শিক্ষকের ডায়রিঃ পর্ব-৬

লেখালেখিতে সাহিত্যচর্চা বনাম বানিজ্যিক চিন্তাভাবনা

সোশাল মিডিয়ায় কিছুদিন আগে আমার ক্যাডেট কলেজের বেশ কয়েক বছরের এক বড় ভাইয়ের (সিনিয়র ক্যাডেট) “লেখালেখি” এবং “ছাপানো লেখা/বই বিক্রি করা” নিয়ে একটা রম্য ক্রিটিসিজম পড়েছিলাম। সেই সিনিয়রের লেখার বিষয়বস্তুটা আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হওয়াতে সেখানে মন্তব্য করতে গিয়ে দেখি সেটাও বেশ খানিকটা বড় আকার নিয়ে ফেলেছে। অবশ্য এমনটা এবারেই প্রথম নয়; কারো লেখার বিষয় বা উপস্থাপন কোনভাবে ভাবনাগুলোকে স্টিমুলেট করে ফেললে তাতে মন্তব্য এবং পাল্টা-মন্তব্য বেশ ইন্টারেস্টিংভাবেই চলতে থাকে; নিত্য নতুন চিন্তার খোরাক চলে আসে। সেই লেখাটাতে মন্তব্য করতে গিয়ে যে বিষয়গুলো মাথায় ঘুরপাক খেয়েছিল, সেগুলোই এখানে সাজানোর চেষ্টা করছি।

আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, নিজেই লিখে, নিজেই ছাপিয়ে, বিক্রি করার চেয়ে বরং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষ হয়ে প্রকাশকের কন্ট্রাক্ট নিয়ে কাজ করা শ্রেয়। আমার দৃষ্টিতে, এতে অন্ততঃ লেখাটাকে গোছানো, তাতে ফিনিশিং টাচ দেয়া, ছাপানো, প্রেসে বসে এডিটিং, প্রুফ-রিডিং, এরপরে বুক-বাইন্ডিং এবং অন্যন্য সমন্বয় শেষ করে তারপরে সেটাকে বিক্রি করা বা বাজারে চালানো, এতগুলো “চেইন অফ টেনশন” নিতে হয় না; আবার ছাপানো লেখা বা বই বিক্রি হবে কিনা, বা কত কপি বাজারে চলবে, সেটাও তো আরেক টেনশন।

তবে আমার কাছে এটাও মনে হয়, কেউ যদি শুধুমাত্র লেখক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে চান, কিংবা লেখালেখি যদি কারো নেশা হয়ে থাকে, তাহলে তাকে শুধুই তার লেখা এবং লেখালেখির চিন্তার জগতেই ফোকাসড হয়ে থাকা উচিত। সেখানে উপার্জনের বিষয়টা না টানাই শ্রেয়, কারন সেটা বানিজ্যিক টার্গেটের বিষয়। নাম কুড়াতে চাইলে, কিংবা লেখালেখিতে নেশাগ্রস্থ হলে, প্রয়োজনে (আমি এখানে “প্রয়োজনে” শব্দটাতে জোর দিচ্ছি) লেখক তার লেখা ফ্রি-তে ডিস্ট্রিবিউট করবেন (সেটা ছাপানো নাও হতে পারে), যেন পাঠক সমাজ খুব সহজেই তার লেখা পড়ে ফেলতে পারেন। বর্তমান সময়ে কোন লেখা/বইয়ের পিডিএফ সফট-কপি একটা ভাল অপশন। আর নিজের মনের আনন্দের জন্য লেখক কিছু হার্ড-কপি ছাপাতে পারেন; আর এক্ষেত্রে, ধরে নেয়াই যায় যে, এ কাজটাও লেখককে নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করেই করতে হবে।

আবার কেউ যদি শুধু অর্থপ্রাপ্তির জন্য লিখে, ছাপিয়ে, বিক্রি করতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই বাজারের চাহিদা অনুযায়ীই লিখতে হবে, এবং সেক্ষেত্রে লেখার মান নিচে নামাতে হলে নামাতেও হবে; কারন “ক্লাস” এবং “পপুলারিটি” এই দুইয়ের সমন্বয় বড়ই বিরল। আমার ক্ষুদ্র-চিন্তা এটাই বলে যে, “ক্লাসি” হওয়া যায়/যাবে সীমিত পাঠকের কাছে, আর “পপুলারিটি” বা বানিজ্যিকভাবে কাটতি হবে আমজনতার চাহিদার বিচারে (আমজনতার ভাল লাগা বা না লাগায়)। আর আমজনতা সবাই “বোদ্ধা পাঠক” হবেন, এটা লেখালেখিতে নেশাগ্রস্থ কোন লেখকের চিন্তায় না আসাই শ্রেয়।

কালজয়ী লেখকরা মনে তো হয় না যে, তাঁদের কালোত্তীর্ণ লেখাগুলো (তা সে একটা/দুটো লেখার জন্য হলেও) কেবলমাত্র বানিজ্যিক কারনে বা ব্যাপক বিক্রির উদ্দেশ্যে লিখেছেন/লিখেছিলেন। মনে রাখার মতন লেখা, আর বানিজ্যিকভাবে সফলতা পাওয়ার মতন লেখা, এ’দুটো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এক ছিল না, এবং তা হবার কথাও না। আমার সীমিত জ্ঞান বলে, খুব সম্ভবতঃ, কোন “ক্লাসি” লেখা খুব কম লেখকের জীবদ্দশাতেই আমজনতার কাছে “পপুলার” হয়েছে/হয়েছিল, আর যদি এমন লেখা বা ছাপানো বই লেখকের জীবদ্দশাতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েও যায়/থাকে, খুব সম্ভবতঃ সেটা একটা নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে/ছিল। কাজেই এ’দুটো বিষয়কে মিশিয়ে ফেলা, অন্ততঃ আমার হিসেবে, একজন লেখকের জন্য হতাশা বয়ে আনতে পারে, আর্থিক এবং মানসিক, উভয় দিক থেকেই।

যদিও আমি নিজে কোন লেখক নই, তবে ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তীতে দেড় যুগেরও বেশি সময় জুড়ে অনার্স-মাস্টার্স লেভেলে পড়িয়ে এটুকু অন্ততঃ বুঝেছি যে, একটা লেখা বা বইয়ের ভাষাগত উপস্থাপনে তীব্র সাময়িক আকর্ষণ থাকলেও তা সময়ের বিচারে সর্বক্ষেত্রে কালোত্তীর্ণ নাও হতে পারে। এখানে ইমোশনাল হয়ে মন খারাপ করার কিছুই নেই। “নাম” চাইলে “মানের” দিকে ফোকাস করতে হবে, আর লেখালেখিতে বানিজ্যিক বিষয়কে প্রাধান্য দেবার ক্ষেত্রে যারা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে লেখা/বই কিনবেন, তাদের চাহিদার কথা চিন্তা করেই লিখতে হবে। “আমার লেভেল উঁচুতে, আর পাঠক তার লেভেল উন্নত করে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে আমার লেখা/বই সবসময় কিনে পড়বেন” – এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই মনে হয় কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক। আর কেউ যদি নিজের লেখার “মান” কিংবা “জনপ্রিয়তা” যাচাই করতে চান, তাহলে লেখা (সাহিত্য) উন্মুক্ত থাকুক; “কোন শ্রেনির পাঠক” সেটা পড়ছেন এবং “কাদের হাতে হাতে” (স্ক্রীন টু স্ক্রীন) বা “কোন গন্ডির মধ্যে” সেই লেখা/বই (সাহিত্য) শেয়ার্ড হচ্ছে সেটা তো সময়ই বলে দেবার কথা।

২৫৫ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “শিক্ষকের ডায়রিঃ পর্ব-৬”

  1. কাজী আব্দুল্লাহ-আল-মামুন (১৯৮৫-১৯৯১)

    তোমার সুন্দর আলোচনা, বাস্তববাদী পর্যালোচনা, লেখক-পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পড়ে/জেনে উপকৃত হলাম।

    প্রত্নতত্ত্ব বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব আমার আগ্রহের বিষয়। আমার এমেচার টাইপ গবেষণা, সংগ্রহ করা তথ্য-উপাত্ত, হারিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার পথে এমন নিদর্শনগুলোকে ধরে রাখার জন্য সখ করে একটু আধটু লেখার চেস্টা করি। পরিশ্রমলব্ধ এই কাজটি করতে গিয়ে মাঝে মাঝে হতাশ হই যখন দেখি এই বিষয়ে পাঠকের সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা - বেশীর ভাগই গল্পটা শুনতে চান কিন্তু পড়তে চান না….. আমার আসলে কি করা উচিত?

    জবাব দিন
    • আহমদ (৮৮-৯৪)

      ভাইয়া, অসংখ্য ধন্যবাদ, এমন সুন্দর একটা মন্তব্যের জন্য।

      আসলে যিনি পাঠক, তিনি পড়বেন, তা সে বই/লেখা কিনেই হোক আর যেভাবেই হোক। আর যিনি পাঠক নন, তাকে বিনামূল্যে হাতে তুলে দেয়া হলেও সেটা আর পড়া হবে না। নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি, আমার ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে। অনেকেই হয়তো ছাপানো বইয়ের একটা কপি আমাকে দিয়েছেন, আর আগ্রহের মিল না থাকাতে সেটা আমার বইয়ের তাকেই কেবল রয়ে গেছে। আবার এমনও ঘটেছে, কারো বইয়ের ছাপানো সংখ্যা শেষ হয়ে গেছে, লেখককে ধরেও কোন কপি যোগাড় করতে পারছি না; তখন লেখক আমার আগ্রহ দেখে পিডিএফ সফট কপিটাই পাঠিয়ে দিয়েছেন, আর আমি সেটা গোগ্রাসে গিলেছি।

      একজন সাধারন পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিতে বলতে পারি যে, এগুলো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর এগুলো নিয়ে প্রকৃত লেখক মানসের অত বেশি চিন্তার দরকারই নেই, তাতে বরং লেখার মানের ক্ষতি হইয়ে যেতে পারে। লেখা মানসম্মত হলে, কোন না কোন সময়, কোন না কোন পাঠক সমাজ তা পড়বে; আর এটা কিন্তু লেখকের খাতায় একটা প্রাপ্তি বটে।


      চ্যারিটি বিগিনস এট হোম

      জবাব দিন
  2. টিটো মোস্তাফিজ

    চমৎকার বিশ্লেষণ। লেখক প্রসঙ্গে তোমার বক্তব্যের সাথে একমত।
    বাংলাদেশে প্রকাশক আর ছাপাখানার মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা কিন্তু ভাবার বিষয়।


    পুরাদস্তুর বাঙ্গাল

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।