আশা জাগানিয়া কথকতা

বিগত দুই সপ্তাহ গরমে আমরা বঙ্গ সন্তানরা খুবই কাহিল। সম্প্রতি অধিক বৃষ্টিতে প্রধান দুই মহানগরীর জনজীবন নর্দমা এবং বৃষ্টির পানির মাখামাখিতে পর্যুদস্ত। সফরকারী ভারত দলের সামনে প্রথমদিনে বেকায়দায় পড়া বাংলাদেশ দলকে বঙ্গমাতার আশীর্বাদপুষ্ট বৃষ্টি কিছুটা রেহাই দিয়েছে বটে। দিনকাল কাটছে ব্যস্ত। অসাবধানে পড়ে গিয়ে গিন্নি পা মচকে ফেলেছেন, সংসারের অবস্থাখানা তাই একটু নড়বড়ে। আমি বাঙ্গালি বীরপুঙ্গব, কুটোটি নেড়ে খেলেও আমার ইজ্জত যাবে, তাই অবস্থার আশু কোন প্রতিকার নেই। চার বছরের ছেলের স্কুলে পরীক্ষা। এইটুকুন বয়সে আমাকে কোন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। বুড়ো বয়সে নিজেরও পরীক্ষা। নেটওয়ার্কিং, গ্রাফ থিওরি, সিমুলেশন সব মিলে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। নিতান্ত দায়ে না পড়লে ঘরের বাইরে যাই না, পেটের দায়ে বাজার যেতে হয়, ঐটুকুনই।

মাঝে মাঝে নামায পড়তে কাছের মসজিদে যাই। নানান রকমের মানুষ দেখি। কেউ আসে গাড়ি চেপে, কেউ সাইকেল বা মোটরসাইকেলে, বেশিরভাগই পায়ে হেঁটে। পা নেই এমন লোকও আসে। কোনোদিন সুন্নত নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে দেখি কিছু দূরে একজন অনেক সময় নিয়ে সিজদা দিচ্ছে, কারণ বয়স অনেক, তার উপর একটা হাত নেই। এক হাতের উপর সিজদা দেওয়া এবং সেখান থেকে উঠা বেশ কঠিন কাজই বটে, পরে বাসায় চেষ্টা করে দেখেছি, অনেক কষ্টের। নিজের হাজার না পাওয়ার তালিকা যখন মনের ভেতর ঘাই মারতে থাকে, এসব দৃশ্য দেখে লজ্জা পাই। কার যে কি নেই, সে নিজেই কি ভালো করে জানে? মসজিদে যাওয়ার সবচেয়ে ভাল দিক আমার কাছে মনে হয়, প্রতিদিন ৫ বার আল্লাহ্‌ ধনী-গরীব, উঁচু-নিচু সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেখিয়ে দেন, তাঁর চোখে আসলে সবাই সমান। পৃথিবীর আর কোন ব্যবস্থায় এতো অল্প সময়ে এতবার এতো ধরনের মানুষকে এক কাতারে কেউ দাঁড় করাতে পারবে বলে আমার মনে হয়না।

যাহোক, যা যায় সব আম-জনতার উপর দিয়েই যায়। গরমে বাসে আধসেদ্ধ আর ঘামে ভেজা, বৃষ্টিতে আধভেজা বা পুরো ভেজাই মধ্যবিত্তের বাড়ি ফেরার কালের নিয়তি। সৌভাগ্যক্রমে আমি একখানা ভাঙ্গা গাড়ির মালিক, আর আমার অফিসেও সর্বদা বাসা থেকে হেঁটেই যাওয়া যায়। এই জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। শুক্রবার সকাল, ভোরে উঠে যত্ন করে ভাঙ্গা গাড়িখানা ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করলাম (আশংকা ছিল বৃষ্টি হবে এবং বাজারে যাওয়া-আসার কালে ধোয়া গাড়িখানার বারোটা বাজবে, যা কিনা পরবর্তীকালে সত্যি হয়েছিল)। আজ বাজারে গিয়ে বিখ্যাত এক মানুষকে বাজার করতে দেখলাম, আশা করিনি যে উনি নিজেই বাজার করতে আসবেন। উনাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। দামী গাড়ি করে এলেন, দামী দামী বাজার করলেন, যাবার বেলায় তবু বিমর্ষই থাকলেন। তারচেয়ে বরং আমার ‘নূর ইসলাম’ নামের কিশোর মুটেই অনেক আনন্দে ছিল। আমার চেয়ে বাজার করার উৎসাহ তারই মনে হল বেশি। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে আগ বাড়িয়ে দরদাম করে আমার কাজ অনেকটাই সহজ করে দিল ছেলেটা। বাড়ি কিশোরগঞ্জ, সে বাজারে, আর দুই বোন গার্মেন্টস এ চাকরি করে সংসার চালায়। অসুস্থ বাবার কাছ থেকে এই বয়সেই নিয়েছে সংসারের ভার, তবু তার মুখে হাসি, শেখার আছে অনেক কিছুই।

বাজার করে ফেরার সময় রাস্তায় এক তালওয়ালা পেলাম, কচি তালের শাঁস বিক্রি করছে। থামলাম, বছর ত্রিশেক বয়সের বিক্রেতার নাম ‘রাসেল’। ‘সিয়াম’ নামের এক ছেলে আর ‘অন্তরা’ নামের এক মেয়ের বাবা। ধারালো দায়ের কোপে সুনিপুণ দক্ষতায় আমাকে শাঁস ছাড়িয়ে দিল। ছেলেমেয়েকে স্কুলে পড়ায়, আশা তারা জীবনে তার মত তাল বিক্রি করে কাটাবে না। তার চোখে আশার আলো এবং আশঙ্কার মেঘের মিশেল। জানিনা তার চোখের ঐ আলো তার সন্তানদের জীবনকে কতখানি আলোকিত করবে, কিংবা আশংকার কালো মেঘ তাদের ভাগ্যকে কতখানি ছেয়ে ফেলবে। কিন্তু তাদের চোখে আশা আছে, বুকে একজোট লড়াই করার বল আছে; এইটুকুই আমাদের কতজনের আছে?

ছোটবেলায় গ্রিক মিথোলজির একটা গল্প পড়েছিলাম। এক গ্রিক রাজা দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য তাদেরকে এক ভোজসভায় আমন্ত্রণ করেন। আপ্যায়নে খুশি হয়ে দেবরাজ যাবার বেলায় তাকে একটা থলি উপহার দেন এবং জানিয়ে দেন যে এতে মানুষের জীবনে যা যা প্রয়োজন সব কিছু দেয়া আছে। এটা খোলার একটা শর্তও জুড়ে দেন তিনি। দেবতারা সবাই ঊর্ধ্বাকাশে চলে না যাওয়া পর্যন্ত রাজা যেন ওটা না খোলেন। যাহোক, দেবতারা রাজার প্রাসাদ চত্বর পেরিয়ে যেতেই রাজা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। উনি তড়িঘড়ি থলের মুখ খুলে দেখতে গেলেন যে ভেতরে কি আছে। ভেতরে থাকা সবকিছু দ্রুত বের হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে লাগলো। রাজা তাড়াতাড়ি থলের মুখ বন্ধ করলেন। এরপর তিনি দেবতাদের ঊর্ধ্বাকাশে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি থলের মুখ খুলে একটি জিনিসই দেখতে পেলেন। তা হল ‘হোপ’ বা ‘আশা’। এক রাজার ধৈর্যচ্যুতিতে মানবকুল আশা বাদে সবই হারাল। তাই আমরা সব ছাড়তে পারি, তবু আশা ছাড়তে পারি না।

১,০০৪ বার দেখা হয়েছে

৮ টি মন্তব্য : “আশা জাগানিয়া কথকতা”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।