আজাইরা প্যাঁচাল ও কিছু কথা!!

ঈদের আগে আগেই শেষ করলাম একমাসের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং। এই বছরটার শুরুতেই জানতাম, এরকম একটা সুযোগ ভার্সিটি থেকেই করে দেয়া হবে। মনে মনে ভাবলাম, “যা বাবা, ক্লাস রুমে বইসা বইসা তো অনেক থিওরি কচলাইলাম… এইবার তো রিয়েল ফিল্ডে গিয়া সব শিখা ফালামু… মামা, পারলে ঠেকাও!!!”

যাই হোক, যথাসময়ে “ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে” হাজির হলাম। মনে অনেক আশা, দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, নামি দামি ইঞ্জিনিয়াররা এইখানে, জানার আছে অনেক। গেট দিয়ে ঢুকে মনটাই ভালো হয়ে গেলো। বিশাল এলাকা, অনেক বেশি সাজানো গুছানো, সারিবাধা রাস্তা, মাঠ, বাগান, ছোট ছোট কোয়ার্টার… অনেকটাই ক্যাডেট কলেজের মতন।

ভালো লাগার অনুভূতি ঐ পর্যন্তই… একটি আবাসিক বিল্ডিং এ থাকার ব্যবস্থা। সেখানে গিয়েই নতুন উপলব্ধিঃ

১.আমাদের সরকার মাকরসা আর ছারপোকার চাষ করে।(মশার কথা বলার কোনো মানেই হয় না!)

২.সরকারি সিঙ্গেল বেড মানে আক্ষরিক অর্থেই “সিঙ্গেল বেড”। (দুইজন একসাথে বসলেও খবর আছে!!! ঘরের মেঝে আর বিছানা একই সমতলে যেতে বাধ্য! নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বললাম। অবশ্য একদিক দিয়ে এইটা ভালোঃ এই বেড আমাদেরকে শালীন হতে শিখায়ঃ))

৩.সরকার সারা দেশকে এনার্জি সেভিং লাইট ব্যবহারে উৎসাহিত করলেও নিজে এই ব্যপারে একেবারেই উদাসীন। (টিউব লাইটের পয়েন্ট আছে, কিন্তু লাইটটি নেই। সেই মান্ধাতার আমলের ৬০ওয়াটের বাল্বই ভরসা, হোক না বিদ্যুৎ এর অপচয়, কার কি!!!)

৪.বাথরুমটা যদি কোনো কারণে পরিস্কার থাকে, তবে বুঝতে হবে আপনি স্বপ্ন দেখছেন।(নিজের গায়ে চিমটি কেটে কনফার্ম হওয়া আবশ্যক!)

৫.উপরের সবই মিথ্যা প্রমান করা সম্ভব, যদি অতি অমায়িক কেয়ারটেকারকে চা নাস্তা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা যায় তবেই!

এইতো গেলো থাকার ব্যাপার, এইবার আসি শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারটাতে…।
আমাদের দেশের অনেকজন প্রকৌশলী এই কেন্দ্রে কর্মরত। তারপরেও মূল জেনারেটর রুম এ দেখি বেশ কয়েকজন রাশিয়ান মিলে কাজ করছেন। কেমন যেন উদ্ভূত লাগলো। আজ থেকে প্রায় ৪০বছর আগে রাশিয়ানরাই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশকে তৈরী করে দিয়েছিল, তার মানে এই না যে, ওরা এখনও এইখানে আটকে থাকবে। সাথে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম,
“স্যার ওরা এইখানে কি করে?”
স্যার এর উত্তরঃ “ওনারা ইঞ্জিনিয়ার। রাশিয়া থেকে এসেছেন। রক্ষনাবেক্ষন এবং কেন্দ্রটির মূল চালনা ও্নারাই দেখেন।”
“তাহলে স্যার আপনারা?”
স্যার এর উত্তরঃ “কেন? আমরা এই দেশের ইঞ্জিনিয়ার!!!”

এমন নির্দেশ যত্রতত্র চোখে পড়ে!

এমন নির্দেশ যত্রতত্র চোখে পড়ে!


নতুন একটা ব্যাপার শিখলাম। একধরনের লোক হলো ইঞ্জিনিয়ার, যারা বিদেশ থেকে এসেও সারা গায়ে ঝুল কালি মেখে পরিশ্রম করে কাজ করেন এবং তার বিনিময়ে সরকার থেকে বিপুল পরিমান টাকা নিয়ে যান… আর আরেক দল লোক হলেন তারা, যারা “এই দেশের ইঞ্জিনিয়ার”, এবং তার বিনিময়ে সরকার থেকে বিপুল পরিমান টাকা বেতন নেন। আমি কারো নিন্দা করছি না। কিন্তু ব্যাপারটা চোখে লাগার মতন বৈকি!!! আজ যারা আমার মতন স্টুডেন্ট, তাদের থেকেও একটা বড় অংশ তথাকথিত “এই দেশের ইঞ্জিনিয়ার” ই হবে… আমার কথায় কেউ আঘাত পেলে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। কিন্তু আমি মনে করি এটাই সত্য। এই ঘোড়াশাল থেকে ফেরার এক সপ্তাহের মাথায় আমি পিডিবি’র একজন বিভাগীয় প্রকৌশলীর দেখা পাই। যিনি চাকুরি জীবনের শুরুতে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ছিলেন। ওনাকে দেড় বছরের মাথায় ওখান থেকে জোরপূর্বক বদলি করে দেয়া হয়। কারণঃ ওনিই প্রথম বাঙ্গালি প্রকৌশলী, যে কিনা রাশিয়ানদের থেকে অনেক কাজ শিখে যথাযথ প্রয়োগ করেছিলেন। যার ফলে “চেইন অফ কমান্ড” ব্যহত হচ্ছিল!!!

ভালো যে কিছু হয় না, তা না… হয়তো ভালোটাই বেশি হয়… কিন্তু সেই টিপিক্যাল ক্যাডেটের মতন “অসঙ্গতি”গুলাই বেশি চোখে পরে, যা কিনা আবার “চেইন অফ কমান্ড”।

২,৯২৫ বার দেখা হয়েছে

৪৫ টি মন্তব্য : “আজাইরা প্যাঁচাল ও কিছু কথা!!”

  1. রাশেদ (৯৯-০৫)

    😮 ;;) ;)) ;)) 😀 😛
    আহমেদ তুই????? সাবাশ ব্যাটা কুমিল্লার ৪০০ তম ব্লগটা তুই লিখলি :clap: আমি লিখতে চাইছিলাম কিন্তু ডজটা যে তোর থেকে খাব এইটা আশা করি নাই ~x( x-( 😡


    মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়

    জবাব দিন
    • হাসনাইন (৯৯-০৫)

      ।...।...।...হমেদ।...
      সত্যি কথা কইলি। ইঞ্জিনিয়ারগো এই আবস্থাই, তয় কিছু ভাল আছেন। ঘোড়াশাল সার কারখানায় এমন অনেক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে ক্লাস করছি। ভাল ইঞ্জিনিয়ার দেশে থাকে না, সরকারের টাকায় কোর্স কইরা বাইরে যায়গা। আবার অনেকদিন ধরে নিয়োগ বন্ধ সেখানে তাই ভবিষ্যতের কথা ভাইবা অনেককেই আশংকা করতে দেখলাম। আর মেইন্টেনেন্সের বিষয়টা জিজ্ঞেস করছিলাম এক জিএমরে। তিনি একটা উদাহরণ দিলেন ফিল্ডের, জেনারেটর নষ্ট হইলে ফিল্ডের ইঞ্জিনিয়ার হইত সেটা খুলতে পারমিশন চাইল কিন্তু অনেক সময় সেটা পাওয়া যায় না উপর থেকে কারণ সেই রিস্ক কেউ নিতে চায়না। আর কোন একটা পার্টস দুই বছর পর নষ্ট হইতে পারে সেই হিসাব কইরা ফাইল বানাতে হয় সেটা পাইতে আরও একশ সাইন লাগে। গিয়াঞ্জাম মামা বহুত গিয়াঞ্জাম।

      জবাব দিন
  2. দিহান আহসান

    প্রথম ব্লগ, কেও দেহি কিছু কয়না,
    দেখি ভাইয়া ব্লগের নিয়ম অনুসারে ১০টা :frontroll: দিয়া দাও।

    অভিনন্দন ৪০০তম ব্লগের জন্য,
    লেখা ভালো হয়েছে।
    আশা করি এখন থেকে নিয়মিত থাকবে আমাদের সাথে। 🙂

    জবাব দিন
    • আহমেদ

      :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll: :frontroll:
      ১০টার জায়গায় ১১টা দিলাম... কলেজে অনেক ডজ মারছি, তাই এখন ভালো সাজলাম 😀

      ধন্যবাদ ভাবী। অনেকদিন থেকে কিছু লিখবো লিখবো করছিলাম। হঠাৎ কইরা দেখি পিকনিক চইলা আসছে, এখন যদি বাদ দিয়া দেয়, এই ভয়ে লিখা ফেললাম 🙂 দোয়া রাইখেন, খাওয়া-দাওয়ার চান্স মিস হইতে দেখলে আবার একটা লেইখা ফেলবো 😀

      জবাব দিন
  3. অবশেষে আপনি লিখলেন.. সিসিবি'র অনেক লেখা পড়েছি আগে.. সবসময়ই ভালো লেগেছে...আজ তোরটা পড়ে সিসিবি'র জন্য প্রেম আর বেড়ে গেল..আশা করছি নিয়মিত থাকবি.

    জবাব দিন
  4. আরে টান্টু দেখি এইখানেও চইলা আসছে :chup: । কঙ্গ্রাচুলেশন্সেন্সেলেব্রেশন্স ~x(
    ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং বলতে খালি ঘোড়াশালের কথাই কয় ক্যান সবাই? এনার্জিপ্যাক আর এটমিক এনার্জি কমিশনের মাল মাল ব্যাডা গুলার কতা কস না ক্যান?

    ঘুরাশাল (কপিরাইটঃ শহীদুল্লাহ স্যার) গিয়া কি শিখছি আর কি শিখি নাই সেই প্যাঁচাল পারুম না, একটা কাহিনী কই। রাইতে ক্রিকেট খেলার সময় এক ব্যাডা আইসা কয়, হুয়াটিউয়ার্ডুয়িং? রেসিডেন্সিয়াল পেলেস হিয়ার, নো পেলে নো পেলে। উই আর ইমপোলোয়ি হিয়ার। আন্ডারিস্ট্যান? পুলাপান ব্যাডার কতা শুইনা হাইসাই কুল পায় না। তয় খেলা বাদ দিল। পরের দিন সেই কনফারেন্স রুমে গিয়া দেখি সেই ইমপোলোয়ি আইছে টারবাইন পড়াইতে। ক্লাসে কি হইছিল সেইডা বিরাট ইতিহাস মাগার এইডা কই, জীবনের বেস্ট কমেডি ক্লাস করছিলাম সেইদিন।

    ঘুরাশাল রক্করে
    বদঅভ্যাস এখনো যায় নাই, টিজ করতে যে কি মজা... আহ....

    লেখা ভাল হইছে টান্টু। :-B

    জবাব দিন
  5. রাশেদ ভাইআ,জেরিন নাম টা শুধু চেনাচেনা লাগলো??কষ্ট পাইলাম।
    আর যেখানে টান্টু আছে আমাকে তো সেখানে আসতেই হবে!আমার টান্টুকে আর বেশি বেশি লেখার উৎসাহ দিবেন ভাইআ।হাঁসের বাচ্চা ভাইআ ক চিনতে পারআম না ঠিক,তুহিন ভাই নাকি এইটা?

    জবাব দিন
  6. তৌফিক (৯৬-০২)

    নিজের অভিজ্ঞতা মিলে গেল। আশুগঞ্জে গিয়াই আমি প্রথম বুঝছিলাম দেশি ইঞ্জিনিয়াররা সুইচ টিপা ছাড়া আর ইঞ্জিনিয়ারিং কোন কাজ করে না। ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ট্রেইনিং-এর সময়েই বাইরে আসার পরিকল্পনা ফাইনাল করছিলাম। ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে দেশসেবা করতে হইলে শিক্ষক হওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর দেখি না। সিস্টেম না বদলাইলে কিছুই হবে না। তবে সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার দিয়া বদলানো যাবে না, সেই জন্য রাজনীতি করা লাগবে। আমি ইঞ্জিনিয়ারই হইতে চাইছিলাম, সিস্টেম বদলানোর কেরামতি আমি শিখতে পারি নাই।

    যাহোক, কেমন যেন অজুহাত অজুহাত মনে হইতেছে নিজের কাছেই। বহুত কাজ আছে যেগুলা আমরা একটু আন্তরিক হইলে আর আমলাতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষকতা পাইলে করতে পারি। কিন্তু, বিচিত্র সেলুকাস......... 🙁

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।