গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র – ১

গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র – ১

গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দর্শন। কি এই গণতন্ত্র, কোথা থেকে এর উদ্ভব, এই দর্শন প্রতিষ্ঠার পিছনে কারা ছিলেন, বিশ্বের অতিত ইতিহাসে গণতন্ত্র কখন কেমন ছিল, কি করে তা রাষ্ট্রযন্ত্রে স্থান পেল, কতটুকু সফল এই রাজনৈতিক মতাদর্শ, এর বিকল্প কিছু আছে কিনা; বিভিন্ন জ্ঞানী, খ্যাতিমান, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি ও লেখকেরা এই মতাদর্শের পক্ষে ও বিপক্ষে কি বলেছেন বা লিখেছেন এই সম্পর্কে ধারাবাহিক লিখে যাব। আপনাদের গঠনমূলক মতামত কামনা করছি।

প্রথমে উল্লেখ করছি সুখ্যাত ভারতীয় লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ বইয়ের একটি অংশ:

আমাদের দেশের গ্রামে-গন্ঞ্জে, আধা মফস্বলে আমি ঘুরেছি অনেক। আমি দেখেছি বাধের উপর বসে থাকা বিষন্ন মানুষ, যার কোন কাজ নেই, পেটে ভাত নেই। দেখেছি খরায় বিবর্ণ ফসলের খেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিমর্ষ চাষীকে। বস্তির ধারে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলা করে ধুলোর মধ্যে । শহরের চৌরাস্তায় গাড়িগুলো থামলে শিশু কোলে নিয়ে ভিক্ষে চাইতে আসে জননী। পুরিষের পাত্র মাথায় করে নিয়ে যায় হরিজন। এরা যেন অনন্তকালের স্রোতে এক-একটি বিন্দু। কোনও পরিবর্তন নেই। আমাদের শৈশবে যেমন শিশুকোলে জননীকে ভিক্ষা করতে দেখেছি, আজও তাই দেখছি। গণতন্ত্র এই শিশু ও জননীকে মাথার উপর একটি আচ্ছাদন দিতে পারেনি, দিতে পারেনি একটি সম্মানজনক জীবিকা।কোন শিল্পী হয়তো সেই ভিখারিণীর মর্মন্তুদ ছবি আঁকেন, তার জন্য বাহবা পান, লেখা হয় কবিতা, মন্চস্থ হয় নাটক, তবু চৌরাস্তার মোড়ে শিশু কোলে জননীকে দেখতে পাওয়া যাবেই। ছোটবেলায় রাস্তার মুচিকে ঠিক যে অবস্থায় যে পোষাকে বসে থাকতে দেখতাম, এখনও তারা ঠিক সেরকমই রয়েছে। বাড়িতে ধাঙরেরা আসে খালি পায়ে, নেংটি পড়ে, আমাদের ঠাকুরদারা যেমন দেখেছিলেন আমরাও সেরকমই দেখছি। প্রতিদিন যে মানুষটি আসে তার নামও আমরা জানি না, ওরা সবাই ধাঙর বা মেথর। আফ্রিকার কেনিয়া শহরে আমি জুতো পায়ে মেথর দেখেছি, পরনে প্যান্ট-শার্ট। আমাদের এখানকার যেকোন ধনী কিংবা সাম্যবাদীর বাড়ির মেথরের একই রকম চেহারা। কাশী শহরে ভিখিরির লাইনের মধ্যে এক বৃদ্ধকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম, তার মুখে অজস্র আঁকিবুকি, সামনে হাত পেতে বসে সে ঘুমে ঢুলছে। আমার মনে হয়েছিল ঐ ভিখিরির বয়স আরাই হাজার বছর।গৌতম বুদ্ধ ওকে যেমন দেখেছিলেন, আমরাও সেই অবস্থাতেই দেখছি। কিছুই বদলাতে পারিনি।

এই গণতন্ত্র আমাদের কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে? কোন পথে আসবে সমস্ত মানুষের মুক্তি? নাকি সেই মুক্তি কোন দিনই আসবে না? তার আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী কিংবা মানব সভ্যতা? যদি মানব সভ্যতার বিনাশ হয়ই, তবে তা পরমাণু অস্ত্র বা বিষবাস্পে হবে না। হবে বন্ঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে।

(চলবে)

৭৬৮ বার দেখা হয়েছে

৭ টি মন্তব্য : “গণতন্ত্রের তন্ত্র-মন্ত্র – ১”

  1. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    তৃতীয়বিশ্বে বিশেষ করে এশিয়ায় গনতন্ত্রের রূপ দেখে আমারও এমনটা মনে হয়। এই একই বিষয়ে একটা লেখা শেষ করে আর পোস্ট করছি না। কারণ আমাদের মধ্যবিত্তরা মোটামুটি ব্রেন ওয়াশড। পশ্চিমে যেই তন্ত্রে কাজ দেয়, পুবের জন্য সেই একই তন্ত্র কার্যকরী কিনা সেটা ভেবে দেখার মতো মেধারা এখন বসে বসে কম্পিউটার প্রোগ্রাম করে। সমাজরতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রও পছন্দ নয়। কারণ বড্ড বেশি গলা চিপে ধরে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের। তবে পশ্চিমের মতো এখানে দলে গনতন্ত্রের চর্চা থাকলে সেটা মন্দের ভালো।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
  2. সাদিক (২০০০-২০০৬)

    আসলে আমি মনে করি তন্ত্র কোন ব্যাপার না আসল ব্যাপারটা হল টাকা আর ক্ষমতার লড়াই।কারণ মানুষের একটা সাধারণ প্রবৃত্তি হল টাকা আর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা।আমাদের এমন একটা সমাজ গঠন করতে হবে যেখানে টাকা রূপে সম্পদ রাখা যাবেনা।

    জবাব দিন
  3. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    কাশী শহরে ভিখিরির লাইনের মধ্যে এক বৃদ্ধকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম, তার মুখে অজস্র আঁকিবুকি, সামনে হাত পেতে বসে সে ঘুমে ঢুলছে। আমার মনে হয়েছিল ঐ ভিখিরির বয়স আরাই হাজার বছর।গৌতম বুদ্ধ ওকে যেমন দেখেছিলেন, আমরাও সেই অবস্থাতেই দেখছি। কিছুই বদলাতে পারিনি।

    কিছুই বদলাতে পারিনি।


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  4. ৭৮০

    মনে পড়ছে সেই উক্তির কথা, "গণতন্ত্র হচ্ছে মূর্খদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা'। আর একটি যুক্তির কথাও মনে আসছে (অন্য সূত্র থেকে উদ্ধৃত), কোন একটি দেশের ৫১ ভাগ লোক যদি একমত হয়, তারা বাকি ৪৯ ভাগ মানুষকে মেরে ফেলবে, সেটা ও হবে গণতন্ত্রে সিদ্ধ।"

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।