রোজায় খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত?

কলেজে রমজান পালনের সুযোগ হয় নি। তবে প্রতি বছর আমরা মহাসমারোহে পালন করতাম শবে বরাতের রোজা। ভোররাতে পাঞ্জাবি গায়ে চাপিয়ে ডাইনিং হলে সবাই মিলে সেহরি খাওয়ার স্মৃতি এখনো টাটকা। মেন্যু — ভাত, ডাল, সবজি ও মুরগী বা মাছ। আর আসর থেকে শুরু হতো ইফতারের জন্যে অপেক্ষা। মেন্যু—একাধিক ফল, চপ, বেগুনি, পেয়াজু, হালিম, মুড়ি, জিলাপি ইত্যাদি। এদেশের অধিকাংশ সামর্থ্যবান পরিবারে সেহরি-ইফতারের মেন্যু অনেকটা এরকমই। অথচ রোজাদারের জন্যে এরকম মেন্যু অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।

সারাদিন না খেয়ে থাকব, এ চিন্তায় আমরা দিশেহারা হয়ে সেহরিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভাতের সাথে মাছ-মাংস-ডিম খাই। অন্যদিকে, সারাদিন যেহেতু না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাই ইফতার করি ভরপেট। বিবিধ ভাজাপোড়া চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য দিয়ে প্লেট কানায় কানায় পূর্ণ! অথচ সেহরিতে প্রাণিজ আমিষ (মাছ-মাংস-ডিম) ও ইফতারে ভাজাপোড়া শরীরের জন্যে অত্যন্ত ক্ষতিকর। দুঃখজনক (সেইসাথে আশঙ্কাজনকও বটে) হলো, শুধু সাধারণ মানুষ নন, অনেক পুষ্টিবিদও এ বিষয়টি জানেন না।

গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক প্রথম আলো-তে একজন পুষ্টিবিদ রোজায় খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। ইফতারে ভাজাপোড়া কম খাওয়ার দাওয়াই দেয়ার পরই আবার তিনি বলছেন, আলুর চপ খেতে পারেন। এ কী তেলেসমাতি! সেহরিতে তিনি ‘একটু ভালো করে’ খেতে বলছেন। কীরকম সেটা? সেই পুষ্টিবিদ বলছেন, ‘ভাতের সঙ্গে সবজি, ডাল, মাছ বা মাংস, ডিম ইত্যাদি মিলিয়ে একটা সম্পূর্ণ খাবার’। আর ‘ইফতার বেশি খাওয়া হলে রাতে হালকা’ খাওয়ার পরামর্শ তিনি দিয়েছেন।

তার এই পরামর্শ মানলে আপনার বারোটা বাজতে খুব বেশি দেরি নেই। আসুন দেখি, নবীজীর (স) জীবনাচরণ ও সত্যিকারের পুষ্টিবিজ্ঞান রোজায় খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারে কী বলে —

সেহরিতে অল্প খান, প্রাণিজ আমিষ বর্জন করুন
প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি খেলে কিডনি বেচারার পরিশ্রম বেড়ে যায়। কারণ শরীরে অধিক হারে বর্জ্য (যেমন ইউরিয়া) জমে। এসব বর্জ্য শরীর থেকে সরানোর জন্যে প্রচুর পানি পানের প্রয়োজন হয়। প্রোটিন খাওয়ার পর পানি পানের পরিমাণ কম হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। কিন্তু সেহরির পর থেকে মাগরিবের আজান দেয়ার আগপর্যন্ত আপনি তো পানি পান করতে পারছেন না। তাই সেহরিতে মাছ-মাংস-ডিম খেলে হজমের জন্যে শরীর যথেষ্ট পানি পাবে না। ফলে দিনের বেলা আপনার তৃষ্ণা বেড়ে যাবে।

তাহলে কী খাওয়া উচিত সেহরিতে? এমন খাবার যা সহজে হজম হয়, শরীরে পানির ঘাটতিও কম দেখা দেয়। ভাত-সবজি, দই-চিড়া বা কলা-খেজুর খান। সারাদিন ঝরঝরে অনুভব করবেন। কাজে ও ইবাদতে মনোযোগ দেয়া সহজ হবে।

ইফতারে চিনিযুক্ত শরবতের বদলে খেজুর পানি ॥ ভাজাপোড়াকে লাল কার্ড
রোজা এলেই বিভিন্ন জুস পাউডার/ড্রিংক মিক্স (ট্যাং, নিউট্রি-সি, ফস্টার ক্লার্ক আরো কত কী) কেনার হিড়িক পাওয়া যায়। তাদের আদিখ্যেতা দেখে মনে হয়, এসব শরবত যেন ইফতারের অত্যাবশকীয় অনুষঙ্গ! কী তাকে পাউডার জুস বা ড্রিংক্স মিক্সে? কৃত্রিম রং, ফ্লেভার ও নানা কেমিক্যাল। খাড়ার ওপর মড়ার ঘা হিসেবে আমরা যোগ করি চিনি বা সাদা বিষ। ইফতারে চিনিযুক্ত শরবতে চুমুক দিতে ভালো লাগলেও পাকস্থলী ঠিকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই চিনিযুক্ত শরবত বা প্যাকেটজাত জুসের বদলে ইফতার করুন খেজুর পানি দিয়ে। খেজুর ও পানির মিশেলে সুক্রোজ তৈরি হয়। যা শরীরে আনে তাৎক্ষণিক প্রাণশক্তি।

খেজুর পানি দিয়ে ইফতার সুন্নতও বটে। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত,

‘রসুলুল্লাহ (স) কয়েকটি তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তাজা খেজুর না পেলে শুকনো খেজুর খেতেন। তাজা বা শুকনো খেজুরের কোনোটাই না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন।’

(আবু দাউদ)

ইফতারে দেশীয় মৌসুমি ফল, মুড়ি, গাজর-টমেটো, ডিম থাকতে পারে। তবে ইফতার অবশ্যই হবে হালকা। অর্থাৎ এমন খাবার যা খেয়ে স্বস্তি বোধ করবেন, প্রাণশক্তিতে উদ্দীপ্ত হবেন। আর ভুরিভোজ করলে নেতিয়ে পড়বেন।

মাগরিবের নামাজের পর রাতের খাবার
হালকা ইফতার করে মাগরিবের নামাজ আদায় করার পর রাতের খাবার খেয়ে নিন। এবার ভালোমতো খাওয়া যেতে পারে। ভাত, সবজি, মাছ/ মাংস/ ডিম, ডালসহ অন্যান্য সুষম খাবার — সবই চলতে পারে। তবে ভাজা-পোড়া ও তেল-মশলা দেয়া গুরুপাক খাবার রাতেও বর্জন করুন।

আসলে রোজা কী? অল্প কথায় বলতে গেলে, বিনামূল্যে পাওয়া এই বিস্ময়কর দেহটার সার্ভিসিং। খাদ্যবিরতির এ সময়ে শরীর তার নিজস্ব প্রক্রিয়ায় দেহের টক্সিন বা বিষাণুগুলো দূর করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে ২০১৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী ইউশিনোরি ওশুমি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় প্রক্রিয়াটিকে বলা হচ্ছে অটোফেজি।

একটু ভেবে দেখুন, যখন আপনার গাড়িটা সার্ভিসিংয়ের জন্যে ওয়ার্কশপে পাঠান, তখন কি ইচ্ছে করলেই যখন-তখন সেটা চালিয়ে রাস্তায় বের হতে পারেন? কিংবা আপনার বাসার একেকটা রুমের দেয়ালে-ছাদে যখন রং করান বা মেরামত করান, তখন কি অন্য সময়ের মতো ঘরগুলো ব্যবহার করা যায়? না, যায় না। সেইসময় নিত্য ব্যবহারের রুটিনে একটু বিরতি দিতে হয়। তেমনি বছরব্যাপী প্রতিদিনকার খাবার গ্রহণের চাপ আর পাকস্থলীকে অবিরাম অস্থির কর্মযজ্ঞ থেকে এক ধরনের বিরতি দেয়ার সময় হলো রমজান। আপনার সার্বিক সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে দেহ যখন একটা শক্তপোক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে, সেখানে আপনি সারা বছরের তুলনায় আরো বেশি তেল-মশলা-চিনি ঢেলে দিচ্ছেন পাকস্থলীতে। বেচারা পাকস্থলী দম নিবে কী! ওর তো দমবন্ধ হওয়ার দশা।

তাই গণমাধ্যম ও (অ) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাহারি বিজ্ঞাপন দেখে আমরা যেন প্রভাবিত না হই। ধর্ম ও পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোকে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলুন। আট বছর ধরে এই ফর্মুলা অনুসরণ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, রমজানে সুস্থ থাকা আপনার জন্যে সহজ হবে।

১,০৮৬ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “রোজায় খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত?”

  1. রেজওয়ান (১৯৯৯-২০০৫)

    বহুবছর বাদে সিসিবিতে এলাম। এসে বুঝলাম এই পোস্টটা আমার আগে দেখা উচিৎ ছিল। আমার গাউটের সামান্য সমস্যা আছে। প্রাণিজ আমিষ বর্জনের বিষয়টি তাই সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারছি।

    জবাব দিন
  2. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    এ উপকারী পোস্টটা তুমি সময়মতই দিয়েছিলে, অর্থাৎ রোজার শুরুতেই, কিন্তু আমিই পড়ছি পড়বো করতে করতে একেবারে রোজা পার করে পড়লাম। যাহোক, ৬টি নফল রোযা এখনও বাকী আছে। কথাগুলো স্মরণে রাখবো।
    সময়োপযোগী পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।

    জবাব দিন
    • কৌশিক(২০০৪-২০১০)

      ধন্যবাদ।
      ফাস্টফুড-সফট ড্রিংকস-এনার্জি ড্রিংকস ও কায়িক শ্রমবিমুখ দিনযাপনের খেসারত হিসেবে পাশ্চাত্যের বহু মানুষ এখন ব্যস্ত মেদ ঝরাতে। উপবাসের নানা ধরন জনপ্রিয় ইতোমধ্যেই। তবে নোবেলপ্রাপ্ত অটোফেজি প্রক্রিয়ার বিবরণ পড়লে সহজেই বোঝা যায়, উপবাসের বহু ফর্মুলা প্রচলিত থাকলেও মানবদেহের জন্যে সবচেয়ে উপযোগী রোজা।
      মাসব্যাপী রোজা পালনের স্বাস্থ্যগত উপকার লাভের অন্যতম উপায় তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ। 🙂

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।