আমার কলেজের শিক্ষকেরা (উপাধ্যক্ষ)

দীর্ঘ বিরতির পর আবার কিবোর্ড হাতে নিয়ে বসলাম। খাওয়া-দাওয়া, ঘুমের মত সবচেয়ে জরুরী কাজগুলো আমাকে এতোটাই ব্যস্ত রেখেছে যে সময় করে উঠা যাচ্ছে না। সবার যেমন সময় নির্দিষ্ট, আমারও সময় নির্দিষ্ট। যে চিন্তা থেকে লেখাটা শুরু করেছিলাম তা বোধহয় সময় করে শেষ হবে না। তবুও দেখা যাক, কতদূর যাওয়া যায়। কি জানি একটা ইংরেজি প্রবাদ আছে না, ওই যে পথিক… অনেক দূর… দুত্তোরি, লেখা শুরু করি, জ্ঞান বেশি দেয়া হচ্ছে।

আমার ক্যাডেট কলেজ জীবনে সর্বপ্রথম উপাধ্যক্ষ স্যার ছিলেন জনাব সৈয়দ রফিকুল হোসেন স্যার। স্যারের লেখক নাম রফিক নওশাদ। বেটে খােটো, স্বাস্থ্যবান স্যার। স্যারের সারা মুখ জুড়ে দাড়ি ছিল। স্যার মাথায় একটি সাদা টুপি পড়তেন। রামপুরি কালো টুপির উন্নত ধরণের সাদা ভার্সন। একজন উপাধ্যক্ষের সাথে একজন ক্লাস সেভেনের যেমনতরি সম্পর্ক থাকার কথা, আমার সাথেও স্যারের ঠিক ততটাই ছিল। আমরা স্যারকে যথেষ্ট কড়া প্রকৃতির দেখেছি। স্যারের চোখ গরম করে চোখ পাকিয়ে কথা বলা দেখলে আমাদের আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড় হতো। স্যার মাঝে মাঝে শাস্তি দিতেন, বেত্রাঘাত। আমি কখনো তা খাই নাই, তাই অভিজ্ঞতা নাই। দুষ্টু ক্যাডেট, বেয়াদব ক্যাডেট, ছন্নছাড়া ক্যাডেট, পড়াশুনায় দূর্বল ক্যাডেটের জন্য স্যার সাক্ষাৎ যম ছিলেন। বোধকরি আমরা স্যারের শেষ সময়টা পাওয়ার কারণে আমরা স্যারের এই মূর্তি দেখেছি। স্যারকে ক্যাডেট কি, অন্যান্য স্যাররাও, কলেজের সবাই সমঝে চলতো। স্যারের কিছু অনন্য গুনাবলী ছিল। আমরা যখন ক্লাস সেভেনে, তখন একটি অলিখিত নিয়ম ছিল ক্লাস সেভেন কখনো হাঁটবে না, দৌড়াবে। আর ক্লাস এইট জোর কদমে চলবে। এর পর অন্যান্য ক্লাস। আর ক্লাস টুয়েলভ একটু হেলতে-দুলতে চলবে। ক্লাস সেভেন একাডেমি ব্লক থেকে দৌড়ে হাউসে যাবে, হাউস থেকে ডাইনিং হল, ডাইনিং হল থেকে মস্ক, সব জায়গায় দৌড়। বিকেলে চা-নাস্তা (টি) শেষে সবার শেষে যখন ডাইনিং হল প্রিফেক্ট ঘোষণা করতো ক্লাস সেভেন, ক্যারি অন, তখন কাঠের বেঞ্চ ডিঙ্গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে কলেজ মস্কের দিকে ছোটার কথা কিঞ্চিৎ মনে পড়ে। রফিক স্যার প্রতিদিন নিয়ম করে মসজিদে নামাজ পড়তে যেতেন। স্যারের সাথে যাত্রাপথে দেখা হলেই দেখা যেতো, স্যার ক্লাস সেভেনকে ধমকে দৌড়ানো বাদ দিয়ে হেঁটে যেতে বলছেন। এমনকি স্যারের অবয়ব দেখলে ক্লাস টুয়েলভের সিনিয়র ভাইয়েরা পযর্ন্ত জুনিয়রদের হেঁটে যেতে বলতো। স্যার যদি হুনাইন হাউসের সামনে থাকে তবুও বদর-হুনাইনের মাঝের জায়গা থেকে সবাই হেঁটে চলতো। আমরা স্যারকে বেশ ভয়ই পেতাম। তবু ক্লাস সেভেন টাইমে অবুঝ মনে রয়ে সয়ে স্যারকে পাশ কাটানোর সময় হেঁটে যেতাম, সামনে দশ পা গিয়ে আবার দৌড়। স্যার উপাধ্যক্ষের বাড়ি থেকে হেঁটে কলেজ মসজিদে আসতেন। তিনি সর্বদা রাস্তার ডান পাশ ঘেষে মাঠের পাশ দিয়ে চলাচল করতেন। পরবর্তীকালে পড়াশুনা করার সময় জেনেছি যে, এটিও একটি সুন্নাহ, রাস্তায় চলার আদব, আমল। স্যার অসাধারণ আবৃত্তি করতেন। প্রত্যেক জাতীয় দিবসে স্যারকে অডিটোরিয়ামে আহবান করা হতো কিছু বলার জন্য। ধীরপদে স্যার ডায়াসে আসতেন। তার কন্ঠের সাবলীল আবৃত্তি, বক্তৃতা সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো। স্যার সম্পর্কে ভালো ভাবে জানার সৌভাগ্য হয় আমাদের কলেজের বড়ভাই সাইদুল ভাইয়ের লেখা থেকে। সময়ের পরিক্রমায় স্যার একসময় প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হন। মাঝে মাঝে মনে হয়, স্যার উপাধ্যক্ষ না হলেই বরং ভালো হতো, ক্যাডেটরা উনার কাছ থেকে কিছু শিখতে পারতো। স্যার আমাদের কলেজ থেকে উপাধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় অবসরে গমন করেন। তখন আমরা এসএসসি ভ্যাকেশনে।

স্যার কলেজে থাকাকালীন একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। আমরা তখন ক্লাস টেনে। ২০০৫ সাল। সেসময় বড় উত্তাল সময়। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। আমরা ক্যাডেট কলেজে নিরাপদে আছি। বাইরের অবস্থা সম্পর্কে আমরা সবাই ওয়াকিবহাল ছিলাম না। এমনই একসময়ে আমাদের ক্লাসের এক বন্ধু নাইট প্রেপ শেষে হাউসে এসে খেয়াল করে তার শখের ক্যাসিয়ো হাতঘড়ি ভুলে ক্লাসরুমে ফেলে এসেছে। তো সে তাড়াতাড়ি সেই ঘড়ি উদ্ধারে একাডেমি ব্লকে গেলো। ইতোমধ্যে একাডেমি ব্লকের বেয়ারা হাতেম ভাই সব দরজা বন্ধ করে ফেলেছে। তো আমার বন্ধুটি ক্যাডেটদের ব্যবহার করার জন্য ক্লাস রুমে যে দুটি দরজা রয়েছে সেগুলো একটু টানাটানি করে একটি খুলে ফেললো। ষ্টিলের দরজার ছিটকানি অত শক্তভাবে লাগানো না থাকায় আর বন্ধুটি তার শক্তির কিছুটা প্রয়োগের ফলে দরজা খুলে সে ঘড়ি উদ্ধার করে তৃপ্তি নিয়ে হাউসে ফিরে আসলো। এদিকে দরজা খোলার সময় দরজার বেশ কিছু গ্লাস ভেঙ্গে যায়। অন্ধকার থাকায় সে এসব খুব একটা খেয়াল করেনি, ঘড়ি উদ্ধারই বড় কথা। পরেরদিন ক্লাসরুম খোলার সময় তা সবার নজরে আসে। কে ভাঙলো, কে দরজা খুললো? সারা কলেজে তা রটে গেলো। উপাধ্যক্ষ স্যার আমাদের ক্লাসে আসলেন। আমাদেরকে ভয় পেতে নিষেধ করলেন। বললেন যে, বাইরের থেকে কেউ দেয়াল টপকে ভিতরে এসেছিল। হয়তো ফ্যান, অথবা দামি কিছু নেয়ার জন্য এসেছিল। কিন্তু কোন কিছু না নিয়ে কেন চলে গেলো সেটাও হয়তো একটা রহস্য! আমরাতো ঘটনা আগের থেকে জানি। ঘটনা খারাপ দিকে মোড় নেওয়ার আগে, দরিদ্র কর্মচারী বেয়ারা, গার্ডদের উপর শাস্তির খড়গ নেমে আসার আগে বন্ধুটি কলেজ অথোরিটির কাছে দোষ কবুল করে। ফলস্বরূপ প্যারেন্টস কল, জরিমানা। আমার বন্ধুটি তার হাতঘড়ি উদ্ধারের জন্য রাত ১০:০০ টার পরে একাডেমি ব্লকে যাওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ আছে। ক্লাস টেনে থাকা অবস্থায় আমাদের অনেকেরই সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর টেবিল ডেস্ক থেকে হারায়। আমরা অনেকেই ঝামেলা এড়ানোর জন্য তালা লাগাতাম না।

স্যার একদিন ক্লাস এইটে থাকতে আমাদের একদিন ক্লাস নিলেন। যে স্যার আসার কথা উনি আসছিলেন না। আমাদের কথা বলার শব্দ হয়তো মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় তিনি দোতলা থেকে নেমে এলেন। হতভাগা ফর্ম লিডার সবাইকে ঠিক সময়ে সাবধান করতে ব্যর্থ হলো। কারণ সুযোগ খুব কম। ফর্ম বি কিনা। সিঁড়ি থেকে মাত্র কয়েক পা দূরে। স্যার ঢুকেই একপ্রস্ত চোটপাট করলেন। কেন চিল্লাপাল্লা করছিলে? যাইহোক উনি আমাদের বাংলা ক্লাস নিলেন। উনি শেখালেন ‘কি’ এবং ‘কী’ এর মধ্যে পার্থক্য। কোনটি অব্যয় আর কোনটি বিশেষণ। কোনটির উত্তর হ্যাঁ অথবা না দিয়ে দেয়া যায়, মাথা নাড়িয়ে দেয়া যায়, আর কোনটি দেয়া যায় না। তিনি উদাহরণ দিলেন খাবার আর মিষ্টি দিয়ে। সব অত বিস্তারিত মনে নেই। তখন অবশ্য মনে শেখার চেয়ে ভীতিটাই বেশি কাজ করেছে।

স্যার এক বর্ণাঢ্যময় জীবন পার করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র ছিলেন। যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের পর কলম চালিয়েছেন। লেখক সংগ্রাম শিবিরের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। বামধারার সাথে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতার পর নিজ অর্থে সাহিত্য পত্রিকা ছাপিয়েছেন। আবার ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করার সময় ছাত্রদের/ ক্যাডেটদের রাজনীতি থেকে বিরত রেখেছেন। টার্নিং পয়েন্ট কি ছিল? লেখক, কবি হুমায়ুন কবির হত্যা?

কলেজ থেকে বের হওয়ার পর স্যারের সাথে খুব একটা স্বাক্ষাত হয়নি। স্যারের গলায়/ জিহবা/ মুখ গহ্বরের ক্যান্সারের খবরটি শুনে কষ্ট লেগেছে। দুই দফায় দেশের বাইরে চিকিৎসা করিয়েও খুব লাভ হয়নি। স্যারের মৃত্যু আমাকে ধাক্কার মত দিয়েছে, আর স্মরণ করিয়ে দিয়েছে চিরস্থায়ী গন্তব্য।

ক্লাস সেভেনে প্রথম প্যারেন্টস ডে এর কথা মনে পড়ছে। সেসময় আমি প্যারেন্টস ডে পালন করেছি টিচার্স/ ষ্টাফ লাউঞ্জে। ৬ বছরের কলেজ জীবনে ওই একবারই ওখানে ঢুকেছি, ওই একবারই শেষ। আর কখনো ঢুকি নাই। আমার সহজ সরল বাবা-মা শুক্রবার সকাল ৮:০০ টায় বাসে উঠে কলেজে আসতে আসতে প্যারেন্টস ডে’র শেষ ঘন্টা বেজে গেছে। তখন আমার মা বলেছিল, ‘তাহলে কি আমার ছেলের সাথে দেখা হবে না?’ স্যার, উত্তর দিয়েছিলো, অবশ্যই হবে। আপনারা ষ্টাফ লাউঞ্জে অপেক্ষা করেন। নামাজ, লাঞ্চের পর সে দেখা করতে আসবে। আমি যাতে লাঞ্চের পর দেখা করতে পারি সে বিষয়টি তিনি সহস্তে নিশ্চিত করেছিলেন। হাতেম ভাইকে হাউসে পাঠিয়ে আমাকে খবর দিয়ে, লাঞ্চের পর ডিউটি মাষ্টারকে নির্দেশনা দিয়ে তা বাস্তবায়ন করিয়েছিলেন।

কলেজ জীবনে স্যারের সাথে শেষ মুহূর্তটা অত স্মৃতিমধুর ছিল না। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পর স্যার ডেকে নিয়ে আমাকে চোখ গরম করে বাংলা বাগধারা দিয়ে কষে বকা দিয়েছিলেন, “সাপের পাঁচ পা দেখেছো?” আমি আলাভোলা ক্যাডেট, সাপের পাঁচ পা শুনে সব গুবলেট পাকিয়ে গিয়েছিলো। পরীক্ষার পর লাঞ্চ, তারপর হাউসে আসা সব একটা স্বপ্নের মধ্যদিয়ে গিয়েছিলো। এখন ভাবি, ওই মুহূর্তে স্যার যদি আমাকে ওই সাহায্যটা না করতেন তবে আমার জীবন হয়তো অন্যরকম হতো। আমার জীবনটা অন্যখাতে প্রবাহিত হতো। আমি আমার জীবনে এইরকম শিক্ষক দ্বিতীয়টি দেখিনি।

কলেজে আমার পাওয়া দ্বিতীয় উপাধ্যক্ষ জনাব ফজলুল করিম স্যার ওরফে ফক স্যার। ফক এসেছে স্যারের নামের সংক্ষিপ্ত রুপ থেকে। কলেজে মাস হিসেবে ডিউটি রোষ্টার বের হতো। কোন স্যার কোথায়, কখন, কবে ডিউটি করবে সব লেখা থাকতো। সুন্দর ব্যবস্থাপনা। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ডিগ্রী না থাকা সত্বেও অত্যন্ত সুচারুভাবে এই কাজগুলো করা হতো। আমারই এক ক্যাডেট বড়ভাই এই ডিউটি রোষ্টার পড়া শিখিয়েছিলো। ডিউটি রোষ্টারে স্যারদের নাম সংক্ষিপ্তভাবে লেখা থাকতো। আর নিচে ফুটনোটে সবার নামের বিস্তারিত থাকতো। স্যার ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন। স্যার আমাদের কোন ক্লাস নেননি। কিন্তু ক্লাস টুয়েলভে কিছু প্রেরণামূলক ক্লাস নিয়েছেন। বাস্তবতা এসব হাইথট বিষয় বুঝিয়েছেন। স্যার বেশ চোস্ত ইংরেজী বলতেন। স্যারের সারা মুখভরা সুন্দর করে ছাটা দাড়ি ছিলো। স্যার লম্বা, সুদর্শন ও হ্যান্ডসাম ছিলেন। স্যারের মিসেস ছিলেন নাজনীন করিম ম্যাডাম। ফজলুল করিম স্যারকে আমরা একাদশের শেষের দিকে ও দ্বাদশ শ্রেণীর কিয়দংশ পেয়েছি। স্যারের সময় আমরা মুদ্রার দুই পিঠই দেখেছি। ভালো এবং মন্দ। শেষেরটা মন্দ হওয়াতে সবার মনে (আমাদের ব্যাচ) স্যার সম্পর্কে সুধারণা নেই। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একই ব্যক্তি সবসময়ে কোন একটি বিষয়ে সমধারণা পোষণ করবে, সময়ে সময়ে সেটি পরিবর্তিত হতে পারে। হয়তো উপয়ান্তর/ নিরুপায় হয়ে উনি কিছু কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। হুকুমের গোলাম আর কি। সিদ্ধান্ত কতটুকু সঠিক আর ভুল ছিল সেটা সময়েই বলে দেয়। তবে স্যারের প্রতি চিরকালই আমার শ্রদ্ধাবোধ আছে। তবে স্যারের চেয়ে আমি ম্যাডামকে একটু বেশিই শ্রদ্ধা করি। ম্যাডামের আলোচনাটা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানেই সেরে ফেলাটা জরুরি। ম্যাডাম, মানে নাজনীন ম্যাডামকে আমরা ক্লাসের শিক্ষক হিসেবে পাইনি। পেয়েছি প্রেপগার্ড টিচার হিসেবে। উনার একটা অসাধারণ গুণ ছিলো। উনি অল্পসময়ে সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। ম্যাডাম খুব সুন্দর করে হাসতেন। আমরা ইলেভেন টুয়েলভে থাকতে এমন কিছু নাই যে আমরা ম্যাডামের সাহায্য নেইনি। ইভিনিং প্রেপের সময় যদি ম্যাডাম আসতেন তাহলে আমরা জেপি, প্রিফেক্টদের একটা দলকে পাঠাতাম যে, আজকে নাইট প্রেপ করবো না, এই খেলা দেখবো, এই করবো, সেই করবো, সোজা কথায় অন্যায় আবদার। তো ম্যাডামকে রাজি করানোর পর ম্যাডাম যেতেন স্যারের কাছে। গিয়ে বলতেন, ওগো শুনছো, ছেলেরা না এটা চাচ্ছে। স্যারতো কোনমতেই দিবেন না। ম্যাডাম বলতো, কেন দিবা না? এইভাবে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর স্যার পরাজয় মেনে নিতেন। ম্যাডামের জয় সবসময় হতো। স্যার ম্যাডামকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। আমরা সেই অন্যায় সুযোগটা নিতাম। আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে মনে হয় কি বর্ণিল দিনগুলোই না পার করেছি! সেদিনগুলো আর ফিরে আসবে না। ম্যাডাম-স্যারের কোন ছেলে ছিল না। উনাদের দুই মেয়ে ছিলো। ম্যাডাম সব ক্যাডেটকে নিজের ছেলের মত স্নেহ করতেন। ম্যাডাম কলেজ থেকে যাওয়ার পর আমাদের এক বন্ধুকে ‘ওয়াছি’কে চিঠি লিখেছিলেন। তাও ক্লাস টুয়েলভে থাকা অবস্থাতেই। চিন্তা করলে ভাবি কতটা স্নেহ করলে একজন ম্যাডাম এই রকম কাজ করতে পারে! আমরা সেসময় ম্যাডামের চিঠি এসেছে শুনে সবাই ফর্ম-এ তে ছুটে গিয়েছিলাম যে, ম্যাডাম চিঠিতে কি লিখেছে? আমাদের কারো নাম আছে কিনা?

স্যার, ম্যাডাম কলেজে থাকা অবস্থায় আমরা (ব্যাচ) চিন্তা করলাম (ক্লাস ইলেভেন), আমরা ইন্টেক বার্থডে পালন করবো। যেই কথা, সেই কাজ। প্রত্যেক ক্যাডেটের একাউন্ট থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কাটা হলো। ৭ মে পুরো কলেজে কেক খাওয়ানো হলো। টিচারদের ষ্টাফ লাউঞ্জে, আর ক্যাডেটদের ডাইনিংহলে। লাঞ্চ শেষে ৫ নং বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে থ্রি চিয়ার্স হিপ হিপ হুররে শ্লোগান দিলাম। আশা করেছিলাম তখন পর্যন্ত ৫০ জন ক্যাডেট আর বছরখানেক সময় হেসে-খেলে পার করে দিবো। জানিনা সবার অজান্তে নিয়তি আমাদের নিয়ে বাঁকা মুখে হেসেছিলো কিনা।

ম্যাডামকে নিয়ে আমার একটি ঘটনার কথা মনে আছে। ম্যাডাম ডে ডিউটি মাষ্টার। লাঞ্চের পর ম্যাডাম আমাকে ডাকলেন। মাত্রই গায়ে নাইট ড্রেসের শার্টটা গলিয়েছি। ম্যাডাম আমাকে বাইরে ডাকলেন। তখন হাউস গার্ডেনিং কম্পিটিশনের জন্য জোর প্রস্তুতি চলছে। ম্যাডাম আমাকে রুমের একটু সামনে হাউসে ঢুকার মুখে দুই পাশে দুটি লাল বাগানবিলাস গাছ ছিলো। সেখানে নিয়ে আমাকে গাছ চেনাতে লাগলেন। রেজা, তুমি এই ফুলের নাম বলতে পারবে? আগ্রহহীন আমি কোন ফুলের নাম বলতে পারি না। ম্যাডাম বলে চলেছেন, এটা চেরী, এটা কসমস, এটা গ্লাডিওলাস….। তখন বাইরে মধ্যদুপুরের কাকফাটা রোদ। আমার রুমের সামনে। ডর্ম টু এডিএল আমার প্লেস। পশ্চিম দিকের তীব্র রোদ তখন। আমি মনে মনে ভেবেছি, এই মহিলা এই তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে আমাকে ফুল চেনাচ্ছেন, তার চেয়ে ভালো হতো উনি যদি ডিউটি মাষ্টারের রুমে গিয়ে বিশ্রাম নিতেন আর আমাকে একটু বিশ্রামের সুযোগ দিতেন। কিন্তু সেটা আর বলা হয়ে উঠেনি। একটা সময় ম্যাডাম এই হতচ্ছাড়া ক্যাডেটকে ছেড়ে দিলেন। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এই ঘটনাটা আমার মস্তিষ্কে কেনো জানি গেঁথে গেছে।

ম্যাডাম যখন কথা বলতেন, তখন উনার সারা চোখ-মুখ কথা বলতো, জ্বলজ্বল করতো। সবাই সেটা খেয়াল করতো কিনা জানিনা। হয়তোবা হ্যাঁ কিংবা না। ম্যাডাম যখন গার্ড দিতে আসতেন, তখন আমরা ম্যাডামের জুতার শব্দেই বুঝে ফেলতাম ম্যাডাম আসছে। ম্যাডামের স্যান্ডেলে শব্দ হতো। আর ফর্ম-এর সবাই হেসে দিতাম। ফর্মলিডার সাবধান করতো এই হাইসিস না। আমরা সব দুষ্টু পোলাপান ফায়দা লুটার জন্য ওৎ পেতে থাকতাম। ম্যাডাম এসে জিজ্ঞেস করতেন, হাসির শব্দ পাওয়া গেলো। তোমরা হাসো কেন? আমরা কিছু বলতাম না। আমরা উল্টা-পাল্টা অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতাম, ব্যক্তিগত প্রশ্ন। স্যার কেমন? রাগী নাকি? অবান্তর প্রশ্ন। কিন্তু ম্যাডাম ধৈর্য নিয়ে আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন। আমি ম্যাডামের নাম দিয়েছিলাম টুকটুকি। ম্যাডাম যেহেতু টুকটুক শব্দ করে আসতেন, তাই। তখন বিটিভিতে সিসিমপুর মাত্র শুরু হয়েছে। সেখানে টুকটুকি একটি চরিত্র ছিলো। সে ঝুটি নাড়িয়ে সুন্দরভাবে কথা বলতো।

টুয়েলভে মাঝামাঝি স্যার-ম্যাডাম আমাদের কলেজ ছেড়ে ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজে চলে যান। স্যারের সেখানে প্রমোশনাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট। স্যার সেখানে প্রিন্সিপাল হিসেবে যাচ্ছেন। আমি বা আমরা (ব্যাচ) মনে করেছি স্যার পুরস্কার পাচ্ছেন। যাইহোক অতীত ঘেঁটে লাভ নেই।
নাজনীন করিম ম্যাডামের ভিজিটিং কার্ড
স্যার-ম্যাডাম দুজনের সাথে আমার শেষ দেখা ২০১০-১১ সালের দিকে ঢাকা সিএমএইচ-এ। স্যার, ম্যাডামকে দেখে চিনতে পেরে সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলাম। কোথায় আছেন জিজ্ঞেস করলাম। কথাপ্রসঙ্গে ম্যাডাম স্যারকে বললো, এই দেখেছো, আমাদের বাসা কোথায় এই ছেলে মনে রেখেছে। এটা এখনো কানে বাজে। ম্যাডাম আমাকে উনার একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়েছিলেন। কারো কাছে কোন জিনিস অমূল্য, কারো কাছে মূল্যহীন। ম্যাডাম যখন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের উপাধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করেন,পরবর্তী সময়ে উনাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে আসার পরেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। খবরটা জানার পর কষ্ট পেয়েছিলাম। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাদের কাছে নিয়ে নেন। এখন এই লেখা লেখার সময় স্যারের একাকিত্ব বিষয়টা চিন্তা করে কষ্ট হচ্ছে।

রফিকুল হোসেন স্যার এবং ফজলুল করিম স্যার এবং এদের মাঝামাঝি সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করেন গণিতের শিক্ষক মোঃ আব্দুল বারী স্যার। স্যারের অন্য ক্যাডেট প্রদত্ত নাম ছিলো ডজার বারী স্যার। স্যার খালি ডজ মারতেন। স্যার খুব সুন্দর করে মুখ বাঁকিয়ে হাসতেন। স্যার রেগে গেলে ঝাড়ি দিতেন, কথায় আঞ্চলিকতা চলে আসতো, আর মাথা ডানে-বামে নাড়াতেন। ‘ক্যারে’-কথাটা স্যার প্রায়ই বলতেন। এইচএসসির সময় স্যার উপাধ্যক্ষ হিসেবে এক্সাম সেন্টারের দায়িত্ব পালন করেন। কলেজ ত্যাগের দিন ছিল ম্যাথ প্র্যাকটিক্যাল। এক্সটারনাল খুব কড়া, যশোর ক্যান্টঃ পাবলিক না জিলা স্কুলের টিচার। মাথা ঘুরাতে দিচ্ছে না। কঠিন ভাইবা নিয়েছে। পরীক্ষা দিয়ে আমরা ক’জন মাঝের সিড়ি দিয়ে (যেটা ক্যাডেটদের ব্যবহার করা নিষেধ ছিলো) উপরে গেলাম। ষ্টাফ লাউঞ্জে বাইরের টিচারকে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। স্যারকে ষ্টাফ লাউঞ্জের বাইরে ডেকে বিষয়টা বললাম। স্যার বললো, ‘আরে, এটা কিছুই না। চিন্তা করো না, আমি আছি না!’ স্যার এই কথাটা প্রায়ই বলতো। স্যার বেশ মেপে মেপে চিন্তা করে কথা বলেতো।

ক্লাস টুয়েলভের সময়। বলবিদ্যা ও বিচ্ছিন্ন গণিত। এইটা পড়ানোর মতো যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ছিলো না। ক্লাস টুয়েলভ পুরোটা সময় প্রেপ টাইম। নিজের মত করে পড়ো। টিচাররাও জানতো, কারণ ওই যে, এক কথা, ‘ক্যাডেট সব পারে।’ নিজের পড়া নিজেকেই করতে হয়। তখন কোন স্পেশাল ক্লাস করার দরকার আছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে পরীক্ষার জন্য এই বিষয়ের কথা বলা হলো। স্যার আসলেন, বারী স্যার। তিনি সূত্রগুলো পড়ালেন। বললেন, সূত্রগুলো সলভ করলেই পরীক্ষায় কমন ফেলানো সম্ভব। এইখানেও স্যার ডজ মারলেন। এই বিষয়টা ভালোমত আত্মস্থ না করার কারণে আমাকে আজও ভুগতে হচ্ছে। তবে স্যারদের খুব একটা দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ একইসাথে স্যারদের ক্লাস সেভেন থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত কোন বিষয় পড়ানো মুখের কথা না। যেটা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে আছে কিনা আমার জানা নাই। সেকেন্ডারী প্লাস হায়ার সেকেন্ডারী। একদিকে যেমন তিনশটা ছোট, মাঝারী, বড় শয়তান সামলাতে হয়, আবার হাউসের ক্যাডেটদের কম্বলের হিসাব রাখতে হয়। কঠিন বিষয়। নিজস্ব বিষয় পড়ানো, দূর কি বাত।

একদম কলেজ থেকে বের হওয়ার আগে জনাব মোঃ জয়েনউদ্দিন স্যার উপাধ্যক্ষ হিসেবে কলেজে যোগদান করেন। বাংলা অথবা ইংরেজীর শিক্ষক ছিলেন।

এইসব স্যার ম্যাডামরা আমার মত ক্যাডেটদের পিছনে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা খেটেছেন মানুষ করার জন্য। মাঝে মাঝে চিন্তা করি আদোও কি মানুষ হতে পেরেছি? একটা কথা শেষ কয়দিন খালি মনে আসছে। যে জিনিস আমার জন্য গর্বের, ঠিক একইভাবে সে জিনিস আমার দুর্বলতার কারণ। কারণ সেটি ছাড়া হয়তো আমার অস্তিত্ব নেই।

১২৫ বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।