ইস্তানবুল,কিছু অভিজ্ঞতা এবং আমি

কথায় আছে যে ক্যাডেট পারে না এমন কাজ খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। তার উপর ক্যাডেট মানেই বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা।ক্যাডেট কলেজের ৬ বছরের জীবন শেষে বাস্তবতার এক বিশাল সমুদ্রে নিজের খুদ্র এক ভেলা নিয়ে পাড়ি জমানোর সময় এই কথাটি আরও এক বার উপলব্ধি করলাম। আজ দেশ, দেশের মাটি ছেড়ে পৃথিবীর অদ্ভুত এক ভূখণ্ডে আমার অবস্থান প্রায় ৪ বছর। ভূখণ্ডটিকে অদ্ভুত বলছি এই কারণে যে এটি না ইউরোপ না এশিয়া। মানে হলো আধা খাওয়া আর কি।আমাদের দেশে বাদুড় যেমন রাতের বেলা আম গাছে পাকা আম অর্ধেক খেয়ে রেখে গেলে যে অবস্থা হয় আমটার সেই রকম। কোনটাই সম্পূর্ণ করতে পারে নি আর কি। অনেকটা এক সাথে দুই নৌকাতে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ভূখণ্ডটি পৃথিবীর পাতায় ইস্তানবুল নামে পরিচিত। এই ইস্তানবুলে ব্যাচেলর ডিগ্রি নেয়ার সংগ্রামে লিপ্ত আমরা গুটি কয়েক ক্যাডেট। অন্য একটা ভাষায় (তুর্কী) পড়ার ঝামেলা যে কতটা তীব্র হতে পারে তা এখানে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। কিন্তু ওই যে বলেছি ক্যাডেট…….ক্যাডেট মচকাবে,দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে তবুও ক্যাডেট হার মানবে না। এই কথাটি আমি প্রতিদিন নতুন করে এক বার হলেও প্রমান করি আমার নিজের জীবনে।আর কত যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই তা ভাবলে নিজেই অবাক হই….

আজকে হটাৎ করে এই লেখাটি লেখতে বসার কারণ হল আমার কিছু আজব অভিজ্ঞতা সবার সাথে ভাগাভাগি করে নেয়া। প্রথম অভিজ্ঞতাটি বলি তাহলে। তুর্কী ভাষায় পড়তে পড়তে এবং ক্লাস করতে করতে যখন প্রায় বিরক্ত, ঠিক সেই সময় হটাৎ করেই যমদূতের মতো আবির্ভাব ঘটলো প্রথম মিড টার্ম এক্সামের। একেতো বিজ্ঞানের এইসব ভয়াবহ বিষয়, তার উপর আবার তুর্কী ভাষার ঝামেলা তো আছেই। এই সব ভয়াবহ বিষয়ের মাঝখানে অনেকটা যেন শরীর ও মনকে চাঙ্গা করতে চলে আসে ইংরেজি এক্সাম। তো মহা আনন্দে এবং ব্যাপক আশা নিয়ে বীরদর্পে আমার এক্সাম হলে প্রবেশ। টার্গেট অনেকটাই বাংলাদেশের লো স্কোরিং ম্যাচে বোলারদের মতন আচমকা দু একটি চার-ছয় মারা। কেননা ইতোমধ্যে অন্যান্য এক্সামে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মতো পারফর্ম করে ফেলেছি।স্বভাবতই সময় হতেই শিক্ষকের আগমন এবং আমার মনের ভিতর এক্সামটাতে চার-ছয় মারার চিন্তাটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা। কিন্তু যখনই প্রশ্নপত্রটা হাতে এল নিজেকে অনেকটা আশরাফুলের ভূমিকায় দেখতে পেলাম। ওমা, এযে দেখি ইংরেজি পরীক্ষায় তুর্কী ভাষার প্রশ্ন। তার উপর আবার দেখলাম যে ইংরেজি প্রশ্নে সব ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক্স এবং ডিজিটাল সার্কিটের প্রশ্ন। ম্যাডামকে ডেকে বললাম যে ম্যাম এটা তো ইংরেজি এক্সাম।উনি আমাকে চিরাচরিত ভাষায় বললেন “হতে পারে এটা ইংরেজি এক্সাম, কিন্তু ওটা শুধু নামেই। এটা আমার কোর্স।আমি যা বলব, যা করব সেটাই হবে এই কোর্সের ইংরেজি।”ফলাফল হিসাবে যা দাঁড়াল আশরাফুলের মতো কিছুক্ষণ পিচে থেকে মোবাইল ডিজিট সেট করে প্যাভিলিয়নের পথে ফেরৎ আসা। ওখান থেকেই শিখা যে ইংরেজি বলতে আমরা যা বুঝি তুর্কীশরা সেটা বোঝে না। ইংরেজি মানে যে তার সাথে ম্যাথেমাটিকস ও জড়িত ওটা আমি ওই দিনই আবিষ্কার করিলাম। ওই দিন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ইংরেজি এক্সামের কথা শুনলেই আমি দৌড়ে গিয়ে ম্যাথ বই খুলে বসি প্রথমে।মাঝে মাঝে ভয়ই লাগে যে এইবার না আবার কেমিস্ট্রি তুলে দিয়ে বলে যে এটাও ইংরেজিরই একটা অংশ। কালে কালে যে আরও কত কি দেখব আল্লাহই ভাল জানে।

দ্বিতীয় অভিজ্ঞতার প্লটটা কেমিস্ট্রি এক্সাম। এক্সামের জন্যে বেশ আঁটসাঁট হয়েই প্রস্তুত হয়েছি। লক্ষ্য বেশ ভাল একটা স্কোর করা। এখানে উল্লেখ্য যে, কেমিস্ট্রি এক্সাম পুরোপুরি তুর্কী ভাষায় এবং বেশ খানিকটা অবোধ্য প্রকৃতির। তো সেই দুর্বোধ্য ভাষার পরীক্ষায় নিজেকে বাংলাদেশের বিখ্যাত ব্যাটসম্যান হান্নান সরকারের মতো মনে হচ্ছিল।কেননা হান্নান সরকারের হাবভাব এমন যে নেমেই ছক্কা মেরে দেবে প্রথম বলে। কিন্তু প্রতিপক্ষের বোলার যে চামিন্দা ভাসের মতো বোলার হতে পারে সেটা একবারেও ভেবে দেখে না। তো প্রশ্ন পেয়ে তো মহা খুশি আমি। বিক্রিয়া দেখে মনেতে খুশির ঝলক। যাক বাবা, এইবার মনে হয় এক্সামটা ভালই হবে। ছক্কাটা মনে হয় মেরেই দিলাম।তাকিয়ে দেখি দূরে দাঁড়িয়ে স্যার আমাকে দেখে হাসছেন। যখনই প্রশ্নপত্রের ভিতরে চোখ বুলালাম মাথার মধ্যে যেন সুনামি একটা রিহারসেল দিয়ে গেল। বুঝলাম স্যার বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ম্যাচের চামিন্দা ভাস আর আমি হান্নান সরকার।আমাকে প্রথম বলেই বোল্ড করে দিলেন। আমি দেখি আমার মতো তুর্কীশ ছেলেপেলেরা ও একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়া- চাওয়ি করছে। আমি আর ধৈয্য ধরে রাখতে পারলাম না। স্যারকে ডেকে বললাম যে স্যার আমাকে দয়া করে একটু প্রশ্নটার ইংরেজি করে দিন। তো স্যার দেখলাম হেভি ভাব নিয়ে পকেট থেকে ডিকসনারি বের করলেন।আমাকে বললেন যে তুমি প্রশ্ন পড়ে লিখতে থাক। আমি তাকে যতোই বুঝাতে চাই যে স্যার আমার ৮ মাসে শেখা তুর্কী ভাষা এই দুর্বোধ্য শব্দগুলোকে যাচাই করার জন্যে উপযুক্ত নয় তিনি ততই বলেন আমি আছি না।আমি তোমাকে ইংরেজি করে দিচ্ছি।তুমি লিখতে থাক। তো দেখলাম উনি একটি একটি করে শব্দের মানে লিখছেন। যখন উনি পুরো প্রশ্নটা শেষ করে বিজয়ীর বেশে আমার কাছে আসলেন ততক্ষণে এক্সামের সময় শেষ। আমি স্যারকে বললাম যে স্যার আমার এক্সামের সময় শেষ।আমার খাতা নিয়ে নেয়া হয়েছে,তিনি মনে মনে একটু যেন খুশিই হলেন।আমাকে বললেন, “আরে ব্যাপার না। এইবার নাহয় ফেলই করলে, সামনের বার আছে না।” এই হল আমার কেমিস্ট্রির প্রফেসরের অবস্থা যিনি কিনা আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রি নিয়ে এসেছেন। হায়রে দুনিয়া, কালে কালে আরও কত যে লীলাখেলা দেখাবে তুমি!!!

আজকের সর্বশেষ অভিজ্ঞতার প্লটটা আমার ডরমিটরি। এখানে উল্লেখ্য যে, তুরস্ক ভুমিকম্প প্রবণ এক দেশ। আর ডরমিটরি এমনই একটা বাজে প্লেস তা বলার মতো না। সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র বলে এখানে থাকতে হচ্ছে। আর বাসায় যে উঠবো সে পরিমাণ টাকাও এই দেশের সরকার দেয় না। তো যাই হোক, আমার রুমে আমার নিচের বিছানায় থাকে এক বিশাল দেহাকৃতির ইরানি এক ভোঁটকা। সোজা বাংলায় বললে ছোট খাট একটা জলহস্তীর বাচ্চা। আর যদি ওটাকে আমি ডব্লিউ ডব্লিউ এফ এর কারো সাথে তুলনা করতে যাই তাহলে রিকিশি পাটু। ওজোন কম করে হলেও ১৩০ কেজির কম না। আর যখন নাক ডাকে মনে হয় যেন টাইটানিকের ভ্যাপুর বাজাচ্ছে। তাও আবার একটা নির্দিষ্ট সুর এবং তাল ও লয়ের সমন্বয়ে। তো এক রাতে আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিনেমা দেখছি। রাত তখন ২ টা ৩০ এর মতো। স্বভাবতই সিনেমার ভিতরে ঢুকে গেছি মানে গভীর মনোযোগের সাথে সিনেমা দেখছি। হটাৎ করেই দেখি বিছানা দুলছে। গত ৩ দিন আগেও তুর্কীতে ভুমিকম্প হয়েছে। তো আমার মনের মধ্যে হটাৎই ভুমিকম্পের কথা মাথা চারা দিয়ে উঠলো। এই দিকে আমার মনেই নেই যে নিচে আল্লাহর দুনিয়াতে পাঠানো ছোটখাটো জলহস্তীর বাচ্চাটা ঘুমুচ্ছে। আমি তো ভয়েই অস্থির যে এই বুঝি ভুমিকম্প শুরু হয়ে গেল। তো প্রিপারেশান নিয়ে নিয়েছি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে যাব তখনি দেখি বিছানার দুলুনি বন্ধ।১ মিনিটও হয় নি আবার একটু দুলে বন্ধ। আবিষ্কার করলাম যে ডব্লিউ ডব্লিউ এফ এর রিকিশি পাটু বিছানায় এক সাইড থেকে আর এক সাইড হচ্ছে। মেজাজতা যে কি পরিমাণ গরম হচ্ছিল রিকিশি পাটুর উপরে তা আর কি বলব। এতো সুন্দর একটা সিনেমা দেখতেছিলাম তার পুরো আমেজটাই নষ্ট করে দিল বদমাইশ রিকিশি পাটু। কি আর করা। মনে মনে ব্যাটাকে কিছু গালাগালি করে ছেড়ে দিলাম।
আজ আপাতত এতোটুকুই থাক।পরে আবার কোন এক দিন এটাকে টেনে লম্বা করবো মানে ইংরেজিতে বললে continue করবো। সেই পর্যন্ত সবাইকে শুভেচ্ছা।
ইস্তানবুল থেকে
সায়খ
র ক ক (২০০১-২০০৭)

১,১৬৭ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “ইস্তানবুল,কিছু অভিজ্ঞতা এবং আমি”

  1. আসাদুজ্জামান (১৯৯৬-২০০২)

    সায়খ, লেখা বেশ ভালো হইসে। বিয়াপক মজা পাইলাম। লিখতে থাকো। তোমার কাছে থেকে তুর্কীর আরো অভিজ্ঞতা শুনা যাবে। আচ্ছা তুরস্ক দেশটা যত সুন্দর মানুষগুলা ততই গোয়ার, তাই না???

    “আরে ব্যাপার না। এইবার নাহয় ফেলই করলে, সামনের বার আছে না।”

    ~x(

    জবাব দিন
  2. আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রভাষক , কানাডাতে মাস্টার্স শেষে দেশে ফেরার পথে ৩ দিন ইস্তানবুল এ বেড়াচ্ছি .. সঙ্গে আমার স্ত্রী ও থাকবেন ... ১৩ থেকে ১৬ অগাস্ট ২০১২ ... আপনি কি এখনো ইস্তানবুল থাকেন? থাকা এবং ঘোরাঘুরির ব্যাপারে টিপস দিতে পারেন? খুব উপকার হয় ...
    - খালেদ, আলবার্টা, কানাডা

    জবাব দিন
  3. মাজহার (০৬-১২)
    এটা আমার কোর্স।আমি যা বলব, যা করব সেটাই হবে এই কোর্সের ইংরেজি

    যখন পড়তেসিলাম তখন ই.হা.তা (ভুগোল) স্যারের কথা মনে পড়তেসিল। পরীক্ষার আগে সিলেবাস দিল বিশাল বড়। কোনমতে পড়ে গিয়ে দেখি প্রশ্ন, "What is geography?"


    MJ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।