অণু ব্লগঃ হারলী ডেভিডসনের ঈগল

ফ্ল্যাট ক্রিক কান্ট্রি ক্লাবের ঝিমনো বিকেল। কাছেই লেকের পাশ দিয়ে লম্বা ওয়াকিং ট্রেইল ধরে হাঁটছে গুটিকয় ছেলেমেয়ে। দু’ চারজন হ্যান্ডসাম বুড়ো রঙচঙ্গা টি-শার্ট পরে অলস ভঙ্গীতে গলফ খেলছেন অদূরে। লিটল ওল্ড লেডিরা ডেকে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছেন অথবা কুরুশ কাঁটায় মোজা বানাচ্ছেন নাতনীর জন্য। গোলাপী রুজ আর লাল লিপস্টিকে বয়স ঢাকবার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা তাদের কারো কারো। মিস ডরোথির সোনালী ঘড়িতে থমকে আছে সময়। বান্ধবী রুথ কে তিনি কুইল্ট বানাবার জন্য উৎসাহিত করছেন আসছে সামারে।

আশপাশ বড় নির্জন এখানে। বছর পনেরোর একটি মেয়ে দাদীমার পাশে বসে নির্লিপ্ত চোখে গানের তালে তালে মাথা নাড়ে। গুল্লু টাইপের হাই স্কুলার ছেলেটা ঘুরে ফিরে মেয়েটির দিকে তাকায়। বালিকা তাকে সবিশেষ পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না। এক কোণে মধ্য তিরিশের দুই বান্ধবী হাত নেড়ে খুব কথা বলছেন। জগত সংসার রসাতলে যাচ্ছে বলে তাদের একজন কে ভারী উত্তেজিত মনে হয়!

অভিজিতের হারলী ডেভিডসনে আজ শহরময় টইটই করে ঘুরে বেরিয়েছে রাবেয়া। এদেশে আসা অবধি কখনো মোটর বাইকে ওঠে নাই সে। দেশে ছোটভাই সদ্য মোটর বাইক কিনে এনে পেছনে বসার আগেই একটানে বহু দূর গিয়ে টের পেয়েছিল যে বড়বোন বাড়ীর সামনের রাস্তায় বসে কাতরাচ্ছে। বাবা খুব রেগে গিয়ে চাবি নিয়ে গিয়েছিলেন ছোট ভাইয়ের থেকে। সেই থেকে মোটর সাইকেলে রাবেয়ার ভয়!

আজ অভিজিতের পিড়াপিড়িতে তার সাথে হেলেনে এসেছে ও। হারলী ডেভিডসন স্ট্রীট ববে অভিজিতের পেছনে কাঠ হয়ে বসেছিল রাবেয়া। বাইক চালু করতেই মেঘ গর্জনে আশেপাশের দু’চারটে পাখি উড়ে যায়। শনিবারের নিস্তরঙ্গ সকাল হঠাৎ শব্দময় হয়ে যায়! সেভেন্টি ফাইভ ধরে রাবেয়াকে নিয়ে তুফান মেইল চালিয়েছে অভিজিৎ বসু। মোটর বাইক চালানো তার শখ। ছুটির দিনে তার বাইকারস ক্লাবের বন্ধুদের জুটিয়ে কতদিন অভি ছুটে গেছে ক্যালাওয়ে গার্ডেন অথবা চেহা পাহাড়ে। বাইকাররা অনেকেই তাদের তাদের বান্ধবীদের নিয়ে এসেছে হামেশাই। কিন্তু অভিজিতের মন চায়নি কাউকে সাথে নিয়ে যেতে। টু সিটেড বাইক তার খালি রয়ে গেছে এতোকাল।

অভির পরনে রংচটা ডেনিমের সাথে কালো চামড়ার জ্যাকেট একখানা। মাথায় নীল ব্যান্ডানা পরেছে আজ, বাঁ হাতে মোভাডো স্পোর্টস ওয়াচ, চোখে রোদ চশমা। রাবেয়ার মনে সংশয়, যাবে কি যাবেনা বুঝতে পারেনা। অভি রাবেয়ার হাত ধরে বল্লো, এসো রায়া! ভয় নেই তোমার। আমি পাঁচ বছর ধরে বাইক চালাই। কখনো কিছু হয়নি। বিশ্বাস করো, আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে মরতে দেবো না। অভিজিতের কথাগুলো ভীষণ ন্যাকা আর বোকা বোকা শোনালেও কি মনে করে রাজী হয়ে গেল রাবেয়া। তবে কি মেয়েরা ছেলেদের আদরে ভোলে কম, ভোলে তাদের উড়নচণ্ডী স্বভাবে?

হেলেনে যেতে যেতে দু’পাশের ইউরোপিয়ান ধাঁচের ঘরবাড়ী অথবা দোকানপাট দেখতে বরাবরই ভাল লাগে অভির। এমনিতেই হারলী ডেভিডসন মানেই তার কাছে অন্য রকম শৌর্য আজ তার সাথে রাবেয়া আছে বলে নিজেকে পাখির মত মনে হয়। মনে হয় সে যেন হারলী ডেভিডসনের সেই ঈগল উড়ে চলেছে তার রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে! হেলেনে পৌঁছে এপেলেশিয়ান ট্রেইল ধরে রাবেয়ার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অভিজিতের মনে হয়েছে বেঁচে থাকবার মত আনন্দ আর কিছুতে হয়না!

আটলান্টায় ফিরতে ফিরতে টের পায় ছুঁচোর কেত্তন চলছে পেটে। এতো যে জল তেষ্টা পেয়েছে বুঝতেই পারেনি রাবেয়া। ক্লাবে এসেই দুটো ডায়েট সোডার অর্ডার দিয়ে রেস্টরুমে ঢোকে চোখেমুখে পানি দেবার জন্য। পিপাসায় কাতর হয়ে আছে ও। অভিজিৎ দেখি মহা নির্বিকার, ওর ক্ষুধা তৃষ্ণার কোন বোধ নেই মনে হয়! ছেলেটা পারেও বটে। এরই মাঝে ব্যান্ডানা খুলে নিয়েছে সে। কোণার দিকের একটা টেবিলে বসেছে বেশ আয়েশ করে। ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ঝুলে আছে যথারীতি। এই ছেলে দেখি কথায় কথায় দাঁত দেখায়!

হাতমুখ ধুয়ে সেফোরার কাজল পরে চোখে রাবেয়া। ঠোঁটে পীচ রঙ্গা একটু গ্লস না লাগালেই নয় এখন। মুখে একবার প্রেস পাউডার বুলিয়ে চটজলদি বেরিয়ে আসে ও। দিন শেষের ক্লান্তি এসে ভর করেছে শরীরে। টেবিলে ফিরে দেখে অভিজিৎ এরই মাঝে খাবারের জন্য অর্ডার করেছে। ফ্রাইড কালামারির সাথে হ্যালোপিনো ডিপিং সস আর দু’জনের জন্য দুটো চিকেন সিজার সালাদ অর্ডার করেছে ও। ক্লাবের অনিওন রিং দারুন মজা খেতে, তাই সাইডে একটা পেঁয়াজের রিঙও অর্ডার করেছে রাবেয়ার জন্য।

কোক জিরোতে চুমুক দিতে দিতে কথা বলে রাবেয়া। অভিজিৎ চিজ খেতে ভালবাসে, তাই বেছে বেছে চিজ খায় আগে সালাদ থেকে। এতো বড় পেঁয়াজের রিং বাইরে পাওয়া যায় না বলতে গেলে। খেতেও খুব কুড়মুড়ে হয়েছে দেখি। রাবেয়া নিজে খেতে খেতে অভির মুখে ক্যালামারি তুলে দেয়। সারাদিন কথা হয় নাই ওদের তাই খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প বলে অভিজিৎ। বোসেদের বাড়ীর ‘বেপরোয়া’ বড় ছেলেটি কী করে শুধুমাত্র অধ্যবসায় আর সততার জোড়ে এই কর্পোরেট দুনিয়ায় স্থান করে নিলো সেই গল্প! হারলী ডেভিডসন চালানো আপাতঃ কঠোর মানুষটা একটু একটু করে নিজেকে উন্মুক্ত করে তার রাবেয়ার কাছে!

৩,১৮৫ বার দেখা হয়েছে

৩৩ টি মন্তব্য : “অণু ব্লগঃ হারলী ডেভিডসনের ঈগল”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    আদ্যোপান্ত ভালো লেগেছে, তবে কেন যেন এ কথাগুলো একটু বেশীইঃ
    টু সিটেড বাইক তার খালি রয়ে গেছে এতোকাল।
    তবে কি মেয়েরা ছেলেদের আদরে ভোলে কম, ভোলে তাদের উড়নচণ্ডী স্বভাবে?
    রাবেয়ার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে অভিজিতের মনে হয়েছে বেঁচে থাকবার মত আনন্দ আর কিছুতে হয়না!
    হারলী ডেভিডসন চালানো আপাতঃ কঠোর মানুষটা একটু একটু করে নিজেকে উন্মুক্ত করে তার রাবেয়ার কাছে!

    লক্ষ্যনীয়, সবগুলো বাক্যই অনুচ্ছেদের শেষ বাক্য।

    জবাব দিন
  2. সাইদুল (৭৬-৮২)

    আগাগোড়া ভালো, সবচেয়ে ভালো লেগেছেঃ

    আশপাশ বড় নির্জন এখানে। বছর পনেরোর একটি মেয়ে দাদীমার পাশে বসে নির্লিপ্ত চোখে গানের তালে তালে মাথা নাড়ে। গুল্লু টাইপের হাই স্কুলার ছেলেটা ঘুরে ফিরে মেয়েটির দিকে তাকায়। বালিকা তাকে সবিশেষ পাত্তা দেয় বলে মনে হয় না। এক কোণে মধ্য তিরিশের দুই বান্ধবী হাত নেড়ে খুব কথা বলছেন। জগত সংসার রসাতলে যাচ্ছে বলে তাদের একজন কে ভারী উত্তেজিত মনে হয়!

    মনে হয় চোখে দেখছি


    যে কথা কখনও বাজেনা হৃদয়ে গান হয়ে কোন, সে কথা ব্যর্থ , ম্লান

    জবাব দিন
  3. অরূপ (৮১-৮৭)

    মিস করছিলাম ... এই কয়দিন আভিজিত আর রাবেয়াকে ... CQ ...CQ চলছিল মাথার ভেতর।
    সাবিনা ধন্যবাদ।
    তবে কি জানো, এটারও অডিও পেতে ইচ্ছে করল।


    নিজে কানা পথ চেনে না
    পরকে ডাকে বার বার

    জবাব দিন
  4. Madam Sabina, another well written piece. Or should I say, a well depicted illustration where the things happening in the background serves up both the characters brilliantly. If the world is a stage and every man must play a part in it, then the set in itself becomes a beautiful frame which makes the painting even better. The setting itself helps to set the mood, influence the way the characters behave, foreshadows event, invoke and emotional response, reflect the society in which the characters live and sometimes even plays a part in the story.

    Your introduction to Abhijit riding a Harley Davidson Street Bob dramatically changes a passive character from a standard bengali man to a rebel. It is said that a vehicle on four wheels moves a body, but a riding a Harley in the wide open American highway, moves the soul. The Americanism of the Harley signifies Abhijit’s pursuit of life, liberty and freedom. In your building of Abhijit’s character, I see an Kafkaesque metamorphosis of man not sure of himself, frequently missing his mother, and dabbling in an archaic hobby of Ham Radio. Abhit has metamorphosed into a bandana wearing rebel, and he is riding in a thunderous motorcycle with Rabya in the back. I can picture Rabya’s arms tightly wrapped around Abhijit’s waist, her torso pinned against his back and they are riding a great snorting iron horse, moulded into a single unit. There is a sense of recklessness about Abhijit. D. H Lawrence in his book, Sons and Lovers writes, "Recklessness is almost a man's revenge on his woman. He feels he is not valued so he will risk destroying himself to deprive her altogether.”. Madam Sabina, how apt is it in this case!

    Now lets take a moment and take a look at the initial scene. The teen age girl ignoring the the dorky boy signifies the state of Rabya mind before. She was in the driver’s seat at one time. She held the power at one time. Now she riding in the back of a great beast of a Harley Davidson motorcycle, body to body, clinging on for her dear life and totally depending on Abhijit. Poor hapless and helpless Abhijit no longer. A metamorphous setting indeed. A classic duality of man’s nature. A man rediscovering himself and a woman’s heart getting softer by the minute. Rabya is thirsty after the long motorcycle ride. She is thirsty for love. It’s her lust for life. Rabya spirit is beginning to soar like an eagle. But she does not know it yet. And in this passion for understanding of Abhijit, Rabya's soul lay close to his; she had him all to herself.

    Your description of the country club is of great significance itself. It is a calm peaceful and sterile environment, like Rabya's soul before. Before she clung on to her Abhijit for her dear life. The quite calmness is shattered from the thunderous motorcycle declaring the arrival of Abhijit. Like a rebel, Abhijit is probably breaking the dress code of the country club as well as it’s serenity. It is quite apt that the other members are discussing the end of civilization as they know it. And yes, the sharing of the salad. If life and love is wondrous meal, then the salad signifies the beginning of their love. It reminds me of a Shakespearean quote, “ ..my salad days. When I was green in judgement and cold in blood.”

    In closing, I can say that this latest episode has not created a wrinkle in the plot but rather a giant twist in character development. The picture of love is beginning to emerge. And great love always carries the seed of great sorrow. I want to know where the polyrhythms of love and celestial time take us next. I want to know more about Rabya. There is still mystery in that area…

    So look into my face Marie-Claire
    And remember just who you are
    Then go and forget me forever
    But I know you still bear
    the scar, deep inside, yes you do

    But where do you go to my lovely
    When you're alone in your bed
    Tell me the thoughts that surround you
    I want to look inside your head, yes i do.

    জবাব দিন
  5. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    তোমার লেখার একটা বড় ঐশ্বর্য খুঁটিনাটি বিষয়ের আর পারিপার্শ্বিকতার নিখুঁত ও সুচারু বর্ণনা। যেমনঃ
    "অভির পরনে রংচটা ডেনিমের সাথে কালো চামড়ার জ্যাকেট একখানা। মাথায় নীল ব্যান্ডানা পরেছে আজ, বাঁ হাতে মোভাডো স্পোর্টস ওয়াচ, চোখে রোদ চশমা।" - নীল ব্যান্ডানা পরার কথাটা বেশ ভালো লেগেছে। প্রথম দুটো আর শেষ দুটো অনুচ্ছেদেও আছে তেমনি চমৎকার কিছু বর্ণনা।
    হেলেনে আমিও গিয়েছিলাম। তাই ছবিগুলো চোখে ভাসছে।

    জবাব দিন
    • সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

      :hatsoff:

      হেলেনের রূপে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই কুড়ি বছর আগেই, ভাইয়া! জর্জিয়া সেভেন্টি ফাইভ ধরে ড্রাইভ করবার সময়ে চারপাশের সবুজ গাছপালা দেখতে দেখতে আমি বলেছিলাম, আহ! সুজলা সুফলা বুঝি একেই বলেগো! হেলেনের ক্লাসিক জার্মান ধাঁচের ঘরবাড়ি আর দোকানপাট দেখবার মত।

      জবাব দিন
  6. পারভেজ (৭৮-৮৪)

    পড়তে পড়তে সঙ্গিসহ নিজের বাইকিং অভিজ্ঞতাগুলো ভেসে আসছিল মাথার ভিতরে।
    জানো, এখনো বাইকিং করি কিন্তু কেউ আর সঙ্গি হতে চায় না। বরং বলে, এই বয়সে কিসের বাইকিং?
    মনের বয়স যে বাড়াতে না চাইলে বাড়ে না, সবাই কি আর তা বোঝে?
    আজকাল তাই বাইকে একা একাই চলি আর মনে মনে অনুভব করি সেই সব দিনগুলো কে, যখন কেউ না কেউ পিছনে বসে জড়িয়ে থাকতো পরম নির্ভরতায়, নিঃছিদ্র আদরে।

    বাকিটা লিখা আগেরগুলোর মতই কুড়মুড়ে, মুচমুচে।
    চেটেপুটে খেলাম আর পড়ার চেয়ে দেখলামই তো মনেহয় বেশি।

    পরবর্তি গল্পের অপেক্ষায় থাকলাম কিন্তু......... (সম্পাদিত)


    Do not argue with an idiot they drag you down to their level and beat you with experience.

    জবাব দিন
  7. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    :hatsoff:

    পাবলিকের মুখ তো বন্ধ করতে পারবেনা, ভাইয়া! লেট দেম সে... তুমি এঞ্জয় করো টু দা ফুলেস্ট! বাইসাইকেল, ট্রাইসাইকেল (রিকশা) অথবা মোটর সাইকেল তিনটাই জোস!

    পরবর্তী গল্প অডিও ব্লগ করবো ভাবছি। অনেক ধন্যবাদ পড়বার জন্য!

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।