ফুটবল এবং আমরা

আপনারা সবাই ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন ৫ বারের ফুটবল বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিলের জার্সিতে এবার মেড ইন বাংলাদেশ লেখা থাকবে । অর্থাৎ তারা বাংলাদেশের বানানো জার্সি পরে খেলবে । এজন্য শুরুতে আমি এদেশের পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত সকল শ্রমিক এবং মালিক সকলকেই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে চাই  । কারন আজ তাদের প্রচেষ্টাই আমাদের এত বড় এক অবস্থানে এনে দিয়েছে । এবং সেই সাথে শুভকামনা করতে চাই যাতে বর্তমান সংঘাত এবং নানা দুর্ঘটনাকে উপেক্ষা করে যেন আমাদের পোশাক শিল্প আরো অনেক দূর এগিয়ে যায় এবং বিশ্বের মাঝে মাথা উচু করে দাড়িয়ে থাকে । সেই সাথে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ যাতে তারা আমাদের এই পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং কাজের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করেন ।

 

কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ট্রফিটা প্রদর্শনীর জন্য নিয় আসা হয় । ঢাকার রেডিসনে অনেক ফুটবলপ্রেমী সেই ট্রফি দেখে এসেছেন , ছবি তুলেছেন , আক্ষেপ ও করেছেন যে এই ট্রফি বাংলাদেশ কখনো নিজের করে নিতে পারেনি । তাই দুধের সাধ ঘোলে মিটানোর জন্য আজকে আমাদেরকে এভাবে প্রদর্শনিতেই দেখতে হয় ।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেট পাগল জাতি হলেও বাংলাদেশে কিন্তু ফুটবলের উম্মাদনা চোখে পড়ার মত । এমন অনেকেই আছেন যারা ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবল খেলা দেখতে বেশি ভালবাসেন । ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ , স্পেনিশ লিগ , বুন্দেসলিগা – ইত্যাদি ইউরোপিয়ান লিগের খেলা দেখার জন্য অনেকেই সারারাত জেগে থাকেন ।  আমি নিজেই একমাত্র বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা ছাড়া আর কোন ক্রিকেট খেলা খুব একটা দেখিনা । কিন্তু ঠিকই চেষ্টা করি ফুটবল লিগের খেলাগুলো নিয়মিত দেখার । শুধু ব্রাজিল আর্জেন্টিনার ফ্যান ই নয় , বিশ্বের বড় বড় ফুটবল ক্লাব যেমন রিয়াল মাদ্রিদ , বার্সেলোনা , ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড , আর্সেনাল , বায়ার্ন মিউনিখ ইত্যাদি অনেক ক্লাবের ফ্যান ও বাংলাদেশে আছেন । ইউরোপিয়ান দেশগুলোর দর্শকদের চেয়ে আমাদের দেশের দর্শকরাও কিন্তু ফুটবল উম্মাদনার দিক থেকে কম জাননা । বরং আমি মনে করি আমাদের দেশে এ উম্মাদনা সেসকল দেশের দিক থেকে কিছু কিছু অংশে বেশি । এমনকি সেসব দেশের মত আমাদের দেশেও এসকল ক্লাবের সমর্থকদের জন্য ফেসবুকে আলাদা পেজ আছে । এবং সেখানে প্রতিনিয়ত ফুটবল বোদ্ধারা তাদের নানান মত প্রকাশ করে চলেছেন । আর বিতর্ক ও চলছে যে কার দল ভালো কার দল খারাপ – এ নিয়ে ।

 

এটাতো গেল ফুটবল খেলা দেখা এবং সমর্থনের কথা । ফুটবল খেলার দিক থেকেও আমাদের উম্মাদনা কম না ? শহর গ্রাম সবখানেই নিয়মিত ফুটবল খেলা হচ্ছে ক্রিকেটের পাশাপাশি । আমাদের দেশের তরুনদের তো ট্রেডিশনই আছে বর্ষাকালে একবারের জন্য হলেও ফুটবলটা পায়ে লাগানো – পারুক না পারুক । ফুটবল খেলা দেখা ও খেলা কোন দিক থেকেই আমরা অন্য ফুটবলপ্রেমি জাতিদের থেকে পিছিয়ে নেই । কিন্তু ফিফা র‍্যাংকিং এ আমাদের অবস্থান ১৬৮ তম ।

 

প্রশ্ন জাগলেও আমরা সকলেই এর উত্তর খুব ভালো করে জানি যে আমরা ফুটবলকে ক্রিকেটের মত যতই ভালবাসিনা কেন এদেশে ফুটবলকে ক্রিকেটের মত এমন যত্ন করা হয়না । বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা নিয়ে যতটুকু যত্ন করা হয় , তার সিকিভাগ যত্নও ফুটবল পায়না । যদিও এদেশে ক্রিকেটের আগে ফুটবল এসেছে । ১৯৫০ সালে যখন ভারত ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য কোয়ালিফাই করে সে দলেও বাংলাদেশের খেলোয়াড় ছিল । তাছাড়া ৮০’র দশকে ও এদেশের ফুটবল খেলা যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল । তখন আবহানী মোহামেডান এর খেলা নিয়ে কিন্তু আজ রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার মত মাতামাতি হত । বেশিদিন না , কয়েকবছর আগেও আমরা সাফ ফুটবলে মালদ্বিপকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলাম । কিন্তু আজ আমাদের দেশের ফুটবলের দৈন্য দশা । এবারের সাফ ফুটবলে আমরা প্রথম পর্বই পার হতে পারিনাই ।

 

আসুন এবার খুব ভালভাবে বুঝে নেই ফুটবল চর্চা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি ? আমরা যারা ইউরোপিয়ান ফুটবল দলগুলোর খেলা দেখি তারা খুব ভালভাবেই জানি সেসকল দেশগুলোতে ফুটবলকে কতটা চর্চা করা হয় । প্রতিটা বড়বড় ক্লাব থেকে শুরু করে ছোটছোট ক্লাবগুলোতে ইয়োথ স্কোয়াড বলে একটা প্রতিষ্ঠানের মতন আছে । সেখানে খুব অল্পবয়সী শিশুদের খুজে আনা হয় যাদের ফুটবলার হবার আগ্রহ আছে এবং ভবিষ্যতে ভালো খেলবে এমন সম্ভাবনা দেখা যায় । এবং তাদেরকে একদম শুরু থেকে ট্রেনিং দিয়ে তাদের ফুটবলের প্রতিভা বিকষিত করবার সুযোগ দেয়া হয় । আজ আমরা যে রোনালদো মেসি নিয়ে মাতামাতি করি তারা কিন্তু এভাবেই এসেছেন । তাছাড়া বিভিন্ন বয়স ভিত্তিক যেমন অনুর্ধ্ব ১৬, অনুর্ধ্ব ১৯ – এ জাতীয় লিগের আয়োজন করা হয় । প্রতিটা ক্লাবেরই এসকল বয়সভিত্তিক দল  থাকে । খুব ভালমতন বলতে গেলে ওরা ভালো কাদামাটি খুজে বের করে এবং তাকে আস্তে আস্তে করে নিখুতভাবে ট্রেনিং দিয়ে একটা সুন্দর মুর্তি গড়ে তোলে ।

 

কিন্তু আমাদের দেশে কী তা হয় ? কখনোই না । হয়ত বিভিন্ন স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক টুর্নামেন্ট হয় । কিছু বয়স ভিত্তিক টুর্নামেন্ট ও হয় । কিন্তু তা কতটা ফলপ্রসু ? সত্যিই কী আমরা একজন প্রতিভাবান ফুটবলারকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করে একজন ভালো মানের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি ? উত্তরটা অবশ্যই না । আমাদের দেশের লিগের খেলা মানুষ কেন দেখেনা এ প্রশ্নের খুব সহজ উত্তর হল আমাদের লিগের খেলার মান bellow standard . আমি সেদিন একটি ফাইনাল খেলা দেখেছি  । প্লেয়াররা ঠিকমত পাসই দিতে পারছেনা । কোন কম্বিনেশন নাই । আমি এখানে নিশ্চয়ই স্পেনিশ লিগের মত খেলা আশা করবনা । তবে একটা মানসম্মত খেলা আশা করার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে ।

আমি আমাদের বাফুফে সভাপতিকে দোষ দিবনা । অল্প বাজেটে তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করছেন এ দেশের ফুটবলের উন্নতির জন্য । তাছাড়া সবসময় চেষ্টা করা হচ্ছে যেন ভালমানের কোচ জাতীয় দলের জন্য নিশ্চিত করা হয় । কিন্তু একজন জাতীয় দলের কোচের ক্ষমতা বর্তমান ফুটবল প্রেক্ষাপটে খুবই সীমিত । কারন , বর্তমানে জাতীয় লেভেলের ফুটবল পুরোপুরি ক্লাব ডিপেন্ডেন্ট । একটা প্লেয়ারকে ক্লাব থেকেই উঠে আসতে হয় । জাতীয় দলের কোচ শুধু বিভিন্ন ক্লাবে খেলা সেদেশের প্লেয়ার জাতীয় দলের ম্যাচের আগে কিছুটা সময় ট্রেনিং দিতে পারেন ।  আর হয়ত সেদেশের ফুটবলকে কীভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে বোর্ড সভাপতির সাথে দেন-দরবার করতে পারেন । এর বেশি তার তেমন কিছু করার নেই । তাছাড়া আমাদের দেশে যেসকল কোচ আসেন বাফুফে অনেক সময় সীমিত বাজেটের কারনে ঠিকমত বেতন দিতে পারেননা । তাই একজন ভালো কোচ আনা হলেও কিন্তু তাকে বেশিদিন ধরে রাখা যায়না ।

 

এবার ক্লাব পর্যায়ে আসি । আমাদের দেশের ক্লাব কর্মকর্তাদের প্লেয়ার তৈরির চেয়ে প্লেয়ার কেনার প্রতি বেশি আগ্রহী । খুব কম প্লেয়ারই তৃনমুল পর্যায় থেকে উঠে আসে । তাছাড়া তারা মনে করেন বিদেশী প্লেয়ার মানেই সে অনেক ভাল । আর কেউ যদি পেলের দেশ ব্রাজিল বা ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার হয় তাহলে তাকে তেমন ফুটবল না জানলেও চলবে । আর আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া বা ঘানা ইত্যাদি দেশ থেকে যদি কমদামি কাঠিও আনা হয় সেও অসাধারন ফুটবলার । বিদেশী প্লেয়ার আনতে দোষ নেই । কিন্তু তাই বলে বাজে মানের প্লেয়ার এনে তাকে খেলানো আর দেশের একজন ভালো প্লেয়ারকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা নিশ্চয় ভালো কোন সিদ্ধান্ত নয় । বিদেশ থেকে ভালো প্লেয়ার আনা অবশ্যই জরুরী কারন একজন ভালো প্লেয়ার পাশে থেকে আমাদের ফুটবলাররা অনেক কিছু শিখতে পারবে যা তাদের ক্যারিয়ারে কাজে লাগবে । আমাদের দেশে শহরে, গ্রামে-গঞ্জে অনেকেই ফুটবল ভালো ফুটবল খেলে । কিন্তু হারিয়ে যায় একসময় । একটু পরিচর্যা পেলে হয়ত তাদেরকে বিশ্বমানের ফুটবলার বানানো সম্ভব । আমাদের ক্লাব কর্তৃপক্ষের সেসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয়না ।

 

আমাদের দেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি গরীব দেশ যেখানে অনেক মানুষই আছে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুড়োয় অবস্থা । সেখানে খেলাধুলার পেছনে অর্থ খরচকে অনেকেই অর্থের অপচয় হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন । আজ দেখুন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ও কিন্তু এত ধনী দেশ না । কিন্তু বিশ্ব মানচিত্রে কিন্তু তারা মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছেন । আজ পুরোটা বিশ্ব তাদেরকে চেনে তাদের ফুটবলের কারনে । হ্যা এটাও হয়ত সঠিক যে আমাদের দেশের আবহাওয়া ফুটবলার তৈরির জন্য খুব একটা অনুকুল না । কারন আমাদের ফিটনেস সুবিধার না । কিন্তু সেই বাধা কী খুব বেশি বড় বাধা ? আমাদের দেশেও অলিগলিতে ক্রিকেটারদের মত ফুটবলারও তৈরি হচ্ছে । যাদের একটু চর্চা করলে তারা বাংলাদেশকে অনেক ফুটবলবিশ্বে অনেক সম্মান এনে দিবে । হয়ত ক্রিকেটের মত ফুটবল নিয়েও আমরা তখন গর্ব করতে পারব । আমরা কী পারিনা সেসকল প্লেয়ারদের সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে ?

 

৭৩২ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “ফুটবল এবং আমরা”

  1. হারুন (৮৫-৯১)

    কিন্তু ফিফা র‍্যাংকিং এ আমাদের অবস্থান ১৬৮ তম ।
    বিকেএসপি-র র‍্যাংকিং কত রাশেদ?
    বিসিসি তে আমার র‍্যাংকিং তোমার উপ্রে ছিল


    শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রোতে ভাসা..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।