আলাপনঃ দুই

– বাবার পাঞ্জাবীর নীচে ন্যাপথলিনের সুবাস মাখা একটি বাজুবন্দ সযতনে রাখা আছে এখনো। মায়ের স্মৃতির এই গয়নাটি ঘুমোয় অনন্তের ঘুম আর আমি অনন্ত তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষা করি তোমার। চায়ের আড্ডায় চকিতে কোন হরিণ চোখে চোখ পড়তেই মনে হতো আহা! এই কি সেই মেয়েগো, যাকে খুঁজে ফিরছি আজন্মকাল?

– একই শহরের আলো হাওয়ায়, একই রোদ জল, রংধনু আর ছুটে যাওয়া তারাদের দেখেই আমাদের বেড়ে ওঠা, দীপ! অথচ কত যোজন দূরে রয়ে গেলাম দুজন। মায়ের বাজুবন্দ দেরাজেই থাকুক এই জীবন, সবাই তো নিশ্চিত জীবনের সুখটুকু চায়, গয়নার আর দোষ কি বলো?

– কাঁসার থালার মত ইয়া বড় এক চাঁদ উঠেছিল কাল রাতে। দেয়াল জোড়া জানালার ভারী পর্দা সরিয়ে দিতেই গোঁফওয়ালা ডাকাতের মতো চাঁদের আলো হামলে পরেছে আমার শোবার ঘরে। আমাদের ফরেস্ট হিলসের কর্মক্লান্ত মানুষ তখন ঘুমিয়ে পরেছে সেই আলোর চাঁদোয়া গায়ে জড়িয়ে। কার অতো দায় পরেছে বলো মাধুরী, চাঁদ অথবা এন্ড্রোমিডার হিসাব নিকাশের?

– আমাদের এই আধ ভাঙ্গা শহরে একই জ্যোৎস্নার আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে কত নির্ঘুম রাত কাটলো, দীপ! তোমার আকাশে যখন গোলগাল একখানা চাঁদ উঠেছে আমি তখন পূজোর ছুটির অবকাশে চর রাধাকানাই তে। মাসীর বাড়ী বেড়াতে এসেছি। রূপসার চরে বসতি বানিয়েছেন আমার শহরবিমুখ মেশোমশাই। মৃত প্রায় নদীটির মতোই নিস্তরঙ্গ জীবন এই চরের। অমরাবতীর নর্তকীর মত বাড়তি আলতা, কাজলের আদিখ্যেতা নাই বলে এখানে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় না, জানো!

– কতদিন আবছায়া আলোতে ধূপের ধোঁয়ায় ঝাঁকড়া চুল দোলানো একটা মুখ দেখেছি সব চোখ ফাঁকি দিয়ে। ধরতে চাইলেও সেই মুখ মিলিয়ে গেছে নিজের অজান্তেই। ন্যাপথলিনের গুটি ফুরিয়ে গেলেও বাবার পাঞ্জাবীর নীচে মায়ের শখের বাজুবন্দ এখনো তেমনি আছে, মাধুরী। এখানে জ্যাকসন হাইটসে পুজোর মন্ডপে সিঁদুর অথবা বাজুবন্দ পরা অপ্সরীদের কেউই আমার নয়। উৎসবের এই মাহেন্দ্রক্ষণে পায়েল বাজে ঘরে ঘরে, আমার ফরেস্ট হিলসে কেবলই নৈঃশব্দ্য, অধরা মাধুরী!

২,৫৫৬ বার দেখা হয়েছে

৪০ টি মন্তব্য : “আলাপনঃ দুই”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    আপনি তো একের পর এক ছক্কা হাঁকিয়ে যাচ্ছে আপু :hatsoff: :hatsoff: :hatsoff:


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. সাবিনা চৌধুরী (৮৩-৮৮)

    তোর থেকে লেখা চাই এবার, শাহেদ! এই যে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াস হামেশাই সেটা লিখ আমাদের জন্য। তোর চোখে নতুন একটা দেশ দেখি আমরাও। ফাটাফাটি ভ্রমণ কাহিনী চাই!

    🙂

    জবাব দিন
  3. তাওসীফ হামীম (০২-০৬)

    বাহ বাহ বাহ, ফেসবুকে আপনার কিছু লেখা পড়েছি, কিন্তু এখানের লেখাটা বেশি চমৎকার। 🙂 চলুক


    চাঁদ ও আকাশের মতো আমরাও মিশে গিয়েছিলাম সবুজ গহীন অরণ্যে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।