আফ্রিকা থেকে…

মাসখানেকের বেশি সময় অন্তর্জালবিহীন থাকার পরে গত কিছুদিন যাবৎ আবারো এই জালে জড়িয়ে পড়ছি। এই সাময়িক বিরতিতেই অনেকখানি অনভ্যস্ততা চলে এসেছে, আগের মত সেই তাগিতও বোধ করি না অন্তর্জালে ঢুঁ মারার জন্য। এর মাঝে অনেক পরিবর্তনও এসেছে, কিছু পছন্দ হয়েছে, কিছু হয়নি। নতুন নতুন অনেক কিছুও চোখে পড়েছে। তবে সবচেয়ে ভাল লেগেছে একটা পুরোনো হয়ে যাবার ঘটনা, সিসিবির পুরোনো হয়ে যাওয়াকে। কী এক যাদুমন্ত্রে জানি সিসিবি আবারো জমে উঠেছে, দূর্দান্ত।

সিসিবির এই ভরা মৌসুমে নিজেও একটা পোস্ট দেবার লোভ সামলাতে পারছিলাম না, কিন্তু গত তিন দিন ধরে ‘ব্লগ লিখুন’ পাতা খুলে বসে আছি। কী বোর্ডের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করেও এক দুই লাইনের বেশি লেখা আগায় না। এর মধ্যে সবচেয়ে যেটি ব্যবহার হয়েছে সেটা হলো ব্যাক স্পেস। আমার লেখার গতি নিয়ে খুব সহজেই পাটিগনিতের সেই তিন-চার ফুটো ওয়ালা চৌবাচ্চার অংক তৈরী করে ফেলা যেত। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম আবজাব যাই হোক, আজকে পোস্ট একটা দিয়েই ছাড়বো।

ই মাসের পহেলা তারিখ থেকে আইভরি কোস্টের বাসিন্দা। আইভরি কোস্টকে এতদিন চিনতাম দ্রগবা, কালুয়ার ট্যুরেদের দেশ হিসেবে। এখানে আসার আগে দেশে বসে আইভরি কোস্টের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি ইত্যাদি সকল ধরনের জ্ঞান নিতে হয়েছে। কিন্তু আবিদজান বিমানবন্দরে নামার পর থেকে প্রায় পুরো শহর ঘুরে আমাদের ক্যাম্পে যেতে যতে এটিকে শুধুই দ্রগবা কালুদের দেশ হিসেবেই মনে হচ্ছিল। এর কারন আফ্রিকান নেশন্স কাপ। পুরো শহর জুড়ে বিলবোর্ড ওদের ছবি, সবার গায়ে ওদের জার্সি (আর্সেনালের জার্ভিনহোকে খুব বেশি জনপ্রিয় মনে হলো না), গাড়িগুলোতে উড়ছে দ্রগবার ছবি ছাপানো জাতীয় পতাকা। এলাহি কারবার! আমি এখানে এসে তিনটে খেলা পেলাম, কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনালে জিতলো। জেতার পরে মনে হয় একজনও মানুষও ঘরে বসে ছিল না, পুরো শহর রাস্তায়। খুব করে চাচ্ছিলাম ওরা ফাইনাল জিতে চ্যাম্পিয়ন হোক, কিন্তু অসাধারন এক ফাইনালে জাম্বিয়া হারিয়ে দিল দ্রগবাদের।

বিদজান থেকে আমার ক্যাম্প দালোয়াতে আসার পথে মাঝে একদিন রাজধানী ইয়ামাসুক্রুতে রাত কাটাতে হয়েছিল, সেখানে থাকা এক পাকিস্তানি ব্যাটালিয়নে। আমার আপায়্যনে ওরা কোন ত্রুটি করেনি, উল্টো অনেক আয়োজনে অবাকই হয়েছি। যেমন ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করা বাংলা গানের আয়োজন (পরে অবশ্য জেনেছিলাম ওদের ক্যাম্পে আসতে হয় এমন সব দেশেরই কিছু গান ওদের সংগ্রহে আছে)। দুটো গান পর্যন্ত ঠিক ছিল, তিন নম্বরে বেজে উঠলো এই দেশাত্মবোধক গান। পাকিস্তানি অফিসার্স মেসে তাদেরই আয়োজনে আমরা এই গান শুনছিলাম, আয়রনি(বাংলা কি হবে?) মনে হয় একেই বলে!

ফেব্রুয়ারী, মার্চ, ডিসেম্বর এই মাস গুলি আমাদের কাছে সবসময়ই একটু আলাদা ছিল। অন্য সময় যাই থাকুক, এই মাসগুলোতে আমাদের দেশপ্রেম, ভাষা প্রেম একটু বেশিই প্রকাশ পেত। কিন্তু এখন মনে হয় পুরো মাস আমাদের জন্য একটু বেশি লম্বা সময় হয়ে যায়, এক দুদিন ঠিক আছে। সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ইদানিং মনে হচ্ছে আমরা শুধু তারিখটাই ভুলতে পারিনি, বাদ বাকি সবকিছুই ভোলা শিখে গিয়েছি, তা না হলে ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের নিজেদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে বলিউডি প্রদর্শনই বা কেন করতে হবে! ফেসবুকের কল্যানে ২১শে ফেব্রুয়ারীর সেই চিরচেনা সুর একটু নতুন আয়োজনে শুনলাম। তারপর থেকে এতেই আটকে আছি, পুরো সন্ধ্যা জুড়ে এটাই বেজে চলেছে।

আমাদের এই বিশেষ দিবস কেন্দ্রিক আবেগ অনুভূতি গুলো যদি কোনভাবে পুরো বছরের ছড়িয়ে দেয়া যেত!

২,৩৪১ বার দেখা হয়েছে

২৫ টি মন্তব্য : “আফ্রিকা থেকে…”

  1. আমিন (১৯৯৬-২০০২)

    লেখা পড়লাম। ভালো পাইলাম।

    দিবস কেন্দ্রিকতার উপর ইদানিং কেমন যেন রুচি উঠে গেছে। আনুষ্ঠনিকতাকে ভয় পাই। তবুও বলি শুভ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

    ফাইনাল খেলাটা আমিও দেখছিলাম। মনে প্রাণে চাইছিলাম জাম্বিয়া জিতুক (তোর আমার আবারো সেই পুরান গরমিল।) ১৯৯৩ এর হারিয়ে যাওয়া জাম্বিয়ার ফুটবলারদের বিদেহী আত্মার কথা ভেবেই হয়তো দলটার প্রতি এক ধরনের সফট কর্নার কাজ করলো।

    সাপ্তাহিক আসুক আবার নিয়মিত।

    জবাব দিন
    • আহসান আকাশ (৯৬-০২)

      নিজে আইভরি কোস্টে না থাকলে আর ওদের কে দুটো জয় উদযাপন করতে না দেখলে আমিও জাম্বিয়াকেই সমর্থন দিতাম। 🙂

      বিপিএল এ এসে মনে হয় আমাদের গরমিল নাই হয়ে গিয়েছে।


      আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
      আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

      জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    বলি ও আকাশদা, তা আচেন ক্যামোন?? আফ্রিকায় গিয়েও কি সেদ্দো মিষ্টি আলুর আদ্দেকটা দিয়ে প্রাতঃরাশ সারচেন নাকি মশাই?তবে মশাই পাকিস্তানি ব্যাটালিয়নে আপনার আপ্যায়নের কতা শুনে ভিরমি খেলুম।তা দাদা পকেটের টাকাপয়সা সব গুনে দেকেচেন তো? গুলি-টুলি এক আধটা খোয়া যায়নিতো আবার? ভালো করে গুনে দেকুন মশাই!

    জবাব দিন
    • আহসান আকাশ (৯৬-০২)

      পাকিস্তানিদের আপায়্যনে আসলেই কোন ঘাটতি ছিল না, তবে এর পিছনে ওদের হালকা একটু স্বার্থও জড়িত ছিল। ওরা মূলত ট্রান্সপোর্ট ব্যাটালিয়ন, পুরো আইভরি কোস্ট জুড়ে ওদের গাড়ি চলে, এর মাঝে টানা দুতিন দিনের যাত্রাও আছে, এসব ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় আমাদের ক্যাম্পগুলোতে ওদের গাড়িগুলো যাত্রা বিরতি করে, রাত কাটায়। সেসময় ওদের ড্রাইভারসহ অন্যান্যদের থাকা খাওয়া যাতে ভাল হয় সে জন্যই যখনই ওদের ক্যাম্পে কেউ যায় তখনই ব্যাপক আয়োজন করে।


      আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
      আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

      জবাব দিন
  3. সামিয়া (৯৯-০৫)

    আপনার এই চুপচাপ লেখাগুলা আমার এত্ত এত্ত ভালো লাগে...কি আর বলব। কাকতাল কি না জানিনা, মধ্যরাতে এই গানটা ইউটিউবে খুজে পেয়ে শুনতেই আছি শুনতেই আছি। একটু আগে সেটা আরও দুজনকে পাঠালাম। অসাধারণ।

    একটু প্রশংসা না করে পারতেছি না নিচের লাইন কটার, কেন জানি খুবই ভাল লাগল ইস্টাইলটা।

    এর মধ্যে সবচেয়ে যেটি ব্যবহার হয়েছে সেটা হলো ব্যাক স্পেস। আমার লেখার গতি নিয়ে খুব সহজেই পাটিগনিতের সেই তিন-চার ফুটো ওয়ালা চৌবাচ্চার অংক তৈরী করে ফেলা যেত।

    আর দিবসকেন্দ্রিকতা...এসব নিয়ে আর ভাবব না ঠিক করেছই। চুপচাপ নিজের কাজটা করে যাওয়াই বোধহয় শ্রেয়। যেই দিবস ভাল্লাগবে উদযাপন করব, যেটা ভাল্লাগবে না করবো না। বাকিরা মুড়ি খাক।

    জবাব দিন
  4. মুসতাকীম (২০০২-২০০৮)

    আকাশদা চমৎকার লেখা :boss: :boss: :boss:
    অটঃ আপনি ১২ না ১৩ বেঙ্গলের সাথে গেছেন???


    "আমি খুব ভাল করে জানি, ব্যক্তিগত জীবনে আমার অহংকার করার মত কিছু নেই। কিন্তু আমার ভাষাটা নিয়ে তো আমি অহংকার করতেই পারি।"

    জবাব দিন
  5. সানাউল্লাহ (৭৪ - ৮০)

    আকাশ: আইভরি কোস্ট চলে গেলে? বারবিকিউ পার্টিতে তোমাকে মিস করবো। ভালো থেকো, সুস্থ থেকো। আর সিসিবিতে বেশি বেশি করে লিখো।


    "মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ"

    জবাব দিন
  6. রকিব (০১-০৭)

    গিটার টিউনিংটা গত ২ দিন যাবৎ শুনতেছি। কেমন যেন মন্ত্রের মতো। চুপচাপ বেজে চলে, তোলপাড় করে দিয়ে বেজেই চলে।


    আমি তবু বলি:
    এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি ..

    জবাব দিন
  7. সামিয়া (৯৯-০৫)

    আকাশ ভাই, আপনার আফ্রিকা পোস্ট দেখে একটা কথা মনে পড়ল 😀 । আমার নানা সম্ভবত গ্র্যাজুয়েশন না কি যেন করেছেন ইংল্যান্ড থেকে। আর আব্বুর মিশন ছিল রুয়ান্ডা আর মোজাম্বিকে। আম্মু মাঝে মাঝে আমাদের ভাইবোনদের খুব পেইন দেয়, 'ভদ্রতা' শিক্ষা দিতে গিয়ে, শব্দ করে খেও না, সুরুত সুরুত করে চা খাবা না, হেলেদুলে হাঁটবা না, ইত্যাদি ইত্যাদি।

    তখন আমরা বলি, 'না ভাই, তোমার বাবা তো ভাই ইংল্যান্ড গেসলো, আর আমাদের বাবা গেসলো গরীব গুরবো রুয়ান্ডায়, আমরা তো এরকম হবোই...'

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।