রাগ

মেয়েটা নিজেকে কী মনে করে ?

আপন মনে বিড়বিড় করতে থাকে শফিক । এই মুহূর্তে সে অফিসের চেয়ারে প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে বসে আছে । তার রাগের কারন অনেক । তবে সূত্রপাত গতকাল রাত থেকে ।

তার রাগটা মূলত কেয়ার উপরে । মেয়েটা নিজেকে অনেক সেয়ানা মনে করে । সে রাগ করলে তার কাছে মাফ চাইতে হবে । কিন্তু আমি রাগ করলে এটা ব্যপার না । এটা কেমন কথা ? আমাকে কি সে মানুষ মনে করেনা ? আমার কী কোন রাগ দুঃখ বলে কিছু নেই , মনে মনে কেয়ার উপর রাগ বাড়তে থাকে শফিকের ।

সকালে ব্রেকফাস্ট করা ঠিক হয়নি । কোনভাবেই ঠিক হয়নি । রাগ করে না খেয়ে বের হলে বুঝত কেমন ঠ্যালা । সকালে না খেলে যে সে মরে যাবে এমনও না । কিন্তু কেয়ার সাথে বিয়ে হবার পর প্রতি সকালেই তাকে খেতে হচ্ছে । এমনই অবস্থা দাড়িয়েছে এখন সকালে তার প্রচন্ড ক্ষুধা লাগে । সকালে কেন সে ব্রেকফাস্ট করল এ নিয়ে তার রাগ আরো বাড়তে থাকে ।

অফিসে এসে একবার ভাবল রাগটা কারো উপরে ঝাড়া দরকার । সুন্দরভাবে পিয়নকে ডেকে মনের সুখ মিটিয়ে ঝাড়ি দেবার চেষ্টা করলেন । কিন্তু ফল হল উলটা । রাগ আরো বাড়ল । পিয়ন ভাব দেখে মনে হল  , স্যার আপনি যত খুশি ঝাড়ি দেন আমার গায়ে লাগতেছেনা । হারামজাদার নামে লিখিত কমপ্লেইন করতে হবে যাতে ওকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় ।

চুপচাপ বসে রাগ একটু কমানোর চেষ্টা করছিল সে । কিন্তু তখনই তাকে তার বস ডাক দিলেন । অফিসে বস , আরিফুর রহমান , মানুষটা সবসময় খুব হাসিমুখে থাকেন । আর যেকোন কথাই শেষ করেন , “work sincerely man” দিয়ে । আজ শফিককে ডেকে বললেন , কী ইয়াংম্যান , কেমন চলে ? শফিক যথা সম্ভব মুখ হাসি হাসি করে বলল , স্যার ভালো । এরপর তিনি সংসার জীবন নিয়ে নানা প্রকার উপদেশমুলক কথা বলতে শুরু করলেন , বুঝলে ইয়াংম্যান সংসার আর চাকরি দুইটাকেই ইকুয়ালি গুরুত্ব দিতে হবে । কোনটার চেয়ে কোনটাকে কম গুরুত্ব দেয়া যাবেনা । এই যে আমাকে দেখ আজ আমি আজ তোমাদের বস । আমি কেন এ পজিসনে এসেছি । Because I emphasized them equally . ইত্যাদি নানা নানা কথা । শফিক মনে মনে বলতে থাকে , বুইড়া ভোদাই থাম । তুই কি করছিস তার খ্যাতা পুড়ি । মনের সাধ মিটিয়ে বুড়াকে কিছুক্ষণ মনে মনে গালি দিল শফিক । সে দেখল রাগ কিছুটা কমছে । কিন্তু রাগটা আবার বাড়ল রুম থেকে বের হওয়ার সময় । কারন তার বস তার হাতে অনেক কাজ তুলে দিয়েছেন ।

ফাইলের দিকে তাকিয়ে শফিক বিড়বিড় করে বলতে থাকে , শালা বুইড়া । কাম নাই কাজ নাই । চেয়ারে বইসা ___ ফালাও আর আমাদের সব কাজ ধরাইয়া দাও । সে দেখেছে যেদিন তার খুব কাজে মন থাকে সেদিন তার হাতে তেমন কাজ থাকেনা । কিন্তু যেদিন তার কাজের দিকে একফোটাও মন নেই সেদিন রাজ্যের সব কাজ দেয়া হয় ।

শফিক ঘড়ির দিকে তাকাতেই তার রাগ আরো বেড়ে গেল । এখন ১২:৩০ বাজে । কেয়া সবসময় তাকে এসময়ের মধ্যে ২-৩বার ফোন করে । কিন্তু মেয়েটা আজ তাকে একটা ফোন ও করে নাই । আচ্ছা বাবা মাফ না চাক । At least  ফোনটা তো করা যেত । তাহলেও সে বিবেচনা করে দেখত । মেয়েরা এত হৃদয়হীনা হয় কেন ?

শফিকের রাগ করার কারণটা খুব একটা ভয়াবহ নয় অবশ্য । সে মাঝে মাঝে টুকটাক একটা দুইটা গল্প লেখে । তো গল্প লিখেই তার খুব ইচ্ছা করে গল্পটা কেয়াকে দিয়ে পড়াতে । ডিরেক্টি সে বলেনা । এমনিতেই কথার কথা হিসেবে বলে , একটা গল্প লিখছি আর কী । দেইখ তো । চারদিন আগে সে একটা গল্প লিখছিল এবং কেয়াকে দিছিল । তো সে প্রতিদিন ভাবে কেয়া হয়ত গল্পটা পড়বে । সে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেনা পড়েছে কিনা । দু-তিনদিন হয়ে গেছে দেখা গেল কেয়া গল্পটা নিয়ে কোন কথা বলেনা । শেষমেষ গতকাল রাতে সে না পেরে খাওয়ার টেবিলে জিজ্ঞেস করে , একটা গল্প লিখছিলাম চারদিন আগে । দেখছিলা ? কেয়া বলে , ও তাইনাকি । খেয়াল করিনাই । শফিকের রাগে গা জ্বলে যায় । সে এত সাধ করে এই মেয়েটাকে নিয়ে গল্পটা লিখেছে আর মেয়েটা কোন মাথাব্যথাই নাই । রাগ করে তখনই খাবার টেবিল থেকে উঠে গেছে । কেয়া ব্যপারটাকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে যেন শফিক প্রায়ই ভাত শেষ না করে টেবিল ছেড়ে উঠে চলে যায় । খালি একবার জিজ্ঞেস করে , কী আর খাবা না ? শফিক উত্তর দেয়নাই । সেই থেকে সে রেগে আছে কিন্তু মেয়েটার যেন কোন মাথাব্যথাই নাই ।

হঠাৎ পিয়ন এসে বলে স্যার প্লেট দিব । লাঞ্চ টাইমে পিয়ন তাকে সবসময় একটা প্লেট দিয়ে যায় । না আজকে প্লেট দিতে হবেনা । স্যার কী কোন কারনে রাইগা আছেন ? পিয়নের উপর রাগটা আরো বেড়ে যায় শফিক ।

ওই হারামজাদা , আমি রেগে আছি না ফুর্তিতে আছে তা দিয়ে তুই কী করবি ? তোকে বলছিনা প্লেট লাগবেনা । ব্যস । এখন গেট আউট ।

শফিক দেখল পিয়ন না যেয়ে দাড়িয়ে রইল । কী হইল ? তোকে না বললাম গেট আউট , শফিক অনেক রেগে গেল ।

স্যার গরীব মানুষ একটা কথা বলব কিছু মনে করবেননা তো ?

কী?

স্যার আপনার কী স্যার আজ ভাবি সাহেবের সাথে ঝগড়া হয়েছে ?

ওই হারামজাদা আমার সাথে তোর ভাবির ঝগড়া হইছে কী হয়নাই তা দিয়ে তুই কী করবি ? তোকে চইলা যাইতে বলছিনা ।

না স্যার । আসলে ডেস্কের এনামুল স্যার ও যেদিন তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে সেদিন এমন করে তাই ভাবলাম আপনার ও কী আজ এমন হইল নাকি ? তয় স্যার খাওনের উপর রাগ করতে হয়না । আল্লাহ্‌ রিজিক দিছেন …………

গেট লস্ট । এই কথা শুনে পিয়ন চলে গেল । পিয়নের উপর তার প্রচুর রাগ হচ্ছে । দিনদিন বেয়াদপ হয়ে যাচ্ছে এইটা । আর পিয়নটা তাকে খাবারের কথা মনে করিয়ে দিল । খাবার প্রিয় এই মানুষটা ভেবেছিল আজ টিফিন ক্যারিয়ার টাচ না করেই বাসায় নিয়ে যাবে । এজন্যে খাবারের কথা তার ভুলে থাকা প্রয়োজন ছিল । কিন্তু এই হারামজাদা সব মনে করিয়ে দিল ।

আচ্ছা না খাই টিফিন ক্যারিয়ারটা একটু খুলে দেখি । দেখি কী দিয়েছে কেয়া , এই ভেবে শফিক টিফিন ক্যারিয়ারটা খুলল । আরে মেয়েটা কত্তোবড় চালবাজ ! আজকে তার সব প্রিয় প্রিয় রান্নাগুলো রেধেছে । মনে মনে শফিক বলতে লাগল । সে ভেবেছে এত প্রিয় রান্না দেখে শফিকের সব রাগ পড়ে যাবে । তাকে সরি বলা লাগবেনা । কী মজা । যতই প্রিয় খাবার হোক না কেন আজ সে খাবারে টাচ ই করবেনা । কিছুক্ষণ খাবারের দিকে তাকিয়ে শফিক ভাবল , নাহ খাবার নিয়ে রাগ করা ঠিক না । আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন তাকে রিজিক দিয়েছেন । সে রিজিক নষ্ট করা ঠিক হবেনা । রাগ অন্যকিছু নিয়ে দেখানো যাবে । তাই তিনি আস্তে করে পিয়নকে ডাক দিয়ে প্লেট দিতে বললেন । পিয়নকে বেশ সুখী মনে হল । পিয়ন রুম থেকে বের হবার সময় তিনি পিয়নকে ডেকে বললেন , আমাকে আজকে অনেক পোলাও দিছে । এত আমি খেতে পারবনা তুই কিছু নিয়ে যা । স্যার আপনার অশেষ মেহেরবানি ।

শফিক অফিস থেকে বের হবার সময় লক্ষ করল তার রাগ তেমন একটা নেই । তবে সে সিদ্ধান্ত নিল আজ বাসায় ইচ্ছা করে দেরিতে যাবে । কেয়া অবশ্য ফোন দিয়েছিল । সে বলেছে , আজ দেরী হবে । কিন্তু এখন সে যাওয়ার কোন জায়গা পাচ্ছেনা । সে সিদ্ধান্ত নিল বাসার আশেপাশে কোথাও সে একটু হাটবে । এরপর ৮টার দিকে বাসায় ঢুকবে ।

শফিকের সাথে কেয়ার বিয়েকে এক হিসেবে লাভ ম্যারেজ বলা যায় । সে দেখতে খুব বেশি একটা হ্যান্ডসাম না । এবং মেয়েদের সাথে আড্ডা দেয়ার স্বভাবও তার ছিলনা। ছোটবেলা থেকে সে মেয়েদের থেকে একটা সুনির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখত । তবে ভার্সিটি জীবনে প্রেম করার ইচ্ছা পোষণ করলেও আর এগুতে পারেনি । তখন সে শিক্ষা পেয়েছিল , যদি প্রেম করতে চাও তো জীবনের একদম শুরু থেকে শুরু কর । নয়ত জীবনেও তা হবেনা । জবে ঢুকার পর পরই তার মা তাকে বিয়ে দেবার জন্য উঠেপড়ে লাগে । তখন সে বলে দেয় , তোমরা যা খুশি কর। তখন ই কেয়ার সাথে তার দেখা । তার পাশের বাসায় থাকত । প্রথম কেয়াকে দেখে শফিক একটু বিব্রত হয়ে যায় । মেয়েটার মধ্যে কিছু একটা তার খুব ভালো লেগেছে । কিন্তু কী সেটা তা সে আজও ধরতে পারেনি । প্রতিদিন সে মেয়েটাকে দেখার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করত । একসময় সে তার মাকে এই মেয়েটার কথা বলে । সে খুব ভয়ে ছিল মেয়েটা রাজি হবে কিনা । কিন্তু দেখা গেল মেয়েটা খুব সহজেই রাজি হয়ে গেল ।

বিয়ের প্রথমদিন শফিক অনেক লজ্জা পাচ্ছিল । হঠাৎ কেয়া বলে উঠল , এই এখন লজ্জা পাচ্ছ কেন ? আগে যখন পর্দার ফাক থেকে আমাকে দেখতে তখন লজ্জা লাগতনা । শফিক একটু বিব্রত হয়ে । বিয়ে হল আজ প্রায় দুই বছর । অনেক আদর্শ স্বামী-স্ত্রীর মত তারা ঝগড়া না করে থাকেনি । বরং প্রায়ই তারা ঝগড়া করে । আরো স্পেসিফিকভাবে বলতে গেলে কেয়া প্রায়ই তার উপর রাগ করে । শফিককে অনেক সাধনা করে সে রাগ ভাঙ্গাতে হয় । কিন্তু শফিক খুব ভালভাবেই বুঝতে পারে এই মেয়েটা তাকে কতটা ভালবাসে ।

শফিক হঠাৎ বাসায় যাবার জন্য তাগিদ অনুভব করে । সে বাসায় চলে যায় । তবে রাগী ভাবটা ধরে রাখে । রাতে ডিনারটা অবশ্য করে । ডিনার শেষে কেয়া বলতে থাকে , এই যে রাগকুমার এ আপনার কেমন রাগ গো । আমার উপর রাগ করেছেন ঠিকই কিন্তু আমার হাতের রান্না খাচ্ছেন । আপনি ভুলেও ভাইবেননা আমি আপনাকে আজকে সরি বলব । শফিক মনে মনে বলল , ম্যাডাম আজকে আমি এত সহজে রাগ ভাংতেছিনা ।

রাতে বারান্দায় শফিক বসে আছে । তখন কেয়া এসে কফি এগিয়ে দেয় । শফিক অন্যদিকে তাকিয়ে কফিটা হাতে নেয় ।স্যার আপনার রাগ ভাঙ্গাতে আমি আসিনাই । বুঝছেন ?

শফিক সিদ্ধান্ত নেয় সে ভুলেও এখন কেয়ার দিকে তাকাবেনা । কারন সে জানে এখন মায়ার দিকে তাকালেই তার রাগ পড়ে যাবে  । কিন্তু সে আবিষ্কার করল সে মায়ার দিকে তাকিয়ে ফেলেছে । মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে সে শফিকের দিকে তাকিয়ে আছে । সুন্দর করে সেজে এসেছে ।

আচ্ছা যাও সরি বললাম । এতই যখন চাচ্ছ । খুশি ।

শফিক মাথা নাড়ল ।

তুমি কি জান যে তুমি রাগতে পারনা । তোমার রাগ হয়না । আর যদি রেগেও যাও তা ভাঙ্গানো অনেক সোজা ।

শফিক একটু ভাব ধরে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল ।

আচ্ছা শুনেন । রাগ টাগ বাদ দিয়ে বলেন সামনে যে গেস্ট আসতেছে তাকে নিয়ে কী কিছু ভাবছেন ।

গেস্ট কবে আসবে?

এই ধর নয় দশ মাসের মধ্যে ।

মানে ?

মানে টানে বলতে পারবনা । আমার খুব ঘুম আসছে । বলে কেয়া উঠে চলে গেল । শফিকের চোখ দিয়ে পানি চলে আসছে । ছেলেদের কাদা ঠিক না । তবে কেন যেন সে তার আনন্দের অশ্রুকে কোনভাবেই বাধা দিলনা । মেয়েটা এমন কেন ? এত বড় একটা সংবাদ কত সাদামাটা ভাবেই না বলল ।

 

 

১,১১৯ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “রাগ”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।