চীনের মসজিদ ২

চীনের মসজিদ ১

মিনিট দশেক অপেক্ষার পর বাস পাওয়া গেল।বাসে বসার জায়গা খালি নেই। দাড়ানোর জায়গা পাওয়াই মুসকিল। কেভিন বলল আমাদের যেতে হবে শেনহুই রোড হয়ে । সুয়ালং মেট্রোস্টেশনের নিচ থেকে ছড়বে আমাদের বাস। ১২ মিনিটে পৌছলাম শেনহুই রোড। দূরত্ব খুব বেশি নয়, মাঝে ৫টি স্টপে থামার জন্যে সময় বেশি লাগে। শেনহুই রোডের কাছে লোঙ্গাং লাইনের শেষ স্টেশন সুয়ালং। শেনঝেন মেট্রোর পাঁচটি লাইনের অন্যতম এই লাইনটি ২০০৫ সালে চালু করা হলেও, ২০১০এর ইউনিভারসিয়াডের সময় ব্যপক উন্নতি হয় এই লাইনের। ৩২ কিমি থেকে বাড়িয়ে লাইনের দৈর্ঘ ৪২.৫ করা হয় । প্রতিদিন ৩০টি স্টেশনের লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করে এই লাইনে।
গল্প করতে করতে বাস এসে গেল। মেইলিনের বাস মোটামুটি ফাঁকা পাওয়া গেল। কেভিন বলল আর একটু সকালে ভীড় বেশি থাকে। অনেকেই মেইলিন থেকে অফিস করে লোঙ্গাঙ্গে।

গাছপালায় ছাওয়া ছোট্ট শহর মেইলিন। আমরা যখন পৌছলাম সূর্য তখনও পুরোপুরি মাথার ওপর ওঠেনি।কেভিনকে বললাম, এই জন্যেই আমি আরও পরে রওনা দিতে চেয়েছিলাম। নামাজের এখনও বেশ দেরি। কেভিনের সরল উত্তর আমরা কেবল মেইলিনে এসেছি। এখনও তোমার মসজিদে পৌছাই নি। মোবাইলের জিপিএস থেকে মসজিদের লোকেশন খুঁজে বের করল সে। বেশি দূর হাটতে হল না। বাস স্টপের কাছেই মসজিদ। তবে ইন্টারনেটে মসজিদের যে ছবি দেখেছিলাম, এক মাত্র রাস্তার পাশের তোরণ ছাড়া আর কোন কিছুর সাথে তার মিল নেই। বিশাল একটা বারান্দাওলা ঘর। বাইরে একচালা টিনের ছাউনির মত।

মেইলিন রোডের মসজিদ

মেইলিন রোডের মসজিদ

মসজিদে তেমন কোন ভিড় ছিল না। বারান্দায় চেয়ারে বসে বই পড়ছিলেন জনা দুয়েক লোক। মসজিদের পূর্বদিকের মিনারের পাশে বাগান পরিচর্যা করছিলেন একজন । আমাদের দেখে এগিয়ে তিনি এগিয়ে এলেন। কেভিনের সাথে কুশল বিনিময়ের পর আমার দিকে হাত বাড়িয়ে ইংরেজিতে বললেন ‘ওয়েলকাম, আমি আব্দুর রহমান। এই মসজিদের মুয়াজ্জিন’। ভদ্র লোকের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। আমরা লোঙ্গগাং থেকে এসেছি শুনে খুশি হলেন। তারও বাড়ি লোঙ্গাঙ্গে।

আব্দুর রহমানের সাথে কেভিন

আব্দুর রহমানের সাথে কেভিন

এই মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় তিন বছর ধরে। লোঙ্গাঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা কম হওয়ায় ওখানে এখনও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আব্দুর রহমানের কাছেই শুনলাম চীনে ইসলাম ধর্ম পালন, কোরান চর্চা এবং ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের জন্যে জাতীয় পর্যায়ের একটি কমিটি আছে। মসজিদ নির্মান, হজ্জ পালন সহ অন্যান্য ধর্মীয় আচার আচরণ পালনে ষোল সদস্যের এই কমিটি যথেষ্ট ভুমিকা রাখে।

ছোট খাটো গড়নের এই মানুষটাকে প্রথম দর্শনেই আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। তার সাথে আলাপচারিতা শুরু হল কেভিনের জবানিতে। প্রথম বাক্যটি তিনি বলেছিলেন ইংরেজিতে। তবে ইংরেজির জড়তার জন্যে এর পর আলাপ চলল কেভিনের মাধ্যমে। আব্দুর রহমান জানালেন ইংরেজিটা তার ঠিক মত আসেনা আর মন খুলে কথা বলতে হলে মাতৃভাষাতেই বলা ভালো।
কেভিনকে বললাম “তোমাদের মুয়াজ্জিনের চেহারায় ধর্ম ভাব যতটা না প্রকাশিত সৈনিকের আদল তার চেয়ে বেশি। গোঁফ দাড়িহীন মুখ, মেদহীন ছোটখাটো শরীর সব কিছু চাইনিজবক্সিং জাতীয় সিনেমার গ্র্যান্ডমাষ্টারদের কথা মনে করিয়ে দেয়”। কেভিনের অনুবাদ শুনে তিনি হেসে ফেলে বললেন ‘তোমার বিদেশি বন্ধুকে বল আমি উশু জানি’।
আমি রোজা রাখিনি শুনে মন খারাপ করলেন কিনা জানিনা। ক্ষনিকের জন্যে একটু গম্ভীর দেখালো তাঁকে। কথা না বাড়িয়ে মসজিদ দেখাতে নিয়ে গেলেন। বললাম “ইন্টারনেটে আপনাদের মসজিদের চেহারা অনেক সুন্দর। জানা গেল ইন্টারনেটে যে ছবিটা দেয়া হয়েছে সেটাই মসজিদের আসল ছবি। কয়েকদিন আগে মসজিদের নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। নতুন মসজিদে গম্বুজ, মিনার ছাড়াও আরও অনেক কিছু থাকবে। কেভিন ভেবেছিলো তাঁকে মসজিদে ঢুকতে দেওয়া হবেনা।
আমি বললাম ‘ইসলাম ধর্ম অনেক উদার তুমিও ঢুকতে পার, তবে স্যন্ডেলটা বাইরে খুলে রেখে ঢুকো’। আমার কথা ঠিকমত শুনতে না পেয়ে কেভিন স্যন্ডেল পায়ে মসজিদে ঢুকে পড়তেই তাঁকে আব্দুর রহমানের রোষানলে পড়তে হল। মুয়াজ্জিন সাহেবকে ঠান্ডা করতে হল আমাকেই। কেভিনও ভাল ছেলের মত স্যন্ডেল খুলে বাইরে রেখে এল। আব্দুর রহমানের কাছে চীনের মুসলমানদের গল্প শুনে অবাক হয়ে গেলাম।

চীনের প্রথম মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল সপ্তম শতকে।নবীজীর ওফাতের আগেই চীনারা ইসলামকে বরণ করে নিয়েছিল। আমি জানালাম বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন হয়েছিল প্রায় একই সময়ে, বাংলাদেশের প্রাচীনতম মসিজদটির বয়স দেড় হাজার বছরের কাছাকাছি। ইন্টারনেটের কল্যানে জেনেছি ৬১৮ সালে তিনজন সঙ্গী সহ ওয়াক্কাস ইবনে ওয়াহাব নামে একজন সাহাবি এসেছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরে। তিনি কিছুদিন চট্টগ্রামে অবস্থান করে মায়ানমার হয়ে চীনে গিয়েছিলেন।

হুইশেয়াং মসজিদ, চীনের প্রথম মসজিদ

হুইশেয়াং মসজিদ, চীনের প্রথম মসজিদ

আমার কথা শুনে মিট মিটিয়ে হাসলেন আব্দুর রহমান। বললেন, ‘অনেক আগে থেকে পারস্যের সাথে চীনের ব্যবসা বানিজ্য ছিল। আমি যতদূর জানি পারস্য থেকেই সিল্ক রোড ধরে মুসলমানরা এদেশে এসেছিল প্রায় পনর শ’ বছর আগে। প্রথমবারের সে দলে ছিলেন সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সাইয়্যেদ ওয়াহাব ইবনে আবু কাবসা আর অন্য একজন সাহাবি। তবে প্রথম দিকে আরবরা এদেশে ধর্ম প্রচারে আসেনি। এসেছিল বানিজ্যক কারনে। সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস ছিলেন বিবি হালিমা(রা)’র দূর সম্পর্কের ভাই। যতদূর জানা যায় নবীজির আত্মীয় এবং সাহাবা সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাসের মাধ্যমেই চীনারা প্রথম ইসলাম ধর্ম এবং রাসুলুল্লাহ’(দঃ)র কথা জানতে পেরেছিল।
দ্বিতীয়বার তিনি চীনে আসেন ৬৩৭ সালে, সেবার ফিরে যাবার সময় তিনি ইয়ুনান-মনিপুর হয়ে চট্টগ্রাম সফর করেন’। আমি বললাম ‘চট্টগ্রামে ওনার আসার কথা এর আগে শুনিনি’।
– চট্টগ্রামে তিনি বেশিদিন ছিলেন না। চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্র পথে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন আরবে।সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস কিন্তু আরও একবার এসেছিলেন আমাদের দেশে।
– আবার এসেছিলেন?
– হ্যা। সেবার তিনি এসেছিলেন সরকারি সফরে। ৬৫১ সালে হযরত ওসমান তাঁকে সম্রাট গাওঝং এর কাছে পাঠিয়েছিলেন দূত হিসাবে।
– তার পর?
– গাওঝং এর কাছে তারা যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল। সম্রাট গাওঝং নবীজির সম্মানে ক্যন্টনে একটি মসজিদ নির্মাণেও সহায়তা করেছিলেন। ৬২৭ সালে নির্মিত এই মসজিদকে বলা হত হুইয়াশেং মসজিদ।
– আপনি না বললেন সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস গাওঝং এর কাছে এসেছিলেন ৬৫১ সালে?
– এখানে একটা ভুল হলেও হতে পারে, তবে উনি যে ত্যং রাজত্ব কালে এসেছিলেন তার যথেষ্ট প্রমান আছে।
এসব ইতিহাস কেভিনের খুব একটা ভাল লাগছিল না। সে নিচু গলায় জানাল সকালে নাস্তা খাওয়া হয়নি তার। পেটে ছুচোর কেত্তন শুরু হতে দেরি লাগবে না। আমারও খিদে লেগে গিয়েছিল, তবে আব্দুর রহমানের গল্পও ছেড়ে আসতে ইচ্ছে করছিল না। পথ বাতলে দিলেন আব্দুর রহমানই বললেন, ‘নামজ শুরু পৌনে একটায়, তোমরা না হয় একটু ঘুরেই এস’। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তখন মাত্র এগারো টা বাজে। আব্দুর রহমানকে বিদায় জানিয়ে নাস্তার খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম।

এখানেও ভীড় জমেনি

এখানেও ভীড় জমেনি

মসজিদের কাছে বেশ কয়েকটা রেস্তোরা ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল উন্মুক্ত রেস্তোরা, আমাদের চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের পাশে যেমন সারি সারি টেবিল চেয়ার পাতা থাকে, সন্ধ্যার পর কাবাবের গন্ধে মৌ মৌ করে ওঠে পুরো এলাকা অনেকটা সে রকম। মেইলিনের এই রেস্তোরায় প্রায় তিনশ’জন লোক একসাথে বসতে পারে। পুরো রেস্তোরার ছাদ বলতে শুধুই গাছের ছায়া। উন্মুক্ত রেস্তোরাটি তখনও জমেনি। অল্প কয়েকজন মানুষ এখানে সেখানে। কেভিনের পছন্দে অন্য একটি রেস্তোরায় ঢুকে ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন নিয়ে বসলাম। কেভিন নিল বারগার। খেতে খেত কেভিন বলল ‘এখনওতো নামাজের অনেক দেরি।‘বিরক্তির চিহ্ন স্পষ্ট তার চোখে মুখে। আমি বললাম, আব্দুর রহমানের গল্প শুনে তো সময় মন্দ কাটছিল না। তোমার ত তেমন কোন মনযোগ দেখলাম না’।
– দ্যাখোনি, কারন এই গল্প গুলো আমিও জানি।

১,৪৫০ বার দেখা হয়েছে

১৪ টি মন্তব্য : “চীনের মসজিদ ২”

  1. লুৎফুল (৭৮-৮৪)

    এমন গোছানো উন্মুক্ত রেস্তোরাগুলো মলের পাশে, লেকের পাশে কেনো জানি আমাকে ভীষণ টানে । মনে হয় সারাদিন কাটানো যায় এমন কোথাও বসে মানুষ বা প্রাকৃতিক পরিবেশের দিকে চোখ রেখে আর এক এক দেশের এক এক রকম খাবারের বৈচিত্র চেখে চেখে ।

    – দ্যাখোনি, কারন এই গল্প গুলো আমিও জানি।
    নাটকীয় ভাবে চমকে দিয়েছে ।

    আবারো লেখার মুনশীয়ানা । :boss:

    জবাব দিন
  2. ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

    চমৎকার! সাইদুল ভাই। বেশ কিছু নতুন তথ্য জানলাম। কিছু অবশ্য আমার আগেই জানা ছিলো। চীনের প্রথম মসজিদ-টির উপর আমার একটি লেখা লেখার ইচ্ছা ছিলো। ছবিটা ডাউনলোড করে কম্পিউটার-এ সেভও করে রেখেছিলাম। সময়ের অভাবে লিখতে পারিনি। যাহোক এখন আপনার লেখা থেকেই, প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে অনেক কিছু জানলাম।

    জবাব দিন
  3. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    খুব ভালো লাগলো। জেনে বিস্মিত হ'লাম যে "চীনের প্রথম মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল সপ্তম শতকে।নবীজীর ওফাতের আগেই চীনারা ইসলামকে বরণ করে নিয়েছিল"।
    "পুরো রেস্তোরার ছাদ বলতে শুধুই গাছের ছায়া" - কত অল্প কথায় কি নিখুঁত বর্ণনা!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।