অলিভার

অলিভারের সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল যখন Real wheel এর একটা সমস্যা নিয়ে আমাদের কোম্পানীতে আসে। মোটামুটি লম্বা। প্রায় ৫ ফুট ৯ অথবা ১০ ইঞ্চির মত হবে। কাঁচা-পাকা চুল আর ছোট ছোট চোখের সামনে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাঁটে একটু ঝুঁকে ঝুঁকে। Stainless Steel এ মরিচার মতন সাদা সাদা দাঁতের উপর কালো কালো দাগ। সিগারেটের প্রতি আসক্তিটা তখনই বুঝে গিয়েছিলাম। দেখে মনে হয়েছিল বয়স চল্লিশের আশেপাশে কিন্তু পরে জেনেছিলাম পঞ্চান্ন। শুদ্ধ গ্রামারে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে ওর কথাগুলা বেশ মজা লাগতো। প্রথম দেখার দিনই আমাকে সম্বোধন করেছিল,”Helloooo! my friend…”

অলিভার মূলত কাজ করতো মার্কেটিং এর। তবে এখানে সে এসেছিল অনেকটা দোভাষী হিসেবে। অন্য দুইজন চাইনিজদের জিজ্ঞাসা বা আমাদের সমস্যা তাদের কাছে তুলে ধরাটাই ছিল তার মূল কাজ। প্রথমদিকে কাজের কথা ছাড়া আর তেমন কোন কথা হতো না।
একদিন জিজ্ঞাসা করলাম,”তুমি কত বেতন পাও ? সংসার চলে ?”
সম্ভবত কোন মানুষের সাথে ফ্রী হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সিগারেট অফার করা অথবা চাকরীতে বেতন স্বল্পতা এবং এর দরূন জীবনে বিপর্যস্ততা নিয়ে কথা বলা। কাজে দিল। যদিও জীবনের বিপর্যস্ততা নিয়ে কোন অভিযোগ ছিল না তবে জীবনের অনেক শখের কথা বলেছিল। সেদিন জানলাম ও বিয়ে করেনি। কারন বলেছিল সময় হয়ে ওঠেনি। প্রায় ১২ টি ভাষায় কথা বলতে পারে। বাংলাদেশে এই প্রথম আসা, তাই বাংলা ভাষাটা শিখা হয়নি। তবে এবার গিয়ে শিখে নিবে। ধীরে ধীরে সবার সাথেই খুব ফ্রী হয়ে গেল অলিভার। যেমন আমার সাথে তেমন ওয়ার্কশপের অন্য সবার সাথে। মাঝে মাঝেই কোম্পানীর বাইরে টং দোকানে গিয়ে একসাথে গোল্ডলীফ টানতাম।
ওয়ার্কশপের ফোরম্যান ছিল হারুন। অলিভার আর হারুনের কথা হতো অনেকটা সাংকেতিক ভাষায়। হাত নেড়ে নেড়ে মাথা ঝাঁকিয়ে তারা ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও চাকরী জীবনের নানা প্রকারের সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করতো। মাঝে মাঝে ভিজিটে গিয়ে দেখতাম দুইজনই “হা হা” করে হাসছে। ইশারা ইঙ্গিতে জোকসের ব্যাপারটা সেদিনই প্রথম বুঝেছিলাম। মাঝে মাঝে আমিও শামিল হতাম তাদের সাথে। যদিও আগা-মাথা কিছু বুঝতাম না। এর মধ্যে অলিভার হারুনের নামটা শিখে ফেলে। তবে কখনোই শুদ্ধভাবে তা উচ্চারন করতে পারেনি। হারুনকে সে ডাকতো “হালুউউ”। “ল” এর পর দুই আলিফ টানটা অনেক চেষ্টা করেও বন্ধ করতে পারিনি। QC তে আরেকজন মেকানিক ছিল জালাল। কাজ করতে করতে ওর নামটাও শিখে নিয়েছিল অলিভার। যদিও এক্ষেত্রেও অশুদ্ধ উচ্চারন করে ডাকতো “জালাআআ”। আবারো দুই আলিফ টান। একদিন অনেকক্ষন চেষ্টা করলাম ওকে “র” এর উচ্চারন শিখাতে। যতই বলি “র” অলিভার বলে “ল”। ইংরেজীতে লিখে দিলাম Harun, Jalal. তবুও ঠিক হলো না।
জিজ্ঞাসা করলাম “তোমার নাম কি?”
বললো “অলিভা”
বললাম “লাস্টে যে “R” আছে, তার কি হবে ?”
বেচারা কিছুক্ষন হেসে বললো “সম্ভব না।”
অনেক চেষ্টা করেও কেন জানি আমার নামটা মনে রাখতে পারেনি।

অলিভার কোম্পানীতে ছিল প্রায় একমাসের মত। এই একমাসের মধ্যে এই একা মানুষটা সবারই খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিল। মাঝে মাঝেই দেখা যেত অফিসের ছুটির পর আর সবার সাথে ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বাজারে যাচ্ছে। একদিন সন্ধ্যাবেলা দেখি বেশ সেজেগুজে কোথায় জানি যাচ্ছে।
জিজ্ঞাসা করলাম “কই যাও ?”
বললো “দাওয়াত আছে।”
বললাম “এই দেশে তোমাকে দাওয়াত দিল কে আবার ?”
মুচকি হেসে বলেছিল “হালুউ”।
সেদিন রাত্রে অলিভার আর আসলো না। পরদিন দেখি হারুনের সাইকেলের পিছনে বসে গম্ভীর মুখে অফিসে আসছে। হাতে “আঁচল বস্ত্রবিতান” এর ব্যাগ।
জিজ্ঞাসা করলাম “আঁচল বস্ত্রবিতান থেকে তুমি আবার কি কিনলা ?”
অলিভার ব্যাগ খুলে দেখালো একটা লুঙ্গি, “তোমাদের এই ড্রেসটা খুব ভাল্লাগসে। স্কাটের মত, কিন্তু ছেলেরাও পড়ে।”

অলিভারের সাথে খুব অল্প দিনের মধ্যেই সবার একটা বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে উঠে। মাঝে মাঝে আনমনে চাইনীজ গান গাইতো। যখনই বুঝতো আমরা কেউ শুনছি চুপ হয়ে যেত। একদিন পূর্নিমা রাতে ছাদে বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা হল। সেদিন সবার অনুরোধে গান গাইলো। খোদার কসম একটা শব্দও বুঝতে পারমাল না কেউ। তবে সুর শুনে মনে হয়েছিল ছ্যাঁকা খাওয়া টাইপ গান। সুর সেটা সব ভাষায়ই একি রকম। দুঃখের সুর প্রতিটি ভাষায়ই এক। আনন্দেরও তাই। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে ওদের প্রায় যাওয়ার সময় হয়ে গেল।
জিজ্ঞাসা করলাম “তোমাদের ফ্লাইট কবে ?”
বললো “এইতো শুক্রবার।”
বললাম “দেশের পলিটিকেল অবস্থা খারাপ। মাঝে মাঝেই মারামারি হয়। হরতাল দিয়েছে আবার। কিভাবে যাবা ?”
সেই চিরচেনা মুচকি হাসি দিয়ে অলিভার বলেছিল “চিন্তা নাই। আমি একা মানুষ।”

এরপর অলিভারের সাথে আর কোন কথা হয়নি। weekend এ আমি বাসায় চলে আসি। ব্যাস্ততার চাপে ওর মোবাইল নম্বরটা আনতেও ভুলে যাই। পরদিন ভোরবেলা হঠাত মোবাইল ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। বসের নম্বর দেখে তাড়াতাড়ি রিসিভ করি।
– সাকিব সাহেব ঢাকা মেডিকেলে আসেন।
– কেন স্যার ?
– দরকার আছে তাড়াতাড়ি আসেন।
কোন মতে মুখটা ধুয়ে দৌড় দিলাম।
৪ নম্বর বাসে ভীড়ে অনেক দেরী হয়ে গেল। পৌছে দেখি ততক্ষনে অফিসের অনেকেই চলে এসেছেন সেখানে। গতকাল অবরোধের মধ্যেই ঢাকা আসার সময় অলিভারের গাড়িতে কারা যেন পেট্রোল বোমা ছুড়ে মেরেছিল। দেহের অনেকাংশ পুড়ে গেছে মারাত্মকভাবে। শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়ায় কোন কথাই সে বলতে পারছে না। হাসপাতালে আনার সময় অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছিল এদেশে কেউ পরিচিত আছে কিনা তার? কথা বলতে পারছিল না। পকেটে বসের কার্ড দেখে সেই নম্বরে ফোন দেয় তারা। তবে হাসপাতালে আসার পর নাকি সে প্যাডের কাগজে কি লিখেছিল। বস সেই কাগজটা দিলেন। দেখি কাঁপা কাঁপা হাতের লেখায় অস্পষ্টভাবে লেখা “Harun Jalal My friend”
আর কেউ না বুঝলেও আমি জানি সিঙ্গুলার নম্বরে এই friend টা আমিই।

পুমশ্চঃ সম্পূর্ন কাল্পনিক কাহিনী হলেও চরিত্রগুলো সত্যি। সত্যিকারের অলিভার অনেক আগেই সহি-সালামতে চীনে ফিরে গিয়েছে। কিছুদিন আগে unknown ID থেকে একটা মেইল দেখে Open করি। দেখি প্রথমেই লেখা “Helloooo! my friend…”

১,৫০৪ বার দেখা হয়েছে

১৭ টি মন্তব্য : “অলিভার”

  1. মোকাব্বির (৯৮-০৪)

    ব্লগে স্বাগতম! লেখা ভাল লেগেছে। ঘটনা সত্য না হলেও শেষে এসে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। লেখা চলুক! 🙂


    \\\তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
    অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিল পিতামাতার লাশের ওপর।\\\

    জবাব দিন
  2. মামুনুর রশীদ খান(২০০১—২০০৭)

    মামা স্বাগতম। কোপাকুপি লেখা হইছে। আজ চলে আসলাম ট্রেনে। ফিশপ্লেট উত্তলোন আতংকে ট্রেনের গতি দশের আশেপাশেই ছিল।৫ ঘন্টা লাগল।পুরোটাই দাঁড়িয়ে। ঝুইলা ঝুইলা মানুষ যাইতেছে।কি যে অবস্থা দেশে।!!


    ক্যাডেট রশীদ ২৪তম,প ক ক

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।