গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র – ২

গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র – ২
—————- ডঃ রমিত আজাদ

যে গণতন্ত্র সক্রেটিসকে হত্যা করেছে


গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দর্শন। কি এই গণতন্ত্র, কোথা থেকে এর উদ্ভব, এই দর্শন প্রতিষ্ঠার পিছনে কারা ছিলেন, বিশ্বের অতিত ইতিহাসে গণতন্ত্র কখন কেমন ছিল, কি করে তা রাষ্ট্রযন্ত্রে স্থান পেল, কতটুকু সফল এই রাজনৈতিক মতাদর্শ, এর বিকল্প কিছু আছে কিনা; বিভিন্ন জ্ঞানী, খ্যাতিমান, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি ও লেখকেরা এই মতাদর্শের পক্ষে ও বিপক্ষে কি বলেছেন বা লিখেছেন এই সম্পর্কে ধারাবাহিক লিখে যাব। আপনাদের গঠনমূলক মতামত কামনা করছি।

এবারের পর্বে আলোচনা করব, যে গণতন্ত্র সক্রেটিসকে হত্যা করেছে তাকে নিয়েঃ

সক্রেটিসকে নিয়ে আলোচনা ঐতিহাসিকদের জন্য একটি কঠিন বিষয়। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সম্পর্কে খুব কম জানা যায়, আবার এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায। কিন্তু সক্রেটিস সম্পর্কে আমরা কম জানি না বেশি জানি সেটাই অনিশ্চিত। সক্রেটিসের জন্ম খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬৯ সালে এথেন্সের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাদানুবাদ ও যুবকদের দর্শন শিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি সময় কাটিয়েছেন। তবে তিনি সোফিস্টদের মত অর্থের বিনিময়ে জ্ঞান দান করতেন না। এটি নিশ্চিত যে উনার বিচার হয়েছিল, এবং বিচারে উনাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। খ্রীষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে সত্তর বছর বয়সে সেই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

কেন তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল? বিচারক ও শাসকদের অভিযোগ কি ছিল? আর্গুমেন্ট কি ছিল আর ফ্যক্ট কি ছিল? এইগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেই সময়ে এথেন্সে ডেমোক্রেসি (গণতন্ত্র) প্রচলিত ছিল, তিনি সেই ডেমোক্রেসির বিরোধিতা করেছিলেন। তার ফলে তদানিন্তন শাসকবৃন্দ যারা কিনা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত ছিল তাদের রোষানলে পড়েন সক্রেটিস।

সক্রেটিস বলতেন, সুযোগ্য ব্যক্তির রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করা উচিৎ। তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করতেন, “আমি যদি জুতা মেরামত করতে চাই, তাহলে আমি কাকে নিয়োগ দেব?” ছাত্র-ছাত্রীরা সাদামাটা উত্তর দিত, “হে সক্রেটিস, মুচিকে”। এইরুপে কাঠের কাজের জন্য কাঠমিস্ত্রি, লোহার কাজের জন্য কামার, স্বর্নের কাজের জন্য স্বর্ণকারের কাছে যাব। সবশেষে সক্রেটিস তার ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন করলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কার উপর ন্যস্ত হবে?” এই প্রশ্নে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল যে, যারা বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আছে তারা আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নয়। ফলে ত্রিশ জন স্বৈরশাসকের সঙ্গে তার দ্বন্দ দেখা দেয়।

এই স্বৈরশাসকের দলের প্রধান ক্রিটিয়াস সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন এবং তিনি তার তর্ক পদ্ধতির সাথে পরিচিত ছিলেন। ক্রিটিয়াস তাই তাঁকে যুবকদের শিক্ষা দান করতে নিষেধ করেন। ক্রিটিয়াস বলে যে, সক্রেটিসের শিক্ষার ফলাফল অত্যন্ত ধংসাত্মক হয়ে পড়েছে। পেলোপনেনসিয়ান যুদ্ধ শেষে স্পার্টাবাসি কর্তৃক স্বল্প সময়ের জন্য একটি ধনিকতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া অধিকাংশ সময় এথেন্সে গণতান্ত্রিক সরকার ছিল। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এমন ছিল যে, সামরিক জেনারেলগণও সাধারণ নাগরিক দ্বারা নির্বাচিত হতেন। জেনারেল হতে ইচ্ছুক এক যুবকের সাথে সক্রেটিসের দেখা হয়। তিনি তাকে যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষার পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী সেই যুবক যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত কোর্সে যোগ দেয়। উক্ত কোর্স শেষে যুবক সক্রেটিসের সঙ্গে দেখা করতে এলে, তিনি তাকে বিদ্রুপাত্মক প্রশংসা করে পুনরায় আরো কিছু যুদ্ধের কলাকৌশল শেখার জন্য পাঠিয়ে দেন। এরুপ আরো একজন যুবককে হিসাব ব্যবস্থাপনা শিক্ষার পরামর্শ দেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীসহ এমন অনেককেই তিনি এইরূপ পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরিশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে, সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যেসব অশুভ কাজের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা থেকে সক্রেটিসকে মুক্ত করার চেয়ে বরং হেমলক বিষপানে তাকে হত্যা করাই অধিকতর সহজ।

যে কয়েকটি সংলাপ ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে তার মধ্যে একটি হলো এ্যপোলজি (Apology)। আধুনিক ইংরেজীতে Apology অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু গ্রীক ভাষায় Apology-অর্থ ভিন্ন। সেখানে Apology-অর্থ defense। আদালতে বিচারের সময় আত্মপক্ষ সমর্থন করে সক্রেটিস যে ভাষণ দেন এ সংলাপ তারই বর্ণনা। আদালতে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো ছিল নিম্নরূপ – ‘সক্রেটিস অশুভ কাজ করেন এবং তিনি একজন কৌতুহলী ব্যক্তি, তিনি স্বর্গ-মর্ত্যের বিদ্যমান বস্তু নিয়েও অনুসন্ধান করেন, এবং যা ভালো তাকে খারাপ বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন এবং অন্যকে এসব বিষয় শিক্ষা দেন’।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে শত্রুতার প্রায় নিশ্চিত প্রকৃত যে কারণটি ছিল তা হলো তাকে অভিজাত দলের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো। তাঁর অধিকাংশ ছাত্র ঐ দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে আবার অনেকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতও ছিল। এরা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক বলেও প্রমাণ করেছিল। কিন্তু এই অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি বলে সক্রেটিসকে এই অভিযোগ মুক্ত করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক দ্বারা তাঁর অন্যান্য অপরাধ প্রমাণিত হয় এবং তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। বিচারের ফলাফল তিনি পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু দোষ স্বীকার করে তিনি মৃত্যুদন্ড এড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার ছিল না।

বিচারকদের মধ্যে ছিলেন গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ এনিটাস, কবি মেলিটাস, বাগ্মী লাইকন। তারা অভিমত ব্যক্ত করেন যে, সক্রেটিস জাতীয় দেব-দেবীর উপাসনা করেন না। বরং নতুন নতুন দেব-দেবীর প্রচলন করার অপরাধে অপরাধী। এছাড়া তিনি যুবকদের এসব বিষয়ে শিক্ষাদান করে পথভ্রষ্ট করার অপরাধেও অপরাধী।

সক্রেটিস আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন যে, তার বিচারকরা বাগ্মী, কিন্তু তিনি বাগ্মী নন, শব্দ ও প্রবাদে অলংকৃত একটি যথাযথ ভাষণ তিনি দিতে পারবেন না, তিনি তার অভ্যস্ত উপায়ে ভাষণ দেবেন। তাঁর বয়স তখন সত্তরেরও বেশি আর এই প্রথম তিনি বিচারালয়ে উপস্থিত হয়েছেন, সুতরাং আদালতের বিধিবিধানসম্পন্ন বক্তৃতা দিতে তিনি অপারগ। তিনি আরো বলেন যে, তিনি বিজ্ঞানী নন, তিনি শিক্ষকও নন এবং সোফিস্টদের মত তিনি শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ গ্রহন করেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, “আমি জ্ঞানী নই, তাহলে আমাকে জ্ঞানী বলার ও দুর্নাম করার কারণ কি?”

ডেলফির উপাসনালয়ে একবার তার বন্ধু কায়রেফোন (Chaerephon ) জিজ্ঞাসা করেছিলেন সক্রেটিস অপেক্ষা বিজ্ঞতর কোন ব্যক্তি আছে কি না। গায়েবী আওয়াজ এসেছিল, ‘সক্রেটিস অপেক্ষা বিজ্ঞতর কোন ব্যক্তি নেই’। এই দৈববাণীতে সক্রেটিস সম্পূর্ণরূপে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। কারণ তিনি জানতেন যে, ‘তিনি কিছুই জানে না’। আবার ইশ্বর মিথ্যা কথাও বলতে পারেন না। সুতরাং বিষয়টি পরীক্ষা করার জন্য তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিকট যেতে শুরু করেন। প্রথমেই তিনি একজন রাজনীতিবিদের কাছে গেলেন জ্ঞানী বলে যার খ্যতি ছিল। সেই রাজনীতিবিদ নিজেও নিজেকে জ্ঞানী বলে মনে করতেন। তার সাথে আলোচনা করে সক্রেটিস খুব শীগগিরই বুঝতে পারেন যে, সেই রাজনীতিবিদ মোটেও জ্ঞানী নন। একথা সক্রেটিস তাকে বিনয়ে কিন্তু দৃঢ়তার সাথে বলেন। এর ফলে সক্রেটিস তার ঘৃণার পাত্র হন। এরপর তিনি কবিদের কাছে যান, কিন্তু সেখানেও ঐ একই অবস্থা। সক্রেটিস বুঝতে পারলেন, কবিগণ জ্ঞান দ্বারা কবিতালেখেন না, বরং এক ধরনের সৃজনী ক্ষমতা ও অনুপ্রেরণার দ্বারাই কবিতা লেখেন।এরপর তিনি কারিগড়দের কাছে যান, তাদেরকেও অজ্ঞ বলে মনে হয়। সক্রেটিস বলেন, “এভাবে আমি আমার অনেক বিপজ্জনক শত্রু সৃষ্টি করেছি’। পরিশেষে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনিত হন যে একমাত্র ইশ্বরই জ্ঞানী, আর ইশ্বরের জ্ঞানের তুলনায় মানুষের জ্ঞান অতি সামান্য বা কিছুই না।

দৈববাণীতে বলা হয়, ‘হে মানবগণ, তিনিই মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী, যিনি সক্রেটিসের মত এ বিষয় জানেন যে, প্রকৃতপক্ষে তার জ্ঞান কিছুই নয়।’ জ্ঞানাভিমানীদের অভিমান ভাঙাতেই সক্রেটিসের সমস্ত সময় ব্যয় হয়েছে। ফলে তিনি কঠোর দারিদ্রের মধ্যে নিপতিত হয়েছেন। কিন্তু দৈববাণির সত্যতা প্রমাণ করাকে সক্রেটিস তার কর্তব্য মনে করেছেন।

সক্রেটিস বলেন, অধিকতর বিত্তশালী যুবকদের তেমন করণীয় কিছু থাকেনা বলে তারা সক্রেটিসের কথা আগ্রহের সঙ্গে শোনে, এবং জনগণের কাছে জ্ঞানের ভানকারীদের অজ্ঞতা প্রকাশ করে দেয়। এভাবে তাঁর শত্রুসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ তথাকথিত খ্যাতিমানরা যারা এতকাল জ্ঞানের ভান করে আসছিলেন, তারা স্বীকার করতে চান না যে, তাদের জ্ঞানের ভান ধরা পড়ে গেছে।

এরপর সক্রেটিস তার অভিযোক্তা মেলিটাসকে জেরা করতে শুরু করেন। মেলিটাস নিজেকে একজন ভালো মানুষ ও প্রকৃত দেশপ্রেমিক বলে দাবী করত। তিনি মেলিটাসকে প্রশ্ন করেন, “কারা যুবকদের উন্নতি সাধন করেন?” উত্তরে মেলিটাস প্রথমে বিচারকদের কথা বলেন। এরপর ক্রমান্বয়ে প্রশ্নের ফলে চাপের সম্মুখীন হয়ে তিনি বলেন যে, শুধু সক্রেটিস ব্যতীত প্রতিটি এথেন্সবাসী যুবকদের উন্নতিসাধন করে। এর উত্তরে সক্রেটিস নগরবাসীদের তাদের সৌভাগ্যের জন্য অভিনন্দন জানান।

অভিযোগপত্র অনুযায়ী সক্রেটিস শুধু জাতীয় দেব-দেবীকে অস্বীকারই করেননি, বরং নিজ ইচ্ছা অনুসারে নতুন নতুন দেব-দেবীর প্রবর্তনও করেছেন। তাই মেলিটাস বলেন সক্রেটিস একজন পূর্ণ নিরীস্বরবাদী।

Apology-র সংলাপের অবশিষ্ট আলোচনা মূলতঃ ধর্মীয় আলোচনা। তিনি একজন সৈনিক ছিলেন এবং সৈনিকের কর্তব্যে তিনি অবহেলা করেননি। এখন ইশ্বর আমাকে দার্শনিকের কর্তব্য, অর্থাৎ নিজের ও অন্যের সম্পর্কে অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছেন। যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করা যেমন লজ্জার ব্যপার, তেমনি ইশ্বরের এই নির্দেশ পরিত্যগ করাও তার জন্যে লজ্জার ব্যপার হবে। মৃত্যুভয় প্রজ্ঞা নয়, কারণ কেউ জানেনা জীবন অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়তর কিনা। সক্রেটিসকে যদি বলা হয়, পূর্বে তিনি যেরূপ দার্শনিক আলোচনা করেছেন, সরূপ আলোচনা পরিত্যাগ করলে তাকে মৃত্যুদন্ড থেকে ক্ষমা করা হবে, তাহলে তিনি বলবেন, “এথেন্সবাসীগণ, আমি আপনাদের শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসী। কিন্তু আপনাদের আদেশ পালন করা অপেক্ষা ঈশ্বরের আদেশই পালন করবো। এবং যার সঙ্গেই আমার দেখা হয়েছে তাকেই আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছি, যতদিন আমার দেহে প্রাণ আছে ততদিন আমি দর্শন চর্চা ও দর্শন শিক্ষাদান থেকে বিরত হবোনা। কারণ আপনারা জেনে রাখুন আমার প্রতি এটিই ঈশ্বরের আদেশ; এবং আমি বিশ্বাস করি যে, আমি ঈশ্বরের আদেশ পালন করার কারণে রাষ্ট্রের যে অধিকতর কল্যাণ হয়েছে, সেরূপ কল্যান আর কখনো হয়নি।” তিনি আরো বলেন,

” আমি আপনাদের জানাতে চাই যদি আপনারা আমার মত একজন মানুষকে হত্যা করেন, তাহলে আমার যে পরিমাণ ক্ষতি হবে তার চেয়ে আপনাদের অধিক ক্ষতি হবে। কোন কিছুই আমার ক্ষতি করতে পারবে না। মেলিটাস আমার ক্ষতি করতে পারবে না, এনিটাস তো নয়ই। কারণ একজন ভালো মানুষের ক্ষতি করার ক্ষমতা ঈশ্বর দুষ্ট লোককে দেননি। দুষ্টলোক শুধু নিজেদেরই ক্ষতি করতে পারে। আমি অস্বীকার করিনা এনিটাস তার চেয়ে একজন ভালো মানুষকে হত্যা করতে পারে বা তাকে নির্বাসনে পাঠাতে পারে, বা রাষ্ট্রীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে; এবং সে কল্পনা করে, এরূপ করে সে তার যথেষ্ট ক্ষতি করেছে, অন্যরাও সেরূপ মনে করতে পারে। কিন্তু এ ব্যাপারে আমি তাদের সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করিনা। অন্যায়ভাবে একজনকে হত্যা করে সে নিজের যে পরিমান অকল্যান করবে তা নিহত ব্যক্তির অকল্যাণ থেকে অনেক বেশি।”

তিনি আরো বলেন, “তিনি একটি গো-মাছি (Gad-fly)। রাষ্ট্র নামক যন্ত্রের কাছে ঈশ্বর তাকে দান করেছেন, তার মত একজন ব্যক্তিকে পাওয়া সহজ হবে না। ‘আমি অনুমান করি আপনারা রাগান্বিত হতে পারেন। এবং এনিটাসের উপদেশ অনুসারে আমাকে হত্যা করে বাকী জীবন নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন। কিন্তু আমার স্থলে ঈশ্বর অন্য একটি গো-মাছি পাঠাতে পারেন।”

“আপনারা আমাকে বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন স্থানে এক দৈববাণী ও দৈব নিদর্শনের কথা বলতে শুনেছেন। এই দৈববাণী দেবতার নিকট থেকে আমার কাছে আসে, এবং এই দেবতাকে মেলিটাস তার অভিযোগপত্রে বিদ্রুপ করেছেন। আমি যখন শিশু ছিলাম তখন এই দৈব নিদর্শন, যা ছিল এজ ধরনের কন্ঠধ্বনী, আমার নিকট প্রথম আসা শুরু করে। এই দৈববাণী আমাকে অনেক কাজ করতে নিষেধ করেছে, কিন্তু কখনো কোন কাজ করতে নির্দেশ দেয়নি। এই দৈববাণীই আমাকে রাজনীতিবিদ হতে নিরুৎসাহিত করেছে। কোন সৎলোকই রাজনীতিতে বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনা।”

এভাবে তিনি প্রথমতঃ গণতন্ত্রের বিরোধিতা করেছিলেন, দ্বিতীয়ত, ত্রিশজন স্বৈরশাসকের বিরোধিতা করেছিলেন। এই দুটি ক্ষেত্রেই শাসকগণ অবৈধভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন বলেই তিনি এর বিরোধিতা করেন।

“হে আমার দোষ সাব্যস্তকারী ব্যক্তিগণ, আমি মৃত্যুকালে ব্যকুল চিত্তে তোমাদের নিকট ভবিষ্যদ্বানী করে যাচ্ছি, আমি মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছি, এবং মৃত্যুকালে মানুষ ভবিষ্যদ্বাণী করার সহজাত শক্তি অর্জন করে। আমার হত্যাকারীদের নিকট আমি ভবিষ্যদ্বাণী করে যাচ্ছি যে, তোমরা আমাকে যে শাস্তি দিলে, আমার মৃত্যুর পর তা অপেক্ষা গুরুতর শাস্তি তোমাদের অবশ্যই ভোগ করতে হবে। যদি তোমরা মনে কর মানুষকে হত্যা করে তোমরা তোমাদের অশুভ জীবনযাপনের সমালোচনা করা থেকে তাদের বিরত করতে পারবে, তবে তোমরা ভুল করবে; সমালোচনা থেকে মুক্তির পথ এটা নয়, এবং তা সম্ভবও নয় বা সম্মানজনকও নয়। সবচেয়ে সহজতম মহৎ উপায় হচ্ছে নিজেদের উন্নতিসাধন করা, অন্যকে আঘাত করা নয়।”

উপরিউক্ত বক্তব্য প্রদানের পর সক্রেটিস বিচারকদের মধ্যে যারা তাকে বেকসুর খালাস দেয়ার পক্ষে ভোট দেন, তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, অন্যান্য ঘটনায় দৈববাণী তাকে তার বক্তব্যের মাঝখানে থামিয়ে দিলেও সেদিনের বক্তব্য প্রদানের সময় দৈববাণী তার কোন বিরোধিতা করেন নি। “এই ঘটনা থেকে বুঝতে পেরেছি আমাকে যে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়েছে তা আমার মঙ্গলের জন্যই, এবং আমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুকে অশুভ বলে মনে করে তারা ভ্রান্ত ধারনা পোষন করে।’ কারণ হয় মৃত্যু স্বপ্নহীন নিদ্রা অথবা মৃত্যুতে আত্মা অন্য জগতে চলে যায়। মৃত্যু যদি স্বপ্নহীন নিদ্রা হয় তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই কল্যাণকর। আর যদি তা না হয়, মৃত্যুতে আত্মা অন্য জগতে চলে যায়, তাহলে তিনি ইতিপূর্বে গত জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করার সৌভাগ্য লাভ করবেন। “প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার অপরাধে পরলোকে কাউকে হত্যা করা হয়না, এবং নিশ্চিতভাবেই হত্যা করা হয়না। পরলোক সম্পর্কে যা বলা হয় তা যদি সত্য হয়, তাহলে পরলোকবাসীগণ আমাদের চেয়ে অধিকতর সুখী হওয়া ছাড়াও অমর হবেন।

‘বিদায়ের সময় উপস্থিত হয়েছে, এবং আমরা যে যার পথে চলে যাব — আমি মৃত্যুপথে তোমরা জীবনের পথে। কোন পথ অধিকতর উত্তম তা শুধু ঈশ্বরই জানেন।’

Apology-র শিক্ষাঃ
১। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অযোগ্য ব্যক্তিও শাসক হিসাবে নির্বাচিত হতে পারে।
২। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত শাসকও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর স্বৈরাচারী হয়ে দেখা দিতে পারে।
৩। একজন স্বৈরশাসক অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে নিজেরই অকল্যাণ করে।
৪। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রজ্ঞা ও দক্ষতা।

Ahmadiyya viewpoint

Mirza Tahir Ahmad (the fourth Caliph of the Ahmadiyya Muslim Community) argued in his book Revelation, Rationality, Knowledge & Truth that Socrates was a prophet of the ancient Greeks. The apparent prophetic qualities of Socrates are indeed a subject for debate. His constant reference to the oracle and how it performs the active function of a moral compass by preventing him from unseemly acts could easily be taken as a reference to – or substitute for revelation. Similarly, Socrates often refers to God in the singular as opposed to the plural and actively rejected the Greek pantheon of Gods and Goddesses unless citing them as examples of their falseness.

৬০৬ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র – ২”

    • বিশ্বের গনতন্ত্রীদের পথিকৃত দাবীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ক্ষমতার দাপটে অন্যকে কাবু করার অগনতান্ত্রিক হীনমন্যতায় আক্রান্ত । যুক্তরাষ্ট্রের গনতন্ত্রের এই যদি হয় নমুনা,তাহলে সেই গনতন্ত্রে শান্তি ও সমৃদ্ধির আশা করা দুরূহ বৈকি । তথাকথিত পাশ্চাত্যের ঠুনকো গনতন্ত্রের ধ্বজাধারীদের এত্থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত ।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।