আবারও ক্যাডেট কলেজে আমরা

বেলায় বেলায় সময় গড়িয়ে যায়, জীবন থেকে হারিয়ে যায় এক একটা দিন। পৃথিবীর সাথে সাথে আমার বয়সও একদিন বেড়ে যায়। কলেজের দিনগুলা থেকে আমি আরও একদিন দূরে সরে যাই। আসলেই কি দূরে সরে যাই? সময়ের সাথে অনেক স্মৃতিতে মরচে পড়ে, কলেজের দিনগুলাতে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। প্রায় ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি কলেজ নিয়ে, হয়তো ক্লাস টেনের ব্লকে পরীক্ষার্থী আমরা মোজা বানিয়ে ক্রিকেট খেলছি, কিংবা টুয়েলভ ব্লকে দাঁড়িয়ে চলছে আড্ডা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উদাস হয়ে চেয়ে আছি আকাশের চাঁদটার দিকে, সেই সময়টা ছিল প্রেমে পড়ার বয়স। অনাগত সঙ্গীনির কথা ভেবে অকারনেই বিরহ কাতর হওয়া – সিগারেট ঠোঁটে লাগিয়ে হাউজের ছাদে বসে আনমনে আকাশের পানে চেয়ে থাকা, কি অসাধারন সুন্দর সেই দিনগুলা। আমার একটা হারমনিকা ছিল, বাজাতে বাজাতে ভাবতাম ডাকাতিয়া বাঁশী শুনে কখনও বুঝি কেউবা আমার দিকে কেউ ফিরে চাইবে, কারন এমনিতে তো কেউ ফিরে তাকায়না এই চেহারা দেখে। আমার সহধর্মিনী আমায় প্রায়ই মনে করিয়ে দেন যে আমাকে বিয়ে করে উনি কত বড় একটা পরোপকার করেছেন। তো যাই হউক হারমনিকার দৌড় বন্ধুদের হাততালি পর্যন্তই। কালচারাল প্রোগ্রাম গুলার আগে অডিটোরিয়ামে রিহার্সাল, ইন্টার হাউজ ড্রামা কম্পিটিশানের আগে প্রেপ টাইমে হাউজ কমন রুমে রিহার্সাল আর ফাঁকে ফাঁকে মুড়ি মাখা খাওয়া। কোনও টেন্‌শান নাই লাইফে, খাও-দাও, পড়, ঘুমাও, গুলতানি মার। এই মাসে চাল-নুনে কোনও টান পড়লো কিনা, বাচ্চার ডায়াপার শেষ হইয়া গেল কিনা, বউরে নিয়া পারসোনায় যাইতে হইব কিনা আর নিচে ভেবলার মত দাঁড়ায় থাকতে হইব কিনা, স্যালারি হইতে আর কয়দিন বাকি এই সব টেনশান তো ছিলনা। পকেট মানি থাকলেই খুশি, সেও ছিল মাসে দেড়শ টাকা মাত্র। তাতেই নিজেকে রাজা রাজা মনে হইত। কলেজ থাকতে মনের দিক দিয়া অনেক ধনী ছিলাম, মনটা অনেক বড় ছিল, এখন পকেট তুলনামুলক ধনী হইলেও মনের দিক দিয়ে হইছি ফকির। জীবনের টানা-পোড়েন কোন ফাঁক দিয়া কখন ঢুকে মনের মধ্যে ক্রমাগত ছিদ্র তৈরী করছে বুঝতেই পারিনা।

এত কিছু চিন্তা করে আমরা বন্ধুরা ঠিক করেছি ক্যারিয়ার শেষে অবসর জীবনে আমরা আবার এক হব এক বৃদ্ধনিবাসে, ক্যাডেট কলেজ বৃদ্ধনিবাস। আর কেউ জ্বালাবেনা, শুধুই আমরা, আর পুরানো সেই দিনকে আবার নতুন করে ফিরে পাওয়া।

৪,৩৯৯ বার দেখা হয়েছে

৬৮ টি মন্তব্য : “আবারও ক্যাডেট কলেজে আমরা”

  1. তৌফিক (৯৬-০২)

    ১...
    শফি ভাই, ভয় দেখান ক্যান? আপনার লেভেলে যাইতে এখনো সাত আট বছর বাকি, কিন্তু আপনার লেখা পইড়া এখনি হাত পাও ঠান্ডা হয়া আসতাছে।

    ২...
    ক্যাডেট কলেজ থাইকা বাইর হওয়ার বছর দু'এক পরে আমার এক ক্যাডেট বন্ধু বড় হওয়ার আসল মাজেজা বুঝতে পাইরা প্রস্তাব দিছিল, সবগুলা মিলে যেন আবার ক্লাস সেভেনে গিয়া ভর্তি হই। আপনারাও একই বুদ্ধি করছেন, তবে অন্যভাবে। আমি একটা সিট বুকিং দিলাম। নিবেন না আমারে?

    জবাব দিন
  2. রায়হান আবীর (৯৯-০৫)

    আহ্‌ শফি ভাই এইটা কি লিখলেন বস!!! প্রতিটা লাইন ছুঁয়ে গেল।

    আমারও মাঝে মাঝে এইভেবে কষ্ট লাগে যে একদিন আমারও বুড়া হয়ে যেতে হবে। চাকরি করতে হবে। পোলাপাইন মানুষ করতে হবে। এই জীবন আমি কেমন সহ্য করবো। 🙁

    তারচেয়ে লাল পাহাড়ির দেশে যাবো, হাড়িয়া ভর্তি মাদল খাব। এইখানে আমায় মানাবে না, ইক্কেবারে মানাবে না...

    জবাব দিন
  3. শফি ভাই
    লেখা পইড়া বুকটা কেমন ফাকা ফাকা লাগা শুরু হইলো।

    গুরু ,
    এমন কঠিন সত্য আমাদের মতো নাদান পোলাপাইনরে না বললে হইতো না? রোজার মাস। নইলে আইজ রাতে মাল খাইতে বসতাম। :(( :(( :((

    জবাব দিন
  4. সাব্বির (৯৫-০১)

    কলেজ থাকতে মনের দিক দিয়া অনেক ধনী ছিলাম, মনটা অনেক বড় ছিল, এখন পকেট তুলনামুলক ধনী হইলেও মনের দিক দিয়ে হইছি ফকির।

    এক্কারে খাটি কথা।
    শফি ভাই, আপনার লেখার প্রতিটা লাইন বাস্তব। অনেক অনেক ভাল লাগল।

    জবাব দিন
  5. জুনায়েদ কবীর (৯৫-০১)

    আপনেরা কত ভাল স্বপ্ন দেখেন...
    আমার কলেজের সব স্বপ্নে খালি বোর্ড এক্সাম থাকে... 😕 😕
    আর দেখি সময় শেষ, অথচ কিছুই লেখা হয় নাই... :(( :((


    ঐ দেখা যায় তালগাছ, তালগাছটি কিন্তু আমার...হুঁ

    জবাব দিন
  6. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    শফি ভাই,আমি এমনেই সিঙ্গেল,আপনের লিখা পইড়া ডাবল হয়া যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছাডা কুনদিকে জানি দৌড় দিলো।আমার আম্মায় এমনিতেই আমার সাইজের এর মাইয়া পাওয়া যাইব কিনা সেইটা নিয়া চিন্তাগ্রস্ত-এর পরে আপনে দিলেন আমার মন উঠায়া। 😕

    অফ টপিকঃ আমারে ভালোবাইসা আপনে যেই এক্সট্রা মোগলাই দিছিলেন, সেইটা নিয়া পুলাপাইন আমারে "দানবাকৃতি পেটুক" কইয়া চালায় দেওনের অপচেষ্টা করতেছে।আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

    জবাব দিন
  7. সাব্বির (৯৫-০১)

    পুলাপাইন আমারে “দানবাকৃতি পেটুক” কইয়া চালায় দেওনের অপচেষ্টা করতেছে।আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।

    আমিও প্রতিবাদ জানাই। দৈত্য, দানব মানেই তো একটু পেটুক। এত কষ্ট করে “দানবাকৃতি পেটুক” বলা দরকার কি? শুধু "দানব" অথবা "দৈত্য" কইলেই পারে।

    জবাব দিন
  8. আদনান (১৯৯৩-১৯৯৯)

    আমি ভাবতাম খালি আমি স্বপ্নগুলি দেখি, এখন দেখছি তা না অনেকেই দেখে কলেজের স্বপ্ন!সত্যই খুব ভাল লাগল জেনে। তবে আমার বেশীরভাগ স্বপ্ন ডাইনিংহল কেন্দ্রিক। বেশ অনেকবার দেখেছি যে ব্রিহস্পতিবার(ধুর! অনেক চেষ্টা করেও ঠিক বানানটা লিখতে পারলাম না।)ডাইনিংহল এ প্যাটিস খেতে যাচ্ছি। তবে স্বপ্নে ক্যাডেট, অক্যাডেট গুলিয়ে ফেলি, বেশ কয়েক বার ডাইনিং হলে আমার cousin দের কে নিয়ে প্যাটিস খেতে দেখেছি 😀 ।
    আচ্ছা ক্যাডেট কলেজের চেয়ে ভাল প্যাটিস (ঝাল্টা) আর কখনো কেঊ খেয়েছেন? আমি খাই নি।

    জবাব দিন
  9. আমার সহধর্মিনী আমায় প্রায়ই মনে করিয়ে দেন যে আমাকে বিয়ে করে উনি কত বড় একটা পরোপকার করেছেন।
    এই মাসে চাল-নুনে কোনও টান পড়লো কিনা, বাচ্চার ডায়াপার শেষ হইয়া গেল কিনা, বউরে নিয়া পারসোনায় যাইতে হইব কিনা আর নিচে ভেবলার মত দাঁড়ায় থাকতে হইব কিনা, স্যালারি হইতে আর কয়দিন বাকি এই সব টেনশান তো ছিলনা।
    ক্যারিয়ার শেষে অবসর জীবনে আমরা আবার এক হব এক বৃদ্ধনিবাসে, ক্যাডেট কলেজ বৃদ্ধনিবাস।

    আমি বুড়া ক্যাডেটনিবাসে সিট বুকিং দিলাম, ইয়ে মানে.. ওই খানে ভর্তির জন্য আবার মেডিক্যাল টেস্ট হবে না তো? 😮 :(( :((

    জবাব দিন
  10. সায়েদ (১৯৯২-১৯৯৮)

    "আনন্দ উল্লাস করে জন্মদিন পালন করার কোন কারণ আমি দেখি না। আমরা ভুলে যাই যে প্রতিটা জন্মদিনের মধ্য দিয়ে আমরা মৃত্যুর দিকে এক বছর এগিয়ে যাই"।
    এক বন্ধুর ডায়রীতে লেখা কথাগুলো মনে পড়ে গেল শফি ভাইয়ের লেখাটা পড়ে।
    হৃদয় ছুঁয়ে গেল।


    Life is Mad.

    জবাব দিন
    • মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

      ১)সুন্দরবন? 😀 বাঘ মামার সাথে থাকুম আর হরিণের কাবাব খামু...(জোকিং)
      ২)ককসবাজার থেকে একটু দূরে ইনানী বীচের কাছের কোন জায়গা কিনে সেখানে বানানো যেতে পারে।ছোটখাট কুটির শিল্পও গড়ে তোলা যেতে পারে।যারা দেয়াল পত্রিকায় কাজ করতেন তারা টুরিস্টদের জন্যে বিভিন্ন আর্টপিস বানাবেন।
      (শফি ভাই,কাল্পনিক একটা ওল্ড হোম নিয়ে কিছু লিখে ফেলেন না কেন?এমনও হতে পারে যে কোন একদিন সত্যি সত্যি এটা গড়ে উঠল!!)

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।