উপলব্ধি

বেশ কিছুদিন যাবত পেশাগত ব্যস্ততার কারণে ব্লগে আসতে পারিনি। নিজে লেখা তো দূরে থাক, অন্যদের লেখা পড়তেও ব্লগে আমার আসা হয়ে ওঠেনি। প্রচন্ড খারাপ লাগছিল এই দিন গুলোতে। কেমন যেন একটা অপূর্ণতা সব সময় ঘিড়ে রাখত আমাকে। সবকিছু ছাপিয়ে, আমার অনুপস্থিতির কারণ ও আমার বাবার স্বাস্হ্যের খবর জানতে চেয়ে ব্লগের অতি পরিচিত মুখ সিরাজের মেইলটি ব্লগে আসার জন্য আমাকে আরো ব্যকুল করে তুলেছিল । কিন্তু তারপরেও কিছু করার ছিলনা। চাকুরী বলে কথা। যখন মোটামুটি একটু ফ্রি হলাম, ঠিক তখনই আমার বস্ আমাকে ডেকে জানালেন, “আগামী ২৮ আগষ্ট আমাদের এই ষ্টেশনে একটা কালচারাল প্রোগ্রাম হবে যেখানে এই গ্যারিসনের সবাই উপস্থিত থাকবেন এবং এই প্রোগ্রামটা আমাদের অর্গানাইজ করতে হবে (উল্লেখ্য, বাইরে থেকে কোন শিল্পী আনা যাবেনা, পারফর্মার সব আমাদের মাঝে থেকেই হতে হবে)।” চোখে মোটামুটি শর্ষে ফুল দেখতে থাকলাম, কারন সেই সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট থেকে আমি এই ধরনের প্রোগ্রামের সাথে জড়িত থাকার সুবাদে খুব ভালো করেই জানি যে কত শত ঝামেলা আছে একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করার মাঝে। আর সব চেয়ে বড় ব্যপার হলো, ৩ দিনের সরকারী ছুটিটা মাটি। খুব আশা ছিল এই ৩ দিনে ব্লগে জমে থাকা সব লেখা গুলো পড়ে ফেলব। কিন্তু বিধি বাম।

যাই হোক, প্রাথমিকভাবে শিল্পী সংগ্রহ করে এক আধটা প্র্যাকটিস ও দিয়ে ফেললাম এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমার বস কে কনভিন্স করলাম যে এখন আপাতত সবাইকে আর প্র্যাকটিসের জন্য বিরক্ত না করে আগামী ২৪ তারিখ থেকে নতুন উদ্যমে প্র্যাকটিস শুরু করি। বসও সম্মতি দিয়ে দিলেন। আমি তো মহা খুশী। অডিটরিয়াম থেকে ফিরে ড্রেস চেঞ্জ না করেই কম্পিউটার এ বসলাম। কিন্তু ভাগ্য কেন যেন এবারও আমার সাথে বিট্রে করলো। নেট এ ঢুকতে গেলেই আমাকে জানানো হচ্ছে, “The page can not be displayed”। ফোন করে জানতে পারলাম সার্ভার রুমের কি কি ইকুইপমেন্ট যেন ভোল্টেজ আপ ডাউনের কারনে পুড়ে গেছে, ঠিক করতে ৬/৭ দিন লেগে যাবে। মেজাজটা এত খিঁচিয়ে উঠল যে ইচ্ছে করছিল মার্ফি সাহেবকে উঠিয়ে এনে বলি, “আপনার এই অনবদ্য মার্ফি’স ল খানি তুলে নিয়ে আমদের এবার একটু মাফ করেন।“

শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই কম্পিউটার এ বসলাম কিছু একটা লেখার জন্য। উদ্দেশ্য, নেট ঠিক হলেই যেন কোন ধরনের সময় নষ্ট না করে নতুন একটা লেখা জিহাদের জিম্মায় দিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু কি নিয়ে লিখব, তা ভেবে পাচ্ছিনা। কি লিখি……???

আমার আগের লেখা গুলো পড়ে অনেকেই হয়তো আমাকে খুব ভালো, ভদ্র এবং আদর্শ ছেলে হিসেবে ভাবছেন। চেষ্টা করে দেখি আজ এই লেখা দিয়ে তাদের সেই সু-ধারণাটা বদলাতে পারি কিনা…

কলেজে জয়েন করার পরে প্রথম দিকে সবাই ই একটু আধটু কম বেশী জড়সড় ছিল, কেবল আমার মতো ৩/৪ জন ছাড়া (যাদের কাছে কলেজ ক্যাম্পাসটি অপরিচিত নয়)। আমার কাছে ক্যাম্পাসটি পরিচিত এই কারণে, তখন আমার মামা ঐ কলেজের ই একজন শিক্ষক ছিলেন এবং মামার বাসায় বেড়ানোর সুবাদে কলেজ ক্যাম্পাস এবং অধিকাংশ শিক্ষকরাই ছিলেন আমার পরিচি্ত। সেই সময় আমাদের কলেজে বাংলার একজন স্যার ছিলেন, যিনি ভীষন মাত্রার কড়া মানুষ। ক্লাশে পড়াতে এসে জীবনে কোন দিন হেসেছেন বলে অন্ততঃ আমার মনে পড়েনা। এমন কি বছরের দুইটি ঈদেও তিনি হাসতেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। ক্যাডেটদের অকারনে তিনি খুব একটা প্রহার করতেন না, তবে যখন করতেন……থাক সে কথা আর না হয় নাই বা বললাম।

স্যারের মারের ও আবার একটা বিশেষ স্টাইল ছিল। লাঠি বা স্কেল যেটাই হোক না কেন, সেটা দিয়ে শরীরের যে কোন একটা জায়গাতেই তিনি অনবরত মারবেন এবং লাঠির গতি হবে ঘন্টায় সর্বনিম্ন ১২০ কিঃমিঃ। একবার শুধু চোখটি বন্ধ করে ভাবুন আপনার শরীরের যেকোন একটিমাত্র জায়গাতে ন্যূনতম ১২০ কিঃমিঃ বেগে ননষ্টপ লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করা হচ্ছে…। আমি ভুক্তভোগী হিসেবে শুধু এটুকুই বলতে পারি, “ব্যপারটা অত্যন্ত কষ্টকর এবং বেদনাদায়ক…।” ভুক্তভোগী বলাতে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, যেভাবেই হোক না কেন, স্যারের সেই বেত্রাঘাত পর্ব আমার কপালেও জুটেছিল।

তখন কলেজে আমাদের বয়স কেবল দুই আড়াই মাস হয়েছে। বাংলা ক্লাশ। সেই কড়া স্যারের ক্লাশ। স্যারের ক্লাশে আমাদের সবার বাংলা হাতের লেখা জমা দিতে হতো। স্যার আসার আগেই ফর্ম লিডার সবার কাছ থেকে খাতা জমা নিয়ে নিত। সবাই যখন নিজ নিজ খাতা রেডি করছে, তখন আমার খেয়াল হলো যে আমি গতকাল প্রেপে তো কোন হাতের লেখা লিখিনি। কারণ, আফটারনুন প্রেপে ঘুমানোর কারণে সারাটি প্রেপ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। ইভিনিং প্রেপে কার কার সাথে যেন গল্প করে কাটিয়েছি আর নাইট প্রেপে সফলতার সাথে ঘুমাতে পেরেছিলাম। সুতরাং হাতের লেখা লেখার সময় পেলাম কখন?

হাতের লেখা লেখা হয়নি আবিষ্কার করার পর আমি রীতিমত ঘামতে শুরু করলাম। আজ যে আমার কপালে খারাবি আছে তা বুঝতে আর বাকি রইলনা। অসহায়ের মত চারিদিকে তাকাচ্ছি। ঐ দিকে ফর্ম লিডার আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। হঠাৎ দেখতে পেলাম, আমার পাশের ডেস্কটিতে বসে একজন একটু কনফিউজড দৃষ্টিতে তার ডেস্কের উপর খুলে রাখা দুইটি খাতার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কাছে গিয়ে দেখলাম আমার এক গরু সিনসিয়ার ক্লাশমেট, হাতের লেখা এক পাতা লিখেই ক্ষান্ত হয়নি। দুইটি খাতাতে দুই পৃষ্ঠা হাতের লেখা লিখে এখন সে কনফিউজড… কোন লেখাটা দেখতে সুন্দর হয়েছে…কোন লেখাটা স্যারের কাছে জমা দিবে। আমিতো ব্যপারটা দেখে যা বোঝার বুঝে নিয়েছি এবং মনে মনে মহা খুশী। আল্লাহ’র কাছে অলরেডি শুকরিয়াও আদায় করা হয়ে গেছে এক চোট। কিছু বুঝিনি এমন ভাব করে তার পাশে গেলাম। কি ব্যপার জানতে চাইলে সে আমাকে এই বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করার জন্য অনুরোধ করল। আমিও বেশ বিজ্ঞের মত ভাব করে একটা খাতা দেখিয়ে দিলাম। ভাল কি খারাপ সেটি দেখা তখন আমার মূল লক্ষ্য ছিলনা। আমার লক্ষ্য তখন অন্য কিছু। আমার দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতার একটা হাসি দিয়ে এমন একটা ভাব সে করলো, যেন আমি তাকে গভীর সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছি। নিজ থেকে যেচে তাকে উপকার করায় তার দৃষ্টিতে আমি তখন মহামানব। কিন্তু একটু পরেই এই মহামানবের আসল রুপ দেখতে পেয়ে আমার সেই বন্ধুটি রীতিমতো বেকুব হয়ে গেল। কে কি ভাবলো আমাকে, তা নিয়ে আমার তখন একটু ও মাথা ব্যাথা নেই। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা, “আসন্ন দোযখের আযাব থেকে আমাকে বাঁচতে হবে…তা যেকোন মূল্যের বিনিময়ে।“

খুব ভদ্র ভাব করেই তাকে বললাম, “যেহেতু আমি তোমাকে (তখন ও আমরা “তুই” বলার মত ঘনিষ্ঠ হতে যে সময়টুকু লাগে তা পার করিনি) একটা বিপদ থেকে উদ্ধার করেছি, সুতরাং তোমার ও উচিৎ, আমাকে একটা বিপদ থেকে উদ্ধার করা। আর সেই উপকারটি হচ্ছে, তোমার বাকি খাতাটি আমাকে দিয়ে দাও, আমি আমার নাম করে জমা দিয়ে দেই।” আমার বন্ধুটিকে মনে হলো এতক্ষণে সে সত্যিকার অর্থেই কনফিউজড। তার জিজ্ঞাসা, “স্যার যদি ধরে ফেলে?” আমার অভয়, “কি করে ধরবে? তার উপরে তোমার নাম আর আমার নামতো অলমোষ্ট একই।” মনে হলো তাও সে আস্বস্ত হতে পারছেনা। ওদিকে সময়ও নেই। আমি আমার বন্ধুকে আর কোন কিছু ভাবার সময় না দিয়ে একরকম জোর করেই খাতাটি নিয়ে যখন ডেস্ক এ ফিরলাম তখন একই সাথে ফর্ম লিডার আমার কাছ থেকে খাতাটি নিয়ে নিল আর স্যার ক্লাশে ঢুকলেন। পুরো ক্লাশ চুপ। আমার সেই বন্ধুটি কোন প্রতিবাদ করারও সুযোগ পেলোনা।

ফর্ম লিডার স্যার কে রিপোর্ট দিলো- ২৫ জন ক্লাশে উপস্থিত এবং সবাই ই হাতের লেখা জমা দিয়েছে। স্যার রিপোর্ট পাবার পরে আমাদেরকে কি একটা লিখতে দিয়ে হাতের লেখার খাতা গু্লো দেখতে শুরু করলেন। আমি লেখার ফাঁকে ফাঁকে স্যারের দিকে বারবার দেখছি, কখন স্যারের খাতাগুলো দেখা শেষ হবে। কিন্তু আজ কেন যেন সময় থেমে গিয়েছে। কোনভাবেই সময় শেষ হতে চাইছেনা। হঠাৎ দেখলাম স্যার কেমন যেন একটু বিচলিত এবং যে খাতাগুলো অলরেডি দেখে রেখেছেন তার মাঝে কি যেন একটা খুঁজতে লাগলেন। আমার বুক তখন ঢিপ ঢিপ করছে। কি হবে বা কি হতে চলেছে ঠিক বুঝেও যেন বুঝতে পারছিনা। একটু পরেই দেখতে পেলাম যে স্যার দেখে রাখা খাতাগুলো থেকে একটি খাতা টেনে বের করলেন এবং যেই খাতাটি তিনি দেখছিলেন তার সাথে কি যেন যাচাই বাছাই করছেন। যাহোক, স্যারের গবেষণার ফল হলো, আমার সেই বন্ধুটি ধরা পড়ল এবং কে খাতা জমা দেয়নি সেই হিসেবে আমিও ধরা খেলাম। এহসানের অপরাধ, আমাকে অপরাধ করতে সে সাহায্য করেছে।

দুই নম্বরী কাজ করলেও, মানুষ হিসেবে মনে হয় ভিতরে ভিতরে তখনও কিছুটা হলেও ভাল ছিলাম। তাই আমার সেই বন্ধুকে যখন স্যার হ্যান্ডস ডাউন হতে বললেন, তখন আমি বলে উঠলাম, “স্যার ও আসলে কিছু জানেনা। ওকে না বলে আমি ওর ডেস্ক থেকে খাতাটি সরিয়ে নিয়ে জমা দিয়েছি।” স্যার এবং এহসান দুজনেই হতবিহবল হয়ে পড়লেন মনে হলো। আমি নিজেও ঠিক তখনো বুঝতে পারিনি যে এই কথাটির গভীরতা কতটুকু। আমার সেই বন্ধুটিকে ছেড়ে দেয়া হলো। পুরো ক্লাশকে উদ্দেশ্য করে স্যার কিছু বললেন, আর তখনই আমি টের পেলাম যে আমার স্বীকারোক্তির পর, অপরাধের মাত্রা কতটা জটিল এবং ভয়ঙ্কর আকার ধারন করেছে।

এবার আমার কর্মফল প্রাপ্তির পালা। হ্যান্ডস ডাউন হলাম। ফর্ম লিডার কে পাঠানো হলো বৃক্ষ শাখা নিধনের জন্য। নতুন ফর্ম লিডার, সদ্য ক্লাশ সেভেন, ক্লাশমেট বন্ডেজ তখনও হয়ে ওঠেনি, অনেক উৎসাহ…… কোথা থেকে যেন বিশাল সাইজের মোটা একটা লাঠি নিয়ে এলো- যেন এই লাঠি আনার মাঝেই তার করিৎকর্মা গুণটি নীহিত। স্যার খুশী হলেন কিনা তা কেউ না বুঝলেও আমি বুঝেছিলাম যে ডালটি ওনার খুবই পছন্দ হয়েছে। আমার পশ্চাৎদেশে তখন সিডর বয়ে যেতে থাকলো… । প্রথমে একটু ধৈর্য্য ধরার চেষ্টা করলেও মূহুর্তের মধ্যে আকাশ বাতাস ফাটিয়ে “ওরে বাবা রে… মা রে… গেলাম রে…” বলে চীৎকার করে উঠলাম। পাশের ফর্ম থেকে স্যার পর্যন্ত দৌঁড়ে এলেন ঘটনা কি দেখার জন্য। সম্ভবত হ্যান্ডস ডাউন থেকে উঠে এসে পা জড়িয়ে ধরার পরে সে যাত্রা স্যারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম।

কাঁদতে কাঁদতে ডেস্কে গিয়ে বসলাম। মার খেয়ে ঠিক মত বসতেও পারছিলাম না। স্যার তখন পুরো ক্লাশ কে উদ্দেশ্য করে আবার জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়া শুরু করলেন। আমার কানে কিছুই ঢুকছিলোনা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিজের চোখ মুছছিলাম। হঠাৎ স্যারের একটি কথা কানে এলো। পুরো ক্লাশ কে তিনি বলছেন…… “তোরা দেখিস, বড় হয়ে এই ছেলেটা একদিন আমারই ঘরে ডাকাতি করবে।” ঐ ছোট বয়সে এত অমানুষিক মার খাবার পরেও কথাটা আমার কান এড়ায়নি এবং কেন যেন কথাটি আমার ভালোও লাগেনি। নিজেকে খুব নীচ আর ছোট মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, এই কথাটা না বলে স্যার আমাকে আরো কেন মারলেন না? কেন আমাকে এই রকম একটা কথা বললেন স্যার?

দিন যায়…মাস যায়…বছর যায়…

কালের পরিক্রমায় সিনিয়র হতে থাকি। স্যারের সাথে কেন যেন ফ্রি হতে পারিনা। স্যারও ব্যপারটা মনে রেখেছেন কিনা বুঝতে পারিনা। সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও, আমি মন থেকে স্যারের “তোরা দেখিস, বড় হয়ে এই ছেলেটা একদিন আমারই ঘরে ডাকাতি করবে” কথাটি ভুলতে পারিনা। মনে মনে শুধু আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনা করতে থাকি যেন স্যারের এই ভবিষ্যদ্বাণীটি সত্য না হয়।

আল্লাহ আমার প্রার্থনা শুনেছেন। ঐ ঘটনাটির পর থেকে আমি যেই মানষিক চাপ নিয়ে বড় হচ্ছিলাম আজ আর তা নেই। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল স্যারের সামনে গিয়ে একদিন তার পা ছুঁয়ে বলি, “স্যার, জীবন আমাকে আপানার ঘরে ডাকাতি করতে দেয়নি। আমি এজন্য আল্লাহ এবং আমার জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি আপনার কাছেও কৃতজ্ঞ। আপনি সেদিন আমাকে এই কথাটি না বললে হয়তো আমি এতোটা সতর্ক হতাম না। আমার জীবনটা হয়তো এরকম হতোনা।”

সাহস করে উঠতে পারিনা স্যারের মুখোমুখি হতে। অবশেষে একদিন জানতে পারলাম যে স্যার সিলেট ক্যাডেট কলেজে আছেন। আমিও যেহেতু সিলেটে, তাই মনে মনে ঠিক করলাম যে একদিন স্যারের সাথে দেখা করতে যাবো এবং কথা প্রসঙ্গে স্যারকে কথাগুলো বলবো। স্যার যদি এখনো আমার উপরে রাগ করে থাকেন, তাহলে মাফ চেয়ে নেব।

গত শবে বরাতের ছুটির দিনে কোন একটি কাজে এয়ারপোর্টের দিকে গিয়েছিলাম। আসরের নামায পড়ার জন্য সিলেট ক্যাডেট কলেজের মসজিদে ঢুকে আমাদের কলেজের পিয়ন আলাউদ্দীন ভাইয়ের (বর্তমানে তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজে কর্মরত) সাথে দেখা হলো। বুকে জড়িয়ে ধরলাম। কি যে এক শান্তি পেয়েছি, তা বলে বোঝানো যাবেনা। সে যাইহোক, আলাউদ্দীন ভাই যেহেতু আমাদের কলেজে ছিলেন তাই ওনার কাছে স্যারের কথা জানতে চাওয়ায় উনি জানালেন যে স্যার এই কিছুদিন আগে অবসর গ্রহণ করেছেন। প্রচন্ড রাগ হলো নিজের উপরে। এত কাছে থেকেও কেন স্যারের সামনে আসলামনা এতদিন এই জন্য।

স্যার এখন কোথায় আছেন জানিনা। আর কখনো স্যারের সাথে দেখা হবে কিনা তা ও জানিনা। আমার লেখা হয়তো কোনদিন স্যারের কাছে পৌঁছাবেনা…আর পৌঁছালেও স্যার ঘটনাটি মনে করতে পারবেন কিনা জানিনা। স্যারের উদ্দেশ্যে শুধু এইটুকুই বলবো, “বাংলা ভাষার অনেক কিছুই আপনি শিখিয়েছেন। নির্মম প্রহার কি জিনিষ তাও আপনিই আমায় বুঝিয়েছেন। কিন্তু জীবনে মানুষ হবার মূলমন্ত্রটি আমি আপনার কাছেই শিখেছি। আপনার একটি কথা আমার জীবনে নতুন মাত্রা এনে দিয়েছে। ভুল আমি করেছিলাম, আর সেজন্য আমি আজো অনুতপ্ত। স্যার, আমার সেই দুষ্কর্মটি যদি আপনার মনে এখনও কষ্ট দেয়, আমি হয়তোবা জানতে পারবোনা। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার মনোকষ্টের কারণে, আপাত দৃষ্টিতে আমাকে সফল মনে হলেও সত্যিকার অর্থে জীবনে সফল এবং প্রকৃত মানুষ আমি হতে পারবোনা। আপনার নিজ সন্তানের উপর কি এতদিন রাগ করে থাকতে পারতেন? আমি কি আপনার সন্তানদের মত ক্ষমা পেতে পারিনা স্যার? প্লিজ স্যার, মনে কষ্ট রাখবেন না। বাবার মনে কষ্ট দিয়ে পৃথিবীর কোন সন্তান ই যে সুখে থাকতে পারেনা।”

দোয়া করবেন স্যার।

৮৩৯ বার দেখা হয়েছে

২৯ টি মন্তব্য : “উপলব্ধি”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    যাক আহসান ভাই ফেরত আসলেন অবশেষে।আমরা সবাই আপনাকে খুব মিস করছিলাম,ভাইয়া!খেয়াল করলে দেখবেন বিভিন্ন ব্লগ এ আমরা অনেকেই বলাবলি করছিলাম আহসান ভাই কই গেল, উনি সুস্থ আছেন কিনা,কোন সমস্যা হল না তো উনার?আশা করি দুর্দান্ত একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করবেন যা দেখে আপনার সি ও একেবারে অভিভূত হয়ে যাবেন।বরাবরের মত এবারের ব্লগটাও অন্তর ছুঁইয়ে গিয়েছে।ওয়েলকাম হোম, আহসান ভাই!! 🙂

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      মাসরুফ,
      বাড়িয়ে বলছিনা। ব্লগের প্রেমে তো বহুত আগেই পড়ছি, কিন্তু আমার এত্তগুলা ভাইয়ের ভালবাসা আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখালো। মাসরুফ সত্যি বলছি, প্রচন্ড শূণ্যতার মাঝে ছিলাম এই কয়েকটা দিন। গত কাল রাত ১১টার সময় আমার এক মির্জাপুরিয়ান কোর্সমেটের বাসায় গিয়ে ওর জি পি ফোন দিয়ে লগ অন করে লেখাটা পোস্ট করেছিলাম। এই মাত্র আমার এখানে নেট ঠিক হলো। তোমাদের ভালোবাসা আমাকে প্রচন্ড ইমোশনাল করে দিয়েছে...প্রচন্ড...

  2. আহসান ভাই, আপনে তো চিন্তায় ফালায় দিছিলেন...
    আপনার মত ইমোশনাল লোকের খবর দুইদিনের বেশি না পাইলে যে কারও চিন্তা হবে...
    ব্যাপারটা মাথায় রাইখেন...

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      আমার ভাই গুলা যে আমাকে এত ভালবাসে তা না বুঝতে পারার অপরাধটা দয়া করে মাফ করে দিও। আশা করি ইনশাল্লাহ ভবিষ্যতে এরকমটা সজ্ঞানে আর করবোনা।

      অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।

      ভালো থেকো।

  3. কনক রায়হান (৯৮-০৪)

    ভাইয়া খুব ভালো লাগলো।
    বাংলার একজন স্যারকেই এমন অমানসিক ভাবে পেটাতে দেখেছি,আখতার হোসেন স্যার,বরিশাল থেকেই আমাদের কলেজে এসেছিলো।একবার উনি আমাদের এক ফ্রেন্ডকে গালে থাপ্পর মেরে দাঁতের মাড়ি নড়ায় দিয়েছিলো..পরে ওকে অপারেশন করতে হইসিলো।

  4. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    কলেজে সব স্যারকেই যে শ্রদ্ধা করতাম তা বললে পুরোপুরি সত্য বলা হবেনা।আমি একজন মাত্র স্যারকে(তাকে স্যার বলতে আমার দ্বিধা হচ্ছে) কলেজ থেকে বের হবার সময় করমর্দন করার সময় হাত ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।এটাও বলেছিলাম,তিনি এই ব্যবহারেরই যোগ্য।এই লোকটি একজন জুনিয়র টিচার ছিলেন কিন্তু তার কাজ ছিল প্রিন্সিপাল আর অ্যাডজুটান্টকে তৈলমর্দন করা।সেটা হয়ত উপেক্ষা করা যেতে পারে কিন্তু এই লোকটি এইচ এস সি পরীক্ষার ৩ মাস আগে আমার দুই ক্লাসমেটকে কলেজ আউট করার পেছনে দায়ী ছিলেন।এবং তিনি সেটা গর্ব করে প্রকাশ করতেন সবার কাছে।আমার ব্যাচের আরেকজন ক্যাডেটের পেরেন্টস কল করিয়েছিলেন পরীক্ষার ১ মাস আগে(কোনোটাই ততটা সিরিয়াস কারণ ছিলোনা)।

    আহসান ভাই,পরম করুণাময়ের অশেষ রহমত আপনার উপর যে তিনি আপনাকে এত বিশাল একটা অন্তর দিয়েছেন।কিন্তু আমি তো রক্ত মাংসের মানুষ ,ভাইয়া!
    যে অন্যায় আমার বন্ধুদের প্রতি করা হয়েছে আমার পক্ষে তা ক্ষমা করা খুব কঠিন।কিভাবে ভুলি তাদের পিতামাতার কান্নারুদ্ধ অপমানিত মুখ?আর সেই মুখের দিকে তাকিয়ে ওই স্যারের গর্বিত হাসি,যেন খুব বীরের মত একটা কাজ করেছেন?

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      ভাইয়া মাসরুফ,
      আমিও তোমার সাথে সম্পূর্ণ একদম। সবাই একরকম হয়না। সব স্যার ই যে আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর তা না। ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা বলে একটা ফ্যাক্টর আছে যা আল্লাহ প্রদত্ত। ব্যপারটা একটু কন্সিডার করো...ঐ যে..."তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবোনা কেন?"

  5. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    ওহ আহসান ভাই,হয়তো এগুলো বলে আপনাকে না জেনে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি।কিন্তু ভাইয়া, আপনার লিখাটি পড়ে নিজের সীমাবদ্ধতাটুকু খুব বেশি উপলব্ধি করছিলাম।বড্ড ইচ্ছে হচ্ছিলো এটা ভেবে, ইস, যদি আপনার মত রাগ আর ক্ষোভগুলো ভুলে যেতে পারতাম!আশা করি ছোটো ভাইএর এই সীমাবদ্ধতাটুকু মাফ করে দেবেন...

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      মাসরুফ,
      তুমি অনেক ভাল একটা ছেলে। ভাল মনের মানুষ ছাড়া কার উপলব্ধি এমন হতে পারেনা। আর হ্যা, তোমাকে তো মাফ করা যাবেনা ভাইয়া। কারন আমি চাই এরকম আর অনেক উপলব্ধির কথা তুমি লেখ এবং আমাদের সাথে শেয়ার করো।

      আমি তোমার লেখা কমেন্টগুলোর ও প্রতিটা লাইন পড়ি। I like those too much. And I don wanna to be deprived.

      ভালো থেক ভাইয়া।

  6. ওবায়দুল্লাহ (১৯৮৮-১৯৯৪)

    দোস্ত,
    অনেক ভাল লাগলো রে।
    ক'দিন ব্যস্ত ছিলাম আসা হয়নি।

    তোর প্রোগ্রাম ইনশাআল্লাহ ফাটাফাটি হবে রে...
    যেমনটি হয়ে এসেছে।

    তোর 'উপলব্ধি'টাও হৃদয় ছুঁয়ে গেল রে।
    দোওয়া করি ঐ স্যারের সাথে দেখা হবে একদিন।
    আর জানিস তোর আজকের অবস্থানে তিনি সত্যি অনেক অনেক গর্বিত হবেন।

    শুভেচ্ছা নিরন্তর...


    সৈয়দ সাফী

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      কি করে ফাটাফাটি হবে? পরিকল্পনা এবং উপস্থাপনায় তুই নাই...এই অনুষ্ঠান কি করে ভালো হয়? সত্যি বলছি দোস্ত, তোর একটু খানি ছিটাফোটা পাইলেও আমার চলতো।

      মহা ঝামেলাতে আছি দোস্ত। প্র্যাকটিসে ভাবীদের এবং পিচ্চিদের কন্ট্রোল করাটা বড়ই কঠিন ব্যপার হয়ে দাড়িয়েছে। বউ থাকলে হয়ত ভাবী মহল সামলানো যেত। মহা বিপদ রে দোস্ত।

      By the way, I tasked U abt something through a personal mail to U. Pl, do the needful and save me from the deep sea.

      ভাল থাকিস দোস্ত।
      আল্লাহ হাফেয।

  7. সাব্বির (৯৫-০১)

    নেটের লাইন না থাকায় ৩/৪ দিন পর ব্লগে ঢুকলাম।
    মনটা খুব ছটফট করছিল না আসতে পেরে।
    আহসান ভাই লেখাটা বরাবরের মত অতি সৌন্দর্য হয়েছে।
    এই স্যারের কাছে আমাদের ব্যাচের সবাই কম বেশী মাইর খাইছে।
    কিন্তু আমি কখনো খাই নাই 🙁
    হয়তো সে কারণেই আমি কোন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারছি না।
    আপনার এই লেখা পড়ে মনে হচ্ছে ইস্‌ স্যার যদি আমাকে মারত।
    ( 😕 কোন অজ্ঞেত কারণে স্যার আমাকে পছন্দ করতেন)

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      সাব্বির,
      এভাবে বলোনা...জীবনে প্রতষ্ঠিত হবার শেষ সময়টুকু তো এখনো শেষ হয়ে যায়নি ভাইয়া...আল্লাহ'র রহমতে সারা জীবন এ তো পড়ে আছে। আর তুমি অনেক ভাল অবস্থানে আছো। অনেকের চেয়ে ভালো।

      মন খারাপ করার কিছু নেই। ইনশাল্লাহ একদিন আমাদের চেয়ে অনেক ভালো অবস্হানে থাকবে তুমি..দেখে নিও।

      ভালো থেকো । আল্লাহ হাফেয।

  8. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    ....স্যারের লংরেঞ্জ চড় আর ননস্টপ একই জায়গায় পিটানোর তুলনা আমার জানা নেই। আর আমি এখনো ভেবে পাই না ঠান্ডা মাথায় কিভাবে মানুষ এভাবে পিটাতে পারে!!

    তবে আরেকটা জিনিসেরও তুলনা খুজে পাচ্ছি না.....
    এত কিছুর পরও স্যারকে নিয়ে এতটা পজিটিভ করে কিভাবে লিখলেন আহসান ভাই?
    আমি অভিভূত।


    Life is Mad.

    • আহ্সান (৮৮-৯৪)

      সায়েদ,

      আমার বাবা নানা কারনে আমাকে অনেক মেরেছেন এ জীবনে। আমি কি আমার বাবাকে ভালো না বেসে থাকতে পারবো? পারবো কি তার উপরে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে? তবে বাবা মারার পর তার উপর ভীষন রাগ হত..স্যারের উপরেও তখন হয়ছিলো...কিন্তু ঐ যে, বাবা আমাকে কি জন্য মেরেছিলেন তা যেভাবে উপলব্ধি করেছিলাম,ঠিক সেভাবে স্যারের টা ও উপলব্ধি করছ......।

      আফটার অল, বাবা তো ছেলের মঙ্গলই চাইবেন তাই না?

      ভালো থেকো।