একজন খাদিজা বিবির গল্প

শাহজাদপুর এলাকায় থাকছি প্রায় দেড় বছর ধরে । বছর খানেক হবে আমাদের এলাকার মসজিদটা ভেঙে আবার চারতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে নতুন করে করা হচ্ছে।মোটামুটি প্রতি সপ্তাহেই জুম্মার নামাজের সময় ইমাম সাহেব মসজিদের কাজে সহযোগিতার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহবান করছেন। অনেকেই এগিয়ে আসছেন। খুতবা শেষে ইমাম সাহেব কারা কারা কত সাহায্য করলেন তার একটা ছোট হিসাব দিতেন। নামাজ শেষে তাদের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করা হতো।

বেশ কিছুদিন আগে ইমাম সাহেব জানালেন দোতলার ইলেক্ট্রিক ওয়ারিং এর কাজ বাবদ প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা লাগবে। আপনারা যারা যারা সামর্থবান, দয়া করে এগিয়ে আসুন। এর দুই সপ্তাহ পর জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়েছি। খুতবা শেষে ইমাম সাহেব খুব উৎসাহ নিয়ে দাড়ালেন।
: আপনাদের কাছে কিছুদিন আগে দোতলার ওয়ারিং এর জন্য কিছু টাকা চেয়েছিলাম। আল্লাহর রহমতে সেই টাকার অনেকটুকুই যোগাড় হয়ে গেছে। আল্লাহর ঘরের কাজ যে কখনোই আটকে থাকে না, এর আরেকটা প্রমান আজকে পেলাম। আমাদের এক ভাই জনাব অমুক আল্লাহর ঘরের জন্য ৫০০০০ টাকা দান করেছেন। আল্লাহ উনার মনের নেক মাকসুদ পুরন করুক। সবাই বলি আমীন।

আমরা সবাই বেশ জোড়ে বল্লাম আমীন। সব মসজিদেরই পেছনের সারির ছোট ছেলেপুলেদের আমীন বলার একটা আলাদা জোশ থাকে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। পেছনের পোলাপান মোটামুটি চেচিয়ে আমীন বলে যাচ্ছে। ইমাম সাহেব হাত তুলে সবাইকে থামালেন।

: তবে উনার কথা বলার জন্য আমি আজকে দাড়াই নাই। এখন যার কথা বললাম, উনি ছাড়াও আরেকজন মসজিদে ৬২০০০ টাকা দান করেছেন। উনি নবাবপুরে একজনের বাসায় কাজের মহিলার চাকরি করেন। আগে খ্রিস্টান ছিলেন, এখন ইসলাম গ্রহন করে মুসলমান হয়েছেন। মুসলমান হয়ে নাম রেখেছেন খাদিজা বিবি।গতকালকে উনার সমস্ত জীবনের সঞ্চয় এই ৬২০০০ টাকা আমাদের দিয়ে গেছেন।

মসজদে হাল্কা গুঞ্জন শুরু হলো, এক কাজের মহিলা তার সারা জীবনের সঞ্চয় মসজিদে দান করে চলে গেছেন এটা বিশ্বাস করা কিছুটা কঠিন বৈকি। ইমাম সাহেব সবাইকে থামিয়ে বললেন,
:জি, আপনারা ঠিকই শুনেছেন। সেই কাজের মহিলার স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে, ছেলে-মেয়েও কেউ নেই। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মা আপনি যে আপনার সারাজীবনের সঞ্চয় আমাকে দিয়ে যাচ্ছেন, আপনি চলবেন কিভাবে?
উনি বললেন, বাবা, সারা জীবন নবাবপুরের একটা পরিবারে কাজ করছি। যেই বাসায় কাজ করতাম সেই বাসার মালিক আমারে বলছে আপনি অনেকদিন এখানে কাজ করছেন, আপনার আর কাজ করার দরকার নাই। আপনি এখন থেকে আমার এখানেই থাকবেন, খাবেন। মাস শেষে আপনাকে বেতন হিসেবে যেই টাকাটা আগে দেয়া হতো, সেটা আপনাকে এখনো দেয়া হবে। আপনি শুধু আমার ছেলেমেয়েদের জন্য দোয়া করবেন। আমার তো ছেলেমেয়ে নাই, আমার থাকা-খাওয়ার ও তো ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমি এই টাকা দিয়ে কি করবো। এই টাকা দিয়ে আল্লাহর ঘরে বাতি জ্বলুক।

চুপ করে ইমাম সাহেবের কথা শুনছিলাম। আজকাল পত্রিকার পাতা খুললে মনে হয় কোন দেশে আছি। সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে টিভি ছাড়লে দেখা যায় পাষন্ড স্বামী কর্তৃক নিজের স্ত্রীর চোখ উপড়ে ফেলার খবর। এত বর্বরতা, এত নিষ্ঠুরতার মাঝেও খাদিজা বিবির মত মানুষগুলোর কথা যখন শুনি তখন মনে হয় দুনিয়া এখনো নষ্ট হয়ে যায় নি। মনের গভীরে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি আসে। পরিচিত না হোক, সাদা মনের মানুষ কেউ তো আছে।

৮৮২ বার দেখা হয়েছে

১১ টি মন্তব্য : “একজন খাদিজা বিবির গল্প”

  1. আহমদ (৮৮-৯৪)
    বাবা, সারা জীবন নবাবপুরের একটা পরিবারে কাজ করছি। যেই বাসায় কাজ করতাম সেই বাসার মালিক আমারে বলছে আপনি অনেকদিন এখানে কাজ করছেন, আপনার আর কাজ করার দরকার নাই। আপনি এখন থেকে আমার এখানেই থাকবেন, খাবেন। মাস শেষে আপনাকে বেতন হিসেবে যেই টাকাটা আগে দেয়া হতো, সেটা আপনাকে এখনো দেয়া হবে। আপনি শুধু আমার ছেলেমেয়েদের জন্য দোয়া করবেন। আমার তো ছেলেমেয়ে নাই, আমার থাকা-খাওয়ার ও তো ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আমি এই টাকা দিয়ে কি করবো। এই টাকা দিয়ে আল্লাহর ঘরে বাতি জ্বলুক।

    চুপ করে ইমাম সাহেবের কথা শুনছিলাম। আজকাল পত্রিকার পাতা খুললে মনে হয় কোন দেশে আছি। সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে টিভি ছাড়লে দেখা যায় পাষন্ড স্বামী কর্তৃক নিজের স্ত্রীর চোখ উপড়ে ফেলার খবর। এত বর্বরতা, এত নিষ্ঠুরতার মাঝেও খাদিজা বিবির মত মানুষগুলোর কথা যখন শুনি তখন মনে হয় দুনিয়া এখনো নষ্ট হয়ে যায় নি। মনের গভীরে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি আসে। পরিচিত না হোক, সাদা মনের মানুষ কেউ তো আছে।

    ::salute::


    চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

    জবাব দিন
  2. মাসুম (৯২-৯৮)

    আরো ভাল লাগতো যদি টাকাটা ইলেকট্রিক ওয়ারিং এর কাজে ব্যয় না করে কোন দরিদ্র পরিবারকে স্বাবলম্বি করার কাজে বা কোন এতিমখানায় কিংবা দরিদ্র ছাত্রের পড়ালেখার কাজে ব্যয় হতো।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।