আমার কলেজের শিক্ষকেরা (অধ্যক্ষ)

আমার শিক্ষক ভাগ্য ছোটবেলা থেকেই ভালো। বরাবরই আমি গুরুজন শিক্ষকদের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখেছি। এ অধ্যায়ে আমি আমার কলেজে পাওয়া শিক্ষকদের স্মৃতিচারণ/স্মরণ করবো। আমি আমার শিক্ষকদের কাছে কৃতজ্ঞ। শুধুমাত্র পেশাগত শিক্ষক নয়, অন্য যারা আমাকে কাজের মাধ্যমে, কথার মাধ্যমে, আচরণের মাধ্যমে আমার স্মৃতির মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই এ লেখা লিখছি। কারণ উনাদের ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। আর লেখার মাঝে কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ থাকবে, যা একান্তই ব্যক্তিগত। কেউ পড়ে কষ্ট পেলে আমি দুঃখিত। এ লেখার পিছনে আরো কিছু কারণ আছে, যেমন আমার শিক্ষকেরা একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছেন। হয়তো তাদের স্মৃতিগুলো সময়ের সাথে সাথে চাপা পড়ে যাবে। আর আমার মাথার নিউরণগুলো যত দিন যাবে পুরনো স্মৃতিগুলো মনের অজান্তে অপ্রয়োজনীয় ধরে নিয়ে ক্যাশ মেমোরীর মত ফাঁকা করে ফেলবে, সেটা একটা সমস্যা। তাই যৎসামান্য যা মনে আছে এখনো, কিবোর্ডের র্খোঁচা দিয়ে লিখে ফেলার জন্য এই প্রয়াস।

ক্যাডেট কলেজ হচ্ছে একটা বড়সড় চিড়িয়াখানা। অনেকে আধুনিক কারাগার বলে। আমার কাছে চিড়িয়াখানা মনে হয়। এটা এক অন্য জগত। এখানে পাখিও নিয়ম করে সকালে ডাকে। সব নিয়মের মধ্যে। মানুষগুলোও নিয়মের মধ্যে আটকা পড়েছে। এখানে মনে হয় সময় স্থির।

প্রথমেই আমার সময়কালে কলেজের অধ্যক্ষদের আলোচনা করবো। আমার কলেজে প্রবেশের সময় কলেজের অধ্যক্ষ স্যার ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্যার। রসায়নের অধ্যাপক। সায়েন্সের স্যারদের খুব একটা অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষ হিসেবে দেখা যায় না। এই হিসেবে উনি ব্যতিক্রম। স্যার বেশ রাশভারী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। কাঁচা পাকা গোঁফ। অবশ্য বেশিরভাগ শ্বেত শুভ্র। মধ্য গড়নের শরীর। স্যার সবর্দা সাদা শার্ট আর সাদা ফুলপ্যান্ট এবং কলেজ টাই পড়ে আসতেন। স্যারের গায়ের রংও ছিল সাদা। সাদা যে শুভ্রতা আর পবিত্রতার প্রতীক সেটা উনার সর্বাঙ্গে সাদা দেখেই বোঝা যেতো। ক্যাডেটদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও উনি ফর্মাল থাকতেন। কখনো পরিমিত এর বাইরে স্যারকে যেতে দেখিনি। কলেজে ঢোকার আগে যে প্রসপেক্টাস দেয়, সেখানে স্যারের ছবি ছিল। নভিসেস ড্রিলে প্যারেড কম্যান্ডার আর হাউস প্রিফেক্টকে ট্রফি দিচ্ছেন। কলেজে গিয়ে দেখলাম ইনিই অধ্যক্ষ। স্যারকে আমি বেশিদিন পাইনি। আমি অষ্টম শ্রেণীতে থাকার সময় তিনি অবসরে যান।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্যারের অবসরের পর কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে আসেন ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ স্যার। এখানে আসার পূর্বে উনি পাবনা ক্যাডেট কলেজে উপাধ্যক্ষ ছিলেন। স্যার বেশ সময়কাল নিয়ে আমাদের কলেজে ছিলেন। মাঝারি গড়নের শ্যামলা বর্ণের, খানিকটা স্থুলকায়। আমি দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি অবসর নিয়ে কলেজ ত্যাগ করেন। আমাদের কলেজে থাকার সময় স্যারের মেয়ের বিয়ে হয়। স্যারের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে কলেজ ডাইনিংহলে ক্যাডেটদের মিষ্টি পরিবেশন করা হয়। সমসাময়িককালে আমাদের কলেজে আরেক স্বনামধন্য শিক্ষক, মতিউর রহমান স্যারেরও মেয়ের বিয়ে হয়। উনিও কলেজের প্রত্যেকটি ক্যাডেটকে মিষ্টি খাওয়ান। মিষ্টি খাওয়ার পর আমার অদ্ভুত চিন্তা এসেছিল। উনারা উনাদের পারিবারিক আনন্দ সবার সাথে ভাগাভাগি করার জন্য তিনশত ক্যাডেট প্লাস আরো শ’খানেক কর্মচারীকে মিষ্টি খাওয়ার জন্য কি বিপুল আয়োজন ও টাকা ব্যয় করেছিলেন! টাকার অংকে সেটা কম নয়। আর রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় খাওয়ানোর আয়োজনের কথা তো বাদ দিলাম। অতিথিদের খাওয়ানোর অনুষ্ঠানগুলো কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হতো।

স্যার প্রিন্সিপাল থাকা অবস্থায় কিছু ঘটনা এখনো আমার মনে আছে। আমরা তখন ক্লাস নাইন। আপ স্টেয়ার লিডার। গরমকাল। নাইটপ্রেপ শেষ করে কোনমতে স্লিপিং গাউন গায়ে চাপিয়ে মশারি সরিয়ে ঘুমাচ্ছি। গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। হঠাৎ রাত দেড়টা-পৌনে দুটার দিকে ঝড়ের বেগে অধ্যক্ষ স্যারের ঝটিকা সফর। ঝড়ের বেগে প্রত্যেক হানা দিলেন। “ইউ ক্যাডেট, হোয়াই আর ইউ ইন দিস ড্রেস? হোয়াই আর ইউ নট ইন বেড? হোয়াই মসকিউটো নেট ইস নট ইন রাইট প্লেস? হোয়াই? হোয়াই?” থতমত খেয়ে সম্বিত আসার আগে অধ্যক্ষ স্যারের নির্দেশ, স্টাফ নাম নোট করুন। সাথে আসা স্টাফও তড়িৎ গতিতে নাম আর ক্যাডেট নম্বর নোট করেন। খুব বেশি হলে দশ সেকেন্ড করে প্রত্যেক ডরমে অভিযান চালিয়ে স্যার ফিরে গেলেন। পরেরদিন পুরা কলেজের হট টপিক। সেভেন-এইট বাদে সবাই কম বেশি তিন হাউসে প্রায় সবাই ধরা খেয়েছে। পরবর্তীতে এই শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজের জন্য সবার বাসায় প্রেমপত্র (সতর্কীকরণ) যায়, আর পুত্র/ পোষ্যের অপরাধের জন্য পঞ্চাশ টাকা জরিমানা করা হয়।

আরেকটি ঘটনা। তখন আমরা ক্লাস টেন। পাংখা গজিয়েছে। কলেজে মোটামুটি সিনিয়র। ডিনার শেষ করে একাডেমিক ব্লকে নাইট প্রেপ শুরুর আগে ফরমের পোলাপান সবাই একপ্রস্থ নাচা-গানা করে নিতাম। শয়তানি-দুষ্টামি যা করা যায়। ইলেভেন-টুয়েলভ হেলতে দুলতে ব্লকে আসার আগে বেশ কিছুটা সময় পাওয়া যায় আর প্রেপ শুরু না হওয়ায় নাইট ডিউটি মাষ্টাররাও বেলের জায়গাটায় আড্ডা দিতেন। টেন ফরম বি তো মেলা দূর। তো একদিন পোলাপান মজা করতেছে, খেয়াল নাই। অধ্যক্ষ স্যার মনে হয় রাউন্ডে অথবা একটু হাঁটতে বের হয়েছিলেন। চিল্লাপাল্লা দেখে তিনি শেড দিয়ে হেঁটে আসলেন। শেডের পাশ দিয়ে উঁচু গাছের ঝাড় থাকায় আর শেড অন্ধকার থাকায় অত ভালো ঠাওর করা যেতো না। তো শেষ মুহূর্তে যখন খেয়াল হলো ততক্ষণে অনেক দেরি। সবাই যাওবা একটু গোছগাছ করে, বিষম খেয়ে সিটে বসেছে, আমাদের এক বন্ধু (প্রেপ ডিউটি ক্যাডেটের সামনের চেয়ার) একটু দেরিতে অনুধাবন করে যে, কিছু একটা হচ্ছে। উনি আবার আনন্দের আতিশয্যে নিজের চেয়ারের উপর উঠে লাফালাফি করছিলেন। হঠাৎ দেখেন কে জানি তাহার বাম কর্ণ ধরিয়া টানিতেছে। কোন দুষ্ট বদমাশ তাহার কান ধরিয়াছে তাহা ছাড়াইতে গিয়া দেখেন স্বয়ং অধ্যক্ষ মহাশয়! অধ্যক্ষ মহাশয় জিজ্ঞাসিলেন, তা ক্যাডেট চেয়ারে উঠিয়া কি করিতাছিলে? ক্যাডেট উত্তরে কহিল, স্যার মশক খুব জ্বালাইতেছে। তাই মশক মারিতেছিলাম। অধ্যক্ষ যত চাপিয়া ধরে, ক্যাডেট ততই আবৃত্তি করে মশক খুব বিরক্ত করছিল। অধ্যক্ষ স্যারকে দেখিয়া গদগদভাবে ডিউটি মাষ্টার আসিলেন। স্যারের নির্দেশে উনিও একদফা জেরা করিলেন। তবুও হাতে নাতে নাচিতে গিয়ে ধরা খাওয়া ক্যাডেটের যুক্তি, স্যার, মশা মারিতেছিলাম। যাই হোক সেই বেলা সেই ক্যাডেটকে মৃদু বকুনি দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। স্যারও হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, কিছু দুষ্টামি ছাড় দেয়া যায়।

স্যারের সময়ে একটি বিরক্তিকর ঘটনা ঘটতো প্রতি শুক্রবার। সকাল সাড়ে আটটা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকতো না। এর চেয়ে বিরক্তিদায়ক আর কষ্টকর কিছু হতে পারে না। ছুটির দিনটাই মাটি হতো। কি কারণে এই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হতো সেটা আমার কাছে আজো রহস্য ঠেকে।

এসএসসি পরীক্ষার পর দীর্ঘ বিরতির পর কলেজে এসে আমরা খন্ডকালীন অধ্যক্ষ পেলাম ফক স্যারকে। ফজলুল করিম স্যার। ফ্রেঞ্চকাট সাদা পাকা দাড়ি। সুন্দর করে ছাঁটা। স্যারের আগের দিনকার ছবি দেখেছিলাম। একই রকম ছিলেন, শুধু সময়ের সাথে দাড়িতে পাক ধরেছে এই যা। উপাধ্যক্ষ হিসেবে স্যার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম (রফিক নওশাদ) স্যারের পরে এসেছিলেন। উপাধ্যক্ষের পাশাপাশি অধ্যক্ষের দায়িত্ব সামলেছেন। যেহেতু স্যার উপাধ্যক্ষ হিসেবে ছিলেন, সেহেতু স্যারের আলোচনা যথাসময়ে হবে। আর স্যারের সহধর্মিণী নাজনীন করিম ম্যাডামের আলোচনা যথাসময়ে হবে।

দ্বাদশ শ্রেণীর প্রায় মধ্যভাগে আমাদের কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে আগমন হয় লেঃ কর্নেল সেলিম স্যারের। মোহাম্মদ সেলিম। আমাদের কলেজে থাকা অবস্থায় প্রথম আর্মি অধ্যক্ষ। আমাদের কলেজের বদর হাউসের প্রাক্তন ক্যাডেট। আমাদের কলেজের প্রাক্তন এ্যাডজুট্যান্ট। এখন উনি সমহিমায় কলেজ অধ্যক্ষ। কোর অব ইনফ্যান্ট্রির সৈনিক। ৩য় বিএমএ লং কোর্স-এ সোর্ড অফ অনার প্রাপ্ত। ডাবল মাষ্টার্স। আরো নানা গুণে বিশেষায়িত। দুই দফায় কলেজে থাকার ফলে একশত চার একর জায়গার কোন কিছু অজানা উনার ছিল না। উনি কলেজে আসার পর প্রথম যে পরিবর্তন আমার চোখে পড়লো তা হলো রাবার গাছ। একে একে রাবার গাছ কেটে ফেলা হতে লাগলো। কলেজ অডিটোরিয়ামের পুব পাশে (লাইব্রেরীর দিকে) বেশ কয়টি রাবার গাছ ছিল, পাতাগুলো পুরুষ্টু সেগুলো একদিন দেখলাম মালীরা কেটে ফেলছে। আরেকদিন অষ্টম শ্রেণীর ক্লাসের সামনে (মানে পিছনের সাইডে) একটি বড় কেয়াগাছ ছিলো। সাধারণত এসব গাছ খুব একটা দেখা যায় না। সেই গাছ কাটা মানে ডাল-পালা কেটে ফেলতে লাগলো। শেষমেষ গাছটি পুরো কেটে ফেলা হলো। মাঠের উত্তর দিকে নালা বরাবর বেশ কয়েকটি বড় গাছ কেটে ফেলা হলো। আর বাস্কেটবল গ্রাউন্ড সমান্তরালে সৌদি আরব থেকে আনা খেজুর গাছের চারা লাগানো হলো। আমাদের কলেজের বেশ কিছু ছবি দেখেছিলাম, যেখানে বাস্কেটবল মাঠ সমান্তরালে বড় বড় খেজুর গাছ ছিল। পরে কোন এক সময়ে সেই খেজুর গাছের জায়গায় কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া গাছ লাগানো হয়েছিল। আমাদের সময়ে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো বেশ বড় ছিল। গেমসের পর গোছল শেষে টি টাইমের আগে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে হলুদ বেঞ্চিতে বসে সময় কাটানোর স্মৃতি ভোলা যাবে না। বর্তমানে কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো আছে কিনা বলতে পারবো না। সেলিম স্যার কলেজে আসার পর অনেক পরিবর্তন দেখা গেলো। ডাইনিংহলে খাবারের মান ভালো হলো। অশোক-অসীম ভাই পাওনা বিল ছাড়াই উন্নতমানের বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করতেন, বিল পাওয়া নিয়ে দুঃখ করতেন, কিন্তু ক্যাডেট না খেয়ে থাকবে তাই প্রতিদিন দশটায়-সাড়ে দশটায় ভ্যানে করে বাজার নিয়ে আসতেন । প্রায়শই লিডিং ক্লাস হিসেবে আমাদের সাথে অধ্যক্ষ স্যারের সাক্ষাত হতো। আমাদের নসীহত করতেন। সেটা কখনো ডাইনিং হলে, কখনো বা গ্যালারী কিংবা অডিটোরিয়ামে। ডাউনিংহলে খাবার-দাবার নিয়ে স্যারের একটা ফ্যাসসিনেশন ছিলো। উনি প্রায়শই মাঝে মাঝে ডাইনিংহলে ভিজিট করতেন। ক্যাডেটরা যেন ভালো খাবার খেতে পারে এদিকে উনি বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছিলেন। কলেজে স্যার আসার আগে ডাইনিংহলে কিছু ট্রাডিশ্যান ছিলো। যেমন কলেজ প্রিফেক্ট ও কলেজ ডাইনিংহল প্রিফেক্ট বিসমিল্লাহ বলার পর টেবিলের সবচেয়ে জুনিয়র মোস্ট ক্যাডেট ক্লাস সেভেন খাবার নিয়ে খাওয়া শুরু করতো। তারপর ধারাবাহিকভাবে এইট, নাইন, টেন এভাবে সবশেষে ক্লাস টুয়েলভ টেবিলে খাবার নিতো। এই নিয়ম আমি ক্লাস সেভেন থেকে টুয়েলভ অবধি দেখে এসেছি। বোধকরি কোন একসময় সিনিয়ররা আপাত এই মহৎ ট্রাডিশ্যান চালু করেছিলেন যে, ছোট ভাইয়েরা অভুক্ত থাকা অবস্থায় বড় ভাই খাবার গ্রহণ করবে না। শুধুমাত্র সিনিয়র বলে সবার আগে টেবিলে খাবার গ্রহণ এবং পছন্দনীয় খাবারটি নিজে গ্রহণ থেকে আমার দেখা সিনিয়ররা বিরত ছিল। আমার সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীর সময় এমনো দেখেছি বাউলের সবচেয়ে নিচে চিপকে যাওয়া পরোটা, নাইন-টেন বেশি করে দই নিয়ে ফেলায় শেষে এক-দু চামচ দই দিয়ে একপ্লেট চিড়া খাওয়া, মাংসের বাউলের মাংস শেষ হয়ে যাওয়ায় শুধু ঝোল দিয়ে খাওয়া শুরু করা আর ডাইনিং হল বেয়ারার ভেতর থেকে খাবার নিয়ে আসার প্রতীক্ষায় খাবার শেষ করেছেন। কিন্তু নিয়মের ব্যতয় করেননি। সন্তষ্টচিত্তে খাওয়া সেরেছেন। তা নিয়মটা শেষমেশ পাল্টে গেলো।

ব্যারেট ক্যাপে লাল-সবুজ ফ্লুম লাগানো হতো। সামনে থাকতো সবুজ আর পেছনে লাল। সেটিও উল্টে গেলো। এটার পেছনের কারণটা আমি পরে পড়ে জেনেছি। সবুজ সম্মান আর লাল রক্ত। রক্ত দিব কিন্তু সম্মান দিবো না।

কলেজে অনেক উন্নতি সাধিত হলো। নতুন একটি রেষ্ট হাউস বিনির্মাণ করা হলো। নতুন ইডি গ্রাউন্ড হলো। সে দেখার বস্তু একটা। প্রায় ৫০ ফিট বাই ৭০ ফিট। আরো বড় হতে পারে। অবস্ট্যাকল গ্রাউন্ডের শেষে মাঠ তৈরী হলো। প্রথমে বালুর স্তর, তারপর ইটের আধলা। বড় বড় চোখা চোখা ইট। ক্যাডেটদের কষ্টসহিষ্ণু হিসেবে গড়ে তোলার জন্য স্যারের প্রয়াস। ফলাফল প্রতিদিন ইডি শেষে কেউ হয়তো মাঠেই ফিট হয়ে যেতো, কেউবা ডর্ম পর্যন্ত যাওয়ার সৌভাগ্য হতো।

সেলিম স্যারের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিলো বিড়ালের মত চলাফেরা করা। শব্দহীন চলাচল। সকালে পিটির সময় ঘন কুয়াশার মাঝে স্যারকে দেখা যেতো উনার বাইসাইকেল নিয়ে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে থাকতে। যতক্ষণ না ঘন কুয়াশা কেটে যেতো উনার উপস্থিতি বোঝা যেতো না। আবার কখনো উনাকে দেখা যেতো মস্কের শেডের নিচে। কখনোবা অধ্যক্ষ বাড়ির কর্ণারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো। আর স্যার নিয়ম করে লাইটস অফের পর ম্যাডামকে নিয়ে কলেজ চক্কর দিতেন।

স্যারের সময় ষ্টাফদের প্রভূত ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তারা হাউসে প্রবেশ করতে পারতো। যা আগে কল্পনাই করা যেতো না। ক্যাডেটদের কোন বক্তব্য শোনা হতো না। ষ্টাফদের ইচ্ছায় ইডি দেয়া হতো। এখানে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, ছোট-খাট কারণে ইডি দেয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিলো। মসজিদে ক্লাস টুয়েলভ সবার পেছনের সারিতে বসতো। স্যার এই নিয়ম বাদ দিয়ে সামনের সারিতে বসার রেওয়াজ চালু করলেন।

বদর হাউসের পাশ দিয়ে পেয়ারা গাছের নিচ দিয়ে একটি শর্টকাট রাস্তা ছিলো। বদর-হুনাইন ডাইনিং হলে যেতে আর খায়বার পিটি-প্যারেডে আসতে এ পথ ব্যবহার করতো। তা বন্ধ করা হলো। সেখানে বেড়া দেয়া হলো।

ক্যাডেটদের প্রাত্যহিক কাজের জন্য যে বেল বাজানো হতো, তা মাঠের কিনারা হতে বদর হাউসের শেডের পাশে পেয়ারা গাছে বাঁধা হলো। এরকম অনেক ট্র্যাডিশ্যান হারিয়ে গেলো। জুনিয়রদের অবারিত স্বাধীনতা দেয়া হলো, প্রিফেক্ট ছাড়া কেউ পানিশমেন্ট দিতে পারবেনা, হ্যান্ডচার্জ নিষিদ্ধ করা হলো। কিছু শিক্ষক নীরব হয়ে গেলেন, আর কিছু শিক্ষক ক্যাডেট ধরো এই মন্ত্রে সোৎসাহে রিপোর্ট করতে লাগলেন।

ব্যক্তিগতভাবে অধ্যক্ষ স্যার দুই সন্তানের জনক ছিলো। একজন সে সময়ে এমসিএসকে তে পড়তো (বড় ছেলে)। তারা একবার কলেজে এক্সকারসানে আসলে বড় ছেলে অধ্যক্ষ স্যারের বাসায় যায়। আর স্যারের ছোট ছেলে আমাদের বের হবার সময় মানে ২০০৮ সালে কলেজে যোগদান করে।

স্যার আমাদের প্রশিক্ষণের কাঠিণ্য, কঠোরতা শিক্ষা দিলেন। স্যারের কল্যাণে আমাদের ব্যাচের সতেরো জন সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীতে দেশ ও দশের সেবা করে যাচ্ছে।

আমার এতে একটি উপকার হয়েছে। কলেজ থেকে বের হওয়ার সময় অনেকেই স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ে। আমার ক্ষেত্রে আর স্মৃতি কাতরতা কাজ করেনি। কাঁদার বদলে হাসিমুখে কলেজ থেকে বিদায় নিয়েছি।

অধ্যক্ষ স্যারদের স্মৃতিচারণ এখানেই ইতি টানছি। পরবর্তীতে আমার সময়ের পাওয়া উপাধ্যক্ষ, এ্যাডজুট্যান্ট, মেডিকেল অফিসার, শিক্ষকমন্ডলী, ক্যাডেট, কলেজ কর্মচারী ও ষ্টাফদের নিয়ে আলোচনা করবো। সেই পর্যন্ত বিদায়।

২৭৭ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “আমার কলেজের শিক্ষকেরা (অধ্যক্ষ)”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।