মর্চুয়ারি

[এখানকার বক্তব্যগুলো হায়দারের স্ত্রী প্রেরণা’র লেখা]

ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে কেন যে লাশগুলোকে আইডেন্টিফাই করা হলো না, বুঝতে পারলাম না। ভাইদের লাশগুলোর তো খুবই বিশ্রী অবস্থা ছিল। খুবই কম সংখ্যককে চেনা গেছে। পোস্ট মর্টেম করার সময় স্যাম্পল সবারই রাখা হয়েছিল। দাফন করা লাশগুলোকে কেন কবর থেকেই বা তুলতে হবে, আমি বুঝি না। মেডিকেল সায়েন্স না পড়ে থাকলেও এতটুকু জ্ঞান তো আমার আছে। প্রত্যেকের বাচ্চার সাথে স্যাম্পলের ডিএনএ টেস্ট করা যেতে পারে। যখন মৌলবী সাহেবকে ডেকে দিনের পর দিন আমাকে বলা হয় যে, ‘মুসলিম ধর্মে কবরের চিহ্ন রাখার নিয়ম নাই।’ যে কোনটাতে ওদের দাফন হয়ে গেছে, তখন অবাক হয়ে যাই, এত বড় ঘটনার পরও দুজন অফিসারের লাশ না খুঁজে যে জুনিয়র দুইজন ভাবীকে ইসলামের বাণী শোনানো হয়! ইসলাম ধর্মে কি আছে, সুযোগ থাকার পরও ভাবীরা বাচ্চাদের ডিএনএ টেস্ট করাতে রাজি হবার পরও অযথা ধামা-চাপা দেবার চেষ্টা করা হয়? এতগুলো ফ্যামিলি নিয়ে খেলার পরেও মুসলিম হয়েও নতুন নতুন পদ্ধতিতে আমাদের ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল করা?

some-sports-day-Tanveer
কোন একটি দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করানোর আগে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে

এখনও যে দুজন ভাইয়ের লাশ মর্চুয়ারিতে পড়ে আছে, কবে কখন তাদের দাফন হবে? প্রথমে বলা হলো মুসলমান ধর্মে রক্তাক্ত শহীদের লাশ আল্লাহ বলেছেন দাফন দিতে। তাহলে এই দুজন ভাই কেন এখনও পড়ে আছে? শেষ পর্যন্ত মেনে নিলাম (ডিএনএ না মিলার পর) আমরা নিখোঁজ দু’জনকে আমাদের বলে দাফন দিব। কিন্তু এরপর এখনও আমাদের শ্রদ্ধেয় সিনিয়র ভাইদের সময়ই হয় না। কারন যে বেঁচে নাই, সে তো কোনই কাজে আসে না। কবর দিলেই কি- আর না দিলেই বা কি? তারা তো আর আর্মির কোন কাজে আসে না।

thinking-capt-Tanveer
কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করছে

ছোট থেকে বড় অফিসার, ছোট থেকে বড় সৈনিক, সবাইকে তানভীর একটু বেশিই হেল্প করতো। তখন ওর এত প্রশংসা শুনতাম, আমি গর্ববোধ করতাম। কিন্তু এখন অবাক হয়ে যাই তাদের মধ্যে অনেকেই দেখা হলে না চেনার ভান করে চলে যান! আবার অনেক ভাবী আছেন দেখে বলেন যে, ‘আল্লাহ! আপনারা এত নর্মাল হয়ে আছেন কিভাবে? হাসেন কিভাবে? সাজেন কিভাবে? রঙিন রঙিন কাপড় পড়েন কিভাবে?’ ইফাজকে জিজ্ঞেস করে অনেকে, ‘তোমার মনে হয় তোমার বাবা মরে গেছে? তোমার মা-কে কি কাঁদতে দেখো? সেদিন তোমার মা-কে কি মেরেছিল? তুমি কি কোয়াটার গার্ডে ভয় পেয়েছ?’ ইত্যাদি ইত্যাদি . . .

Ifaaz-with-Sun-Glass
আমার বড় ছেলে ইফাজ

আবার এমনও হয়, কেউ কেউ চেনারও চেষ্টা করেন না। ডিএনএ টেস্ট করে লাশ খুঁজতে বলার পর শুনতে হলো, ‘সব লাশ কি কবর থেকে তোলা সম্ভব?’ কোন ভাবীই বা কেন তার স্বামীর কবর খুঁড়তে দিবেন? আচ্ছা লাশ খুঁজতে কবর থেকে ডেড বডি তুলতে হবে কেন? ভাবীরাও তো চাইবেন ডিএনএ টেস্ট করলে পুরোপুরি শিওর হওয়া যাবে লাশকে নিয়ে। আর একটা কথা- পোস্ট মর্টেম করার সময় তো সবারই স্যাম্পল রাখা হয়েছিল। কিভাবে সহজে মেনে নিবো ৫৭ জন অফিসার মারা গিয়েছেন, ৫৭ টা ডেড বডি রয়েছে? ৫৫ টা কবরস্থ ও ২ টা আজও মর্চুয়ারিতে পড়ে রয়েছে! তাতে কি কারো মাথা ব্যথা আছে? কী বড় দুর্ভাগ্য আমার . . . আমার সন্তানদের . . . আমার রুমির . . .

With-my-little-son-Woada
আমার ছোট ছেলে ওয়াদা’র সাথে

সব সৈনিকরা ওর কথা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতো। বাসায় পানির বা অন্যান্য কাজে কাউকে আমি ডাকলে ছুটে চলে আসতো সৈনিকেরা। আমি মানতে পারি না কিভাবে ওরা এমন কাজ করলো! ও এতো সুন্দর করে কথা বলতো, আমি সব সময় মনে করি। বাসায় ঢুকে আমাকে সামনে না দেখলে বাথরুমের সামনে গিয়ে ‘রণা- রণা-‘ করতে থাকতো! বলতো যে, ‘তুমি জানো না আমি ঘরে ঢুকে সবার আগে তোমার মুখটাই দেখতে চাই।’ ওর সেল ফোনে, মানিব্যাগে আমাদের ছবি থাকতো। বর্ডারে রাতে থাকলে বলতো, ‘ঘুম থেকে উঠে তোমার মুখটা না দেখলে তো আমার দিনটাই মাটি হয়ে যাবে।’ ও সব সময় আমাকে সাথে সাথে নিয়ে ঘুরতো। বলতো, ‘আমার বউ আমার পকেটে থাকবে, আমার হার্টের উপরে যে পকেট, সেখানে।’

Me-with-my-lovely-husband
আমার আর রুমির একটি আনন্দদায়ক মুহূর্তে

ও সব সময় লাশের মতো চাদর দিয়ে শুয়ে থাকতো। সেটা দেখে আমি রাগ হলে বলতো, ‘জানো বেনিনের স্যারদের লাশ নিয়ে কনফিউশন আছে। তাই মরতে তো হবেই একদিন। আর্মি অফিসার বিয়ে করেছো, এখনই দেখে অভ্যাস করো। আবার নাও তো লাশ দেখতে পারো!’ কথাগুলো খুব সহজভাবেই বলতো। মাঝে মাঝে ভাবি, ও কি আগে থেকেই জানতো সব কিছু?

Rumi-with-chador
চাদর গায়ে রুমি . . .

আমাকে কক্ষণো সাদা কাপড় পড়তে দিতো না। ও কেন যেন চাইতো না এই রঙের কাপড় আমি পড়ি। ও আমাকে লুকিয়ে সিগারেট খেলে যদি বুঝতে পারতাম, তখন বলতো, ‘আজকে রাগ করেছ তো, তাই।’ আবার হঠাৎ বেশি খুশী হলে বলতো, ‘আজকে তো একটা খেতেই হবে।’ দেরি করে বাসায় ফিরলে সিগারেট জ্বালাতে দেখলে বলতো, ‘আজকে অনেক পরিশ্রম গিয়েছে, তাই ধরালাম।’ অর্থাৎ সিগারেট ধরানোর জন্য কোন না কোন কারন সে দেখাতোই! পুরানো জামা-কাপড় বের করতে গিয়ে গত ২৩ নভেম্বর হঠাৎ ওর একটা জ্যাকেটের ভিতরের পকেটে ১ টা বেনসনের প্যাকেট ও ১ টা ম্যাচ বক্স পেলাম, প্যাকেটের ভিতরে ৩ টা বেনসন। সাথে সাথে সিগারেট সংক্রান্ত স্মৃতিগুলো মনে পড়ে গেল। প্রায় বছর খানেক ধরে সেগুলো সেখানে সেভাবেই ছিল।

মাঝে মাঝে বাচ্চারা বিরক্ত করে যখন, রাগ করি খুব। তারপর আবার মনে হয়, আগে ওদের বাবা ওদেরকে আমার বকা-মার থেকে উদ্ধার করতো। তাই মনে হয় এখন যদি আমি এমন বিহেভ করি, কে ওদেরকে উদ্ধার করবে? নিজে অনেকদিন সিএমএইচ-এ ভর্তি ছিলাম, শুনলাম ব্রেইনে ইনফেকশন হয়েছে, কোন টেনশন করা যাবে না। একদিন এক ডাক্তার ভাবী বললেন, ‘তুমি চিৎকার করে কাঁদো প্লিজ, তাহলে তুমি সুস্থ হয়ে উঠবে।’ আমি যে কাঁদবো, আমাকে তো কাঁদতে দেখলে বাচ্চারা অস্থির হয়ে উঠে বলে, ‘বাবা তো বর্ডার থেকে চলে আসবে।’ এরপরে কি কাঁদা যায়?

Eid-day-with-Woada
ঈদের দিনে ওয়াদার সাথে

আমার ওয়াদা ওর জন্য পাগল হয়ে থাকে। বাবার সাথে খেলনা ফোনে কথাও বলে; বলে, ‘মা শুদু কেতে বলে, গুমাইতে বলে, আচো তো বাবা, একনই আমি তোমার কোয়ে যাবো।’ অর্থাৎ, ‘মা শুধু খেতে বলে, ঘুমাইতে বলে, আছো তো বাবা, এখনই আমি তোমার কোলে যাবো।’ আমার ইফাজ কোন ড্রেসটা পড়লে বাবার মতো লাগবে, জিজ্ঞেস করে আমাকে।

Ifaaz-upon-Cow
গরুর পিঠে ইফাজ

৩,২৯৩ বার দেখা হয়েছে

৩৫ টি মন্তব্য : “মর্চুয়ারি”

  1. মিশেল (৯৪-০০)

    বিচার হয়নি '৫২-র খুনিদের, বিচার হয়নি '৭১-র ঘাতক দালালদের, বিচার হয়নি এই ৩৮ বছরের জানা অজানা শত সহস্র শহীদদের। তারপরও স্বপ্ন দেখি বিচার হবে একদিন। বিচার হবে একদিন।

    সকল শহীদদের :salute:

    জবাব দিন
  2. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    তোমার যে কোন কষ্টের কথা আমাদের সাথে শেয়ার করো। বরের পূর্ণ সহযোগিতা পাবার পরও দুটো বাচ্চা মানুষ করা যে কতোটা কঠিন, তা প্রতিদিন বুঝতে পারছি। তুমিই তো এখন ওদের সব। আমার ভাবতে ভালো লাগবে প্রতিহিংসা বা বিচারের আশায় না- আর দশটা বাচ্চার মতো খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওরা বড় হয়ে উঠবে হাসিখুশী প্রাণবন্ত মানুষ হয়ে। সমাজের যে সব কটু কথা ওদের কানে যায়, তা থেকে কিভাবে ওরা এবং তুমি চাপমুক্ত থাকতে পার, তা নিয়ে কোন বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে দেখতে পারো। আসলে এ সমাজের মধ্যেই তো আমাদের থাকতে হবে। এ সমাজ ধুম করে বদলাবেও না। আমাদের তাই টেকনিকটা জানা দরকার কিভাবে এর মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়। যেমন পানিতে পড়লে মানুষ ডুবে যায়। কিন্তু কেউ যদি সাঁতারের টেকনিকটা জানে তাহলে সে বেঁচে যেতে পারে। তবে তুমি যে লিখে অন্তত্ব কিছু মানুষকে জানান দিচ্ছ, এটাও কিন্তু একটা বড় পদক্ষেপ। আশা করি একদিন এসব কথা তাদের কানেও যাবে, যারা বুঝে না বুঝে তোমার মতো শহীদ পরিবারকে কষ্ট দিচ্ছে। আমার চোখে এখন তুমি বড় এক্টিভিস্ট।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
  3. রহমান (৯২-৯৮)

    ওয়াহিদা নূর আফজা আপুর কমেন্টের সাথে একমত পোষন করছি। মোসাদ্দেক ভাই, আপনার এ ধরনের পোষ্টগুলো বারবার আমাকে কাঁদায়। কিন্তু তাও বলবো এভাবে পোষ্ট দিয়ে যাবেন, অন্তঃত কেঁদে যদি কিছুটা পাপ মোচন হয়... আরেকটা অনুরোধ, প্রেরণা ভাবীকে আমাদের সিসিবি'তে প্রকাশিত শহীদদের উদ্দেশ্যে লিখা পোষ্ট এবং মন্তব্যগুলো পড়তে বলবেন। আমার বিশ্বাস, এই অভাগা দেশে অধিকাংশ অমানুষের মাঝেও কিছু মানুষ যে সবসময় ঐ বীর শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এবং তাদের ও তাদের পরিবারবর্গের জন্য সর্বদা প্রার্থনা করে, এটা জেনে অন্তঃত কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে, মানসিক যন্ত্রণা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে।

    জবাব দিন
  4. মইনুল (১৯৯২-১৯৯৮)

    ভাবী, আপনার দুইটা লেখাই পড়লাম। কেএফসি'র লেখাতে, ওই মহিলাকে থাপ্পড় মেরেছেন জেনে খুব ভালো লাগলো... :salute: :salute: :salute:

    আর ওই মহিলারা আবার যদি জিজ্ঞেস করে আপনি নর্মান আছেন কেমনে, সরাসরি বলে দেবেন যে আপনার বাচ্চাদের বাবা-মা দুই দায়িত্বই এখন আপনাকে নিতে হয়, আপনার নর্মাল না হয়ে উপায় নাই।

    আপনার কেএফসি'র লেখাটা থেকে মাসরুফের একটা কমেন্ট ধার করতেসি--- আমাদের অনেক শিক্ষা আছে, কিন্তু আমরা অনেকেই এখনো শিক্ষিত হই নাই। খুবই দুঃখজনক, কিন্তু সত্য কথা।

    সিএমএইচ-এ ভর্তি ছিলাম, শুনলাম ব্রেইনে ইনফেকশন হয়েছে, কোন টেনশন করা যাবে না।

    নিজের যত্ন নিয়েন ভাবী। আর প্লীজ মনে রাখবেন, আমরা সবাই আপনার সাথে আছি।

    জবাব দিন
  5. শাওন (৯৫-০১)

    ভাবীকে কি বলবো?? 🙁 কিছু বলার নেই... ভাবী, ক্ষমা করে দিয়েন আমাদেরকে। আমাদের অক্ষমতার জন্য... কিছু করতে না পারার জন্য...


    ধন্যবাদান্তে,
    মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শাওন
    প্রাক্তন ক্যাডেট , সিলেট ক্যাডেট কলেজ, ১৯৯৫-২০০১

    ["যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি"]

    জবাব দিন
  6. রাহাত (২০০০-২০০৬)
    ‘জানো বেনিনের স্যারদের লাশ নিয়ে কনফিউশন আছে। তাই মরতে তো হবেই একদিন। আর্মি অফিসার বিয়ে করেছো, এখনই দেখে অভ্যাস করো। আবার নাও তো লাশ দেখতে পারো!’

    কি নিষ্ঠুর বাস্তব সত্য......

    জবাব দিন
  7. হায়দার (৯৮ - ০৪)

    ভাবী, আমরা আপনার জন্য দোয়া করি। ভালো থাকবেন। আমাদের ভাইয়াকে আমরা রেসপেক্ট করি, আমাদের ভাবীকেও আমরা শ্রদ্ধা করি। দুর্জনের মন্দ কথায় সুজনের মান যায়না। কে কি বললো তাতে কিছু যায় আসেনা।

    জবাব দিন
  8. একটি প্রাণ ভালবেসেই সিক্ত হলো অন্য একটি প্রাণে। দুটি আলো এলো। অনাবিল সুখ আর আনন্দ এলো পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার মতো। হঠাৎ বিধাতা কেড়ে নিলো সুখের আর ভালোবাসার উৎসকে। ম্লান করে দিলো সব আনন্দ, সব সুখ। কিন্তু কেন? কেন? কেন? কেউ কি উত্তর দিতে পারেন? বিধাতা তাকে শক্তি দিন, সাহস দিন, মঙ্গলে ভরে দিন তার বর্তমান সময়। দুটো আলো নিয়ে তার জীবন হোক সুন্দরের আর সুখের।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।