ক্যামেরা হারানোর পর

কুমারের ভিজিটিং কার্ড

কুমারের ভিজিটিং কার্ড


শনিবার সকাল থেকে আমরা খুব ব্যস্ত ছিলাম। ৪ টার বাসে জোহরবারু ফিরতে হবে। পৌনে বারোটায় দাঁড়াতে হবে পেট্রোনাস টাওয়ারে ওঠার লাইনে। দেরি হলে সম্ভবত ৮৬ X ৪ = ৩৪৪ রিঙ্গিতের টিকেট পানিতে যাবে। যাবে কীনা স্পষ্ট জানিনা। কুয়ালালাম্পুরের মানুষরা ইংরেজি বিমুখ। আমি জানিনা তাদের ভাষা। বেশি কথা জানতে চাইলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন দীর্ঘ হতে থাকে। দুর্বোধ্য উত্তর নার্ভের উপর চেপে বসে।

শ্রেয়াকে দীর্ঘদিন ঘুরানো হচ্ছে ট্যাব কিনে দেবার কথা বলে। পরীক্ষায় ভালো করার জন্যে এটি তার ২০১৩ সালের পাওনা। নানা ভাবে ঘুরাতে ঘুরাতে কুয়ালালামপুরে এসে ঠেকেছে। মেয়েটাকে আর ঘুরাতে মন চাইছেনা। তবে তার জন্যেও সময় ওই চারটা পর্যন্তই। তাও পুরো চারটা নয়। অন্ততঃ ১৫ মিনিট আগে বাসের কাছে পৌছাতে হবে।

কুয়ালালামপুরের ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর জন্য লোইয়াট প্লাজা ভালো। বুকিত বিনতাঙ্গের এই মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে তিনটে বেজে গেলো। এখান থেকে সরাসরি হোটেলে চলে যাবো ভেবে বেরিয়েছিলাম। বলা নেই কওয়া নেই কোথা থেকে বৃষ্টি এসে পথ আটকে দিলো। ঘড়ির কাটার তাতে কিছু যায় আসেনা। দৌড়ে ট্যাক্সিতে উঠলাম। বিপদ আঁচ করে ট্যাক্সি ওয়ালা ২০ রিঙ্গিত ভাড়া হাকিয়ে বসলো। কুয়ালালামপুরে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৬ রিঙ্গিত, আমাদের হোটেলের দূরত্ব তার অর্ধেকও নয়। তবু মেনে নিলাম, মনে নিলাম না।

পথে ট্যাক্সি ওয়ালা খাতির জমাতে চাইছিলো এখানে অনেক বাংলাদেশী আছে, তার বন্ধুদেরও কয়েকজন বাঙালি এসব কথা বলে। ভাড়ার ব্যপারে তাঁর দাও মারার কথা ভেবে কথা বাড়ালাম না, শুধু বললাম, তুমি যে কত বাংলা প্রেমি তা তোমার আচরণেই স্পষ্ট হয়েছে। তুমি অন্যায় ভাবে আমার কাছে প্রায় চার গুণ ভাড়া চাচ্ছো।

আমাদের হোটেলে নামিয়ে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে সে বেরিয়ে যাবার পর আবিষ্কৃত হল, আমার ক্যামেরাটি তার গাড়িতে রয়ে গেছে। ভদ্রলোক ভারতীয় বুঝেছিলাম। কলকাতায় এক ট্যাক্সি ড্রাইভার ঠিক একই ভাবে আমার মোবাইল নিয়ে চম্পট দিয়ে ছিলো। তিন মাস পর মোবাইলটার খোঁজ পেয়েছিলাম। বিহারি ড্রাইভার সেটি বক্রি করে দিয়েছিলেন। অনেক বছর আগে দুবাইতে এক ভারতীয় ড্রাইভার আমাকে দুইশো টাকার বদলে ২০টাকা ধরিয়ে দিয়েছিলো, এক ঝলক দেখে আমি নোট চিনতে পারিনি।

এই ক্যমেরাটি খুব দামি নয়। বছর দুই আগে ৩৬৯ ডলারের এই ক্যামেরাটি কোর্টস সিঙ্গাপুরের সেল থেকে মাত্র ১৭৯ ডলারে কিনেছিলাম। তারপর থেকে আমাদের যাপিত জীবনের অনেক কিছুর সাক্ষী সে। টুইন টাওয়ারে সদ্য তোলা ছবি গুলো আমাদের জীবনে তার সর্বেশষ অবদান। জিনিষটার উপর মায়া পড়ে গিয়েছিলো ।

মনের দুঃখে জোহরবারূতে ফেরার সময় বাসে বসেই একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। আবেগ চেপে রাখতে না পেরে ড্রাইভার এবং ভারত বর্ষের খানিকটা বদনামও করেছিলাম। অনেকেই সমবেদনা জানিয়েছেন। কুয়ালালামপুর থেকে মেহেদী হাসান সুমন গাড়ির নাম্বার চেয়েছিলেন সাহায্য করার জন্যে। আমি তো এ জীবনে কোনদিনই ট্যাক্সি নম্বর মনে রাখিনি। আর শনিবার বৃষ্টি ধাক্কা আর বাসের চিন্তায় তো ট্যাক্সি নাম্বারের কথা মনেই হয়নি।

অর্ধেক রাস্তা যাবার পর একটি ফোন পেলাম। বাসের কারণে নাম শুনতে পারিনি। একটু পর বুঝলাম
– হা—লো। আই ক্যাব ড্রাইভার কুমার
– হু ইজ ইট?
– স্যার । আই এম দ্যা ক্যাব ড্রাইভার হু দ্রপড ইউ ইন দ্যা হোটেল।
আমার স্ত্রী আমার পাশে কান খাড়া করে বসে আছে। আমি ভালো শুনতে পাচ্ছি না। যেটুকু বুঝলাম তা হলো, কিছুদূর যাবার পর ক্যামেরাটি তাঁর চোখে পড়ায় তিনি আমার খোঁজে হোটেলে এসেছেন। তার কথা শুনে আমার খুব লজ্জা করতে লাগলো। কিছুক্ষণ আগে আমি তাঁর বদনাম করে ফেসবুক গরম করেছি। আমার বড় মেয়েকে বকেছি, আমার স্ত্রীকে কথা শুনিয়েছি। আমি ক্যাব চালকের নামটা বুঝতে পারছিলাম না। তাঁকে বললাম ক্যামেরাটা হোটেলে রেখে যেতে।

এই হোটেলে যশোরের একটি ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছিল। কুয়ালালামপুরে কোন একটি ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পাশাপাশি সে এখানে কাজ করে। তাকে ফোন দিয়ে বললাম সম্ভব হলে ক্যাব ড্রাইভারের সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু ততক্ষণে ড্রাইভার বিদায় নিয়েছেন। রিসেপসনে ফোন করে জানলাম ক্যামেরাটা সেখানে জমা দেওয়া হয়েছে। রিসেপসন থেকে তার নাম্বার নিয়ে ধন্যবাদ দেবার জন্যে ফোন করলাম। কোন জবাব পাওয়া গেলোনা। বউ বাচ্চারা বলতে থাকলো যে ভাবেই হোক ফোন কর থ্যাক্স দাও।

কাল আবার গেলাম কুয়ালালামপুর। হোটেলের লকারে থেকে ক্যামেরা বের করে দিলেন রিসেপসনিস্ট। আমাকে ড্রাইভারের একটি কার্ডও পেলাম তার কাছে। একেবারেই সাদামাটা কার্ড। লেখা:
Kumar
012-689 3546

এবার কুমারকে পাওয়া গেলো ফোনে। সে বলল, আপনার ক্যামেরাতো রিসেপসনে দিয়ে এসেছি।
আমি বললাম, আমি তোমাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ফোন করেছি। অনেক উপকার করেছ আমার। তোমার এই উপকারের প্রতিদান দেবার সামর্থ্য তো আমার নেই। তুমি গাড়ি চালিয়ে এসেছো গিয়েছো অন্ততঃ তার জন্যে কম্পেন্সেট করি। তোমার গারির নম্বরটিও বল।

আদর্শ লেখকদের ক্যাব চালকরা এক্ষেত্রে বলতেন, না আমি আর কী করেছি, এটা তো আমার কর্তব্য। আপনার কিছু দেবার প্রশ্নই আসেনা।

কুমার বলল, আমার গাড়ির নম্বর HBA 2852
আমি অনেক দূর থেকে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলাম। আপনার যদি কিছু দিতে ইচ্ছে করে একটি খামে আমার নাম লিখে রিসেপশনে দিয়ে যাবেন, আমি চারটার দিকে কালেক্ট করবো।

কুমারকে কে অনেক ধন্যবাদ। আমার কুয়ালালামপুরের বন্ধুরা যদি কুমারকে একটিবার ফোন করে ধন্যবাদ দেন কৃতজ্ঞ হবো।

ফেসবুক থেকে

১,০১৬ বার দেখা হয়েছে

১২ টি মন্তব্য : “ক্যামেরা হারানোর পর”

  1. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    🙂 🙂 🙂 🙂

    আই এম দ্যা ক্যাব ড্রাইভার হু দ্রপড ইউ ইন দ্যা হোটেল।

    তুমি স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান হিসেবে একটা ট্রাই দিতে পার ভাইয়া, আমরা তালি দিতে এতটুকু কার্পণ্য করবো না আগেই বলে দিচ্ছি!

    লেখা বরাবরের মতই ভাল লাগলো! :clap:

    জবাব দিন
  2. মোস্তফা (১৯৮০-১৯৮৬)

    বরাবরের মতই স্বচ্ছন্দ লেখা। মন ভরে পড়লাম।

    রিঙ্গিতের হিসেবের ভেতর চুপিসারে যদি এমন কিছু ঢুকিয়ে দিতেন যাতে করে টাকার সাথে এর একটা তুলনা করা যেত, আর দুটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার একচিলতে আভাস পাওয়া যেত, তবে হয়ত ভালো হতো। ভ্রমণ কাহিনীতে সময়ের পদচ্ছাপ আঁকা থাকলে তা আখেরে কাজে দেয়।

    ট্যাক্সি ড্রাইভারের চরিত্রটা খুবই বাস্তবসম্মত হয়েছে। দেখেন, একে মূল চরিত্র করে ভবিষ্যতে কোন গল্প লিখতে পারেন কি না।

    ক্যামেরার ব্যাপারে মোস্তাফিজের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য,

    বহু ব্যবহারে যন্ত্রও আপন হয়ে যায়।


    দেখেছি সবুজ পাতা অঘ্রানের অন্ধকারে হতেছে হলুদ

    জবাব দিন
    • সাইদুল (৭৬-৮২)

      মোস্তফা, খুবই ভালো বুদ্ধি। ভবিষ্যতে এইটা কোন কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবছি।
      দু'দেশের অর্থনৈতিক ব্যপার, সমাজ, আচার চলে এলে পাঠক আরও ভালো ভাবে ইনভল্ভ হতে পারে। খেয়াল রাখবো।


      যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

      জবাব দিন
  3. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    "২০১৩ সালের পাওনা"-এর পর থেকে এই ভ্রমণের সময়কালটা খুঁজছিলাম ।
    মন্তব্যে সময়কালের চাহিদাটাকে তাই সমর্থন করছি ।
    আপনার সাবলীল ও গতিময় লেখার গুণে শুরু করলেই হয়ে যায় শেষ । আরো পড়বার তেষ্টাটা তাই আতিপাতি করে তখনও ।
    জিইয়ে রাখলাম ... সেই তেষ্টা ...

    জবাব দিন
  4. সাইদুল (৭৬-৮২)

    ধন্যবাদ হাবিব, আসলেই ওখানে একটা ফাক রয়ে গেছে আমি মনে করেছিলাম

    যেটুকু বুঝলাম তা হলো, কিছুদূর যাবার পর ক্যামেরাটি তাঁর চোখে পড়ায় তিনি আমার খোঁজে হোটেলে এসেছেন।

    এই বাক্যটিতেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। বুঝেছি আরেকটু খোলসা করা দরকার ছিলো। আসল কথা হল, চেক আউট করার সময় আমরা হোটেলের রিসেপশনেও বলে এসেছিলাম।

    তোমাকে ধন্যবাদ


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
  5. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    "আমি তো এ জীবনে কোনদিনই ট্যাক্সি নম্বর মনে রাখিনি" - সেটাই স্বাভাবিক।
    বরাবরের মতই খুব সুন্দর হয়েছে গল্প বলা। যারা কান পেতে থাকে তোমার গল্প শোনার জন্য, তারা সন্তুষ্ট হবে বৈকি।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।