আবোলতাবোল

গতকাল বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্বখ্যাত প্রক্টর &গ্যাম্বল কোম্পানির শীর্ষ দুই কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অডিটরিয়ামে আয়োজিত সেমিনারে তারা জানালেন, আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশে মার্কেট শেয়ার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর এদেশে P&G আয় করেছে ১৭৫ কোটি টাকা। তাদের ভাষায় “it’s nothing!”। যে কোম্পানির মোট আয় ৫৭৪০০০ কোটি টাকা, তাদের কাছে হয়ত ১৭৫ কোটি হাতের ময়লা। কিন্তু, প্রক্টর &গ্যাম্বল বাংলাদেশে আসলে যেসব দেশি কোম্পানির লালবাতি জ্বলবে তাদের কাছে?দেশি কারখানাগুলো বন্ধ হলে যে পরিবার গুলো আরও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে তাদের কাছে? কৌতূহলী যেকোনো বাংলাদেশী খেয়াল করলে দেখতে পাবে হঠাৎ করেই এদেশে যেন বিদেশী হর্তাকর্তাদের মচ্ছব লেগেছে। রাতারাতি কি এমন হল যে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ দেশটা তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে এক ঝটকায় সবার কাছে সোনায় মোড়া আলাদিনের চেরাগের মতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠল?

দুনিয়াজুড়ে সবাই যখন বলছে it’s time for Bangladesh, আমরা তখন ঢাকার যানজটে বসে মশা মারছি আর অপেক্ষা করছি সবুজ বাতি তো আজ হোক কাল হোক জ্বলবেই! কে জানে,মৃতপ্রায় এ শহর হয়তোবা আমাদের অজান্তেই অনুভুতি-শূন্য করে ফেলছে তার বাসিন্দাদের। কিন্তু, কেন সবাই ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ বলে চিৎকার করছে? কারণ, এদেশে ৬.৫ কোটি মানুষ তারুণ্যের শক্তিতে টগবগ করছে। সম্ভাবনাময় এই তরুণদল বদলে দিতে পারে দক্ষিন এশিয়ার মুখ। আমরা কি প্রস্তুত? কবি নজরুলের সেই কবিতা আজো আমাদের জন্য সমান প্রযোজ্য, ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’

আজ থেকে মাত্র ৩০০ বছর আগেও এই দেশ ছিল পৃথিবীর ৯ম সম্পদশালী অঞ্চল। ২১৪ বছরের শোষণের পরও যা আছে তা পেলে যেকোনো পরিশ্রমী জাতি বদলে ফেলত তার জীর্ণ-মলিন বেশ। হল্যান্ডের ৬০ ভাগ ভূমি ডোবায় ভরা। কঠোর সাধনায় আজ সেই জমি দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে কয়েক দশক আগেও এখানে সমুদ্র ছিল। জাপানের কোন প্রাকৃতিক সম্পদ নাই। মাটির উর্বরতা বাঙলার মাটির ৬ ভাগের এক ভাগ। মস্তিস্ক ব্যবহার করে আজ তারা আমেরিকার পর সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। আর আমরা? পৃথিবীর মোট সুপেয় পানির ১০ ভাগের এক ভাগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারছি না। পায়ের উপর পা তুলে অপেক্ষা করছি কখন সর্বনাশের ষোলকলা পুরণ হবে!আর গান গাইছি ‘আয় আয় চাঁদ মামা’। সমঝদাররা আশঙ্কা করছেন পরের বিশ্বযুদ্ধ হবে পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। গান না গাইলেও চাঁদ মামারা যে আসবে এবং কপালে বড় করে টিপ দিয়ে যাবে সে বিষয়ে সন্দেহ না রাখাই ভাল।

এইসব অতি জটিল তত্ত্ব যখন হতাশ করে তখনি আবার নিঃসীম অন্ধকারের প্রাচীরে ছিদ্র হয়ে আলো নিয়ে আসে নওগাঁর সেই ভিক্ষুকের মতো মানুষগুলো। কথাসাহিত্যিক শাহাদুজ্জামানের (ক্র্যাচের কর্নেল) ‘চিরকুট’ এ পড়ছিলাম, সেই ভিক্ষুক চাল- টাকা-পয়সার বদলে ভাদ্র মাসে তাল ভিক্ষা নেন। দীর্ঘদিন ধরে তার এই অভ্যাস। বর্তমানে বদলগাছি উপজেলায় রাস্তার দুধার তাল গাছে ছেয়ে গেছে। ঠা ঠা রোদের মাঝে এক চিলতে ছায়ার পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে যে গাছ গুলো তা ওই নিরক্ষর-অবহেলিত ভিক্ষুকের লাগানো। মুখোশ পরা ‘ভদ্রলোকদের’ তীব্রস্রোতে এই ভিক্ষুক আর পলান সরকাররা কোন শক্তিতে উল্টোযাত্রা করছেন কে জানে!

তবে ওই উল্টো যাত্রাই হয়ত আমাদের আবার পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী দেশগুলোর কাতারে স্থান করে নেওয়ার গুপ্তিমন্ত্র…

১,৫৮৪ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “আবোলতাবোল”

  1. রেজা শাওন (০১-০৭)

    লেখায় ৫ দিলাম। চমৎকার আশাবাদী লেখা। বাংলাদেশ নিয়ে আমি নিজেও বাড়াবাড়ি রকমের আশাবাদী।

    আমাদের সুযোগ আছে। এবং এতো সমস্যার পরেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

    এটা নিয়ে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে আসলে। কিন্তু সব লিখতে গেলে আরেকটা ব্লগ লিখতে হবে। 😛 😛

    সিসিবিতে লেখা লিখি জারি থাকুক।

    জবাব দিন
  2. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    দারুন লিখেছ :hatsoff: দেশ নিয়ে আমারো এরকম আশাবাদি হতে ইচ্ছে করে...


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    আমি জানিনা আজকাল সেইরকম ধনী বা সম্পদশালীরা দেশ বা জনগণের জন্য কিছু করেন কিনা। তবে তারা রাজনীতিতে আসতে চান, জনসেবা করতে চান, এবং জনসেবা করে থাকেন।
    আমাদের দেশীয় শিল্পে যদি রণদা প্রসাদ সাহার মতন লোক না থাকে তবে আমরা দেশীয় শিল্পকে ব্যাক আপ দিব কেন? শুধুমাত্র দেশীয় বলে? ব্যাপারটাকে এতো সহজ করে দেখার উপায় নেই।
    আর মোদ্দা কথা দেশের স্কয়ার, এসিআই ইত্যাদি প্রকটর এন্ড গ্যাম্বলের চাইতে ভালো জিনিস দিতে পারলে মানুষ ভালোটাই নেবে।
    দেশাত্তবোধ মানে তো আর দেশের জিনিস সেটা যদি নিম্নমানের হয় তাও ব্যাবহার করা!


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  4. মাহমুদুল (২০০০-০৬)

    কৌশিক খুব ভাল লিখেছো।

    আমার কাছে মনে হয় এই দেশের যদি বারোটা বাজানোর দায়িত্ব নিয়ে থাকে তাহলে সেতা হচ্ছে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ। অন্যদের কথা বলতে পারব না । তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে বলতে পারি যদি এখান কার শিক্ষক এবং ছাত্র রা চায় তবে তারা নিজেরাই এই দেশটাকে বদলে দিতে পারেন।

    কৌশিক তুমি ভাবতে পারো প্রক্টর &গ্যাম্বল এর দুই কর্মকর্তা এসে তোমাদের কিছু মাথা কিনে নিয়ে গেছে হয়তো। আমি জানি না। সেই মাথাগুলো দেশের টাকায় পড়াশুনা করে কয়েকবছর পর তারাই সারাজীবন চেষ্টা করবে কিভাবে বিদেশী প্রভুদের পকেট ভারী করা যায়। যারা এখানে জয়েন করতে চায় তাদের কি বুঝাতে পারবে এটি দেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর? হাই স্যালারী দেখিয়ে তারা কত মানুষকে যে কিনে নিবে তার ইয়ত্তা নেই।

    সবাই যার যার আখের গুছাতে ব্যস্ত। আমরা হাই স্যালারী দেখলে নিজের কথা ভুলে যাই, দেশের কথা ভুলে যাই।

    আরও অনেক কথা বলার ছিল । পরে কথা হবে।


    মানুষ* হতে চাই। *শর্ত প্রযোজ্য

    জবাব দিন
  5. আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)

    আমরা স্বাধীনতাত্তোর 'কিছু নেই'র দেশে' তিল তিল করে তোমাদের জন্যে বিনির্মাণ করেছি হাঁটাপথ,
    - এই আশায় যে তোমাদের দৃঢ় হাত, সেই পথকে রূপান্তরিত করবে 'মহা সড়কে'।

    আমাদের 'হাটি হাটি পা, তোমাদের নতুন প্রজন্ম কে সেই মহাসড়কে দৃপ্ত পদে ধাবিত করবে 'পৃথিবীর পথে'।

    এই অপেক্ষায় আমরা।
    শুভেচ্ছা সুন্দর লিখার জন্যে/
    আজিজ/এফসিসি/১৯৭২~৭৮


    Smile n live, help let others do!

    জবাব দিন
  6. নাফিজ (০৩-০৯)

    আশাবাদী লেখা পড়তে সবসময় খুব ভালো লাগে... পরিচিত প্রতিভাবান মানুষগুলা সমাজ, দেশ নিয়ে এখনো পজিটিভলি চিন্তা করে- ব্যাপারটা বাকিদের জন্য খুব ইন্সপায়ারিং।

    আমার ব্যক্তিগত ধারণা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের জাপান, জার্মানী, কিংবা ৪৭ এর পরের ভারতের সাথে আমাদের সময়কে তুলনা করা যায়না। এখনকার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা অনেক বেশি আন্তর্জাতিক- ইচ্ছে করলেই তুমি টয়োটা কিংবা টাটার মত কোম্পানী খুলে রাতারাতি ১নাম্বারে যেতে পারবেনা- মাল্টিন্যাশনালদের সাথে প্রতিযোগিতা করেই টিকে থাকতে হবে। দরজা যদি ভেতর থেকে না খোল তো বাইরে যাবে কিভাবে? আমি অর্থনীতির "অ" ও বুঝিনা, কিন্তু গ্রাহক এবং দেশীয় উদ্যোক্তা-সবাই যেদিন "ব্যবসা" আর "ধান্দার" মধ্যে পার্থক্যটা মন থেকে ধরতে পারবে, সেদিন হয়তো সমস্যাটা আস্তে আস্তে খানিকটা কমতে শুরু করবে।

    মধ্যবিত্ত সমাজের ব্রেইন ড্রেইন খুব জটিল একটা সমস্যা। এটার সমাধান আছে কিনা জানিনা- ভাবতে গেলে লজিক গুলিয়ে যায়।

    যেকোন দেশের সবচে বড় শক্তি তার শিক্ষিত জনগণ- শুধু থিওরেটিক্যালি না, প্র্যাকটিকালিও এটা সত্যি। প্রাকৃতিক সম্পদ আফ্রিকারও কম নেই- কিন্তু সেটা নিজেদের কাজে লাগানো জানতে হয়,জেনে সেটা সৎভাবে নিজেদের কাজে লাগাতে হয়। এভাবেই একটা দেশ উঠে আসে, আমার ধারণা।

    ভাবতে থাকো। দেখো সবাই মিলে ভাবতে ভাবতেই একদিন হুট করে সমাধান বের হয়ে যাবে।


    আলোর দিকে তাকাও, ভোগ করো এর রূপ। চক্ষু বোজো এবং আবার দ্যাখো। প্রথমেই তুমি যা দেখেছিলে তা আর নেই,এর পর তুমি যা দেখবে, তা এখনও হয়ে ওঠেনি।

    জবাব দিন
  7. কৌশিক(২০০৪-২০১০)

    @আজিজুল ভাই... সময় করে পড়েছেন, ধন্যবাদ ভাইয়া।

    @ নাফিজ ভাই .. আমরা যে আফ্রিকা না সেটা প্রমান করাটা আমাদেরই দায়িত্ব।

    @মাহমুদুল ভাই.. নিলান যাক তারপর APEC office এ সিরাম একটা গুরুগম্ভীর আলোচনা করা যাবে! 😛

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।