হাশেম মামা

প্রায় ২ বছর পর নানা বাড়ি তে গেলাম। তাও আবার মাত্র ৪ ঘন্টার জন্য। গ্রাম আসলে আগের মত নেই। বাড়ি ঘর সব পাকা। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বোধহয় দেখা যায়, এমনই মনে হল। ঘুরলাম ফিরলাম আর দেখলাম।
চলে আসার আগে আগে হঠাত হাশেম মামাকে দেখলাম। হাশেম মামা একজন কৃষক, সব সময় আমার নানা বাড়িতে আসতেন। আমরা যখনই নানা বাড়ি যেতাম উনি এক বার হলেও আমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন। উনার ৩ মেয়ে ছিল খুব সুন্দরি। স্পেশালি রত্না আপু। আমার আম্মু তাই বারবার মামাকে বলতেন মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে যেন ১ টা ভাল জায়গায় বিয়ে দেন। হাশেম মামার একই কথা, “ও দেখা যাবে।”
দেখা হতেই হাশেম মামা কে বাড়িতে আসতে বল্লাম। হাশেম মামার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল খুব অসুস্থ। হাটার ভঙ্গী দেখে হাসি পাবে। যেন কার্টুন হয়ে গেছেন। মামা ঘরে ঢুকতেই আম্মু আমাকে বলল, “জানো, হাশেমের মেয়েকে ওর শশুড় বাড়ির লোক মেরে ফেলছে।” ধাক্কা খেলাম।
এরপর হাশেম মামা নিজ মুখে বলতে শুরু করলেন।। “আমার মেয়েডার মাইর ফেইলেছে। আমি উকে বুইলছিলাম তুই আর জাইস নে। আমার কতা কিছুতি শুইনল না। আগের বার জখুন আইশলো, আমার বুইল্লো আব্বা ৫০ হাজার টেকা দেও সব ঠিক হই যাবেনে। আমি কিশোক মানুষ। কত কস্ট কইরে টেকা গুনু দিলাম। তাউ উরা ছড়িনি। শেষবারের বেলায়উ যখুন আইশলো মেয়ের আমি বারবার কইরে বুল্লাম যাইশ নে। ও কিছুতিই শুইনল না। উর এক্টাই কতা, আমার ছোট ছেইলেডার কি হবে। তারপর একদিন মাঠে কাজ করতি গিয়ে শুনি মেয়ে আমার মইর গিয়েছে।”
পুলিশ বা আইনের আশ্র্রয় নিয়েছেন কিনা জিজ্ঞেস করলাম মামা কে। মামা বল্লেন পুলিশ শুধু বলে ‘আপনার কেস ত আছে।’ এই পর্যন্তই।
হাশেম মামা কান্না কি ভুলে গেছেন। চোখ দিয়ে একটা বার ও পানি দেখলাম না। কিন্তু তার প্রত্যেকটা কথায় অশ্রু ছিলো। তার কার্টুনের মত হাটাও একই কারনে। মানুষটা পঙ্গু হয়ে গেছে।
হাশেম মামা বলতে লাগলেন, “ময়না তদন্ত করি নি আস্লাম ৭০০ টেকা খরচ কইরে। তাউ কিছু হইল না। আমি আর কার কি বুইল্ব।”
আসলেই হাশেম মামা কাকে কি বল্বেন। উনি গরিব কৃষক। আমাদের ডিজিটাল দেশে ডিজিটাল মানুষের জন্য আইন। এনালগ হাশেম মামার চিন্তা করে কে সময় নস্ট করবে। তবে নিজেকে আমার খুবই অসহায় মনে হল। বারবার মনে হল আমার কি কিছুই করার নেই??
আসলে আমার কিছুই করার নেই। শুধু CCB তে ১ টা ব্লগ লেখার বেশি আমার করারই বা কি আছে। তবে ১ টা অনুরোধ সবার কাছে, এই ডিজিটাল যুগেও কেউ প্লিজ এনালগ এই হাশেম মামাদের ভুলে যাবেন না।

(সত্যি ঘটনা)

৫৮০ বার দেখা হয়েছে

২ টি মন্তব্য : “হাশেম মামা”

  1. নাজমুল (০২-০৮)

    কোন লেখা খুজে পাচ্ছিনা মন্তব্য করার জন্য, ইনশাল্লাহ আমরা এই লোকদের কথা সবস্ময় মনে রাখবো, আর এইসব মেয়েদের জন্য কিছু করতে পারলে খুব ভালো লাগবে 🙂

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।