পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পুস্তক সমালোচনাঃ “তিনটি সেনা অভ্যুথান ও কিছু না বলা কথা” -শেষ ভাগ

১ম ভাগের পর এই ভাগেই আলোচনা শেষ করবো। বেশি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে, আর আমার ধৈর্যও কম। ১৯৭৫ এর ঘটনা খুব সাধারণ ঘটনা বলে আমার কাছে মনে হয়নি। হটাত করে কয়েকজন মধ্যম সারির অফিসারের মনে হলো, আর দুম করে ক্যু করে বসলো বিষয়টা এমন না। দিনক্ষণ খুব সুচিন্তিত ভাবে নির্বাচিত করা হয়েছিল বলে আমার মনে হয়েছে। ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস। বাংলাদেশে বর্ষাকাল। ভারতীয় সৈন্যবাহিনী আক্রমণ করলে সময় লাগবে। ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা চুক্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কথা ছিল। এই বিষয়ে লেখার জন্য/ বিষয় গুলো জানার জন্য আমাকে লেখক সাহিত্যিক আহমেদ শফা’র লেখার উপর নির্ভর করতে হয়েছে। আসলে টাকা খাওয়া কিম্বা সুবিধাবাদী ইতিহাসবিদ পণ্ডিতদের চেয়ে এই সাহিত্যিকের উপর ভরসা করা যায়। ইনি নির্মোহভাবে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে ঘটনা বর্ণনা করেছেন। উনার লেখায় উনি লিখেছেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। সে সময়ের ৬ লক্ষ টাকা যে কত টাকা আমি বলতে পারবো না। বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করার জন্য সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে অপেক্ষা করছিল। সে সময়ে বাকশালে যোগদান করার জন্য ফরমের মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। বাকশালে তখন তিনটি দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ, মুজাফফর) আর বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মুজাহিদ)। কিছুদিন আগে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এর অন্তরালে গোপনে পার্টির কার্যক্রম চালানোর বিষয়টি স্বীকার করার পর নিন্দিত হন। সেসময়ে চাপে পরে বাধ্য হয়ে অনেকেই বাকশালে যোগদানের জন্য ফর্ম পূরণ করে। প্রায় হাজার খানেক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সেইদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালে যোগদান করতেন। আহমেদ শফার ভাষ্যমতে হাতে গোণা ১০-১৫ জন শিক্ষক সেই ফর্ম পূরণ করেননি। তিনি তাদেরকে চিনতেন। বাকশাল গঠনের পর সেসময় চারটি পত্রিকা জাতীয়করণ করে বাকিগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকার সাংবাদিকরা দলে দলে মিছিল নিয়ে বাকশাল অফিসে গিয়ে যোগদান করছিলো, তাদের যাতে ওই চারটি পত্রিকায় চাকুরী দেয়া হয় সেই আশায়। তখন চাকুরীর এত সুযোগ ছিল না। রুটি-রুজির প্রশ্ন। এসময় চাপে পড়ে কে বাকশালে যোগদান করেনি? জিয়াউর রহমান করেছেন, হুমায়ূন আহমেদ করেছেন (উনার লেখায় আছে, উনার বিষয়ে ভবিষ্যতে পৃথক একটি লেখা লিখার ইচ্ছা আছে)। সে সময়ে বাকশালে যোগদান না করা মানে হলো, সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হওয়া। সাক্ষাৎ বিশ্বাসঘাতক তকমা পাওয়া। তারপরেও সে সময়ে হাতে গোণা কিছু সাংবাদিক, সাহিত্যিক বাকশালে যোগ দেননি। এর মধ্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক-সাহিত্যিক আল-মাহমুদ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কলম না চালিয়ে বন্দুক চালিয়েছেন। যদিও কলম চালানো নিরাপদ ছিল। আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজও তাকে যথার্থ সম্মান দেখিয়েছে! আসাফুদ্দউলা, এনায়েতুল্লাহ খান সহ কয়েকজন (নামগুলো নিশ্চিত করতে পারছি না, কেউ নিশ্চিত ভাবে সেসময়ের শিক্ষক-সাংবাদিকদের নাম জানালে উপকৃত হব) সাংবাদিক নিজেদের নীতি বিকিয়ে দেননি।

২০২০ সালে দাঁড়িয়ে সে সময়ের কথা চিন্তা করুন। আপনি মহীরুহ সমান বৃক্ষের সামনে এক ক্ষুদ্র দূর্বাঘাস সদৃশ। চিন্তা করা যায়? যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, ছাত্র-শিক্ষকরা জিন্নাহকে মানেনি, আইউব-ইয়াহিয়া মানেনি, ভাষা আন্দোলন, দেশ স্বাধীনের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা সেসময় কিভাবে বঙ্গবন্ধু, বাকশালকে গ্রহণ করবে, আলিঙ্গন করবে তার ক্ষণ গণনা করছিল। তবে কি তারা নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিবে? তৎকালীন শাসকের পদতলে মাথা পেতে দিবে? কুর্নিশ জানাবে? (দিনাজপুরের রাজার রাজসিংহাসন আনা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য, ছবি নেটে পাওয়া যাবে) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে অভ্যর্থনা জানায় তার প্রতীক্ষা চলছিল। ১৪ তারিখ সন্ধ্যার পর ছাত্রলীগ, পুলিশ, শেখ কামালের নিজস্ব দল-বলের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ টি বোমা বিস্ফোরিত হয়। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গুমোট পরিবেশ। বোমা বিস্ফোরণের পর ছাত্র-শিক্ষকরা একটু হাঁফ ছাড়লো। হয়তো এত সহজে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ভুলুণ্ঠিত হবে না। শিক্ষকদের নৈতিক পরাজয় হবে না। চিন্তা করুন কখন কি পর্যায়ে অরাজকতা আকাঙ্ক্ষিত হতে পারে? ১৯৭৫ এর সেই দুর্বল শিক্ষক- সাংবাদিকদের চামচামির উত্তরসূরি আজ আমরা সমাজে দেখি। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রাজনীতি সেখান থেকে শুরু হয়েছে, যা আজ লাল-নীল-হলুদ-সাদা আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে। সেই তখন যৌবনকাল আর আজ জাতির ৫০ বছরের কাছাকাছি সময়ে বার্ধক্যে উপনীত হওয়া ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থায় তাদের নিত্যদিনের চেহারা দেখে আশান্বিত হওয়ার আমি কিছু দেখি না। সেদিন ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিত হলে কি হত?

এখন ১৯৭৫ এর নভেম্বরের আলোচনা করবো। আগস্টের পর আর্মিতে বেশ রদ-বদল হয়। আসলে রদ-বদল আগে থেকেই হচ্ছিল। ৪৬ বিগ্রেডের দায়িত্বভার লেঃ কর্নেল জিয়াউদ্দিন থেকে কর্নেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, আবার তার থেকে কর্নেল শাফায়াত জামিল। অনেকটা দাবা খেলার চেক (কিস্তিমাত) দেয়ার জন্য জায়গায় জায়গায় গুটি মোতায়েন। আগস্টে মধ্যম সারির অফিসারদের ক্যু, এবার উপরের সারির অফিসারদের পালা। আর্মিতে ডিসিপ্লিন, আইন শৃঙ্খলা ঠিক নেই, চেইন ইন কমান্ড ঠিক নেই। কি করা যায়? ক্যান, ক্যু করি। এটাতো ডাল-ভাত। কিভাবে করতে হবে তাতো পূর্বসূরীরা দেখিয়েই গিয়েছে। সেনাপ্রধানকে দিয়েই শুরু হোক, এভাবেই শুরু হলো।

আগস্টে করেছে দুই কোরের (আরমার্ড, আর্টিলারি) দুই ব্যাটালিয়ন। এবার ইনফ্যান্ট্রি কোরের দেখানোর পালা। ২ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের দিবাগত রাত ১০ টার দিকে এটি শুরু হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াকে গৃহবন্দী (হাউস এরেস্ট) করা হয়। লেখক লেঃ কর্নেল হামিদ খবর পেয়ে জিয়ার সাথে দেখা করতে তার বাসার যান। তিনি গেট থেকে ফিরে আসেন। বিগ্রেডিয়ার মইনুল হোসেন কিন্তু ঠিকই সান্ত্রীদের পার হয়ে নিরাপদে ঘরে প্রবেশ করেন এবং দেখা-সাক্ষাৎ করে ফিরে আসেন (গৃহবন্দীর কোন এক সময়ে)। এর পরে ৩ তারিখ সকাল থেকে শুরু হয় ক্যান্টনমেন্ট-বঙ্গভবন দূত চালাচালি, ফোনে আলাপচারিতা। সে দীর্ঘ বয়ান (mutual persuasion)। এই ২-৩ নভেম্বরের ক্যু এর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে। রক্তপাতহীন ক্যু। সে সময়ের কোন ভিডিও নেই। আমার খালি ১৯৯৯ সালের পাকিস্তানে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের রক্তপাতহীন ক্যু এর কথা মনে হয়। অস্ত্র নিয়ে উঁচু লোহার গেট বেয়ে সৈনিকদের প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রবেশ। পারভেজ মোশাররফ আমাদের কাহিনীর নায়ক বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ব্যাচমেট ছিলেন। দর কষা-কষি শেষে ৩ তারিখ রাতে পূর্ববর্তী ক্যু-কারী মেজরদের দেশ ত্যাগ। এর আগে ২ তারিখ দিবাগত রাত, ৩ তারিখ ভোরে জেলহত্যা। উল্লেখ্য শুধুমাত্র তাজউদ্দীন আহমেদ আপস না করে বাকশালে যোগদান করেননি। ৩-৪ নভেম্বর দর কষাকষি করে ৪ তারিখ রাতে বিগ্রেডিয়ার খালেদ প্রমোশন নিয়ে মেজর জেনারেল হলেন। ৫ তারিখ ও ৬ তারিখ ক্যান্টনমেন্টের ভিতর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ সামরিক মিটিং করলেন। আর্মি চীফ হওয়ার পরও তিনি স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। রংপুর থেকে তিনি কর্নেল হুদাকে সৈন্য নিয়ে ঢাকায় আসতে বললেন। তৎকালে ঢাকায় কর্মরত অফিসাররা খুব সম্ভব ব্যক্তি বিশেষকে পছন্দ করতেন। চেয়ার কে না। যাই হোক ৩ থেকে ৭ পর্যন্ত একাধিক ঘটনা ঘটে। এখন ৩ তারিখের ঘটনার পর সিপাইরা চিন্তা করলো আর্মি বড়-ছোট অফিসাররা ক্যু করলো, আমরা কিল্লাই বইয়া থাকমু। আমরাও একটা ক্যু করি। তো উনারা মিলে একটা ক্যু করলেন। সেটা ৬ তারিখ দিবাগত রাত ১২ঃ০০ টায়, অর্থাৎ ৭ তারিখ প্রত্যুষে। ইনাদের উদ্বুদ্ধ করলেন বাংলাদেশের আরেক বীর সেনানী লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের বীর উত্তম। ইনার সম্পর্কে (সামরিক যোগ্যতা) জানতে মেজর আনোয়ারের ‘হেল কম্যান্ডো’ বইটি পড়তে পারেন (সেবা প্রকাশনীর বই, অন লাইনে পাবেন)। কি ধাতুতে গড়া ছিলেন বোঝা যায়। উনি উনার বিপ্লবী সৈনিক সংস্থাকে দিয়ে সৈনিকদের উদ্বুদ্ধ করেন। এক বইয়ে পড়েছিলাম যে তাহের, উনার ভাই আবু ইউসুফ, আনোয়ার হোসেন, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল ইনারা নাকি মনস্তাত্ত্বিক ভাবে সর্বহারা পার্টির সমর্থক ছিলেন, কিন্তু দল করতেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। উনার ভাই-বোন সবাই মুক্তিযোদ্ধা। আনোয়ার হোসেন রসায়নের শিক্ষক এবং হুমায়ূন আহমেদ-এর সহকর্মী ছিলেন। সর্বহারা দল আর সমাজতান্ত্রিক দলের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমার মাথায় অবশ্য এইসব লাইন, ফাইল, লেনিন, মার্ক্স, ট্রটস্কি, মাও জেদং (সেতুং) ঢুকে না। জেনারেল জিয়া বন্দী হওয়ার আগে নাকি কর্নেল তাহেরের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। উনার বিপদ, জীবন হুমকির সম্মুখীন। আমাকে বাঁচাও। তো ৭ তারিখ ভোররাত ২ঃ৩০ টার দিকে ক্যু এর পর মুক্ত জিয়ার সাথে দেখা করতে কর্নেল তাহের এসেছিলেন। এসে অনেক মিটিং। গরম কথা। মুক্তির বিনিময়ে ১২ দফা মানতে হবে। কি সেই ১২ দফা? হা… হা… হা… শুধু এতটুকু বলি সেই ১২ দফা মানা হলে বাংলাদেশের ইতিহাস নতুনভাবে লিখতে হতো। আওয়ামী লীগ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকতো না, সেনাবাহিনী বলে কিছু থাকতো না, অফিসার বলে কিছু থাকতো না। সব লাল আর লাল থাকতো। কিছু যে পরবর্তীতে মানা হয়নি তা না, ব্যাটমানের কাজ থেকে সিপাইদের অব্যাহতি দেয়া হয়। কর্নেল তাহের জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এনে উনার তথা জাসদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে আশা গুড়েবালি। সুবেদার মেজর আনিস আর ৪ বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর কর্নেল আমিনুল হক (সম্ভবত বিগ্রেডিয়ার আবু জাফর মোঃ আমিনুল হক, এরশাদ পরে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়) এরকম কয়েকজনের দৃঢ়তায় জিয়া সেযাত্রায় বেঁচে যান। ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বের হলে কি হতো সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। ৭ নভেম্বর পরবর্তী সময়ে এই কর্নেল আমিনুল হকই অনুগত থেকে জেনারেল জিয়াকে রক্ষা করেছেন। ৭ তারিখ দিনের শুরুতে যে খেলা শুরু হয়েছিল তা প্রায় দুই সপ্তাহের মত চলেছিল। সিপাহীদের ১২ দফার কথা আর জিয়ার মুক্তির কথা বলে ক্যু করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। ১২ টায় শুরু হলে সুবেদার মেজর আনিস আর মেজর মহিউদ্দিন এর নেতৃত্বে জিয়াকে মুক্ত করে ২ ফিল্ড আর্টিলারিতে আনা হয়। এইখানেও সমস্যা আছে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকজন জিয়াকে মুক্ত করার আগে একদল লোক জিয়াকে মুক্ত করে আর্টিলারি ইউনিটে নিয়ে গেছে। কি সমস্যা! বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার লোকজন সৈনিকের পোশাক (খাকি পোশাক) পরে সাধারণ সৈন্যদের সাথে মিশে অপারেশন পরিচালনা করছিল। গোঁড়াতেই কেঁচে গেলো। তাহেরের সৈন্যরা ব্যর্থ হলে উনি মধ্যরাতে ক্যান্টনমেন্টে যান জিয়ার সাথে দেখা করতে। যাই হোক বইয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শ্লোগানের কথা বলা হয়েছে। এইসব শ্লোগান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিপাইদের মোরাল বুস্ট-আপ করতে কাজে লাগে। সিপাই-সিপাই ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই। জিয়া জিন্দাবাদ ইত্যাদি। ৭ তারিখ প্রথম প্রহরে জিয়া মুক্ত। ক্যু উদ্দেশ্য সফল। সাধারণ সৈনিকরা খুশি। সকাল ৭ টায় শেরে বাংলা নগরে বিশ্বস্ত সৈন্যদের আওতায় খালেদ মোশাররফ, নাজমুল হুদা, আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দারের প্রাণনাশ হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় যা পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় খালেদ মোশাররফ উনার পরিণতি সম্পর্কে ধারণা করতে পেরেছিলেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উনি কম্পোসড, ধীর ছিলেন। উদ্বিগ্ন ছিলেননা। লেঃ কর্নেল হায়দার ভাগ্যের ফেরে সেখানে উনার ছিলেন। উনি বিয়ের কেনাকাটার জন্য কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসে উনার বসকে সঙ্গ দিতে যান। বিগ্রেডিয়ার খালেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় মাথায় আঘাত পান। যুদ্ধের সেই আঘাতের দরুণ উনার চিন্তা-ভাবনার উপর সম্ভবত প্রভাব ফেলেছিল। যার ফলে উনার ৩ নভেম্বরের ক্যু এর দুর্বল দিকগুলো দেখলেই একটা ধারণা পাওয়া যায়। উনি ১৯৭১ সালে যতটা শার্প ছিলেন, ১৯৭২ এ চিকিৎসা শেষে ফিরে এলে উনার চোখের দৃষ্টি অতটা শার্প ছিলনা। উনার আঘাতটা ছিল ব্রেনের ফ্রন্টাল লোবে। আমার কাছে বিগ্রেডিয়ার খালেদের ক্যু এর যে দুর্বল দিক গুলো চোখে লেগেছে সেগুলো হলোঃ আর্মিতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলে উনি আসলেন, এসে উনি আর্মি চীফ হয়ে গেলেন। আর্মি চীফ হলেন ভালো কথা, কিন্তু পূর্ববর্তী চীফ (বা উনাকে কেন্দ্র করে) যিনি ক্যান্টনমেন্টে আছেন উনি যে ঘোঁট পাকাবেন না তার নিশ্চয়তা কে দিলো? ৩ তারিখ পর থেকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তাদের ১২ দফা দাবিগুলো সৈনিকদের মাঝে বিলি করছিলো। অফিসাররা (উনার অনুগত,
কারণ সবাই আবার উনার অনুগত ছিলেননা) কি করছিলেন? সেম টু ২০০৯ বিডিআর বিদ্রোহ। সেইখানেও একই জিনিস। মনে হয় ইতিহাসের আইটেমগুলো ঘুরে ফিরে বারবার আসে। উনার উচিত ছিল ৪ নভেম্বর উনার আর্মি চীফ হওয়ার পর সসম্মানে জেনারেল জিয়া কে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া। উনি সেটি করেননি। ক্যু-ই যখন করলেন তখন কেনইবা খন্দকার মুশতাক-কে দিয়ে উনার মেজর জেনারেল প্রমোশন জায়েজ করে নেয়া? জায়েজ করলেন তো করলেন, তারপর তারে বিদায় দিলেন। বিদায় দিয়ে বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির গদিতে বসালেন। সায়েমের কাছ থেকে প্রমোশন নিলে হতো না? টেলিফোনে আর দূতিয়ালিতে এতো সময় ক্ষেপণ করলেন কেন? ক্যান্টনমেন্টে ঘোঁট পাকাচ্ছে, আপনি বললেন আর্মির ডিসিপ্লিন আনবেন, তাহলে কেন আর্মির দুঃসময়ে ক্যান্টনমেন্টে না থেকে বঙ্গভবনে ডি এম এল এ (ডেপুটি মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর) হওয়ার জন্য এত তোড়জোড় করছিলেন? (সিএমএলএ হতে চাচ্ছিলেন তিনি, পরে কয়েকজন অফিসার উনাকে নিরস্ত করে, এতে বোঝা যায় উনার একার পক্ষে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব ছিল না) উনারও ক্ষমতার প্রতি লোভ ছিল।

৭ নভেম্বর তারিখ নির্বাচন এমনি এমনি হয়নি। অক্টোবর বিপ্লবের সাথে মিল রেখে আবু তাহের বলে অপারেশন তারিখ ঠিক করেছিলেন। ভাবা যায়? জিয়া ২ তারিখ রাত থেকে বন্দী। সশস্র সেনা পাহারা। ৩ তারিখ সেচ্ছায় অবসর প্লাস পেনশন-রেশন চেয়ে আবেদন। বাইরে তাহের কি করছে জানেন না। একটু বেচাল হলে উনাকে সরায়ে দেয়া কোন ব্যাপার ছিল না। উনিও মনে হয় আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে উনার ভাগ্যের কি পরিবর্তন। ইহাকেই বুঝি বলে, কপালে যা লিখায়, তা নাহিবা খণ্ডায়। ৭ তারিখের বিদ্রোহ ৮-৯ তারিখে সম্ভব ছিল না।

৭ তারিখ বাংলাদেশের ইতিহাসে আমার বিবেচনায় সবচেয়ে জটিল দিন। এই দিন বিশ্লেষণ করতে হলে প্রত্যেক মুহূর্ত মুহূর্ত বিবেচনা করতে হবে। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলিয়েছে এই দিন। সকালে মুক্ত জিয়ার ভাষণ রেকর্ড করে বেতারে প্রচার করা হল। ৩ থেকে ৭ তারিখ সকাল পর্যন্ত বেতার প্রচার হয়নি বলে জানা যায়। তখন খালি প্রচার মাধ্যম হিসেবে বেতার আর পত্রিকা ছিল, টেলিভিশন সব জায়গায় ছিল না। বেতার অকেজো করার ক্ষেত্রে কর্নেল শাফায়াত জামিলের একটা ভুমিকা ছিলো। এখানে কর্নেল জামিল কার পক্ষে কাজ করেছেন আমি বুঝি না। বেতার বন্ধ রাখা বিগ্রেডিয়ার মোশাররফের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছিল। তাই জামিলের ভুমিকা নিয়ে সন্দেহ হয়। সাধারণ জনগণ জানতে পারেনি কি হচ্ছে দেশে। ৭ তারিখ বিদ্রোহের পর আর্মির ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান ক্যান্টনমেন্টের বাইরে বের হয়। কেন, আল্লাহই জানে। সেই ট্যাঙ্কের উপর উঠে সাধারণ জনগণ আনন্দ উল্লাস করে (১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও সাধারণ মানুষ তাই করেছিল, একজন বিখ্যাত ব্যক্তিও করেছিল বলে শোনা যায়, ছবিতে দেখা যায়, তবে উনি দাবি করেন উনি নিজে নাকি কখনো শার্ট-প্যান্ট পরতেন না, পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন)। ১২ দফা যখন জিয়া না মেনে নিতে চাইলেন তখন দিন শেষে যখন রাত নামলো তখন ক্যান্টনমেন্টে অন্য রুপ। ৭ তারিখ প্রারম্ভে এক দফা অফিসার হত্যা হয় (এইটা মনে হয় যাদের উপর সিপাইদের রাগ বেশি ছিল প্লাস বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার মদদে), মাঝে মুক্তিযোদ্ধা তিনজন, আর রাতে প্লান মাফিক ধরে ধরে হত্যা। ৭ তারিখ বিদ্রোহের সিপাইরা ছিল সার্ভিসের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সিপাই। ভাগ্যক্রমে লেখক আব্দুল হামিদ বেঁচে যান, মইনুল হোসেনও বেঁচে যান। উনাদের ভাগ্য যে উনারা বিশ্বস্ত সৈনিকদের সাথে ছিলেন। সারা ক্যান্টনমেন্টে অফিসার হত্যা চলে। সৈনিক-সৈনিক ভাই ভাই, অফিসারের রক্ত চাই। তো রক্ত বইল। যারা অফিসার ছিল, যে যেভাবে পারলো পালিয়ে বাঁচলো। জিয়া রয়ে গেলেন, আর উনাকে প্রোটেকশন দিয়ে রাখলো আমিনুল হক এবং বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা। ইনফ্যান্ট্রি কোরের সৈন্যরা তাদের অফিসারদের রক্ষা করেছে, আর একটু উচ্চ শিক্ষিত সার্ভিস কোরের (সিগন্যাল, আর্টিলারি, মেডিক্যাল…) সৈনিকরা দক্ষযজ্ঞ চালিয়েছে। “এই আর্মির চীফ হইয়া কি হইবে, এই আর্মি লইয়া আমি কি করিব?” -এই চিন্তা জিয়ার মাথায় এসেছিল কিনা জানিনা। তবে অবস্থা বর্ণনার অতীত ছিল। সৈনিকরা কোন কথা শুনছে না। বিশৃঙ্খল অবস্থা। এই অবস্থা চলতে থাকলে কি হতো আল্লাহই ভালো জানে। এ সময় জিয়া উনার ব্যাচমেট লেখক আব্দুল হামিদের সাহায্য চান। উনাকে ষ্টেশন কম্যান্ডার থেকে লগ (লজিস্টিকস) এরিয়ার দায়িত্ব নিতে বলেন। লেখক যে জিয়ার ব্যাচমেট এবং উনার প্রতি খানিকটা না বেশ দুর্বল ছিলেন, তা বোঝা যায় (বিপদে প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় দেন, কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয়) উনার লেখায়। যাইহোক জিয়াও এর প্রতিদান দেন, উনার ডিউ প্রমোশন না দিয়ে। অবশেষে একসময় লেখক রাগে ও স্বেচ্ছায় অবসর নেন। সেটা পরের বিষয়।

লগ এরিয়ার দায়িত্ব পেয়ে উনি সৈনিকদের ডিসিপ্লিন ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন। এইসব অকুতোভয় অফিসারদের কারণে আজো আর্মি টিকে আছে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, জাসদ, আবু তাহের গং-রা একেবারে মেরুদণ্ডে আঘাত করেছিল। জাসদ সফল হলে কি হতো, অফিসাররা নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলে কি হতো বলতে পারছি না। ৭-৮ নভেম্বর সবচেয়ে ক্রুসাল সময় যায়।

আস্তে আস্তে সৈনিকদের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসলে জিয়া কঠোর হন। মুক্তি দিয়ে আবার গ্রেফতার করা হয় জলিল, রব, ইনুদের। এসময় পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন এরশাদ। মেজর জেনারেল হিসেবে প্রমোশন দিয়ে জিয়া উনাকে ডেপুটি চীফ বানান। হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ যে কি জিনিস আল্লাহই ভালো জানেন। জিয়া যদি ৭ নভেম্বর আকাশের তারা পেয়ে থাকেন, তবে এরশাদ সময়ের পরিক্রমায় চাঁদ পেয়েছেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ভারতের আর্মিরা লুটতরাজ চালালেও এরশাদের বাসার মূল্যবান সম্পদ পাহারা দিয়ে তার রংপুরের বাসায় পৌঁছে দেয়া হয় বলে জানা যায়। উনি তখন পাকিস্তানে বন্দী!!! দেশে এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আমলে ১৯৭৩ এ কর্নেল, ১৯৭৫ জুনে বিগ্রেডিয়ার র‍্যাঙ্ক পান। ১৯৭৫ আগস্টে মেজর জেনারেল র‍্যাঙ্ক। ১৯৭৮ এ লেঃ জেনারেল। জিয়া উনার বিশ্বস্ত মীর শওকত আলীকে আর্মি চীফ না করে চীফ করলেন এরশাদকে! আরেকটা কথা শোনা যায়, স্বাধীনতা পরবর্তী ষড়যন্ত্র নাকি শুরু হয়েছিল পাকিস্তানী এক বন্দী শিবিরে। সব কিছুর মূলে যদি এরশাদ থাকেন তা হলে বলতে হয় অন্য চরিত্ররা তার তুলনায় শিশু। জিয়ার বিশ্বাসের দাম এরশাদও যথাসময়ে দিয়েছেন।

একসময় জিয়া আবু তাহের কে গ্রেফতার করেন। তার বিচার হয়। বিচারে ফাঁসি হয়। ১৭ জুলাই রায়, ২১ তারিখ ভোর ৪ টায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় যা পাওয়া যায়, তা হলো উনিও ফাঁসির মঞ্চে স্বাভাবিক ছিলেন। এর আগে আম খেয়েছেন। মৃত্যুকে সত্য হিসেবে আলিঙ্গন করেছেন। প্রথম কোন মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলা। এরপর… এরপর চলতেই লাগলো। চলছে।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত জিয়ার আমলে অসংখ্য ক্যু সংগঠিত হয়েছে। জিয়া সব দমন করেছেন। খালি হত্যা, হত্যা, হত্যা। ধরো আর ফাঁসিতে ঝুলাও। অনেক অফিসার, সৈনিক এভাবে চলে গেলো। পরিবারগুলো কিভাবে ছিল আল্লাহই জানে। নিরাপরাধরাও (ক্যু তে জড়িত না) রেহাই পায়নি।

বইয়ের শেষ বিদ্রোহ চট্টগ্রামের ১৯৮১ সালের ক্যু। জিয়া আগে রাস্তা পরিস্কার করেছেন, clean sweep যাকে বলে। আর জিয়া, মঞ্জুর-কে একঢিলে দুই পাখি ফেললো কে? এরশাদ? হতে পারে। সবচেয়ে শান্ত-শিষ্ট ভদ্র অফিসার যে কত বড় ধরুন্ধর হতে পারে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়। যাদের থেকে কোন বিপদের আশঙ্কা নাই, খালি তারাই তখন সার্ভিসে ছিল। বাকি সব সাফ, পরিবেশ একদম ঠাণ্ডা। এরশাদের অবস্থা অনেকটা এরকম,’ময়লা সরিয়ে, জঞ্জাল সরিয়ে তো আমাকে হাত নোংরা করতে হয়নি। আমি তুলসী পাতা।’

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম কেন এই দায় কাঁধে নিলেন আমার বুঝে আসে না। উনারও কি ক্ষমতার মোহ ছিল? কি জানি। কয়েকজন মিলে রাষ্ট্রপতিকে ৩০ মে ১৯৮১ সালের ভোরবেলায় শহীদ (মৃত্যুমুখে পতিত করা) করা হয়, তারপর উনাকে গিয়ে বললেন যে আমরা অপারেশন করেছি, সাকসেসফুল (একদম ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ২-৩ নভেম্বর এর মত, মধ্যম সারির অফিসার, সেম টু সেম পার্থক্য শুধু ১ম ঘটনায় মৌন সম্মতি, ২য় ঘটনায় হুজুগে জেনারেল খালেদ আসলেন, ৩য় ঘটনায় জেনারেল মঞ্জুর আসলেন)। জানি না তৎকালীন কোন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে উনি এই দায় নেন। উনি যদি তৎক্ষণাৎ ওইসব অফিসারদের নিরস্র করে গ্রেফতার করতেন তাহলে হয়তো ভালো করতেন। পরে উনাকে বিনা বিচারে ঠাণ্ডা মাথায় মেরে ফেলা হয়। সবচেয়ে অভাগা আমার উনাকেই মনে হয়েছে।

বইয়ের ও লেখকের লেখার সীমাবদ্ধতা সহ উপসংহার টানছি। ৩-৭ তারিখের বর্ণনায় একটু ইতস্তত লেগেছে। আসলে এতো কিছু ঘটেছে এই কয়দিনে তা বইয়ে মাত্র কয়েক পাতায় বর্ণনা করা হয়েছে। ১৫ আগস্টের ঘটনায় লেখক পেছনের কারণ অনুসন্ধানে সময় নষ্ট করেননি। নষ্ট করলে উনার বয়ানে আরো কিছু পাওয়া যেতো। লেখক জিয়াউর রহমানের ব্যাচমেট ছিলেন তা বইয়ে স্বীকার করেছেন। তার প্রতি তার অনুরক্ততা দোষের নয়। তবে ১৯৭৫ সালে ৩-৭ নভেম্বরের সময়ে উনার অবস্থান পরিস্কার করতে পারতেন। উনি কার প্রতি অনুগত ছিলেন, জিয়ার প্রতি না চেয়ারের প্রতি? কারণ চেয়ারে তখন জেনারেল খালেদ। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মকাণ্ড উনার অজানা থাকার কথা নয়। কম্যান্ডার ষ্টেশন হেড কোয়ার্টারে দায়িত্ব পালনের সময় উনার পদক্ষেপ কি ছিল? এগুলো বইয়ে আসেনি। উনি যে তৎকালীন চীফকে ফোনে সাবধান করেছিলেন তা লেখায় বলেছেন। এখানেও জেনারেল খালেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা দেখি। বইয়ের ভাষা প্রাঞ্জল, বর্ণনা চমৎকার।
লেখকের সাথে দেখা হলে বলতাম সেচ্ছায় অবসরে যাওয়া আপনার সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ সন্দেহপ্রবণ জিয়া কখন না আপনাকে সন্দেহ বশত সরিয়ে দিত। উনাকেও দোষ দেয়া যায় না। এতো এতো ক্যু, বিদ্রোহ। উনিও সম্ভবত উনার পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। উনিও দরজা খুলে বাইরে এসেছিলেন (ঠিক বঙ্গবন্ধুর মত, মৃত্যুকে দুইহাতে আলিঙ্গন করার জন্য)। জেনারেল জিয়া সৎ অফিসার ছিলেন, ধর্মপ্রাণ ছিলেন। অনেকেই উনার ভাঙ্গা সুটকেসের গল্প করে। উনার পরিবার উনার পথ মাড়ায়নি এইটা সত্য।

১৯৭৫ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর উপরের পর্যায়ের অফিসারদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা, রেষারেষি ছিল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতো না। বাইরে খুব ভাব ছিল। কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পারতো না। এটা কি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা ছিল? ব্যাক স্ট্যাবিং চলছিল। এর পেছনের কারণ কি? তীব্র প্রতিযোগিতা মূলক পরিবেশই কি এর জন্য দায়ী? জেনারেল শফিউল্লাহ কে আরো ৩ বছর রাখতে যাচ্ছিলো বঙ্গবন্ধু। জিয়া ধরার মধ্যে ছিল না, উনাকে দূতাবাসে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। উনাকে সন্দেহের চোখে দেখতো। কে না কে জিয়া নিজেরে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করসে (উনি বুঝে হোক, না বুঝে হোক, উনার উচ্চাশা প্রকাশ করে ফেলেছিলেন ১৯৭১ এ)। ২য় পছন্দ ছিল খালেদ মোশাররফ। সফিউল্লাহর পর উনিই হয়তো আর্মি চীফ হতেন। তবে উনি আরো ৩ বছর অপেক্ষা করতে চাননি। তারপরে মনে হয় কর্নেল জামিল।

লেখার শেষ টানবো। আমার জন্ম স্বাধীনতার অনেক পরে। এইসব উত্তাল সময় আমি দেখিনি। তাই বই-ই একমাত্র ভরসা। সবার বই পড়ে তৃপ্ত হওয়া যায় না। কারণ বেশিরভাগ সেফ সাইডে থেকে লেখা পছন্দ করে। নিজের বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমার কাছে মনে হয় জহির রায়হানের ছোট গল্পের ন্যায় ‘সময়ের প্রয়োজনে’ হয়েছিল। এটি আল্লাহ বা বিধাতার নির্ধারিত বিষয়। আর সব চরিত্র তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব সময়ের প্রয়োজনে করে গেছে। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ শুধু ১৯৭১ এই হওয়ার কথা ছিল, ১৯৭২ এ নয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ আগস্ট পূর্ব পর্যন্ত সময় আসলে খুবই কঠিন সময় ছিল। বঙ্গবন্ধু নেতা হিসেবে অতুলনীয় ছিলেন, কিন্তু দেশ চালনার অভিজ্ঞতা না থাকায়, বিশ্বস্ত লোক না থাকায় উনাকে পদে পদে উশটা খেতে হচ্ছিল। উনি ভাবলেন যে রক্তের সম্পর্কের লোকজন বেঈমানি করবে না। সেটা আবার স্বজনপ্রীতি হিসেবে চিহ্নিত হলো। তখন সব কিছু একজনের হুকুমে, এক বাড়ি থেকে পরিচালিত হত। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি। ১৭৫৭ সালে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর কত রক্ত ঝরেছে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এর ২৪ মার্চ পর্যন্ত কত রক্ত ঝরেছে, আর ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ থেকে কত রক্ত ঝরছে? এই রক্ত ঝরা থামছেই না। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ গেলো, দেশ স্বাধীনের পর জাসদ-সর্বহারা, ১৯৭৫ থেকে অফিসার-সিপাই রক্তের হোলিখেলা চলছেই। কেউ একবার কোন কিছু শুরু করলে সেটা থামে না। ২০০৯ এ গেল। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলছেই। গুম-খুন চলছেই। আসলে সব কিছুতে টার্গেট লাগে। আপনি টার্গেট, প্রতিপক্ষ ঠিক করবেন, তারপর আক্রমণ করবেন। তারপরেই না সফল হবেন। নষ্ট রাজনীতি চলছে। পূর্বের ঘটনা বারংবার ঘটছে, খালি চরিত্রগুলো পাল্টাচ্ছে। অনেক রক্তের উপর এদেশ দাঁড়িয়ে। কত মানুষের প্রাণ গেছে কে জানে। ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা কি করে এর পরে পরিবর্তিত হয়ে যায়? যে সেনাবাহিনী এক ব্যক্তিকে এতো সম্মান দেয় সেই কিভাবে এই সেনাবাহিনী ধ্বংসের পায়তারা করে? আসলে সবাই স্বপ্ন দেখেছিলো। মুজিব, জিয়া, তাহের, সিরাজ শিকদার, খালেদ; সবাই। কিন্তু কারো সাথে কারো মিল ছিলনা। সবাই অস্ত্রের ভাষায় কথা বলেছেন, স্বপ্ন বুনেছেন। সবাই ক্ষমতার মোহে পড়েছিলেন। সবাই মানুষ। সবাই এক একটি চরিত্র। মানুষের সঠিক-ভুল থাকবেই। ভুল স্বীকার করে নেওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের লক্ষণ। শুধু ১৯৭১ দিয়ে এইসব চরিত্র বিচার করলে হবেনা।

২০২০ সাল চলে। সামনে ২০২১। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি। করোনা অতিক্রম করে সেই সময়ের দেখা পাবো কিনা জানি না। কার লেখায় জানি পড়েছিলাম যে ৫০ বছর আগে সঠিক ইতিহাস লেখা হয়না। যা লেখা হয় তা তোষামোদি, অন্যের স্তুতি, গুণগান। সে হিসেবে এখনো নির্মোহভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হয়নি। আমরা যে আত্মভোলা জাতি (গোল্ড ফিসের মত)। ইতিহাস থেকে আমরা কিছুই নেইনা। রাজনীতি নীতি-হীন। সবাই নিজের দোষ ঢাকতে চায়। ঘুণেধরা সমাজে পচন ধরেছে। নীতি বাক্য বোকারাই মানে। আগুন জ্বালাতে লাগে জ্বালানী, অক্সিজেন আর স্পার্ক (অঙ্গার)। ১৯৭২-৭৫ এ জ্বালানী জমা হয়েছে, রক্ষী বাহিনী, দুর্ভিক্ষ। আগস্টে অঙ্গার দিয়ে জ্বালিয়ে/ আগুন ধরানো হয়েছে। সে আগুন জ্বলছে। সময়ে সময়ে কেউ খড় দিয়েছে আগুনে, কেউ দিয়েছে জ্বালানী গ্যাস (টেংরাটিলা), কেউ গান পাউডার। আবার কেউ ভেজা খড়। ভালো না জ্বললেও কালো ধোঁয়া বেশ দেয়। ১৯৭১ এর পরে বাইরের কেউ না, আমরাই নিজেদের মারছি, মরছি। আমারাই নিজেদের মাথার উপর বসে শাসন করছি। তাইতো আজো পুরানো রীতিধারা মেনে ম্যাজিস্ট্রেট/ এসি (ল্যান্ড)/ অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার একদম রুট লেভেলে চাষা-ভূষার গায়ে হাত তুলে, কান ধরে ছবি তুলে। অভিজাত শ্রেণী তৈরি হচ্ছে, অফিসার হচ্ছে।

রক্তের বন্যায়, ভেসে যাক অন্যায়। আমি অপেক্ষায় আছি কবে সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ হবে, আমি পড়বো।

২,০৮০ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পুস্তক সমালোচনাঃ “তিনটি সেনা অভ্যুথান ও কিছু না বলা কথা” -শেষ ভাগ”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    বিষয়গুলো এতই স্পর্শকাতর যে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোন নির্মোহ, নিরপেক্ষ মন্তব্য করা সম্ভব নয়। সাম্প্রতিক ইতিহাস বিজয়ীদের দ্বারা লিখিত হয়, সেখানে বিজিতদের কোন ঠাঁই হয় না। এজন্য সাম্প্রতিক ইতিহাস নিয়েও বিতর্ক চলতে থাকে। সব বিতর্ক শেষে একদিন ইতিহাস থিতু হয়। হয়তো তখন সব সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।