শিক্ষকের ডায়রিঃ পর্ব-৫

ইংরেজি শেখার এবং শেখানোর ব্যার্থতা

আজ সকালে অন্য ক্যাডেট কলেজের এক বড় ভাইয়ের (সিনিয়র ক্যাডেট) একটা লেখায় পড়লাম, চাকরির ইন্টারভিউয়ের লিখিত পরীক্ষায় ২০ জন স্নাতক/স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারি চাকরিপ্ররার্থীকে ১০০ শব্দের মধ্যে ইংরেজিতে নিজের সম্পর্কে প্যারাগ্রাফ লিখতে দেয়া হলে, তাদের কেউই ৩৩% নম্বর অর্জন করতে পারেনি। সেই লেখায় মন্তব্যের ঘরে আমার দেড় যুগেরও বেশি সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা লিখেছিলাম। এই লেখায় সেই কথাগুলোকেই কিছুটা সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি।

ইংরেজি কিংবা যে কোন ভাষা শুধুমাত্র পড়ে এবং লিখে (শুধুই রিডিং এবং রাইটিং চর্চার মাধ্যমে), তাও আবার কেবলমাত্র শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের তাগিদে বা চাপে, বেঁধে দেয়া নির্ধারিত স্বল্প সময়ের মধ্যে, কারো পক্ষেই শেখা কিংবা আয়ত্ব করা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না তা প্রতিনিয়ত অরাল প্র্যাক্টিসে থাকছে। কেবলমাত্র রেগুলার এবং ফ্রিকুয়েন্ট অরাল প্র্যাক্টিসের (লিসনিং ও স্পিকিং) মধ্য দিয়েই একটা ভাষা ইনিশিয়াল লার্নারদের কাছে কন্সেপচুয়ালাইজড হতে পারে। আর যতক্ষণ না তা কন্সেপচুয়ালাইজড হচ্ছে, ততক্ষণ ভাষা শেখা এবং শেখানো দুটোই বোর্ড-এক্সাম পর্যন্ত ঠেলে-ঠুলে নিয়ে যাবার মতন একটা বিষয় হিসেবেই থেকে যায়, এবং স্বাভাবিকভাবেই, এই সামান্য শেখা অংশের অনেক কিছুই আবার এর পরের স্টেজগুলোতে গিয়ে সেই লার্নারেরা ভুলে যায়। স্কুল-কলেজের গন্ডির পরে স্নাতক/স্নাতকোত্তরের মতন পর্যায়ে এসে আগের অর্জনকে কেবল ঘষামাজা করা যেতে পারে; হাতেগোনা কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া, এর বেশি উন্নতি কার্যতঃ খুব একটা সম্ভবপর হয় না।

আমি নিজে এবং আমার মতন (আমাদের সময়ের) ক্যাডেট-রা সকলেই বাংলা মিডিয়ামেরই প্রডাক্ট, তাও আবার গ্রামার-ট্রান্সলেশন মেথডের। বোর্ডের সিলেবাস/কারিকুলামের বাইরে, ক্যাডেট কলেজের নিয়ম অনুযায়ি, ইংরেজির মৌখিক চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতাই আমাদেরকে একটা অরাল সিস্টেমে/চর্চায় রেখেছিল, আর সে কারনেই আমাদের সেই সময়ের এবং সেই সিচুয়েশনের ইংরেজির পরীক্ষার খাতায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া বন্ধুরাও কিন্তু তাদের ইংরেজির বেসিক কন্সেপচুয়ালাইজেশনের সুবিধায় থাকার কারনে বর্তমানে তারা প্রায় সকলেই ইংরেজিতে যথেষ্ট গ্রহনযোগ্য অবস্থানে থেকে বেশ ভালভাবেই কাজ চালিয়ে নিতে পারছে।

আবার বর্তমান প্রেক্ষাপটে, সি.এল.টি. মেথডের এপ্লিকেশনে, ইংরেজি শেখা তো ভালই হবার কথা ছিল; কিন্তু সার্বিকভাবে, সত্যিকারের কমিউনিকেশন শেখানো (যেটা কিনা অরাল এ্যাপ্রচে হবার কথা) এবং ছাত্রদের টেস্ট (বোর্ড-এক্সাম) দুটোই রিটেন এপ্রোচে হবার কারনে সেখানেও টিচিং-লার্নিং টার্গেট মারাত্মকভাবে ফেইল করছে; বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাদে, যেগুলোতে আগের মেথডের (জি.টি.এম.-এর) রিটেন এপ্রোচের সময়েও অরাল কমিউনিকেশনের উপরে জোর দেয়া হতো এবং সেই প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এখনো সেটাই চর্চা করছে।

আমি মনে করি, কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব উদ্যোগ (বোর্ডের বেঁধে দেয়া সিলেবাস বা কারিকুলামের বাইরে) এবং সেই সাথে পারিবারিক লেভেলে কিছু প্রচেষ্টা, এই দুইয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবেই বর্তমান সিচুয়েশনে কিছু ছাত্র পরবর্তীতে বাস্তব জীবনে গ্রহনযোগ্য এবং ভাল মানের ইংরেজি ভাষা-জ্ঞান (কন্সেপ্ট) দিয়ে মোটামুটিভাবে গ্রহনযোগ্য ইংরেজিতে কাজ চালিয়ে নিতে পারছে। আর অপেক্ষাকৃত বড় অংশের ছাত্ররা ইংরেজি নিয়ে আসলেই বড় রকমের সমস্যায় আছে; সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, অনেকে হয়তো বুঝতেই পারছে না যে, নিজের ইংরেজিটা আসলে কতটা দূর্বল পর্যায়ে রয়ে গেছে।

পরিশেষে আরেকটা কথা বলতেই হচ্ছে, শর্ট-কাট রাস্তায় কোন ভাষাই শেখা যায় না; বিদেশি কোন ভাষা তো নয়ই, এমনকি মাতৃভাষাও না।

৩২১ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “শিক্ষকের ডায়রিঃ পর্ব-৫”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।