আহাম্মকদের দুনিয়া

১.

৩/৪ দিন আগের কথা,মল চত্বর থেকে বাসে উঠলে সীট পাওয়া যাবে এই আশায় টিএসসি থেকে মল চত্বরের উদ্দেশ্যে রিকশা নিলাম,তাড়াহুড়ায় খেয়াল করিনি,কিন্তু উঠে বসার পরেই খেয়াল করলাম রিকশাওয়ালার একটা হাতের কনুই পর্যন্ত নেই।আমি ছেলে খুবই খারাপ,তাই  একজন পঙ্গুলোক ভিক্ষা না করে খেঁটে খাচ্ছে,এই দৃশ্য আমার মধ্যে কোন মুগ্ধতা আনলো না,বরঞ্চ আনলো একরাশ বিরক্তি।পকেটে সবচেয়ে ছোট নোটটি ২০টাকার,ভাড়া ১০টাকা।এইলোক নিশ্চয়ই ভাড়া দেওয়ার সময় সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করবে।তার মানে খুচরা নেওয়া যাবে না,১০টাকা গচ্চা।যার সাথে ২টাকা যোগ করলে ডাকসু ক্যাফেটেরিয়াতে এক বোতল মাউন্টেইন ডিউ পাওয়া যায়,এইসব চিন্তা মাথায় ঘুরতে লাগলো।

যাইহোক,ঠিক করলাম সহানুভূতি দেখানোর চেষ্টা করবো না,যদি ইমোশনাল অত্যাচার করে,তাহলে খুব বেশি হলে ভাড়ার চেয়ে ৫টাকা বেশি দেবো,এর বেশি না।চেহারায় দুনিয়ার বিরক্তি নিয়ে আসলাম।নেমেই ২০টাকার নোট এগিয়ে দিলাম,কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই রিকশাওয়ালা চাচা কোন কথা না বলে ১০টাকার একটা নোট ফেরত দিলো।এরচেয়ে দ্বিগুণ অবাক হলাম, যখন দেখলাম তার একমাত্র কর্মক্ষম হাতের ৩টা আঙ্গুলই নেই।এরপরে ভাংতি ফেরত নেওয়ার মত মন-মানসিকতা আর ছিলো না।তাকে রাখতে বলে চলে আসলাম।এর বেশি কিছু বলার খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

২.

গত রোজার শেষের দিকের কথা।সবাই মিলে বাড়ি যাচ্ছি।গাড়ির সামনে আমি বসা,পিছনে বাকি সবাই।ঢাকা থেকেই বের হতে পারছিলাম না,ভয়াবহ জ্যাম।বসে বসে ঘড়ি দেখছি,ইফতারের অপেক্ষায়।গ্লাসে ঠকঠক শব্দ শুনে তাকিয়ে দেখি এক কমবয়সী ভিখারিনী।কোলে একটা বাচ্চা।কোন ধরনের শারীরিক অক্ষমতা নেই দুজনের কারোরই।হাত নেড়ে চলে যেতে বললাম।এরপরেও ঠকঠক করেই যাচ্ছে দেখে আম্মু তার সাইডের গ্লাস খুলে ডাক দিল মহিলাকে।”তুমি তো সুস্থ-সবল মানুষ,ভিক্ষা কর কেন।বাসায় কাজ করবা???”আম্মু কথা শেষ করার আগেই ভিখারীনি জোরে হেঁটে অন্য গাড়ির গ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে আবারো বাচ্চার জন্য ভিক্ষা চাওয়া শুরু করলো।

৩.

বাসার কাছেই গুলশান আজাদ মসজিদ।সাধারণত বাসায় থাকলে জুম্মার নামাজ ওইখানেই পড়ি।আজকেও হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি্লাম।সামনে এক ভদ্রলোক দেখি খুচরা টাকার বান্ডিল হাতে নিয়ে যাচ্ছেন।প্রায় ২০/৩০জন অন্ধ/পঙ্গু/শিশু/মহিলা/বৃদ্ধ ভিখারী চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে তাকে।কিন্তু লোকটার ধৈর্য অসীম।খুঁজে খুঁজে সত্যিকারের অক্ষম ভিক্ষুকদের হাতে গুঁজে দিলেন টাকা।একজনও কর্মক্ষম মহিলা ভিখারী তার বান্ডিলের একটা নোট পেলো না।

৪.

আমার একটা স্টুডেন্ট আছে,বনানীর ১০ নাম্বার রোডে বাসা।সপ্তাহে ৩দিন আধাঘন্টা করে অঙ্ক করাই।ভার্সিটির উত্তরা রুটের বাসে উঠি,সৈনিক ক্লাবের সামনে নেমে রাস্তা পার হয়ে বনানী ১১ নাম্বার রোড ধরে হেঁটে হেঁটে চলে যাই ছাত্রের বাসায়।এমনই একদিন রাস্তা পার হতে যেয়ে দেখি ডিভাইডারগুলো দিয়ে পার হওয়ার উপায় নেই।সেখানে নাম না জানা কিছু গাছ লাগানো আর সেগুলো গ্রিল দিয়ে ঘেরা।বহু কসরত করে একটা ফুটো দিয়ে বের হলাম।হঠাত এই অদ্ভুত জায়গায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচীর কারণ মাথায় ঢুকছিলো না।তার ২/১ দিন পরে পেপারে দেখলাম প্রায় ১৫০কোটি টাকা খরচ করে ঢাকা শহরের সৌন্দর্যবর্ধন করা হচ্ছে,টি-২০ বিশ্বকাপ উপলক্ষে।ওই বৃক্ষরোপণ,সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির একটা অংশ ছিলো।

এইখানে আমার একটা প্রশ্ন আছে।এই সৌন্দর্য কাদের দেখাতে চাই আমরা??? ৪টা অপশন আছে আমাদের হাতে,

১.দেশের জনগণ

২.স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে

৩.বিদেশী খেলোয়াড়দের

৪.বিশ্বকাপ উপলক্ষে আগত ট্যুরিস্ট ও সাংবাদিকদের।

১ম অপশন অবান্তর,স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো খেলা ছাড়া অন্য কিছুই দেখায় না বাংলাদেশের,প্রায় দুইশ বিদেশী খেলোয়াড়কে দেখাতে এত টাকা খরচ করবে,সরকারকে এতবড় আহাম্মক ভাবার কারণ নেই।বাদ থাকলো ৪নং অপশন।সরকার যদি বিদেশী সাংবাদিক ও ট্যুরিস্টদের জন্য রাস্তাঘাটের এই উন্নতি করে থাকে,তাহলে আমার জিজ্ঞাসা,জ্যামে ট্যুরিস্টদের গাড়ি থামলে,কিংবা তাঁরা রাস্তায় বের হলে যখন তাদের ছেঁকে ধরবে ভিক্ষুকরা,সেইটা দেশের কতখানি সৌন্দর্যবর্ধন করবে???বিশেষ করে বিদেশীদের হাতে ক্যামেরা থাকলেই তাঁরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় ভুখা-ফাকা মানুষের ছবি তুলতে ভালোবাসে।এমন ১টা ছবিই কি এই ১৫০কোটি টাকার সৌন্দর্য ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে না???আরো ভালো কোন কাজে কি এইটাকা ব্যয় করা যায় না???যেমন পথশিশুদের জন্য শিক্ষা,কিংবা অক্ষমদের জন্য আশ্রম???

৬৪৬ বার দেখা হয়েছে

৫ টি মন্তব্য : “আহাম্মকদের দুনিয়া”

  1. মাহমুদুল (২০০০-০৬)

    বাংলাদেশে একটা কথা বেশ প্রচলিত। সরকারি মাল দরিয়ামে ঢাল। সরকারি লোকজন মনে হয় এইটারে কোরানের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে।

    ত্রান আর উন্নয়ন এই দুই খাতের হিসাব কোনদিন পাওয়া যায় না।


    মানুষ* হতে চাই। *শর্ত প্রযোজ্য

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।