একটি নিঃস্বার্থ মৃত্যু এবং আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

আমার জীবনের প্রথম লেখা, সত্য একটা ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। এখানে কোনোকিছুই কাল্পনিক অথবা অতিরঞ্জিত নয়।
একটি বিষয়ে প্রথমেই বলে রাখা দরকার, বিষয়টি হচ্ছে – লেখার ভিতরে হয়তো অনেক ভুল পাবেন, আশা করি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। লেখাটি আমার খুব প্রিয় বন্ধু জহির কে নিয়ে।

২১মে, ১৯৯২, চট্টগ্রাম
আমরা ৫৬ জন ১১-১২ বছর বয়সী দুরন্ত ছেলে এক অচেনা জায়গায় একত্রিত হলাম। জায়গাটা হোল ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ। একদিকে বাবা মা কে ছেড়ে আশার কষ্ট আর অন্যদিকে, এক অন্যরকম ভালোলাগা। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ছিল অন্যরকম। আমার বাবাও এইখানে লেখাপড়া করেছেন ১৯৬২-১৯৬৮ পর্যন্ত। আর আমি ৩০ বছর পর ঐ একই জায়গায়, ভালোলাগার পরিমাণটা যেন বেশি ছিল আমার কাছে।
ক্লাস শুরু হবার পর একে একে সকলের সাথে পরিচয় হলো। ঠিক ১৮ দিন পর ছিল আমাদের প্রথম ছুটি, ৮ই জুন। ট্রেন এ ঢাকা যাওয়া। দেখলাম একটা ছেলে খুব চুপচাপ বসে আছে, খুব কম কথা বলে, কিন্তু ভালো শ্রোতা। ছেলেটির নাম জহির। জহির অন্য হাউসে ছিল এবং ক্লাস এ অন্য ফর্মে হবার কারণে, আগে তেমন একটা কথা হয়নি।

জহির ছিল চুপচাপ, শান্তশিষ্ট – বেশির ভাগ সিনিয়র তাকে খুব পছন্দ করত। আন্তঃ-হাউস কুরআন তেলোয়াত প্রতিযোগিতাতে অংশগ্রহণ করত, খুব ভালো সাতারও কাটত। তার পছন্দের খেলা ছিল ভলিবল।
প্রথম থেকেই আমি ছিলাম বাঁদর প্রকৃতির, সবসময় সিনিয়রদের ডলাডলির উপরেই থাকতাম। এই কারণে, জুনিয়র লাইফ এ তার সাথে তেমন সখ্যতা গড়ে উঠেনি।

১৯৯৬, ম্যাট্রিক পরীক্ষা
পরীক্ষার পর ৩ মাসের ছুটি। আমরা সবাই এখন নিজেদের বেশ বড় মনে করি। তাই মাঝে মাঝে বন্ধুদের বাসায় সবাই একত্রে যাই। জহির থাকতো গাজীপুরে, আর আমি উত্তরা তে। তখন মোবাইল এর যুগ ছিলোনা, টিএনটি ল্যান্ড ফোনে তার সাথে কথা হতো। এই ছুটিতেই তার সাথে আমার সখ্যতা গড়ে উঠলো। যখন শহরে যেতাম (আগে উত্তরাবাসি বলত, শহরে যাব, তখন উত্তরা শহরের বাইরে ছিল), আমি আর ও একসাথে যেতাম।

১৯৯৭-৯৮
ক্লাস ১১ আর ১২ এ আমাদের খুব আড্ডা চলতো। সম্পূর্ণ ক্লাসই জহির কে খুব পছন্দ করতো তার অমায়িক ব্যাবহারের জন্য। ঐ সময়, আমাদের অনেকে ধূমপান করা শুরু করে, কিন্তু আমি জীবনে কখনও জহিরকে ধূমপান করতে দেখি নাই। সে আড্ডাতে থাকতো কিন্তু কখনও ধূমপান করতো না। নামাযের সময় হলে বলতো, দোস্তরা আমি যাচ্ছি নামায পড়তে, তোরা কেউ আসবি? কেউ কেউ যেত, আর কেউ কেউ বসে থাকতো।

১৯৯৮-৯৯
আমরা সবাই খুব ব্যস্ত। নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবন গড়া নিয়ে। কোচিং এ ভর্তি, ফর্ম তোলা, এখন আর আমাদের আড্ডা হয় না। কেউ সেনাবাহিনী, কেউ বিমানবাহিনী, কেউ নৌবাহিনী তে যোগদান করলো। আমি চলে গেলাম মেরিন একাডেমীতে। জহির হাওয়া হয়ে গেলো। কেউ জানেনা তার খবর।

২০০১-২০০২
একাডেমী থেকে পাশ করার পর জানতে পারলাম জহির, ঢাকা ভার্সিটিতে লেখাপড়া করছে। আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হয়, আড্ডা হয়। মার্চ মাসে আমি জাহাজে চলে গেলাম, নামলাম সেপ্টেম্বরে। আবার চলে গেলাম ডিসেম্বর ২০০১ এ আর আসলাম ডিসেম্বর ২০০২. তখনও সবার কাছে মোবাইল ছিলোনা।

২০০৩-২০০৭
২০০৩ এ একবার গাজীপুরে গেলাম। আমি পৌঁছে দেখি, সে দেখি আমার জন্য দাড়িয়ে আছে। ওর সাথে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। এরপর আমি দেশে খুব কমই ছিলাম। বেশিরভাগ সময় জাহাজে থাকতাম।

২০০৭ জুন
এই দীর্ঘ পুরাটা সময় জুড়েই জহির এর সাথে বরাবর যোগাযোগ ছিল আমার। তখন আমি সিঙ্গাপুর এ আমার প্রফেশনাল পরীক্ষা দিতে গিয়েছি। একদিন জহির ফোন করলো, অনেকক্ষণ কথা হোল। জানালো সে ২০০৮ এ বিয়ে করবে তার পছন্দের মেয়েকে। আরও বলল, দোস্ত সবার আগে আমি তোকে আমার বিয়ের দাওয়াত দিলাম, ঐ সময় তুই অবশ্যই দেশে থাকবি।

ফেব্রুয়ারি ২০০৮
আমি তখন দেশে। পরীক্ষা শেষ করে ১ মাসের মতো হোল দেশে এসেছি।
১০ তারিখে জহির ফোন দিল আমাকে।
দোস্ত বইমেলায় যাবি?
দোস্ত তোদের ভার্সিটি এলাকায় যেতে আমার ভয় লাগে।
কেনও? কি হয়েছে?
ছাত্ররা আজকাল লেখাপড়া করার চাইতে গাড়ি ভাঙতে বেশি পছন্দ করে।
আরে কিচ্ছু হবেনা, চল যাই।
কবে যাবি?
১২ তারিখে, তোর হবু ভাবি’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো, তোর তো কোন ঠিক নাই, কখন আবার জাহাজে চলে যাবি !!
আমি বললাম দোস্ত, আমি বইমেলা তে যাব না। তোরা দুইজন চলে যা, আমি জাহাজে যাওয়ার আগে তোদের সাথে দেখা করে নিব।

এই ছিল জহির এর সাথে আমার শেষ কথা। কখনও ভাবিনি, না বলে এইভাবে ও চলে যাবে।

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৮
আমি সাধারণতও ঘুমানোর আগে মোবাইল সাইলেন্ট করে দেই। ১২ তারিখ রাতে খুব সম্ভবত রাত ১১:৩০ দিকে শুতে গেলাম। সারারাতে অনেকবার মোবাইল ভাইব্রেট করলো, আমি কোন পাত্তা দিলাম না। সকাল ৮:৩০ মিনিটে দেখি আবার ভাইব্রেট করছে। আমাদের এক বন্ধু ফোন দিলো,
দোস্ত, জহির নাই, এই বলে আর কিছু বলতে পারে না।
দেখি বেশ কিছু এসএমএস, একি কথা, জহির আর নাই।
জহির এর মোবাইল এ ফোন দিলাম, ফোন বন্ধ।
আমি কয়েকজন কে ফোন দিলাম। সবার একি কথা, দোস্ত অমুক থেকে জেনেছি, কিন্তু জহির এর মোবাইল এ ফোন যাচ্ছে না। এই খবর প্রথম কে পেয়েছে, কেউ বলতে পারে না।
মোবাইল সহজলভ্য হবার পর থেকে জাহির এর বাসার ল্যান্ড ফোন নম্বর আমার কাছে নেই।

এইসময় আমাদের আরেক বন্ধু আমাকে ফোন দিলো, সে বললো যে, খবর সত্য, জহির আর নাই। সে জহির এর এক সহকর্মী কে ফোন দিয়ে খবরের সত্যতা পেয়েছে।

আমি বললাম, দোস্ত যেটাই হোক। আমরা সবাই যাবো। আমি উত্তরা’র ওয়ারিদ অফিসে যাচ্ছি। ফোন এ সব জানাবো। আর তোরা সবাই উত্তরা রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স এর সামনে চলে আয়।
উত্তরা ওয়ারিদ অফিস যাওয়ার পর, ওনারা বলল খবর সত্য। জহিরের বাসা ওয়ারিদ অফিসে কর্মরত একজন ড্রাইভার চিনে, এইখান থেকে ১০:৩০ এ সবাই রওনা দিবে।
সব বন্ধুদের ফোনে বললাম ঘটনা, সবাই যাতে রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স এর সামনে সময় মতো চলে আসে।
১৯৯৬ তে ঠিক এইভাবে সবাই একত্রিত হতাম, জাহির একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করতো। আমরা গাজীপুর যেতাম, সারাদিন সবাই হইচই করতাম। এখন কিনা তাকে শেষ বিদায় জানাতে একইভাবে যাচ্ছি!!!!!!!!!!!!

১১:০০ মধ্যে সবাই এসে গেলো। আমরা আমাদের গাড়ি নিয়ে ওয়ারিদ এর মাইক্রো-বাস এর পিছন পিছন যাচ্ছি।

জহিরের বাসায় পোঁছালাম। খাটিয়াতে জহিরকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। কাফন সরিয়ে যখন ওর মুখটা দেখলাম, মনে হচ্ছে যেন আমাদের জহির ঘুমের মধ্যে মিটিমিটি করে হাসছে। গাজীপুরের ছায়াবীথি তে ওদের বাসা। ওর ছোট একটা ভাই আর একটা বোন। জহির সবার বড়। ওর বাবা মা আমাদের সবাইকে কম বেশি চিনে। বোন কে জিজ্ঞেস করলাম, আপু কি করে এইসব হলো? তার উত্তর শুনে আমরা কেউই কিছু বলতে পারলাম না। সবাই যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

ঘটনাটি ছিলো, ১২ তারিখে বইমেলা তে গিয়েছিল জহির। জহির ছিলো ভালো স্বাস্থ্য’র অধিকারী, একটু মোটা আর উচালম্বা। কখনও খারাপ কোন অভ্যাস ছিলোনা। সবসময় ঠিক মতো নামায পড়তো, বাসায় থাকলে মসজিদ এ যেতো, কোন ধরনের রাজনীতি’র সাথে তার সম্পৃক্ততা ছিলও না।

বইমেলাতে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি দেখে, রক্ত দিতে গেলো। জহিরের শরীর থেকে রক্ত নেয়া উচিৎ হবে কিনা, এই ধরনের কোন পরীক্ষা করা হলোনা। সাধারণত রক্ত নেবার আগে, প্রেশার এবং ওজন নেয়া হয়। কারণ রক্তদাতা যদি রক্ত দেবার পর নিজেই অসুস্থ হয়ে যায়, তখন অন্য সমস্যা। কিন্তু বইমেলাতে এই ধরনের কোন কিছুই পরীক্ষা করেনি।

রক্তদান করার পরে থেকেই ওর খারাপ লাগছিলো। একবন্ধু কে বললো, আমাকে বাসা পর্যন্ত পৌছায় দে। যখন এয়ারপোর্ট পার হচ্ছে, তখন প্রথম বমি করলো। বাসায় আসলো রাত ৯ তার সময়। এসে খারাপ লাগার কথা বাসার সবাইকে বললো। ডাক্তার এসে কিছু ঔষধ দিলো। রাত ১০৩০ এ ঘুমাতে গেলো। এরপর রাত ২ টার সময় তাঁর রক্তবমি শুরু হলো, এম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় পানি খেলো, এরপর শেষ। হাসপাতালে যখন পোঁছালও, জাহির আর এই দুনিয়া তে নেই।

জহির হয়তো চিন্তা করেছিলো, তার দেয়া রক্ত কারো জীবন বাঁচাবে। কিন্তু অন্য কারো সামান্য ভুলের জন্য তার জীবন চলে গেলো। কোন ডাক্তার ঐসব রক্তদান প্যান্ড্যালে থাকে কিনা, তা আমার জানা নেই। ঐখানে যদি প্রফেশনাল ডাক্তার থাকতো, নিশ্চয়ই তাঁর ওজন এবং প্রেশার সবার আগে পরীক্ষা করতো, জিজ্ঞাসা করতো, সর্বশেষ কবে রক্ত দিয়েছিলো? সব ঠিক থাকলে তারপর হয়তো রক্ত নিতো।

পড়ে শুনেছি, ঐসব মেলাতে সাধারণতও ইন্টার্নই ডাক্তার থাকে!!!!!!!
অবশ্য প্রশ্নপত্র কিনে যেসব ডাক্তার পরীক্ষা পাস করে, ঐ ধরনের ডাক্তার থেকে এটা আশা করাও চরম ভুলই হবে।

এরপর নিজে নিজে ঠিক করলাম কখনও রক্তদান করবো না, কিন্তু অগাস্ট ২০১২ এ, আমি নিজের কাছে করা এই প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ফেললাম।

আমার বাবার হার্ট এ রিং পরানো হলো। আল্লাহ’র কাছে হাজার শোকর, চেকআপ করতে গিয়ে দেখলাম ব্লক। রিং পরানোর পড়ে যখন বাবাকে ওটি থেকে বের করছিলো, একটা ঘোষণা শুনলাম। ছোট্ট একটা বাচ্চার জন্য ও+ রক্ত দরকার।
আমার কি হলো, আমি নিজেও জানিনা, আমার মা’কে বললাম, তোমরা কেবিনে যাও, আমি আসছি। নিচে গিয়ে খোঁজ করে বের করলাম কার রক্ত দরকার। জানতে পারলাম একটা ছোট্ট ৩ বছরের বাচ্চার রক্ত লাগবে। ডাক্তার আমার ওজন এবং প্রেশার মেপে দেখলো, কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো। এরপর ওরা আমার রক্ত পরীক্ষা করে দেখলো যে, আমার রক্তের সাথে বাচ্চার রক্ত ম্যাচিং হয়। আমি রক্তদান করলাম।

এটা একটা অন্য রকমের অনুভূতি ছিলো। জহির এর মুখটা আমার চোখের সামনে ভাসছিলো, বারবার তার চলে যাবার কথা মনে হচ্ছিলো, কখন যে রক্ত নেয়া শেষ, বুঝতে পারিনি, ডাক্তার এর কথাতে জানতে পারলাম রক্তদান শেষ।

এখনও আমরা ফেব্রুয়ারি মাসে, ক্যাডেট কলেজ ক্লাব এ জহির এর স্মরণে স্বেচ্ছায় রক্তদান করার আয়োজন করি, কিন্তু প্রত্যেক মানুষের ওজন, প্রেশার চেক করে এবং এর সাথে আরও কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে তবেই রক্ত নেয়া হয়ে থাকে।

আল্লাহ আমাদের প্রিয় জহির কে বেহেস্ত নসিব করুক।

আমরা এমন একটি দেশে বসবাস করি, যেখানে নিজেকে সতর্ক থেকে সব কিছু করা উচিৎ। উপরের ঘটনা থেকে আমাদের জন্য অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে।

৭৩৭ বার দেখা হয়েছে

৪ টি মন্তব্য : “একটি নিঃস্বার্থ মৃত্যু এবং আমার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।