অপূর্ণ রয়ে গেল ? গত কয়েকটি মাস আপনার আগের লেখা উপন্যাসগুলো পড়ে আমি ভেবেছি এ মানুষটা কেন অভিমান করে চলে গেলেন ?

জীবনের একটা ইচ্ছা ছিল আপনার মাপের একজন লেখক হব । আপনি আমাকে দেখে বলবেন , কীরে এ ছেলে দেখি আমাকে অতিক্রম করবে । আপনি হাসবেন আর আমি লজ্জায় মাথা লুকানোর চেষ্টা করব । স্যার জানেন আমি আপনাকে নিয়ে একটা কল্পনা করেছি । আপনি আমাদের বাসায় এসেছেন । জানি অনেক হাস্যকর । বামুন হয়ে আকাশের চাঁদ ধরবার সপ্ন । তবু ও আপনি ই তো বলেছেন স্বপ্ন দেখতে । স্বপ্নের জগতে মানুষ স্বাধীন । সে স্বাধীন জগতে একটু না হয় ঘোরা ঘুরি ই করলাম ।     আমি ঘুমিয়ে আছি । গত কয়েক দিন খুব বাজে অভ্যাস হয়ে গেছে । অনেক রাত করে ঘুমাচ্ছি । আর উঠতেছি অনেক বেলা করে । বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করেনা । আম্মু অনেক রাগারাগি করে । বলে সারারাত জেগে থাকে। কোন দিন কোন অসুখ বাজিয়ে বসে ……… আম্মুরা মনে হয় ভাল আশা করতে পারেনা । হঠাৎ দরজায় কে যেন কড়া নাড়লো । আম্মুকে বললাম দরজা খুলে দিতে আম্মু কোন সাড়াই দিলনা । আমি ই উঠলাম । আম্মুর উপর ক্ষোভ জ্ঞাপন করতে করতে দরজা খুলতে গেলাম । দরজা খুলে তাস্কি খেয়ে গেলাম । আমি স্বপ্ন দেখছিনা তো । এ দেখি আপনি  দাঁড়িয়ে আছেন । ঠোটে চিরাচরিত সেই মিষ্টি হাসি । আমাকে দেখে বললেন , দরজাটা থেকে সরে দাড়ালে ভেতরে যেতে পারতাম । আমি তখন ও বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারিনি । আপনার  দিকে মুখ হা করে তাকিয়ে আছি । আপনি হাসি মুখে বললেন মুখটা বন্ধ কর নতুবা মাছি ঢুকে যেতে পারে । বলে হাসতে লাগলেন । আমি তখন লজ্জা পেয়ে মুখ বন্ধ করলাম । বললাম , স্যার আপনি ? আপনি হাসতে হাসতে বললেন, কেন আমার আসাতে তুমি খুশি হওনি । আমি তা হলে চলে যাই । বলে হাসতে লাগলেন । আমি লজ্জা পেয়ে বললাম , তা না স্যার । বিশ্বাস হচ্ছেনা। গরিবের ঘরে হাতির পা । আপনি হেসে বললেন , আমি হাতি ?

ঠিক তখন ই আম্মু এসে আপনাকে দেখে অবাক । আপনি তখন খোলাসা করে বললেন , আসলে কাছেই আসছিলাম শ্যুটিং এর কাজে । ভাবলাম এ বাসাটা একটু হয়ে যাই । তাই চলে এলাম  আর কি । আজ সারাদিন ভাবতেছি আপনার বাসায় থাকব । আম্মুকে আমি বললাম তাড়াতাড়ি রান্না শুরু কর । স্যার কিন্তু খাওয়া দাওয়া অনেক পছন্দ করেন । স্পেশাল কিছু রাধো প্লিজ. তারপর আপনার দিকে তাকিয়ে বললাম স্যার আমি ভাল কফি বানাতে পারি । খাবেন ? দাও দেখি এক কাপ । আমি ও দেখব তুমি কীভাবে কফি বানাও ।
বলে আপনি আমার পিছু পিছু রান্না ঘরে চলে এলেন । আম্মু আর আমার সাথে গল্প করতে লাগলেন । আমি আব্বুকে ফোন দিয়ে বললাম যাতে তাড়াতাড়ি আসে । আর আসার সময় মিষ্টি নিয়ে আসতে । তারপর আপনার সাথে গল্প করতে লাগলাম । আপনি নানা কথা বলছেন । দেখে মনেই হচ্ছেনা এ মানুষটা এ দেশের একজন সেরা লেখক ।  মনে হচ্ছে ইনি আমাদের খুব  কাছের কোন আত্বীয় । আপনাকে আমার লেখালেখির কিছু নিদর্শণ দেখাচ্ছি । আপনি গম্ভির মুখে দেখতেছেন । হাসেন আবার কিছু tips দেন । দুপুরে আপনার জন্য আম্মু তেহারি রান্না করল । আমার আম্মু খুব ভাল তেহারি রান্না করতে পারেন । সাথে বোরহানি বানালেন । আব্বু ও চলে এল । আব্বু অনেক মিষ্টি আনছেন । আপনি দেখে বললেন এত আয়োজনের কী দরকার ছিল । হালকা লজ্জা পেয়ে গেলেন । আমি হাসতে হাসতে বললাম হিমু স্যারের জন্য কিছু না হয় করলাম । আপনি হেসে দিলেন । আপনি অনেকটা ভুরি ভোজ করলেন । খেয়ে বললেন বাবা অনেক খেয়ে ফেলেছি । না জানি প্রেশার বেড়ে যায় । আমি বললাম কিচ্ছু হবেনা স্যার । রান্নাবান্নার সাথে কিছু ভালবাসা মিশিয়ে দিয়েছি । দেখবেন কিছুই হবেনা ।

তারপর আপনার সাথে আমরা সবাই মিলে আড্ডা দিলাম । আপনি নানা কথা বলছেন , আর আমরা শুনতেছি । আপনি এসেছেন শুনে আশেপাশের বাসার অনেকেই চলে এল । আপনি আমার খাটে হেলান দিয়ে ফ্লোরে বসে আছেন আপনার বা পাশে আমি বসে আপনাকে দেখছি । সবার সাথেই হাসি ঠাট্টা করছেন । আমার ঘরটাতে মানুষের সমাগম বারতে লাগল …………

লিখতে লিখতে চোখে পানি চলে আসছে । নাহ আর লিখবনা । আপনি যেমন আপনার অনেক উপন্যাস অসমাপ্ত ভাবে শেষ করেছেন । আমি ও তেমন আমার কল্পনা শেষ করলাম না । চিঠির শেষে মানুষ অনেক কিছু লেখে । অনেক উপদেশ মাখা কথা লেখে । আমি কিছুই লিখবনা । শুধু কিছু চোখের পানি রেখে দেব যা কোনদিন ও শেষ হবেনা ।

৬৭৯ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।