সাত দিনের পথ – নিরাময় পর্ব

মন খারাপ থাকাটা কোন রোগ না। খারাপ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। আমার তো প্রায় সব সময়ই মন খারাপ থাকে, হটাৎ হঠাৎ ভাল হয়ে যায়। যাহোক, মন খারাপ যদি কোন রোগ না হয় তাহলে এই পর্বের নাম নিরাময় দিলাম কেন? যেখানে নিরাময় সেখানেই তো রোগ। তেমন কোন কারণ নেই। তবে নিজে নিজে একটা কারণ বানালাম, সাত দিনের পথ যে বিষাদ পর্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল তাতে মন খারাপটা রোগ হিসেবেই দেখা দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল এই রোগের নিরাময় না হলে ক্যাডেট জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। আশাকরি নিরাময় পর্বের শানে নুযুল ব্যাখ্যা করতে পেরেছি। এবার নিরাময়ের কাহিনী শুরু করা যাক।

কলেজ গেট পেরিয়ে বাস ডান দিকে মোড় নিল। গেট পার হওয়ার সময় সাধারণত সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠে। সেই ক্লাস সেভেনেও তো আমরা এমনটি করেছিলাম। কিন্তু সেবার করিনি, কেউ না। কিছুক্ষণ পর ফরহাদ ভাই (হেল্পার) গান ছাড়লো। লাভের লাভ কিছুই হলো না। এমনকি গানের শব্দ সবার কাছেই বিরক্তিকর লাগতে শুরু করলো, মনের কি আশ্চর্য মিল। এদের মধ্যে কি করে ঝগড়া হয়েছিল ভেবেই পাই না। যাহোক, সামনে থেকে কেউ উঠে গিয়ে গান বন্ধ করে দিল। বাসের মধ্যে সুনসান নিরবতা, ইতিহাস তৈরী করলো যেন। যথারীতি চান্দনায় গিয়ে আবার ডানে মোড়, তারপর বামে মোড় নিয়ে আশুলিয়া রোড।

এর আগে জীবনে মাত্র তিন বার ঢাকা এসেছিলাম। আশুলিয়ার এই রাস্তা দেখেছিলাম মাত্র ১ বার। এসএসসি’র পর মেকা থেকে আমাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল মেকা অফিসে। তখন এদিক দিয়েই গিয়েছিলাম। সে সময় বর্ষাকাল ছিল, আশুলিয়ায় রাস্তার দু’ধার ছিল পানির নিচে। সমুদ্রের (!) মাঝে কিছু বিলবোর্ড, এ দেখেই কত না বিস্মিত হয়েছিলাম। এবার অবশ্য রাস্তার দুপাশ তেমন ছিল না, বর্ষা কবেই শেষ হয়ে গেছে, শীত আসি আসি করছে, এর মধ্যে এতো পানি কোথায় পাব? তারপরও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম, প্রায় পুরোটা সময়।

বাস এক সময় আবদুল্লাহপুর উঠল আর আমার টনক নড়ল। খেয়াল করলাম, বাসের সেই নিরবতা আর নেই। আমার মধ্যে ইতোমধ্যে নিরাময় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। নিরাময়ের কারণ কখনও ভেবে দেখিনি। তবে মহিব কয়েকদিন আগে একটা কথা বলেছিল, “মন ভাল করার জন্য কারণ লাগে না। খারাপ মন নিয়ে কিছুক্ষণ পড়ে থাকার পর এমনিতেই ভাল হয়ে যায়।” আমার অবশ্য এটা মনঃপুত হয়নি। আমি মহিবকে প্রশ্ন করেছিলাম, গান শুনলে কি মন ভাল হয়? মহিব একদম উড়িয়ে দিয়ে বলল, মোটেই না। মন ভাল করার নাকি কোন উপায় নেই। মন যেন এক সরল ছন্দিত স্পন্দন, কিচ্ছু করার নেই। এভাবেই হয়তো আমি সাত দিনের পথের সাপেক্ষে সুস্থ হতে শুরু করেছিলাম। সবাই হতে শুরু করেছিল। ফজলুলিয়ানদের কেউ কেউ উঠে এসে পিছনে আমাদের সাথে যোগ দিল। হালকা পাতলা আড্ডা শুরু হলো। ঢাকার রাস্তার কোলাহল যদিও সেটাকে ছাপিয়ে গেল।

দেখতে দেখতে খিলক্ষেত পেরিয়ে বিশ্বরোডের মোড়ে হাজির হলাম। বাস বামে মোড় নিল। তার মানে মালিবাগ-খিলগাঁও হয়ে যাবে। তৎক্ষণাৎ আলম আর রেজওয়ান সরব হয়ে উঠল। কারণ তাদের বাসা মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, যাওয়ার সময় নাকি দেখা যাবে। আমার মতো যারা জীবনে ঢাকা দেখেনি তাদেরকে কিছু দেখানোর জন্য অনেকেই উৎসুক হয়ে উঠল। কিন্তু বাস তখনই থেমে গেল। বিশ্বরোডের মোড়ে যে সিএনজি স্টেশন আছে সেখানে। সিএনজি তো দূরের কথা, তখন পর্যন্ত সেখানে পেট্রোল পাম্পই গজায়নি, কাজ চলছে।

থামার কারণ সম্বন্ধে কারও কোন ধারণাই নেই, কিছু ক্যাডেট কলেজীয় গ্যাজ অবশ্য ছড়িয়ে গেল। আর কলেজে যেমন হয়, কিছুক্ষণ গ্যাজ ছড়ানোর পর সত্যটাও উঠে আসে। তেমনি এক সময় সত্যটা উঠে আসল। নিষ্ঠুর সত্যটা শুনলাম কলেজ মাইক্রো আসার পর। মাইক্রোতে ছিলেন অ্যাডজুটেন্ট, ভিপি আর অ্যাডজুটেন্টের বউ। জর্ডান (অ্যাডজুটেন্টের বউকে আমরা নাম ধরেই ডাকতাম, ভদ্রতা করার টাইম নাই) সম্পর্কে এতোক্ষণ কিছু বলিনি, কারণ মুড ছিল না। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নাই, আমাদের মন খারাপের অন্যতম প্রধান ঔষধ ছিলেন তিনি। সবাই ভাবছিল, ভাই মন যতই খারাপ থাক জর্ডানকে কেন্দ্র করে আগে যেসব হতো সাত দিনেও নিশ্চয়ই সেসব বন্ধ হবে না। তার মানে কি? পোলাপানের মনও এরকম থাকবে না।

কিন্তু এ কি হল! মাইক্রো থেকে সবাই নামলেন। ১০ মিনিটের মধ্যেই আরেকটা প্রাইভেট কার এল। অ্যাডজুটেন্ট দুই প্যাকেট মিষ্টি কিনলেন। বাচ্চাকে কোলে নিলেন, আমরা ভাবলাম বাচ্চা নিয়ে তো এক্সকারশনে যেতে পারবে না। কাহিনী কি? তারপর দেখলাম, বাচ্চা নিয়ে প্রাইভেট কারে উঠে বসল জর্ডান। মিষ্টির প্যাকেট দুটোও তাকে দেয়া হলো। আর আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। সত্য কাহিনী এটাই। অ্যাডজুটেন্টের বউ আমাদের সাথে যাবেন না। এ পর্যন্ত এসেছেন কেবল। বাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়িতে থাকবেন, এজন্যই জামাইয়ের পক্ষ থেকে দুই প্যাকেট মিষ্টি।

পাঠক হয়তো ভয় পেয়ে গেছেন। ভাবছেন, আমাদের নিরাময় বুঝি আর হলো না। কিন্তু কাহিনী এটাও না। আসল কাহিনী হল, আমরা ততক্ষণে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছি। কারণ বিশ্বরোডের মোড়ে আধা ঘণ্টা আমরা যা করেছি তাতে মেজাজ ভাল না হয়ে পারেই না। তেমন কিছু অবশ্য করি নাই। এক লাইনে দাড়িয়ে নির্মীয়মান পেট্রোল পাম্পের অপেক্ষাকৃত শান্ত জায়গাটিতে প্রকৃতির ছোট্ট ডাকে সাড়া দিয়েছি কেবল। এক ফাঁকে জর্ডানের বেশ কটি ছবিও তোলা হয়েছে। জর্ডান মাইক্রোর পাশে দাড়িয়ে সেলিম রেজা স্যারের সাথে হাসি হাসি মুখে কথা বলছে, এই ছবিটাই সবচেয়ে ভাল এসেছে। ক্যামেরাম্যানের নামটা বললাম না।

তো এভাবেই আমরা আরোগ্য লাভ করলাম। আমাদের নিরাময়ের জন্য জর্ডানকে লাগে নি। লাগবে কেনঅঅঅঅঅঅঅঅ? ভাই, ছয় বছরের জীবনে ইলেভেনের এক্সকারশন একটাই, তাও আবার অনেকদিন থেকে এটার জন্যই অপেক্ষা করছি। তাই সুস্থ না হয়ে উপায় ছিল না।

সময় মতো উচ্ছল ৫০টা টিন বাসে উঠল। এবার আর পায় কে! ঢাকার কোলাহলমুখর রাস্তাও আর আমাদের ছাপিয়ে যেতে পারল না। মালিবাগ আসার পর আলম আর রেজওয়ান অনেক কষ্টে তাদের বাসা দেখানোর চেষ্টা করল। আমি অবশ্য মনোযোগ দিয়ে দেখলাম না। কারণ, টাইম নাই। এখন কক্সবাজার আর রাঙ্গা মাটির স্বপ্নে বিভোর আছি, ঢাকার ঘিঞ্জি বসতবাড়ি দেখার আসলেই কোন টাইম নাই।

*****

< < আগের পর্ব: বিষাদ

১,৫২১ বার দেখা হয়েছে

১৫ টি মন্তব্য : “সাত দিনের পথ – নিরাময় পর্ব”

    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      মেজর শহীদরে আপনারা বোধহয় পান নাই। উনার স্ত্রীর নাম জর্ডান। জার্ডানের বাবাও আর্মি অফিসার। জর্ডান দেশে মিশনে থাকাকালে জন্ম বলেই নাম জর্ডান। এইটা অবশ্য গ্যাজ। নামকরণের আসল রহস্য জানা নাই।

      জবাব দিন
    • মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

      ব্যাকগ্রাউন্ড হল, উনি বিশেষ আকর্ষণীয় ছিলেন। ক্যাডেটরা সময়ে অসময়ে খালি তাকাতে চাইত। একবার মনে আছে,
      অ্যাথলেটিক্স প্র্যাকটিসের সময় আমি হ্যামার নিয়া অনেক কষ্টে সৃষ্টে থ্রো করতেছি। হঠাৎ দেখি আমার চারপাশে জনতার ভীড়। কাহিনী কি? আমার হ্যামার থ্রো নিশ্চয়ই দেখতে আসে নাই। পড়ে বুঝলাম। জর্ডান বাসার ওপেন এয়ার পোর্চে আসছে। তাই দেখতে সবার ভীড়। উল্লেখ্য, আমি বাস্কেটবল গ্রাউন্ডের পাশেই প্র্যাকটিস করতেছিলাম।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।