হারানো বন্ধুটির কাছে আমার খোলা চিঠি :(

প্রাণপ্রিয় বান্ধবী ____,

না তোর নামটা বলব না, কারণ আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইডির password এ তোর নাম একটি অংশ হয়ে আছে।

তোর কাছে লিখতে অনেক দেরি হয়ে গেল তাই প্রথমেই তোর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি । তোর পক্ষে হয়ত এই চিঠিটি পড়া সম্ভব হয়, তবুও লিখছি।

তোর সাথে আমার এমন এক সময় পরিচয়, যখন বন্ধুত্বর সংজ্ঞা তো দূরের কথা মায়ের কোল থেকেই বের হতে পারিনি। তখনই দুটি অবুঝ হৃদয় এক অদ্ভুত বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়।  একদিন খেলার সময় তুই আমার ‘ইয়ে’ ধরে টান দিয়ে বলেছিলি, “এইটা কি তোমার? আমার নেই কেন?” আমি ছুটে গিয়ে আম্মুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম!!!(ঘটনাটি মায়ের মুখে শোনা )।

আমার মেয়ে বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম, তা তুই জানিস। স্কুল জীবন আর sister cadet college এর হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আর তেমন কেউ নেই। কিন্তু তোকে আমার জীবন থেকে বারবার হারিয়ে ফেলিছি 🙁 ।

প্রথম বার হারিয়ে ছিলাম নিজের অজান্তেই। বাবার বদলির কারণে তোকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর জীবনের স্রোতে তোকে ভুলে গিয়েছিলাম।

তারপর তোকে খুজে পাই ২০০৫ সালে, রংপুরে SCAFE ক্যাডেট কোচিং করার সময়। তখন তোর সাথে অনেক কথা হয়েছিল। Parents’ day গুলোতে তোর বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল 😛

আমি খাকি চত্বরে ভর্তি হবার পর class 7/8 এ অনেক দুঃখকষ্ট নিয়ে অতিবাহিত করেছি। দুঃখকষ্ট গুলো share করার মত কেউ ছিল না। #কারণ খাকি চত্বরের বন্ধুরা তখনো বন্ধু হয়ে উঠেনি। আমাদের বন্ধুত্বটা তখন locker-mate, roommate, house-mate, form-mate, classmate, college-mate…. এগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল  তাই সব কথাগুলো তোকেই শুনতে হত। জানি তোর ভাল লাগত না বা বুঝতে পারলি না। তারপরও তোকেই বলতাম।

#তুই এতোটাই সুন্দর ছিলি যে তোকে দেখে অজ্ঞান হয়ে যাবার ভান করতাম। আর তুই রাগ করতি। একই বিছানায় শুয়ে সুখদুঃখের আলাপ করলাম। তোর কোমল হাতের মার খাবার জন্য কতদিন তোর বুকের ওড়না সরিয়ে দিতাম। আমাদের এই নিষ্পাপ খুনসুটি, দুষ্টামি গুলো আংকেল আন্টি সন্দেহর চোখে দেখত। তোর বড় ভাই আমাকে মাঝে মাঝেই রিমান্ডে নিয়ে আজিব আজিব প্রশ্ন করত :-/

২ জানুয়ারি,২০০৮, দ্বিতীয় বারের মত তোকে হারায় ফেলি। হারায় ফেলি বললে ভুল হবে, আমি তোর কাছ থেকে দূরে সরে আসি। ঐদিন তুই একা বাসায় ছিলি। আমি যাবার পর তোর অতিরিক্ত পাগলামো দেখে আমি পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। তোর সাথে আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দেই। দুইজনের কারোরই মোবাইল না থাকায় তুই আমাকে আর খুজে পাসনি। খাকি চত্বরের বন্ধুদের মাঝে তুই যে কখন মন থেকেও হারিয়ে গিয়েছিস টেরও পাইনি। তবুও প্রত্যেক Term End পরিক্ষা শেষে তোর জন্য চিঠি লিখতাম। কিন্তু সেগুলো তোকে কখনোই দেয়া হয়নি। ৬ বছর ছয়টি Excursion এ দুটি করে মেয়েলি gift কিনতাম, একটা আমার ছোট বোনের জন্য, আর একটা তোর জন্য। (যদিও ১০ম শ্রেণীর Excursion এ তিনটা gift কিনেছিলাম।)

শেষবারের মত যখন তোকে খুজে পেলাম সেটা না পাওয়ার মতই। ঢাকায় admission coaching করার সময় ঢাকা থেকে বাসায় ফেরার পথে হঠাৎ বাসে তোর সাথে দেখা। জানতে পারলাম মরনব্যাধি Blood Cancer তোকে ধীরেধীরে নিষ্প্রাণ করে দিচ্ছে। বিধাতা আমাদের দুইজনের রক্তের গ্রুপ (O) একই দিলেও, positive-negative এর বাধার কারণে আমি তোকে রক্ত দিতে পারিনি। তোর blood transaction এর জন্য রক্ত যোগাড় করতে তোর পরিবারের কোন কষ্ট হয়নি। কিন্তু একটাই  দুঃখ যে শেষ সময়ে তোর জন্য কিছু করতে পারলাম না। admission এর সময় মেসের friend দের ORCA office এর নাম বলে পিজি হাসপাতালের বদ্ধ cabin এ তোর সাথে দেখা করতে যেতাম। তুই আমার হাত ধরে শুয়ে থাকতি। আর তোর মিষ্টি হাসিতে আমায় পাগল করতি।

আমি আমার জীবনের প্রায় সব কিছু কোন না কোন বন্ধুর সাথে share করি। কিন্তু তোর কথা আমি কাউকেই বলি নাই। Konok এর সাথে আমার বন্ধুত্ব অনেক আগ থেকেই ও ছোটবেলা থেকে অনেক কিছু জানলেও তোর কথা জানে না। গত ঈদুল ফিতরের দিন আমি মাহফুজের সাথে motorbike এ ঘুরতে ছিলাম তখন ওকে তোর সম্পর্কে বলেছিলাম কিন্তু কোন ভাবেই বিশ্বাস করাতে পারলাম না। কারণ আমার আচরণে তোর উপস্থিতি কখনোই কেউ টের পায়নি।

এত কষ্ট নিয়েও আমার আচরণ ও কথা বার্তায় কোন পরিবর্তন পায়নি। বেশ কিছুদিন আগে রাজশাহীর এক অনুষ্ঠানে sister ক্যাডেট কলেজের এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল যে, আমি কি কখনোই কোন কিছু সিরিয়াসলি নেই না। সেদিন বলেছিলাম নেই না। কিন্তু কারণটা বলিনাই। কারণটা হল-আমি জীবনে যা কিছুই সিরিয়াসলি নিয়েছি তাই আমার জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে তোকে দেখতে ঢাকা যেতাম। তোর কপালে চুমো দিয়ে বলতাম সব ঠিক হয়ে যাবে।আর তুই তোর ছোট্ট হাতদুটি দিয়ে আমার হাত শক্ত করে থাকতি।

#ভালবাসা অনেক ধরনের। বন্ধুর প্রতি ভালবাসার সব টুকুই তোর থেকে পেয়েছি। মাঝে মাঝে মনে হয় বাবা-মার কাছ থেকে সত্যি কারের ভালবাসা পাইনি। যেটা পেয়েছি তা আমার সফলতার প্রতিদান।

ক্লাস শুরু হওয়ার পর অনেকদিন যাওয়া হয়নি L রমজানের ছুটিতে আমি ঢাকা গিয়েছিলাম তোকে শেষ বারের মত দেখতে। কিন্তু সবাই জানে আমি ORCA এর কাজে এবং soulmate দের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তোর শারীরিক অবস্থার ভয়ানক অবনতি হয়েছিল। সেই বদ্ধ cabin এ তোকে প্রথম ও শেষ বাবের মত জড়িয়ে ধরেছিলাম। তোর কান্নার জল আমার কাধ ভিজিয়ে মন কেও দগ্ধ করে দিয়েছিল।

২৭ জুলাই,২০১৩ এই সুন্দর পৃথিবীর সকল মায়াকে ছিন্ন করে তুই না ফেরার দেশে গমন করলি। তোর মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকে আমি নিজেকে নিজের মাঝে খুজে পাচ্ছিলাম না। একা একা শুধু তোর কথা ভাবতাম। ৩১ জুলাই Facebook এ status দিয়েছিলাম নির্জন শিশু পার্কের দোলনায় বসে…

Status ছিল এমনঃ-কে জানি একবার বলেছিল যে, যে তারা গুলো রাতের আকাশে দেখি , তার অনেক গুলোই আসলে অনেক বছর আগেই মারা গেছে।এখন ওখানে ওগুলো নেই! কি আশ্চর্যের কথা ! একটা জিনিস নেই, তবুও আমরা ওটাকে দেখেই চলছি। নিরন্তর!

নির্জন শিশু পার্কের দোলনায় বসে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে তোর কথা খুব মনে পড়ছে, তুই পাশে নেই তাও তোকে দেখতে পাচ্ছি। নিজের কষ্টগুলো বলার মতো কাউকে পাচ্ছি না। তাই আকাশের তারা গুলোকে বলছিলাম কিন্তু ওগুলো তোর মতই আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। তুই সুখে থাক, আনন্দে থাক আল্লাহতালার কাছে এই আমার প্রার্থনা। 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ ইদানীং physics বইয়ের প্রয়োজনটা বেশি হচ্ছে।  feeling lonely at rajarhat shishu park.

আমার জন্য তোর এই ছোট্ট জীবনে যত পাপ হয়েছে,শেষ বিচারের দিন তার সম্পূর্ণ দায়ভার আমি নিয়ে নিব ইনশা আল্লাহ। আল্লাহতালা যেন তোকে বেহেশত নছিব করেন।জানি তুই আমার জন্য বেহেশতের দরজায় অপেক্ষা করবি।

তুই হয়ত এই চিঠি টা পড়াবি আর হাসতে হাসতে বলতেছিস আমার পাগলটা কি করতেছে 😀

এই জন্মে এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।

“কোন শত্রুর যেন প্রাণের বন্ধু এমন দূরে না যায়

শোন বন্ধু, কখনো কোন বন্ধুকে বলনা যেন বিদায়।”(সায়ানের একটি গানের দুটি লাইন, যে গানটি আমায় প্রতিদিন আমায় কাঁদায়)

ইতি,

তোর ইহজগতে বেঁচে থাকা একমাত্র বন্ধুটি

#আদনান

 

বিঃদ্রঃ

  1. উপরোক্ত চিঠিটি লেখকের একান্ত মনের খেয়ালে লেখা।
  2. কোন ব্যক্তি বা কারও জীবনের কোন অংশের সঙ্গে লেখার কোন মিল পাওয়া গেলে লেখক আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

 

২,০৮১ বার দেখা হয়েছে

১০ টি মন্তব্য : “হারানো বন্ধুটির কাছে আমার খোলা চিঠি :(”

  1. সামিউল(২০০৪-১০)

    🙁 🙁

    বুঝতেসিনা এরকম একটা লেখা পড়ার পর কী বলা যায়...

    দোয়া করি তোমার বন্ধুটিকে আল্লাহ্‌ বেহেশত বাসী করুন।


    ... কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!

    জবাব দিন
  2. মাহমুদ (১৯৯০-৯৬)
    চিঠিটি লেখকের একান্ত মনের খেয়ালে লেখা

    ভাগ্যিস ডিসক্লেইমারটা ছিলো। তা নাহলে ত ভেবেই নিতাম যে, এক নতুন টিনএজার দেবদাসের অবির্ভাব হলো 🙂


    There is no royal road to science, and only those who do not dread the fatiguing climb of its steep paths have a chance of gaining its luminous summits.- Karl Marx

    জবাব দিন
  3. হারুন (৮৫-৯১)

    ভুলে তুমি গেছো প্রিয় তারাভরা রাত
    জোনাকিরা ছুঁয়ে দিতো কাঁপা দু'টি হাত,
    তুমি আমি গৃহকোণে নিশি জাগা পাখি
    কেটে যেতো সারা নিশি খোলা দু'টি আঁখি।

    মনে পড়ে রমনার ঝোপের ছায়ায়
    আমাদের কথা হতো বেলা অবেলায়,
    এখনো সূর্য উঠে চাঁদ দেয় আলো
    তুমি আমি শুধু নেই বাসিবারে ভালো।

    খোলো আঁখি চেয়ে দেখো কামরাঙা মুখ
    আমি দেবো রাতভর কামধেনু সুখ,
    তুমি আমি একজন নির্জন ঘর
    ঘরখানি মধুময় রূপালি সাগর।


    শুধু যাওয়া আসা শুধু স্রোতে ভাসা..

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।